‘মৃত্যু বুকে নিয়েই ঘুমায়’ সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা!

বে ইনসাইট রিপোর্ট

মধ্যরাতে যখন বিশ্বের বহু মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় চোখ রেখেছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নেমে আসে অন্য এক বাস্তবতা। টানা ভারী বৃষ্টিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আটজন রোহিঙ্গা। একই রাতে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়।

কিন্তু মৃত্যুর এই হিসাবের বাইরেও বড় হয়ে উঠছে আরেকটি প্রশ্ন- আজ রাতেও কি লাখো মানুষ পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বুকে নিয়েই ঘুমাতে যাবে?

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৪ জন রোহিঙ্গা অর্থাৎ ৮৪ হাজার ৩৮১টি পরিবার এখনও এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেগুলো বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

“শান্তি যেন কোথাও নেই”

“বেশি বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মানুষগুলো ভয়ে থাকে কখন পাহাড় ভেঙে পড়ে। আর আমাদের এখানে ভয় কখন পানি উঠে আসে। শান্তি যেন কোথাও নেই।”

উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদের কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্বের ভার।

ক্যাম্প-৫ তুলনামূলক সমতল এলাকায় হলেও টানা বৃষ্টিতে সেখানেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকেছে, চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে তুলনামূলক উঁচু জায়গায়।

বে ইনসাইটের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্যাম্প-৫-এর আরও তিন মাঝি—মনা মিয়া, শবির আহামদ ও দই মাঝি। তাঁদের ভাষ্য, শুধু এই ক্যাম্পেই অন্তত ২০০টি আশ্রয়ঘর প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ ব্লকের এ-৩ সাব-ব্লকে।

প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, “ক্যাম্প ইনচার্জের পক্ষ থেকে কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘরটাই তো আমাদের শেষ আশ্রয়। দুর্যোগ এলে সেটাও ছেড়ে যেতে হয়। আমাদের দুর্গতির যেন শেষ নেই।”

ক্যাম্প-৫-এর বাসিন্দা মনা মিয়া বলেন, “সারারাত বৃষ্টি হলেই ঘুম আসে না। কখন খবর আসে পাহাড় ধসে পড়ার, আবার কখন ঘরে পানি ঢুকে যায়, এই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। বাচ্চাদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে।”

একই ক্যাম্পের সাব মাঝি শবির আহামদ বলেন, “এবারের বৃষ্টিতে অনেক ঘরে পানি ঢুকেছে। মানুষ কাপড়, খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু করে রাখছে। কেউ কেউ আত্মীয়ের ঘরে গিয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করছে।”

আরেক সাব মাঝি দই মাঝি বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই ভয় নিয়ে থাকতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু যাওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা সবার জন্য নেই।”

তিন ঘণ্টায় তিন পাহাড়ধস

রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার তিনটি আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যু হয়।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং শিশুও।

‘বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই’

পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরে সোমবার সারদিনই বৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই দুপুরের দিকে নিজের আশ্রয়ঘরের দিকে কাঁধে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে ফিরছিলেন নুরুল ইসলাম।

মধ্যবয়সী এই রোহিঙ্গা বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) কার্যালয় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়। তবে অনেকেই সেই নির্দেশ মানতে চান না।

“যেখানে যেতে বলে, সেখানেও তেমন সুবিধা নেই। তাই অনেকেই যেতে চায় না,” বলেন তিনি।

সোমবার রাত কোথায় কাটাবেন এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুক্ষণ নীরব থেকে নুরুল ইসলাম বলেন, “দেখি, কোনো আত্মীয়ের ঘরে যেতে পারি কি না।”

ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি কী ধরনের সহায়তা চান- এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার ক্লান্তি।

তিনি বলেন, “বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই, ভাই।”

‘দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ এখনও ঝুঁকিতে’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে তিনটি পৃথক স্থানে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ক্যাম্প-৭-এ এক শিশু, ক্যাম্প-১১-তে চারজন এবং ক্যাম্প-১৫-এ তিনজন প্রাণ হারান।

তিনি জানান, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর মধ্যে ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

“কমপক্ষে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ বর্তমানে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে”

মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। তবে গত দুই বছরে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর ভাষায়, অনেকেই বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিজেদের মতো করে আশ্রয় নির্মাণ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেও বসতি গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ক্যাম্প-১১-তে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেটিও এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নির্মিত আশ্রয়কে কেন্দ্র করে।

আরআরআরসি বলছেন, সবচেয়ে বড় সংকট হলো পর্যাপ্ত নিরাপদ জায়গার অভাব।

তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ জমির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার এখনও পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।

৭৬টি দুর্যোগ, পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

ইউএনএইচসিআরের কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েট মোশারফ হোসেন জানান, ৪ থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে মানবিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শিবিরে ৭৬টি আবহাওয়াজনিত ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ২১টি ছিল পাহাড়ধস।

এসব ঘটনায় ৫ হাজার ২৪৯ জন রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন, আহত হয়েছেন ছয়জন এবং ৩৮৬ জনকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর মানবিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জরুরি সহায়তা, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বর্ষার আগেই প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু…

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা শুরুর আগেই বিভিন্ন সংস্থা পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, রিটেইনিং ওয়াল ও গাইড ওয়াল নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ, সরিয়ে নেওয়ার মহড়া এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরাই দুর্ঘটনার সময় প্রথম ঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রতিবেশীদের সতর্ক করা, মানুষ সরিয়ে নেওয়া, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে সংস্থাটি বলছে, এসব উদ্যোগ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হলেও তা পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

অর্থসংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রস্তুতি

ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখনও বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী বসতিগুলোর একটি। অনেক পরিবার খাড়া পাহাড়ের ঢালে বাস করছে এবং তাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের মতো পর্যাপ্ত জমিও নেই।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থসংকট।

সংস্থাটি জানিয়েছে, অর্থায়নের ঘাটতির কারণে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়ঘর শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের পরিসর কমিয়ে আনতে হয়েছে।

২০২৬ সালের যৌথ মানবিক সাড়া পরিকল্পনার আওতায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা এবং তিন লাখের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের একাধিক কর্মসূচি ইতোমধ্যে সীমিত করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।

রেকর্ড বৃষ্টি, সামনে আরও শঙ্কা

কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত ৩৩ ঘণ্টায় ৩৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে উখিয়ায়। তবে সেখানে কত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

আবহাওয়া অফিস বলছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের প্রভাবে আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

অর্থাৎ, পাহাড়ধসের আশঙ্কা এখনও কাটেনি।

আরেকটি দীর্ঘ রাত

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে এখন ভয় দুই রকম।

পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের আতঙ্ক ‘কখন মাটি ধসে ঘরের ওপর নেমে আসে’।

আর নিচু এলাকার মানুষের ভয় ‘কখন বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়’।

এক রাতে নয়জনের মৃত্যু হয়তো একটি সংখ্যা।

কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে এখনও ৩ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করছেন, যেগুলোকে মানবিক সংস্থাগুলো নিজেরাই বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে।

তাই কক্সবাজারে বর্ষার প্রতিটি রাত এখন শুধু একটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়,হাজারো পরিবারের কাছে সেটি ঘুম আর অনিশ্চয়তার মধ্যকার এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।

কক্সবাজারে পাহাড়ধসের বিভীষিকা, একরাতেই প্রাণ গেল ৯ জনের

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রবল বর্ষণে একের পর এক পাহাড়ধসে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও কক্সবাজার শহরে পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত নয়জন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী (ক্যাম্প-১৫) রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের চারটি স্থানে এবং কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনও কাটেনি। অনেক রোহিঙ্গা পরিবার পাহাড়ের ঢালে বসবাস করায় নতুন করে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে রাত দেড়টার দিকে উখিয়ার জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে কামাল হোসেনের ঘরের ওপর। ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে মারা যান কামাল হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমাইরা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। একই পরিবারের আরও দুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর কিছুক্ষণ পর, রাত দুইটার দিকে কুতুপালংয়ের ৭ নম্বর আশ্রয়শিবিরের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে মারা যায় সাত বছর বয়সী একরাম। সে রশিদ উল্লাহর ছেলে।

রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরের সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই ভাই—রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ভোর পর্যন্ত অভিযান চালায়। ভারী বৃষ্টি ও কাদার কারণে উদ্ধারকাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে ভোর সাড়ে চারটার দিকে কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়। আলী আকবর (৫০) নামে ওই ব্যক্তির বাড়ির ওপর পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।

সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান,  আলী আকবর ও পরিবারের আরও দুজন মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরিবারের অন্য দুই সদস্য চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাম্পে মাইকিং করে সতর্কবার্তাও প্রচার করা হচ্ছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা কিংবা খাড়া ঢালে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টানা বর্ষণে মাটি নরম হয়ে গেলে মুহূর্তেই ধসে পড়ে পাহাড়ের অংশ, আর ঘুমন্ত মানুষের জন্য তা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী ফাঁদ।

টেকনাফের ওপারে মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে বিমান হামলা

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রায় সাত মাস বিরতির পর বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। বুধবারের হামলার বিস্ফোরণের শব্দ বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তজুড়ে শোনা যায়। এতে সীমান্তবর্তী জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার কিছু পরে পরপর চারটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় টেকনাফের জাদিমুরা থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে।

শাহপরীর দ্বীপের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাম বলেন, প্রথম বিস্ফোরণের সময় তাঁর মনে হয়েছিল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। এরপর পরপর চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন এবং নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের ভেতরে আগুনের শিখা দেখতে পান।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ বলেন, দীর্ঘদিন শান্ত থাকার পর রাখাইনে আবারও সংঘর্ষ ও বিমান হামলা শুরু হয়েছে। এর প্রভাব সীমান্তের বাংলাদেশি জনপদেও অনুভূত হচ্ছে। বিস্ফোরণের শব্দে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ছবিঃ সংগৃহীত

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আনিক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ টেকনাফ সীমান্তে শোনা গেছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, প্রশাসনের কাছে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের সময় মর্টার শেল বিস্ফোরণ ও ভারী গোলাগুলির শব্দ উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তজুড়ে শোনা গিয়েছিল। এরপর কয়েক মাস ধরে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান অভিযান অনেকটাই কমে গিয়েছিল। বুধবারের হামলার মধ্য দিয়ে আবারও সেই নীরবতা ভাঙল।

রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক দাবি করেছে, বুধবার বুথিডং উপজেলার কিয়েত মাউক তাউং (মুসলিম) গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ও একটি ওয়াই-১২ (Y-12) উড়োজাহাজ ব্যবহার করে দুটি ৫০০ পাউন্ডের বোমা নিক্ষেপ করে।

সংস্থাটির দাবি, ওই হামলায় প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি এবং ১২ বছর বয়সী দুই শিশু আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুয়ে দুল আরমিন, মার মাত আর রাউত এবং উ আরমিন হু সাং। তাদের মধ্যে সুয়ে দুল আরমিনের বাম পায়ের উরুর হাড় ভেঙে গেছে বলে জানানো হয়েছে। অন্য শিশুটি তলপেটে এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ডান ভ্রুর কাছে স্প্লিন্টারের আঘাত পেয়েছেন। গুরুতর আহত শিশুটিকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।

ছবিঃ সংগৃহীত

গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক আরও দাবি করেছে, ভারী বৃষ্টির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা হামলার আগে যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনতে পাননি। পরপর দুটি বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পর পুরো গ্রাম কেঁপে ওঠে এবং বিস্ফোরণের অভিঘাত ও স্প্লিন্টারে অন্তত ১০টি মুসলিম পরিবারের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।

তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে গত ২৪ জুন মংডু শহরে দুটি ৫০০ পাউন্ডের বোমা নিক্ষেপ করা হয় বলে একই সূত্রের দাবি। এতে দুই শিক্ষার্থী আহত হন এবং ১০টির বেশি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এছাড়া ১৭ জুন কিয়াউকতাও শহর ও লান মা দাও গ্রামে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বিমান হামলায় নয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং অন্তত ১৮ জন আহত হন বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাখাইনের বিভিন্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলার মাত্রা আবারও বেড়েছে। এতে বেসামরিক মানুষের হতাহত এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে কয়েকটি রোহিঙ্গা-সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বুথিডং ও মংডুতে সাম্প্রতিক বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ছবিঃ সংগৃহীত

কার্যক্রম নিষিদ্ধ তাতেও প্রকাশ্য বিভক্তি কক্সবাজার আওয়ামী লীগে

প্রতিবেদক | বে ইনসাইট

কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই নীরব কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। তবে মাঠে না থাকলেও দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সম্প্রতি টেলিগ্রামে ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঝড়।

জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ দলীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন, কেউ আবার অতীতের নির্বাচনী ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য, এমনকি আর্থিক অনিয়ম নিয়েও অভিযোগ তুলছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দলটির ভেতরে থাকা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে।

অডিওতে কী শোনা গেছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানকে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। সেখানে তিনি নাম উল্লেখ না করলেও বক্তব্যের বিভিন্ন অংশে কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমানকে ইঙ্গিত করেছেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মনে করছেন।

অডিওতে মুজিবুর রহমান বলেন, দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, ব্যক্তিগত মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তিনি তার পক্ষেই কাজ করেছেন। এমনকি নিজের নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে।

তিনি শেখ হাসিনাকে বলেন-

আপনি আমাকে মেয়র নির্বাচন করার জন্য দেন নাই, যাকে দিছেন তার পক্ষে আমি কাজ করে তাকে নির্বাচিত করেছি। তারপরদিন আমার সঙ্গে বেইমানি… আমার আপন চাচাতো ভাই নির্বাচন করছিল, শুধু আপনার দিকে তাকিয়ে আমি পরিবারের সঙ্গে বেইমানি করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি।

কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আরও বলেন-

এখনো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লিখতেছে। কই, জামাতের বিরুদ্ধে তো কেউ লেখে না।

অডিওতে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি শেখ হাসিনাকে জানান, তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ এবং চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে পাঠাতে সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকার কথাও উল্লেখ করেন।

মাহবুবুর রহমানের পাল্টা জবাব

অডিও প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমান নিজের ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন।

তিনি দাবি করেন, বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না করায় তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। একই পোস্টে তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, মুজিবুর রহমানই বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে দেশে অবস্থান করছেন।

মাহবুবুর রহমান আরও লেখেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে ইতোমধ্যে তার একাধিকবার কথা হয়েছে এবং দলীয় প্রধান সবকিছু জানেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মুজিবুর রহমান নৌকা প্রতীকের পরিবর্তে অন্য প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে তার কাছে প্রমাণ রয়েছে, যা সময়মতো প্রকাশ করবেন। তিনি সেখানে লিখেন- ‘তিনি হ্যালমেট মার্কায় জগদীশকে ভোট দিয়েছে।’ পাশাপাশি গত দুই বছরে দলীয় কর্মীদের সহায়তার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও তোলেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি স্ট্যাটাসে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যুবলীগ নেতাদের প্রকাশ্য অবস্থান

বিতর্কে যোগ দিয়েছেন জেলা যুবলীগের কয়েকজন নেতাও।

যুবলীগ নেতা শোয়াইব ইফতেখার এক ফেসবুক পোস্টে মাহবুবুর রহমানের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক সংকটের সময়ে সাবেক মেয়র দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যারা নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তাদের দলে রাখা হলে আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে পারবে না।

অন্যদিকে যুবলীগ নেতা মোনাফ সিকদারও একটি ফেসবুক পোস্টে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে কটাক্ষ করে লেখেন, টেলিগ্রাম গ্রুপে তাকে সহযোগিতা করা নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে তিনি মুজিবুর রহমানের রোষানলে পড়েছেন।

এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আরও কয়েকজন নেতা বিভিন্ন পোস্টে কোনো না কোনো পক্ষের সমর্থনে অবস্থান নিয়েছেন। কোথাও সাংগঠনিক শুদ্ধির দাবি উঠেছে, কোথাও আবার বর্তমান নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রকাশ্যে দলীয় বিভক্তি

গত কয়েক দিনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দলটির অন্তত দুটি স্পষ্ট অবস্থান তৈরি হয়েছে।

একটি অংশ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে সাংগঠনিকভাবে প্রয়োজনীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরছে।

অন্য অংশটি সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমানকে কেন্দ্র করে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, কক্সবাজারে তৃণমূলের বড় একটি অংশ এখনও তার নেতৃত্বে আস্থা রাখে।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।

কথা বলতে রাজি নন কেউ

বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক বর্তমান ও সাবেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

তাদের কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ সম্ভব হলেও কেউই গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কেউ কেউ বলেন, “এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে চাই না।”

অন্যদিকে, যাদের অনেকেই সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদেরই ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ নিয়ে একাধিক প্রকাশ্য পোস্ট দেখা গেছে।

পুরোনো দ্বন্দ্বের নতুন প্রকাশ?

তবে দলটির স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছে বে ইনসাইটের সাথে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ার পর দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে টেলিগ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক যোগাযোগই এখন অনেক নেতার প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেই প্ল্যাটফর্মেই নেতৃত্ব, আনুগত্য, অতীতের নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসছে।

ফলে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল দলীয় বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তা দৃশ্যমান রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

তবে ফেসবুকে দেওয়া বিভিন্ন পোস্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নেতাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প : মৃত্যু ভয়ে বর্ষা এলো বলে

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

উখিয়ার ক্যাম্প-২০-এর পাহাড়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করলেই সেনোয়ারা বেগমের রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়।

কারণ সেনোয়ারার কাছে বর্ষার আগমন আর কেবল ঋতু পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি যেনো অনিশ্চয়তার ফিরে আসা।

বাঁশ, দড়ি ও ত্রিপলে তৈরি তাঁর ছোট্ট আশ্রয়টি একটি খাড়া পাহাড়ের ঢালের নিচে। দিনের বেলায় পাহাড়টিকে যতটা নিরীহ মনে হয়, টানা বৃষ্টির রাতে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। গত কয়েক বছরে এমন বহু পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তাই আকাশে কালো মেঘ জমলেই সেনোয়ারার মনে ফিরে আসে একটাই প্রশ্ন, এবারও কি পাহাড়টি টিকে থাকবে?

“কাছাকাছি নিরাপদ কোনো জায়গা নেই,” বলেন তিনি।

“সহায়তা সংস্থাগুলো যখন অন্যত্র যেতে বলে, তখন যে জায়গার কথা বলে, সেটা আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন আর পরিচিত পরিবেশ থেকে অনেক দূরে। আমরা সেখানে যেতে চাই না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালগুলো যদি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেত।”

সেনোয়ারার এই আশঙ্কা বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়। উখিয়া ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরে হাজারো পরিবার প্রতিদিন এমন বাস্তবতার মধ্যেই বসবাস করছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতিতে জায়গার তীব্র সংকটের কারণে বহু পরিবারকে আশ্রয় নিতে হয়েছে খাড়া পাহাড়ের ঢালে কিংবা তার ঠিক নিচে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বনভূমি কেটে গড়ে তোলা হয়েছে এসব বসতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠনও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর বর্ষা এলেই সেই ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

প্রতিটি ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের মাটি আরও আলগা হয়। কোথাও ছোট ছোট ফাটল দেখা দেয়, কোথাও ধসে পড়ে মাটির অংশ। অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি পুরো ঢাল ভেঙে চাপা পড়ে যেতে পারে একাধিক ঘর।

প্রতি বর্ষাতেই ফিরে আসে পুরোনো শঙ্কা

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

শুধু ২০২৪ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন, যা ওই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। আর চলতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।

বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের জনযোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, “২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৮০ জন।”

তিনি বলেন, “অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল এখনো যথাযথভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্ষাকালে শরণার্থী পরিবারগুলোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস সাধারণত কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করলে ঘটে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে সেই প্রায় সবগুলো কারণই বিদ্যমান- খাড়া ঢাল, বন উজাড়, দুর্বল মাটি, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অত্যধিক জনঘনত্ব।

তহবিল সংকট বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমান ঝুঁকি শুধু প্রাকৃতিক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মানবিক তহবিল সংকট।

সংস্থাটির ভাষায়, অর্থের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-হ্রাস কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, বাঁশের টেরেস নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়কেন্দ্র শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়মিত সংস্কার।

সীমিত অর্থায়নের কারণে মানবিক সংস্থাগুলোকে খাদ্য সহায়তা, পুষ্টি ও সুরক্ষার মতো জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ-প্রতিরোধমূলক অনেক উদ্যোগে কাটছাঁট করা হয়েছে।

এতে এমন বহু পাহাড়ি ঢাল রয়েছে, যেগুলো আগে নিয়মিত মেরামত ও পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল, কিন্তু এখন আর সেই কাজ আগের মতো সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানান্তরও সহজ সমাধান নয়

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটি সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।

শারি নিজমান বলেন, “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে স্থানান্তর করা দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।”

তিনি বলেন, “শিবিরগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। খালি জমি প্রায় নেই বললেই চলে। আবার অনেক পরিবার স্থানান্তরে অনীহা প্রকাশ করে, কারণ এতে তারা জীবিকার সুযোগ, বাজারে যাতায়াত এবং ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পর গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কা করে।”

ফলে অনেক পরিবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়েও একই জায়গায় থেকে যেতে বাধ্য হয়।

বৃষ্টির রাত মানেই নির্ঘুম অপেক্ষা

ক্যাম্প-৪-এর বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই তাঁদের পরিবারের মধ্যে উৎকণ্ঠা নেমে আসে।

“বৃষ্টি হলে আমি ঘুমাতে পারি না। সারারাত ভাবি, কখন পাহাড় ভেঙে পড়বে,” বলেন তিনি।

“আমি সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ের ঢালে থাকি। সব সময় ভয় নিয়ে থাকতে হয়।”

শিবিরের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকি কমানোর ছোট ছোট উদ্যোগও চোখে পড়ে। কোথাও পানি যাতে মাটি ধুয়ে না নেয়, সে জন্য ড্রেনের ওপর প্লাস্টিকের শিট বিছানো হয়েছে। কোথাও আশ্রয়ের পাশে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে। আবার কোথাও বাঁশের খুঁটি দিয়ে পাহাড়ের ঢালকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে এসবই মূলত সাময়িক ব্যবস্থা। টানা ভারী বর্ষণের সামনে এগুলোর কার্যকারিতা সীমিত।

প্রস্তুতির কথা বলছে প্রশাসন

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে প্রতিটি শিবিরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে জেলায় প্রায় ২৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সহকারী আবহাওয়াবিদ এ. বি. হান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। এতে পাহাড়ি ঢাল আরও নরম হয়ে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও তারা বিভিন্ন প্রকৌশলভিত্তিক ও প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার এবং মাটির ক্ষয় রোধে ভেটিভার ঘাস রোপণ।

তবে সংস্থাটির সতর্কবার্তা স্পষ্ট, জরুরি প্রস্তুতির পাশাপাশি পাহাড় স্থিতিশীল করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে ধারাবাহিক বিনিয়োগ না হলে প্রতি বর্ষাতেই একই সংকট ফিরে আসবে।

বর্ষা কেবল একটি ঋতু নয়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের হাজারো পরিবারের কাছে এটি এক দীর্ঘ পরীক্ষার সময়। তারা বৃষ্টি নামলে অনেকেই আকাশের দিকে তাকান না, তাকান পাহাড়ের দিকে।

কারণ তাঁদের কাছে প্রতিটি ভারী বর্ষণ মানে শুধু বৃষ্টির শব্দ নয়, তার সঙ্গে মিশে থাকে মাটি সরে যাওয়ার আশঙ্কা, রাতভর নির্ঘুম অপেক্ষা, আর ভোর পর্যন্ত বেঁচে থাকার প্রার্থনা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নীরবে বাড়ছে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হুমকি

আফজারা রিয়া

বর্ষা মানেই কক্সবাজারে স্বস্তির বৃষ্টি। ধুলোমাখা শহর ধুয়ে যায়, পাহাড়ে নামে সবুজের ছোঁয়া, সমুদ্র ফিরে পায় অন্যরকম সৌন্দর্য। কিন্তু এই বৃষ্টির সঙ্গেই প্রতি বছর নীরবে ফিরে আসে আরেকটি অদৃশ্য আতঙ্ক-ডেঙ্গু।

একটি মশা। কয়েক ফোঁটা জমে থাকা পানি। আর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে প্রাণঘাতী সংক্রমণ।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, কক্সবাজারে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এখন শহরে নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। আক্রান্তের সংখ্যা হোক কিংবা মৃত্যু দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই ক্যাম্পগুলো।

এমন বাস্তবতায় বর্ষা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ।

ঝুঁকি আছে,তবে প্রতিরোধ কঠিন নয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার বংশবিস্তার রোধ করা। তাই বাড়ি, ক্যাম্প বা আশপাশের কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা দেখা দিলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা।

ডেঙ্গুর কেন্দ্রবিন্দু এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২১ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৮১ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশই ছিলেন রোহিঙ্গা।

একই বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৭ জনের মধ্যে ৬ জনই ছিলেন ক্যাম্পের বাসিন্দা।

২০২৫ সালে সংক্রমণ কমে ৮ হাজার ৮৩৮ জনে নেমে এলেও চিত্র খুব একটা বদলায়নি। আক্রান্তদের মধ্যে ৬ হাজার ৩০৩ জনই রোহিঙ্গা, আর ১১টি মৃত্যুর মধ্যে ১০টিই ঘটেছে ক্যাম্পে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্ত ৪৫১ জনের মধ্যে ৩৩০ জনই রোহিঙ্গা। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর খবর না থাকলেও বর্ষার শুরুতেই স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকির বলে বিবেচনা করছে।

কেন এত ঝুঁকিতে ক্যাম্পগুলো?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে কয়েক লাখ মানুষের ঘনবসতি, সীমিত জায়গা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে এডিস মশার জন্য তৈরি হয়েছে আদর্শ প্রজননক্ষেত্র।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন,

আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, ডেঙ্গু আক্রান্তদের বড় অংশই রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, পানি জমে থাকা এবং দ্রুত সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্ষা সামনে রেখে রোগ নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে।

তার মতে, কুতুপালং-বালুখালী মেগা ক্যাম্প, ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশন, ক্যাম্প-৮ই, ক্যাম্প-১৩ ও ক্যাম্প-১৫ বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

ভুল ধারণাও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

ডা. ছাবের বলেন, এখনও অনেকেই মনে করেন এডিস মশা শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। বাস্তবতা ভিন্ন।

পরিষ্কার কিংবা অপরিষ্কার যে কোনো স্থির পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে।

তাই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না। ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা যে কোনো পানিযুক্ত বস্তু নিয়মিত পরিষ্কার বা উল্টে রাখতে হবে।

ক্যাম্পে চলছে সমন্বিত প্রস্তুতি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা মো. রিজওয়ানুল হক ভূঁইঞা বলেন,

বিশাল জনসংখ্যা এবং সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস, পানি জমে থাকা স্থান শনাক্তকরণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

ঝুঁকি শুধু ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ নয়

অনেকে মনে করেন ডেঙ্গু কেবল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সমস্যা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সেটি ভুল ধারণা।

২০২৪ সালে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৩৬৬ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৩৫।

অর্থাৎ কক্সবাজার সদরসহ জেলার প্রতিটি উপজেলাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় মানুষ এবং রোহিঙ্গাদের প্রতিদিনের চলাচলের কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পুরো জেলাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে সংকট

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়,

অনিয়মিত ভারী বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার ওঠানামা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি রোগ নয়; বছরের দীর্ঘ সময়ই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দিলে দেরি না করে পরীক্ষা করাতে হবে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সামান্য জ্বরকেও অবহেলা করা যাবে না।

হাসপাতাল প্রস্তুত, কিন্তু সবচেয়ে বড় ওষুধ সচেতনতা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শান্তনু জানান,

বর্তমানে সংক্রমণ কিছুটা কম থাকলেও আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। প্রয়োজনীয় স্যালাইন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রয়েছে। তবে ডেঙ্গুকে অবহেলা করা যাবে না। জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে এবং দিন-রাত সবসময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হাসপাতাল নয়, প্রতিরোধ।

ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর এর মতে, একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপ, একটি ডাবের খোসা কিংবা টবের নিচে জমে থাকা সামান্য পানিই কয়েক দিনের মধ্যে শত শত এডিস মশার জন্ম দিতে পারে। আর সেই মশাই কেড়ে নিতে পারে একটি প্রাণ।

রুটিন অডিটে ইউএনএইচসিআরের ‘জবাবদিহি’: একটি আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের শিক্ষা

ইফতিয়াজ নুর নিশান

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার জগতে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে- কে কাকে জবাবদিহি করবে? রাষ্ট্র কি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনবে, নাকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিজেরাই নিজেদের মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে? প্রশ্নটির উত্তর কখনোই একরৈখিক নয়। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম নিয়ে জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর (ওআইওএস) যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেটি এই বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয়- জবাবদিহি শুধু সমালোচনার ভাষা নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধন হওয়ারও ভাষা।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট এখন প্রায় এক দশকের বাস্তবতা। ২০১৭ সালের পর কক্সবাজারে যে বিশাল মানবিক সহায়তা কাঠামো গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে তার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।

আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমেছে, দাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে, বিশ্বের নানা প্রান্তে নতুন নতুন সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী প্রায় বারো লাখ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে ওআইওএস-এর অডিট রিপোর্টটি শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়; এটি একটি আয়না, যেখানে একই সঙ্গে সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রতিবেদনটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কোনো প্রতিপক্ষের অভিযোগও নয়। এটি জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরকার স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার ফল। তাই এর পর্যবেক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হয়।

অডিটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কৌশলগত পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও স্যানিটেশন, জীবিকা কর্মসূচি, অংশীদার নির্বাচন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় একাধিক দুর্বলতা ছিল। কোথাও পরিকল্পনার ঘাটতি, কোথাও সমন্বয়ের অভাব, কোথাও সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, আবার কোথাও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতা।

এসব দুর্বলতা কেবল নীতিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; মাঠপর্যায়েও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।

অডিটে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ এসেছে, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও রোগীর তুলনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা বেশি, কোথাও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল, আবার কোথাও ওষুধ ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার ঘাটতি ধরা পড়েছে। মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সম্পদের অভাব যেমন সমস্যা, বিদ্যমান সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারও তেমনি বড় প্রশ্ন।

একইভাবে, কিচেন সেট, রান্নার সামগ্রী, বালতি, স্লিপিং ম্যাটসহ বিভিন্ন নন-ফুড আইটেমের গুদাম ব্যবস্থাপনা ও বিতরণেও অসঙ্গতি উঠে এসেছে। অনেকের কাছে একটি প্লেট, একটি হাঁড়ি বা একটি চামচের হিসাব তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু শরণার্থী জীবনে এগুলো বিলাসিতা নয়, মৌলিক প্রয়োজন। ফলে এসব সামগ্রীর হিসাবের গরমিল কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি সহায়তা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন।

পানি ও স্যানিটেশন খাতেও একই চিত্র। কোথাও ন্যূনতম মান নিশ্চিত হয়নি, কোথাও অবকাঠামো নির্মাণ হলেও তার পূর্ণ ব্যবহার হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে এমন দুর্বলতা শুধু সেবার মানকেই প্রভাবিত করে না, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

এসব পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।

তবে এই অডিটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত দুর্বলতার তালিকা নয়; বরং সেগুলোর প্রতি ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া।

অনেক প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার মুখে প্রথমে অস্বীকার করে, পরে ব্যাখ্যা দেয়, শেষে দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। ইউএনএইচসিআর অন্তত এই অডিটের ক্ষেত্রে সে পথ বেছে নেয়নি।

সংস্থাটি আটটি সুপারিশই গ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি সুপারিশ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কী কাজ চলমান এবং কোন সময়ের মধ্যে তা শেষ হবে—সেটিও বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক।

তবে এখানেই আলোচনা শেষ নয়।

সুপারিশ গ্রহণ করা আর বাস্তবে তা কার্যকর করা এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে অডিটের সুপারিশ কাগজে থেকে গেছে। ফলে ইউএনএইচসিআরের ঘোষিত সংস্কারগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সেগুলোর প্রভাব শরণার্থী শিবিরের হাসপাতাল, গুদাম, পানি সরবরাহ কিংবা দৈনন্দিন সেবায় দৃশ্যমান হবে। তবে সংস্থাটি ইতিমধ্যেই কিছু সুপারিশের বাস্তবায়ন শুরু করেছে এবং যার দৃশ্যমান তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে।

কিচেন সেট ও অন্যান্য নন-ফুড আইটেমের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অডিটে প্রশ্ন উঠলেও, জবাবে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে যে জনসংখ্যার চাহিদা মূল্যায়ন এবং বিতরণ পরিকল্পনার ভিত্তিতে ৬২ হাজার ১০০টি কিচেন সেট ইতোমধ্যে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।

নতুন করে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্যও ২০২৫-২৬ সালের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। বিতরণের তথ্য ডিজিটাল GDT (Global Distribution Tool) সিস্টেমে সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

নোয়াখালীর ২০ শয্যার হাসপাতাল এবং উখিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালের সেবায় বিঘ্নের বিষয়টি অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ইউএনএইচসিআর তাদের জবাবে বলেছে, হাসপাতাল দুটির কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার মূল কারণ ছিল সরকারকে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সরকারি সক্ষমতা ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা।

ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নোয়াখালীর ২০ শয্যার হাসপাতালটি পুনরায় চালু হয়েছে এবং আইওএম সরকারের পক্ষে এটি পরিচালনা করছে।

অন্যদিকে উখিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালের জন্যও একটি অপারেশনাল পার্টনার নির্বাচন করা হয়েছে এবং সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর হাসপাতালের বিদ্যমান চিকিৎসা সরঞ্জাম পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে।

অর্থাৎ অডিটে যে দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে, তার জবাবে ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তনের একটি চেষ্টা দৃশ্যমান।

অডিটে কুতুপালং ট্রানজিট সেন্টারের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।ইউএনএইচসিআর বলেছে, ধাপে ধাপে এর বর্তমান কাঠামো গুটিয়ে আনা হবে।

স্বাস্থ্যখাতের সমালোচনার জবাবে নতুন স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ, ওষুধ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ও তথ্যব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছে। গুদাম ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ইনভেন্টরি ও নিয়মিত স্টক যাচাইয়ের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। একই সঙ্গে এটিও স্বীকার করতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে সব সীমাবদ্ধতার দায় এককভাবে ইউএনএইচসিআরের নয়।

বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত অবস্থান, ক্রমহ্রাসমান আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, দাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে সংস্থাটিকে অত্যন্ত জটিল বাস্তবতায় কাজ করতে হচ্ছে।

কিন্তু এই বাস্তবতা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ব্যাখ্যা হতে পারে, অজুহাত নয়। বরং সংকট যত দীর্ঘ হয়, জবাবদিহির প্রয়োজন তত বাড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই অডিট আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান স্বাধীন মূল্যায়নকে এখনো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখেনি। অডিট রিপোর্ট অনেক সময় প্রকাশই হয় না। প্রকাশ পেলেও তার বাস্তবায়নের অগ্রগতি আর জনসমক্ষে আসে না।

সেই তুলনায় ইউএনএইচসিআরের অবস্থান একটি ইতিবাচক উদাহরণ। তবে সেই উদাহরণের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তব পরিবর্তনের ওপর, ঘোষণার ওপর নয়।

রোহিঙ্গা সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু জরুরি সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে, কিন্তু সংকটের মেয়াদ বাড়ছে। ফলে মানবিক সহায়তার প্রতিটি ডলার, প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি কিচেন সেট, প্রতিটি পানির লাইন এবং প্রতিটি প্রকল্পের কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করতেই হবে।

অডিট রিপোর্ট সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। যেটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই, সমালোচনা কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; সমালোচনা অস্বীকার করাই দুর্বলতা।

আত্মসমালোচনা একটি শক্তি, কিন্তু সেই শক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই, যখন তা দৃশ্যমান পরিবর্তনে রূপ নেয়।

সমালোচনা অনেকেই করতে পারেন। কিন্তু সমালোচনাকে আত্মসমালোচনায় রূপান্তর করার সংস্কৃতি বিরল। ইউএনএইচসিআর অন্তত সেই পথেই আছে দীর্ঘদিন ধরে।

এখন দেখার বিষয়, সেই আত্মসমালোচনা কতটা প্রশাসনিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে, আর কতটা হাসপাতালের সেবা, ওষুধের প্রাপ্যতা, কিচেন সেট বিতরণ, গুদাম ব্যবস্থাপনা কিংবা শরণার্থী পরিবারের প্রতিদিনের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনে দেয়।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি অডিট রিপোর্টের সাফল্য নির্ধারিত হয় না তার ভাষায়, বরং তার বাস্তবায়নে।

লেখক- সাংবাদিক, ঢাকা পোস্ট।

জীবনটা যদি আর্জেন্টিনার মতো সহজ হতো!

রাজিন সালেহ

২০১৪ সাল! মারাকানা! মারিও গোটশের সেই অতিরিক্ত সময়ের ভলি যেভাবে ফ্যাটাল ব্লো হলো! জীবনটা যদি ঠিক ততটা সহজ হতো? ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেসির সেই মেলানকোলিক চাহনিটাই যদি সহজ জীবনের সংজ্ঞা হতো, অথবা বৈজ্ঞানিক নাম!

পরপর দু’বছর চিলির কাছে কোপা আমেরিকার টাইব্রেকারে হার! ১৬ সালের কোপার ফাইনালে মেসির শটটি বারের ওপর দিয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল! জীবনটা কেবল এটুকুই সহজ হলে হতো!

যার বাঁ পায়ের জাদুতে মুগ্ধ গোটা গোলার্ধ, সেই ত্রাণকর্তাকেই নিয়তি বারবার ছুঁড়ে ফেলেছে এক চরম শূন্যতার ব্ল্যাকহোলে। ট্রফি ছোঁয়ার ঠিক দু-এক ইঞ্চি দূর থেকে এই প্রত্যাখ্যান যদি কোনো সহজ জীবনের উদাহরণ হতো!

২০১৬! চারিদিকের তীব্র সমালোচনা আর বিষাক্ত মিডিয়া ট্রোলিং একজন জাদুকরকে বাধ্য করে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে, সেই হাহাকারের মতোই সহজ যদি জীবন হতো?

২০১৮! ট্র্যাজিক আনলাকি নায়ক হওয়ার মতোই সৌভাগ্য যদি একটু হতো? অথবা সেরকমই জীবন! সহজ জীবন!

সেই কবে থেকে ক্রনিক নীল বিষাদ। আর লিওনেল মেসি হলেন সেই গ্ল্যাডিয়েটর, যিনি সমস্ত ট্র্যাজেডি, সমালোচনা আর ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তবেই নিজেকে অমরত্বের আসনে বসিয়েছেন। জীবন যদি হতেই হয়, তবে আর্জেন্টিনার মতোই হোক! শতবার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েও শেষ অঙ্কে এসে পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো রাজকীয়!

রোহিঙ্গা ত্রাণ প্রকল্পঃ তহবিল অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ ইউএনএইচসিআরের বিরুদ্ধে

বে ইনসাইট রিপোর্ট

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর একাধিক মানবিক সহায়তা প্রকল্পে পরিকল্পনার দুর্বলতা, তহবিলের অপচয়, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের অভিযোগ উঠেছে।

জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর -ওআইওএস পরিচালিত এক অডিটে এসব অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ওই অডিট প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এইজ’ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি বলছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটের জন্য অনুদান ধারাবাহিকভাবে কমে আসার সময়েও বিভিন্ন প্রকল্পে এমন ব্যয় হয়েছে, যার অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও একই ধরনের কাজ একাধিকবার করা হয়েছে, কোথাও নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহারই হয়নি, আবার কোথাও বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে। ফলে সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

লক্ষ্যচ্যুত প্রকল্প, অপচয় হয়েছে অর্থ

অডিটে বলা হয়েছে, ইউএনএইচসিআরের বেশ কয়েকটি প্রকল্প সংস্থাটির ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একই ধরনের কার্যক্রম বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনার অভাবে একই উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যয় হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পদের অপচয়ে পরিণত হয়েছে।

অডিটকারীরা মন্তব্য করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন নির্ধারণ, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি।

অডিটে ত্রাণসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার ঘাটতি ও অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত প্রয়োজন মূল্যায়ন না করেই এমন কিছু সামগ্রী কেনা হয়েছে, যেগুলোর ব্যবহার শিবিরে প্রায় নেই বললেই চলে। উদাহরণ হিসেবে খাওয়ার জন্য চামচ, কাটাচামচ ও ছুরি কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গারা ঐতিহ্যগতভাবে হাত দিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন। তা সত্ত্বেও এসব সামগ্রী কিনতে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মার্কিন ডলার।

অডিটে আরও বলা হয়, এসব সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বারবার আপত্তি ও অভিযোগ ওঠার পরও ক্রয় পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এর ফলে ৬২ হাজারের বেশি কুকিং সেট গুদামেই পড়ে থাকে, যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার

কোটি টাকার হাসপাতাল নির্মাণ, কিন্তু ব্যবহার হয়নি

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত।

অডিটে দেখা যায়, উখিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবহারই করা হয়নি। একইভাবে ভাসানচরে নির্মিত ২০ শয্যার একটি ইনডোর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত ছিল।

শুধু ভবনই নয়, হাসপাতালটিতে স্থাপন করা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ৭৪ হাজার ৩০১ ডলারের এক্স-রে মেশিনও কার্যত অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল।

অডিটে বলা হয়, অবকাঠামো নির্মাণের আগে বাস্তব প্রয়োজন এবং পরিচালনা পরিকল্পনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি

রোহিঙ্গা শিবিরে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির অভাবও অডিটে উঠে এসেছে।

অডিটকারীরা বলেন, ২০২৪ সালে শিবিরে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং হেপাটাইটিস-সি রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেও ইউএনএইচসিআরের কোনো সমন্বিত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ছিল না।

মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিও ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে তীব্র পানিবাহিত ডায়রিয়া, কলেরা, খোসপাঁচড়া এবং উকুনের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সময়মতো ও কার্যকর মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ার তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেই খাতেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

মেয়াদোত্তীর্ণ সূঁচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই আবার বড় চুক্তি

অডিটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি ছিল চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে।

একটি প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ মেডিকেল সূঁচের গায়ে নতুন মেয়াদ লিখে সরবরাহ করেছিল। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকেই পরবর্তীতে প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের নতুন চুক্তি দেওয়া হয়।

এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যের সরবরাহকারী নির্বাচন করায় প্রায় ৯৭ হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৬০ লাখ ডলারের ওষুধ কর্মসূচিতে ওষুধের ঘাটতি, আবার কোথাও অতিরিক্ত মজুদ, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের ঘটনাও পাওয়া গেছে।

এদিকে প্রায় ৩৬ লাখ ডলারের পুষ্টি কর্মসূচি এবং ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের রোগী রেফারেল কর্মসূচিতেও উপকারভোগী নির্বাচন, নির্দেশিকা এবং হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা ধরা পড়ে।

হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারেও কোটি কোটি টাকার অপচয়

অডিটে কক্সবাজারের শিবির এলাকায় বন্য হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত টাওয়ার প্রকল্পকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রায় ২২ লাখ ডলার ব্যয়ে ৯৯টি হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী মূল্যায়নে এগুলোকে কার্যকর নয় বলে উল্লেখ করা হয়।

এর মধ্যে ৮৩টি টাওয়ারের ছাদ ঘূর্ণিঝড়-উপযোগী না হওয়ায় খুলে ফেলতে হয়, যাতে প্রায় ৫৬ হাজার ডলারের নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হয়। পরে টাওয়ারগুলোকে আরও টেকসই করতে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৬৭ হাজার ডলার ব্যয় করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালের আরেকটি মূল্যায়নে টাওয়ারের সংখ্যা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও অডিট পর্যন্ত মাত্র ১২টি টাওয়ার অপসারণ করা হয়েছিল।

একই ঠিকাদারের ওপর অতিনির্ভরতা, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কাজ

ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচনেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নির্মাণকাজ মূলত একজন ঠিকাদারকেই দেওয়া হয়। তার দর বাজারদরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি ছিল। এতে সম্ভাব্য ৬৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

শুধু তাই নয়, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের দর ৩৩ থেকে ৪৩ শতাংশ কম হলেও তাদের পরিবর্তে একই ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করা হয়।

এছাড়া ৩ কোটি ডলারের এলপিজি রিফিল, চুলা, প্রেসার কুকার, ইগনাইটার ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কাজও এমন একজন সরবরাহকারীকে দেওয়া হয়, যিনি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন না। পরে ওই প্রতিষ্ঠান আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

চুক্তি অনুযায়ী এলপিজি ডিপোর ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বহন করার কথা থাকলেও ইউএনএইচসিআর নিজেই ১৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। ওয়ারেন্টির আওতায় স্পার্ক লাইটার পাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত ৬৫ হাজার ডলারের লাইটারও কিনেছে সংস্থাটি।

অডিটকারীরা উল্লেখ করেছেন, ওই ঠিকাদারের দর ছিল বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। একই ধরনের কাজ কম খরচে করতে সক্ষম অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

জ্বালানি ও পরিবেশ প্রকল্পেও অতিরিক্ত ব্যয়

অডিটে জ্বালানি ও পরিবেশ খাতের প্রকল্পগুলোকেও ব্যয়বহুল ও অদক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৩৯ লাখ ডলারের জ্বালানি ও পরিবেশ কর্মসূচিতে বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ করানো হয়েছে।

২০২১ সালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিকাদারের দর বাজারদর ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ বেশি ছিল।

এরপর ২০২৩ সালে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই একই কাজের দর ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যাতে অতিরিক্ত ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলার ব্যয় হয়।

পরে বাজার যাচাই ছাড়াই চুক্তির মূল্য আরও ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়, ফলে অতিরিক্ত ২২ লাখ ডলার ব্যয় হয়।

এছাড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোয় স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছে অডিট।

রোহিঙ্গা শিবিরে এলপিজি সরবরাহেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।

একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রায় ৩ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়, যদিও সেটি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল না।

অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৫৫ লাখ ডলার বেশি মূল্যের এলপিজি রিফিল কেনা হয়। প্রেসার কুকার ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক পরীক্ষামূলক প্রকল্প শেষ হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় সম্ভাব্য প্রায় ২০ লাখ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগও হারানো হয়েছে।

অপ্রয়োজনীয় যানবাহন কেনা, অফিস ও গুদাম

যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অদক্ষতার চিত্র পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ১৬টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন ৫২টি কর্মসূচির গাড়ি প্রয়োজন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ইউএনএইচসিআর দিতে পারেনি।

অডিটে আরও উঠে এসেছে, ইউএনএইচসিআরের ১০৪টি গাড়ির মধ্যে ১০টি দীর্ঘ সময় ব্যবহার হয়নি। তারপরও এসব গাড়ির জন্য ৮০ হাজার ডলারের বেশি ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআরের নতুন অফিস ভবন নির্মাণেও একাধিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে অডিট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয়ে অফিস ভবন নির্মাণ করা হলেও জমির মালিকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

নির্মাণকাজ চলাকালে নকশা পরিবর্তন করে ভবনে তৃতীয় তলা যুক্ত করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর জমির মালিক ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ভাড়াচুক্তি ছিল না।

এরপরও নতুন ভবনটি পাঁচ মাস খালি পড়ে ছিল। সেই সময় পুরোনো অফিসের জন্য প্রতি মাসে ১১ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

এছাড়া আট বছর ধরে একটি অব্যবহৃত মোটেলের জন্য বছরে ১ লাখ ২৬ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে, যদিও অনেক কম খরচে বিকল্প জায়গা পাওয়া সম্ভব ছিল।

গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গুদাম ভাড়া নেওয়ায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাসানচরে একই কাজের জন্য একাধিক ব্যয়

অডিটে বলা হয়েছে, ভাসানচরে সরকার যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে ছিল, সেখানে ইউএনএইচসিআরও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে।

ফলে সরকার আগে থেকেই সৌরায়িত করে রাখা তিনটি স্থাপনায় আবারও একই ধরনের কাজ করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়াই ব্যয়বহুল ভোল্টেজ রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে।

একই এলাকায় একই ধরনের প্রকল্প

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নকারী অংশীদারদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে একই এলাকায় ১২৮টি পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ৫২টি পাম্পিং স্টেশন এবং ২০ হাজারেরও বেশি নলকূপ নির্মাণ করা হয়েছে।

অডিটকারীরা বলেছেন, সমন্বয় জোরদার করা গেলে এসব ব্যয়ের বড় অংশই এড়ানো সম্ভব ছিল।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে জরুরি সহায়তায় জোর

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর আট বছর পরও ইউএনএইচসিআরের ব্যয়ের অধিকাংশই তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল।

অডিট অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ জরুরি মানবিক সহায়তায় ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা এবং টেকসই সমাধানমুখী কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ।

অডিটকারীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে।

ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ‘নিউ এইজ’কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের গণসংযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, সংস্থাটি সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তার ভাষায়, অভ্যন্তরীণ অডিট সংস্থার কার্যক্রম মূল্যায়ন ও উন্নয়নের একটি নিয়মিত অংশ। অডিটে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও ব্যয় দক্ষতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শারি নিজমান বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দিতে ইউএনএইচসিআর কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট

বর্তমানে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক হিসাবে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসে।

তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সেই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিজস্ব অডিটে উঠে আসা এই অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ শুধু একটি সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনাই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির জবাবদিহি, দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করেন স্থানীয় একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

তথ্যসূত্র: ‘নিউ এইজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর (ওআইওএস) -এর অডিট রিপোর্ট।

সীমান্তের মৃত্যুর ‘বিচার’ কে করবে?

ইনসাইট রিপোর্ট

হোসনে আরা বেগম সেদিন দুপুরে রান্না করছিলেন।

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের ছোট্ট বাড়িটিতে তখন অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক জীবন চলছিল। চুলায় হাঁড়ি বসানো ছিল। পরিবারের সদস্যরা যার যার কাজে ব্যস্ত।

হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে একটি বিস্ফোরণ।

মিয়ানমারের ভেতরে চলমান সংঘর্ষ থেকে ছুটে আসা একটি মর্টারশেল এসে আঘাত করে তার রান্নাঘরে। ঘটনাস্থলেই মারা যান হোসনে আরা।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে।

কিন্তু তার ছেলে মো. ইব্রাহিমের কাছে এখনো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি মৃত্যুর নয়, বিচার নিয়ে।

“মা তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু মা হত্যার বিচারটাও কি হবে না?”

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ২৭১ কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য প্রশ্ন।

কেউ মর্টারশেলের আঘাতে নিহত হয়েছেন। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়েছেন। কেউ পাহাড়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন, আর ফিরে আসেননি।

প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন হয়েছে। কিছু পরিবার সামান্য আর্থিক সহায়তাও পেয়েছে।

কিন্তু এরপর?

মামলার অগ্রগতি নেই। দায় নির্ধারণ নেই। ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই কোনো দৃশ্যমান বিচারিক প্রক্রিয়াও।

ফলে সীমান্তবাসীর কাছে মৃত্যু যেন একটি পরিচিত বাস্তবতা। আর বিচার, একটি দূরবর্তী সম্ভাবনা।

রান্নাঘরে মর্টারশেল, মৃত্যু সনদে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’

২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘুমধুম ইউনিয়নের একটি বাড়িতে রান্না করছিলেন হোসনে আরা বেগম।

সেদিন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল। সেই সংঘর্ষের মধ্যেই একটি মর্টারশেল বাংলাদেশের ভেতরে এসে পড়ে।

মর্টারশেলে নিহত হোসনে আরা বেগম

বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন হোসনে আরা এবং এক রোহিঙ্গা শ্রমিক।

হাসপাতালের নথি ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ফোরণজনিত আঘাতের কথা উল্লেখ থাকলেও পরে পরিবার দেখতে পায়, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’।

ছেলে মো. ইব্রাহিমের কাছে বিষয়টি এখনো বোধগম্য নয়।

“মিয়ানমার থেকে বোমা এসে মানুষ মারা গেলে সেটা কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়?”

তার প্রশ্ন শুধু নিজের মায়ের মৃত্যুকে ঘিরে নয়। এটি সীমান্তের বহু পরিবারের অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি।

হোসনে আরার স্বামী বাদশা মিয়া মামলা করেছিলেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

পরিবারের ভাষ্য, একপর্যায়ে তাদের বলা হয়েছিল আসামি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

এরপর আর কোনো খবর তারা পায়নি।

২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই

হুজাইফার বয়স ছিল মাত্র ১২। বাড়ির উঠানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল সে। হঠাৎ সীমান্তের দিক থেকে আসা একটি গুলি তার শরীরে লাগে।

গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে চট্টগ্রাম, পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। ২৭ দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মারা যায় শিশুটি।

গুলি আসার সময় উঠানের যেখানে মেয়ে খেলছিলো, তাই দেখাচ্ছিলো জসীম উদ্দিন। ছবি- শাহীন মোবারক।

বাবা জসীম উদ্দিন এখনো ছেলের ব্যবহৃত কিছু জিনিস সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

তিনি বলেন, “সে তো কোনো যুদ্ধ করতেছিল না। একটা শিশু ছিল। তারপরও গুলি এসে তার জীবন নিয়ে গেল।”

ঘটনার সময় আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরএসওর মধ্যে গোলাগুলি চলছিল বলে স্থানীয়রা জানান।

পরিবার মামলা করেনি।

কারণ তারা জানে না, কার বিরুদ্ধে মামলা করবে।

“বিচার চাইব কার কাছে?”, প্রশ্ন করেন জসীম উদ্দিন।

সন্তানের মুখ দেখতে পারলোনা বাবা

২৪ মে। তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় কলাবাগানে কাজ করতে গিয়েছিলেন কয়েকজন শ্রমিক।

হঠাৎ বিস্ফোরণ। ঘটনাস্থলেই নিহত হন শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা, অক্যমং তংচঙ্গ্যা ও চিক্যং তংচঙ্গ্যা।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়ার ফাত্রাঝিরি এলাকার বাসিন্দা তিনজনই নিজ নিজ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তি।

শৈফুচিং মারা যাও্যার এক সপ্তাহ পর সন্তান জন্ম দেন স্ত্রী মাকিংচিং। ছবি- শাহীন মোবারক

শৈফুচিংয়ের স্ত্রী মাকিংচিংয়ের সন্তান জন্ম হয়েছে মাত্র সাত দিন আগে। সন্তানের মুখ দেখার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে স্বামীকে হারান তিনি।

“কলা বিক্রি করে টাকা আনার কথা ছিল। কিন্তু আর ফিরে আসল না।”

সরকারি সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন মাত্র কয়েক হাজার টাকা।

তারপর আর কিছু নয়। না কোনো মামলা। না কোনো তদন্তের খবর। না কোনো ক্ষতিপূরণ।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য অংসাই মারমা বলেন, “এটা ছিল খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরও দুজন মারা গেললো। তিনটি পরিবার একসঙ্গে নিঃস্ব হয়ে গেছে ভাই।”

‘কথা বলে লাভ কী?’

একই ঘটনায় স্বামী অক্যমং তংচঙ্গ্যাকে হারিয়েছেন দুকমালা তংচঙ্গ্যা। কিন্তু তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান না।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য, রাষ্ট্রের প্রতি তার ক্ষোভ এতটাই গভীর যে তিনি মনে করেন, কথা বলে কোনো লাভ নেই।

রাগে ক্ষোভে কথা বলেনা দুকমালা। ছবি- নুরুল হাসান।

দুকমালা তংচঙ্গ্যা দূর থেকে চিৎকার করে বলেন, “বিচার তো পাইনি। উল্টো এখন আমাদেরই দোষ দেওয়া হয়।”

এই নীরবতা সীমান্তবাসীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।

তারা দেখেছেন, মানুষ মারা যায়, আহত হয়, নিখোঁজ হয়; কিন্তু কোনো ঘটনার কোনো বিচারিক পরিণতি হয় না।

নিখোঁজ মানুষেরও খোঁজ নেই

ওয়ামং চাকমা প্রায় চার মাস ধরে নিখোঁজ।

ওয়ামং চাকমার স্ত্রী উসাসিং চাকমা জানান, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। তারপর আর ফিরে আসেননি।

চার মাসেও ফিরে আসেনি উসাসিং চাকমার নিখোঁজ স্বামী ওয়ামং চাকমা। ছবি- শাহীন মোবারক

বেঁচে আছেন কি না, তাও জানে না পরিবার। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পরিবার কোনো মামলা পর্যন্ত করেনি।

কারণ তাদের ধারণা, এতে কোনো ফল হবে না।

উসাসিং চাকমা বলেন, “পুলিশ ও বিজিবির সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা জানিয়েছে যে ওই এলাকায় যেতে পারবে না। ওয়ামং বর্তমানে বেঁচে আছেন কি না, তাও কোনো খবর নেই।”

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, সীমান্ত এলাকায় নিখোঁজ হওয়া অন্তত দুটি ঘটনার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি হয়েছে।

তিনি বলেন, “সুমন তঞ্চঙ্গ্যা এবং ওয়াইমং চাকমা নামে দুইজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বিষয়গুলো তদন্তাধীন আছে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, সীমান্তের দুর্গম এলাকায় তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতা সীমিত।

“সীমান্ত এলাকায় আইনগতভাবে বিজিবি মূল দায়িত্ব পালন করে। কোনো ঘটনা ঘটলে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হয়।”

নিজের দেশেই পা হারালেন হানিফ

টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মো. হানিফ নিজের মাছের ঘেরে যাওয়ার পথে মাইন বিস্ফোরণে একটি পা হারান।

ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের ভেতরেই। নাফ নদীর পাড়ে নিজের ঘেরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি।

পা হারানো মো. হানিফ। ছবি- নুরুল হাসান

হঠাৎ বিস্ফোরণ। এক মুহূর্তে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় একটি পা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিজিবির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন।

কিন্তু এরপর আর কোনো সহায়তা পাননি। এখন স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ছোট ভাইয়ের আয়ের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।

হানিফ জানান, নাফ নদীর আগে যে ঘের বা প্রজেক্টগুলো আছে, সেখানে বাঁধ থেকে প্রায় ২০ ফুট ভেতরে এই বিস্ফোরণ ঘটে। তাঁর মতে, মাইনগুলো আরও ভেতর পর্যন্ত ছড়ানো থাকতে পারে।

বর্তমানে তিনি কর্মহীন অবস্থায় বাড়িতেই থাকেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী ও একটি সন্তান রয়েছে। তিনি তাঁর মা-বাবার থেকে আলাদা থাকেন এবং বর্তমানে তাঁর ছোট ভাইয়ের উপার্জনেই পুরো সংসার চলছে।

মো. হানিফ বলেন, “মামলা করব কার বিরুদ্ধে? পুলিশও তো আসে নাই।”

সীমান্তের ভেতরে কী ঘটছে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্ত্রধারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর আনাগোনা রয়েছে।

কেউ রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথা বলেন। কেউ বলেন আরাকান আর্মির সদস্যদের কথা।

ছবি- নুরুল হাসান

আবার কেউ বলেন, কে কোন পক্ষের সেটা সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় নেই।

ফলে পাহাড়ে কাজ করতে যাওয়া, গবাদিপশু চরানো কিংবা বাগানে যাওয়াও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়ার ফাত্রাঝিরি এলাকার বাসিন্দা উলাসিং তংচঙ্গ্যা বলেন, “পাহাড়ে না গেলে আমাদের খাবার জোটে না। কিন্তু এখন গেলে মৃত্যুর ভয়।”

উলাসিং তংচঙ্গ্যার ভাষায়, এই এলাকার মানুষ পাহাড়ে কলা, পেঁপে, আদা, আম, কাঁঠাল এবং পানের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পাহাড়ে না যেতে পারলে তাদের খাবার জোটে না। বর্তমানে সেখানে যেতে না পারার কারণে তারা চরম আর্থিক ও খাদ্য সংকটে পড়েছেন।

বিজিবি কী বলছে?

৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খাইরুল আলম বলেন, সীমান্তে পাওয়া মাইনগুলোর উৎস নিয়ে তদন্ত চলছে।

প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির সংঘর্ষের সময় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু মাইন পুঁতে রাখা বা ফেলে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, “বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে চাই না।”

বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

“বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে যেন স্পর্শ না করে দ্রুত বিজিবিকে জানায়।”

তিনি আরও বলেন, সীমান্তের অনেক পাহাড়ি এলাকায় শূন্যরেখা স্পষ্ট নয়।

ফলে স্থানীয়রা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা বাংলাদেশের ভেতরে আছেন, নাকি সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য পাশে চলে গেছেন।

বিচারহীনতার এই চক্র কেন?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ সীমান্তের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি।

ছবি- শাহীন মোবারক

“সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা চলছে। সেখানে আরাকান আর্মি আছে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

“কিন্তু বাস্তবে সীমান্তের মানুষরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছে। সবাই জানে কী ঘটছে, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে খুব কম আলোচনা হয়।”

তার মতে, সীমান্তের এসব মানুষ কার্যত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকদের মধ্যে পড়ে।

“শহরের মানুষ নিরাপদে থাকে। সীমান্তের মানুষদের ঝুঁকি নিয়েই বাঁচতে হয়।”

আলতাফ পারভেজ বলেন, এই সীমান্তের মানুষগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। তারা ক্ষমতার রাজনীতির অংশ নয়। তাই তাদের মৃত্যু নির্বাচনী ইস্যু হয় না।

রাষ্ট্রের করণীয় কী?

মিয়ানমারের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।

কারণ অধিকাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠী।

“আরাকান আর্মির মতো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরাসরি বিচারিক ব্যবস্থা নিতে পারে না। কিন্তু সীমান্তে মাইন শনাক্তকরণ, মাইন অপসারণ এবং প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।”

তার মতে, বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করা।

সীমান্তের মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?

হোসনে আরা। হুজাইফা। শৈফুচিং। অক্যমং। চিক্যং। ওয়ামং। হানিফ।

এগুলো কেবল কয়েকটি নাম।

কিন্তু এই নামগুলোর ভেতর লুকিয়ে আছে সীমান্তবাসীর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা, ভয় এবং বিচারহীনতার ইতিহাস।

তারা যুদ্ধ করেনি। তারা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য নয়। তারা কেবল নিজেদের ঘরে ছিল, জমিতে কাজ করছিল, মাছ ধরছিল, সন্তান লালন করছিল।

কিন্তু যুদ্ধের মূল্য দিতে হয়েছে তাদেরই।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ভেতরে একজন নাগরিক যদি মর্টারশেলে মারা যান, গুলিতে নিহত হন, মাইন বিস্ফোরণে পঙ্গু হন বা নিখোঁজ হয়ে যান- তবে সেই ঘটনার দায় কার?

“আর যদি দায় নির্ধারণই না হয়, তাহলে বিচার আসবে কোথা থেকে? এক কথায় রাষ্ট্রকেই তাঁর নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে।”

সীমান্তে মানুষ মরছে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন হারিয়ে যাচ্ছে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাও, এবং সেটিই হয়তো এই গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

আব্দুল মন্নান প্রশ্ন তোলেন, “সীমান্তের মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?”