রুটিন অডিটে ইউএনএইচসিআরের ‘জবাবদিহি’: একটি আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের শিক্ষা

ইফতিয়াজ নুর নিশান

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার জগতে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে- কে কাকে জবাবদিহি করবে? রাষ্ট্র কি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনবে, নাকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিজেরাই নিজেদের মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে? প্রশ্নটির উত্তর কখনোই একরৈখিক নয়। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম নিয়ে জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর (ওআইওএস) যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেটি এই বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয়- জবাবদিহি শুধু সমালোচনার ভাষা নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধন হওয়ারও ভাষা।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট এখন প্রায় এক দশকের বাস্তবতা। ২০১৭ সালের পর কক্সবাজারে যে বিশাল মানবিক সহায়তা কাঠামো গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে তার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।

আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমেছে, দাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে, বিশ্বের নানা প্রান্তে নতুন নতুন সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী প্রায় বারো লাখ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে ওআইওএস-এর অডিট রিপোর্টটি শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়; এটি একটি আয়না, যেখানে একই সঙ্গে সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রতিবেদনটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কোনো প্রতিপক্ষের অভিযোগও নয়। এটি জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরকার স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার ফল। তাই এর পর্যবেক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হয়।

অডিটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কৌশলগত পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও স্যানিটেশন, জীবিকা কর্মসূচি, অংশীদার নির্বাচন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় একাধিক দুর্বলতা ছিল। কোথাও পরিকল্পনার ঘাটতি, কোথাও সমন্বয়ের অভাব, কোথাও সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, আবার কোথাও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতা।

এসব দুর্বলতা কেবল নীতিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; মাঠপর্যায়েও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।

অডিটে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ এসেছে, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও রোগীর তুলনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা বেশি, কোথাও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল, আবার কোথাও ওষুধ ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার ঘাটতি ধরা পড়েছে। মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সম্পদের অভাব যেমন সমস্যা, বিদ্যমান সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারও তেমনি বড় প্রশ্ন।

একইভাবে, কিচেন সেট, রান্নার সামগ্রী, বালতি, স্লিপিং ম্যাটসহ বিভিন্ন নন-ফুড আইটেমের গুদাম ব্যবস্থাপনা ও বিতরণেও অসঙ্গতি উঠে এসেছে। অনেকের কাছে একটি প্লেট, একটি হাঁড়ি বা একটি চামচের হিসাব তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু শরণার্থী জীবনে এগুলো বিলাসিতা নয়, মৌলিক প্রয়োজন। ফলে এসব সামগ্রীর হিসাবের গরমিল কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি সহায়তা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন।

পানি ও স্যানিটেশন খাতেও একই চিত্র। কোথাও ন্যূনতম মান নিশ্চিত হয়নি, কোথাও অবকাঠামো নির্মাণ হলেও তার পূর্ণ ব্যবহার হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে এমন দুর্বলতা শুধু সেবার মানকেই প্রভাবিত করে না, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

এসব পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।

তবে এই অডিটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত দুর্বলতার তালিকা নয়; বরং সেগুলোর প্রতি ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া।

অনেক প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার মুখে প্রথমে অস্বীকার করে, পরে ব্যাখ্যা দেয়, শেষে দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। ইউএনএইচসিআর অন্তত এই অডিটের ক্ষেত্রে সে পথ বেছে নেয়নি।

সংস্থাটি আটটি সুপারিশই গ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি সুপারিশ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কী কাজ চলমান এবং কোন সময়ের মধ্যে তা শেষ হবে—সেটিও বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক।

তবে এখানেই আলোচনা শেষ নয়।

সুপারিশ গ্রহণ করা আর বাস্তবে তা কার্যকর করা এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে অডিটের সুপারিশ কাগজে থেকে গেছে। ফলে ইউএনএইচসিআরের ঘোষিত সংস্কারগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সেগুলোর প্রভাব শরণার্থী শিবিরের হাসপাতাল, গুদাম, পানি সরবরাহ কিংবা দৈনন্দিন সেবায় দৃশ্যমান হবে। তবে সংস্থাটি ইতিমধ্যেই কিছু সুপারিশের বাস্তবায়ন শুরু করেছে এবং যার দৃশ্যমান তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে।

কিচেন সেট ও অন্যান্য নন-ফুড আইটেমের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অডিটে প্রশ্ন উঠলেও, জবাবে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে যে জনসংখ্যার চাহিদা মূল্যায়ন এবং বিতরণ পরিকল্পনার ভিত্তিতে ৬২ হাজার ১০০টি কিচেন সেট ইতোমধ্যে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।

নতুন করে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্যও ২০২৫-২৬ সালের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। বিতরণের তথ্য ডিজিটাল GDT (Global Distribution Tool) সিস্টেমে সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

নোয়াখালীর ২০ শয্যার হাসপাতাল এবং উখিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালের সেবায় বিঘ্নের বিষয়টি অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ইউএনএইচসিআর তাদের জবাবে বলেছে, হাসপাতাল দুটির কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার মূল কারণ ছিল সরকারকে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সরকারি সক্ষমতা ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা।

ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নোয়াখালীর ২০ শয্যার হাসপাতালটি পুনরায় চালু হয়েছে এবং আইওএম সরকারের পক্ষে এটি পরিচালনা করছে।

অন্যদিকে উখিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালের জন্যও একটি অপারেশনাল পার্টনার নির্বাচন করা হয়েছে এবং সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর হাসপাতালের বিদ্যমান চিকিৎসা সরঞ্জাম পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে।

অর্থাৎ অডিটে যে দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে, তার জবাবে ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তনের একটি চেষ্টা দৃশ্যমান।

অডিটে কুতুপালং ট্রানজিট সেন্টারের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।ইউএনএইচসিআর বলেছে, ধাপে ধাপে এর বর্তমান কাঠামো গুটিয়ে আনা হবে।

স্বাস্থ্যখাতের সমালোচনার জবাবে নতুন স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ, ওষুধ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ও তথ্যব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছে। গুদাম ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ইনভেন্টরি ও নিয়মিত স্টক যাচাইয়ের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। একই সঙ্গে এটিও স্বীকার করতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে সব সীমাবদ্ধতার দায় এককভাবে ইউএনএইচসিআরের নয়।

বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত অবস্থান, ক্রমহ্রাসমান আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, দাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে সংস্থাটিকে অত্যন্ত জটিল বাস্তবতায় কাজ করতে হচ্ছে।

কিন্তু এই বাস্তবতা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ব্যাখ্যা হতে পারে, অজুহাত নয়। বরং সংকট যত দীর্ঘ হয়, জবাবদিহির প্রয়োজন তত বাড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই অডিট আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান স্বাধীন মূল্যায়নকে এখনো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখেনি। অডিট রিপোর্ট অনেক সময় প্রকাশই হয় না। প্রকাশ পেলেও তার বাস্তবায়নের অগ্রগতি আর জনসমক্ষে আসে না।

সেই তুলনায় ইউএনএইচসিআরের অবস্থান একটি ইতিবাচক উদাহরণ। তবে সেই উদাহরণের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তব পরিবর্তনের ওপর, ঘোষণার ওপর নয়।

রোহিঙ্গা সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু জরুরি সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে, কিন্তু সংকটের মেয়াদ বাড়ছে। ফলে মানবিক সহায়তার প্রতিটি ডলার, প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি কিচেন সেট, প্রতিটি পানির লাইন এবং প্রতিটি প্রকল্পের কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করতেই হবে।

অডিট রিপোর্ট সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। যেটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই, সমালোচনা কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; সমালোচনা অস্বীকার করাই দুর্বলতা।

আত্মসমালোচনা একটি শক্তি, কিন্তু সেই শক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই, যখন তা দৃশ্যমান পরিবর্তনে রূপ নেয়।

সমালোচনা অনেকেই করতে পারেন। কিন্তু সমালোচনাকে আত্মসমালোচনায় রূপান্তর করার সংস্কৃতি বিরল। ইউএনএইচসিআর অন্তত সেই পথেই আছে দীর্ঘদিন ধরে।

এখন দেখার বিষয়, সেই আত্মসমালোচনা কতটা প্রশাসনিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে, আর কতটা হাসপাতালের সেবা, ওষুধের প্রাপ্যতা, কিচেন সেট বিতরণ, গুদাম ব্যবস্থাপনা কিংবা শরণার্থী পরিবারের প্রতিদিনের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনে দেয়।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি অডিট রিপোর্টের সাফল্য নির্ধারিত হয় না তার ভাষায়, বরং তার বাস্তবায়নে।

লেখক- সাংবাদিক, ঢাকা পোস্ট।

জীবনটা যদি আর্জেন্টিনার মতো সহজ হতো!

রাজিন সালেহ

২০১৪ সাল! মারাকানা! মারিও গোটশের সেই অতিরিক্ত সময়ের ভলি যেভাবে ফ্যাটাল ব্লো হলো! জীবনটা যদি ঠিক ততটা সহজ হতো? ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেসির সেই মেলানকোলিক চাহনিটাই যদি সহজ জীবনের সংজ্ঞা হতো, অথবা বৈজ্ঞানিক নাম!

পরপর দু’বছর চিলির কাছে কোপা আমেরিকার টাইব্রেকারে হার! ১৬ সালের কোপার ফাইনালে মেসির শটটি বারের ওপর দিয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল! জীবনটা কেবল এটুকুই সহজ হলে হতো!

যার বাঁ পায়ের জাদুতে মুগ্ধ গোটা গোলার্ধ, সেই ত্রাণকর্তাকেই নিয়তি বারবার ছুঁড়ে ফেলেছে এক চরম শূন্যতার ব্ল্যাকহোলে। ট্রফি ছোঁয়ার ঠিক দু-এক ইঞ্চি দূর থেকে এই প্রত্যাখ্যান যদি কোনো সহজ জীবনের উদাহরণ হতো!

২০১৬! চারিদিকের তীব্র সমালোচনা আর বিষাক্ত মিডিয়া ট্রোলিং একজন জাদুকরকে বাধ্য করে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে, সেই হাহাকারের মতোই সহজ যদি জীবন হতো?

২০১৮! ট্র্যাজিক আনলাকি নায়ক হওয়ার মতোই সৌভাগ্য যদি একটু হতো? অথবা সেরকমই জীবন! সহজ জীবন!

সেই কবে থেকে ক্রনিক নীল বিষাদ। আর লিওনেল মেসি হলেন সেই গ্ল্যাডিয়েটর, যিনি সমস্ত ট্র্যাজেডি, সমালোচনা আর ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তবেই নিজেকে অমরত্বের আসনে বসিয়েছেন। জীবন যদি হতেই হয়, তবে আর্জেন্টিনার মতোই হোক! শতবার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েও শেষ অঙ্কে এসে পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো রাজকীয়!

কক্সবাজারে ‘নিউ-মিডিয়া’র সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বিপুল

আলতাফ পারভেজ

বাংলাদেশে অনেক পত্র-পত্রিকা। জনসংখ্যার তুলনায় বেশি নয়, কিন্তু সক্রিয় পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের তুলনায় কম নয়। বিজ্ঞাপনের বাজারের তুলনায়ও অনেক।

তাছাড়া যেকোন নতুন মিডিয়া হাউস মানেই নতুন এক দল কর্মীর প্রয়োজনীয়তা। নতুন নতুন আইডিয়া। সেরকম কারিগরী জনসম্পদ ও ভাবসম্পদ খুব বেশি নেই এদেশে। অনেক চাকুরিপ্রার্থীর ভিড় আছে বটে, কিন্তু মিডিয়ার কাজ স্রেফ চাকুরি করা তো নয়। ফলে নতুন গণমাধ্যমের আয়োজন মানেই গতানুগতিক কিছু দেখার শঙ্কা।

তবে অনেকে এর মাঝেও ব্যতিক্রমী কিছুও করছেন। সেই সূত্রে সামনে, এই জগতে সৃজনশীলতা ও দক্ষতার একটা প্রতিযোগিতাও হবে। সেই দৌড়ে সবাই হয়তো টিকবে না। কেউ কেউ এগিয়ে যাবে, মনযোগ আকর্ষন করবে। পাঠক-শ্রোতা-দর্শকও গুণে এবং পরিমানে পাল্টাবে।

আপাতত অবশ্য ভাইরালপণার জোয়ার বইছে, সত্য-মিথ্যার ফারাক করাও বেশ দুরূহ হয়ে যাচ্ছে এবং স্থুলতার জয়-জয়কার চলছে। কবে এই জোয়ারের উপাদান ও ধরন বদলাবে বলা মুশকিল। একসময় নিশ্চয়ই ভোক্তার ক্ষুধা পাল্টাবে। কখন ও কীভাবে সেটা ঘটবে আমরা জানি না।

এরকম প্রত্যাশার মাঝেই জানলাম, কক্সবাজার থেকে একদল সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মী মিলে নতুন গণমাধ্যম গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে ‘কেন্দ্রে’র বেশ দাপট। প্রান্ত এখানে ‘মফস্বল’। কক্সবাজার নিশ্চিতভাবে সেরকম মফস্বল নয়। বহুকারণে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের এই জনপদ আঞ্চলিক এক রাজধানীর মতো।

কক্সবাজারের ফরমাল ও ইন-ফরমাল ইকোনমি আয়তনে বিশাল। আমরা হয়তো প্রথাগত হিসাবপত্তরে তার তলদেশ খুঁজেও পাবো না। এর উপত্যকা আন্তর্জাতিক ঠান্ডাযুদ্ধের একটা ছোটখাটো ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে।

কক্সবাজারের পাশে আরাকান, চিন, মিজোরামসহ নর্থ-ইস্ট, পার্বত্য চট্টগ্রাম বৈশ্বিক মনযোগে রয়েছে সর্বক্ষণ। এখানকার আলো-হাওয়ায় বহু জাতি আর অনেক ধর্মের মানুষের চাওয়া-পাওয়া-হতাশা-প্রত্যাশার আদান-প্রদান চলছে। সামনের দিনগুলোতে যে প্রক্রিয়া আরও বাড়বে। আসন্ন সে-ই দিনগুলোর চেহারা কীরকম হবে আমরা এখনি তা অনুমান করতে পারবে না, কিন্তু নানান ধরনের রাজনৈতিক ও জাতিগত ঘটনাপ্রবাহ দেখবো আমরা কক্সবাজার ও সন্নিহিত জনপদে।

এরকম একটা জায়গায় গণমাধ্যম বা প্রচার মাধ্যমে দুর্দান্ত কাজ করার সুযোগ আছে। এটা হতে পারে বাংলাদেশের গতানুগতিক মিডিয়া জগতের ব্যতিক্রমী কিছু। যাকে আমরা বলতে পারি প্রকৃত ‘নিউ মিডিয়া’। পরিবেশ থেকে ভূ-রাজনীতি বহু বিষয়ে কক্সবাজারের মিডিয়াকর্মীদের কাজের পরিসর অনেক ব্যাপক এবং গভীর।

এই জেলার যেকোন ‘নিউ মিডিয়া’র দিকে চোখ থাকবে আকিয়াব থেকে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত সবার। একে নজরে রাখবে ভূ-রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলো। পর্যটন ও ব্লু ইকোনমির সূত্রে কক্সাবাজার আঞ্চলিক অর্থনীতিরও এক আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠবে ক্রমাগত। পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ এবং আরাকানিজদের সংগ্রামের বিষয় তো থাকছেই।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটা নব পর্যায়ের শিশুকাল চলছে এখন। এই সুযোগে দেশে অনেক নতুন মিডিয়া হাউসের জন্ম হচ্ছে। এটা লক্ষণ হিসেবে শুভ। দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্যও মিডিয়ার সহায়ক ভূমিকা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের গুণগতভাবে অগ্রসর কিছু করার দিকে মনযোগ দেয়া দরকার।

কক্সবাজার উপকূলে মিডিয়ার জন্য যে বিষয়-বৈচিত্র্য রয়েছে তার সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মেলবন্ধন ঘটলে নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক মানের অনেক কিছু হতে পারে। নতুন সময় ভাবনা ও কাজের নতুনত্বও চাইছে।

বে-ইনসাইটের জন্য শুভ কামনা।

লেখক- দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক।

টকি হাউজ সিনেমাহল ও কক্সবাজার শহরের বালেগ হওয়া

।। রহমান মুফিজ ।।

একটা খোলা জিপে দাঁড়িয়ে হাইলাইট করা লালচে কালো ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছুটে চলেছেন জাফর ইকবাল। চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল। পরনে হাতাকাটা পাতলা কাপড়ের কালো শার্ট। বুকের বোতাম খোলা। কালো সানগ্লাসে চোখ ঢাকা। হাস্যোজ্জ্বল অপূর্ব জ্যোতির্ময় মুখ। প্রথম পলকে চিনতে পারিনি। পরের পলকে চিনতে পারতেই সেই জিপের পেছনে পেছনে দিলাম ছুট। বেশ কিছুক্ষণ ছুটেছিলাম জিপের পেছনে। আমার মতো আরো কয়েকজন হৈ হৈ করে ছুটতে ছুটতে সম্ভাষণ জানাচ্ছে তাকে। তিনিও পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাত নেড়ে বাতাসে হাসি ছড়িয়ে দিলেন। আর আমাদের সে কী আনন্দ, সে কী উত্তেজনা, সে কী উন্মাদ হৃদয়ের তোলপাড়! আমাদের প্রিয় নায়ক, আমাদের শহরে এভাবে চুল উড়িয়ে ছুটে চলেছেন! যেন বা ছুটে চলেছেন এক জাদুকর! তার সুঘ্রাণ, তার হাসি, তার চুলের রঙ, তার খোলা জিপের চাকার শব্দ, তার পেছনে আনন্দে লুটোপুটি খাওয়া ধূলো পুরো শহরকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে চলে যাচ্ছেন অনন্ত জাদুর দেশে…

নব্বই সালের ডিসেম্বরে, সম্ভবত এরশাদ শাহীর পতন হলো মাত্র। তখনো সবখানে বিজয়ের আনন্দ। গাছের ডালে, ইলেকট্রিকের থামে, উঁচু বাড়ির বেলকনিতে সম্ভবত আসন্ন বিজয় দিবসকে ঘিরে কেউ কেউ পতাকাও উড়াচ্ছিল। যতদূর মনে পড়ে, সেরকম একটা আনন্দ ও উৎসবঘন আবহের মধ্যে একদিন বিকেলে একটা খয়েরি জিপের উপরে চিত্রনায়ক জাফর ইকবালকে দেখে আমি যে অপার্থিব আনন্দের মুহূর্ত আবিষ্কার করেছিলাম, সেটি আমার চোখ থেকে, মগজ থেকে, বুকের কবোষ্ণ কক্ষ থেকে কোনোভাবেই বিস্মৃত হয় না।

সেই যে প্রথম কোনো ফিল্মস্টারকে এমন সামনাসামনি দেখা, সেটা আমার শৈশব-কৈশরের সবচেয়ে উত্তেজনাময় স্মৃতির একটি। আমি যখন সিনেমা সংক্রান্ত কোনো আলাপে প্রবৃত্ত হই, তখনই এই স্মৃতিটাই এমন তড়িৎ গতি নিয়ে হাজির হয় যে, জাফর ইকবালকে দেখার সেই বিরল দৃশ্যটিই আমার সিনেমাভাবনার সদরদরজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

আমার অবচেতনে মগজের মধ্যে অপার আনন্দময় সেই দৃশ্যটি গেঁথে ছিল বলে কি না জানি না, আমি বড় হয়ে হুট করে একদিন ঘর ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছিলাম, কেবল সিনেমা বানাবো বলে! হতে পারে, জীবনের খুব ছোট কোনো মুহূর্তও হঠাৎ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিতে প্ররোচিত করে। আমি সেই ঝুঁকি নিয়েছিলাম। কিন্তু সিনেমা আমার বানানো হয়নি এখনো। সিনেমা বানাতে এসে ঢাকাতেই কেটে গেছে আঠারো-উনিশ বছর। দুনিয়ার সব কাজ করা হয়েছে, সিনেমা আর বানানো হয়নি। কবে যে সিনেমায় হাত দেবো, সে এরাদাও প্রায় ধূসর হতে চলেছে।

কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু স্বপ্ন ধূসর হয় না। সেই নব্বইয়ের দশকের আমার শহর, আমার প্রিয় জলজোছনাময় জন্মভূমি, আমার স্বপ্নতন্তুতে বোনা কক্সবাজার ধূসর হয় না কখনো। ওটা একটা সিনেমার মতো শহর। ওটা আসলে একটা সিনেমার শহর। ওই একটা শহরেই আমি হেমিংওয়ের বুড়ো সান্তিয়াগোকে পেয়ে যাই, আবার পেয়ে যাই মার্কেজের অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বা একশ বছরের নিঃসঙ্গতার বিচিত্র সব চরিত্রকে।

নব্বইয়ের প্রথমার্ধে আমরা যারা নবকিশোর স্বৈরশাসন বা গণতন্ত্রের কিছুই বুঝি না, তবুও মিছিলে ছুটতাম; আমরা যারা নবকিশোর যৌনানন্দের অনুভূতি কেবল অবয়ব পাচ্ছিল, টিভিতে নায়ক নায়িকাকে জড়িয়ে ধরতে দেখলে লজ্জায় লাল হয়ে উঠতাম, শরীর কাঁপতো; আমরা যারা নবকিশোর সারা দিনমান ক্যানভাচারের মজমার ভিড়ে কামরুক কামাখ্যার গল্প শুনে শিউরে উঠতাম, আর বাদশা মিয়া কবিরাজের কাছ থেকে অচেনা বয়জ্যেষ্ঠদের যৌনশক্তি বর্ধক বড়ি কিনতে দেখে বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস চেপে বিড়বিড় করে বলে উঠতাম, একদিন আমিও বড় হবো!

যদিও আমরা নিজে নিজে বড় হতে পারিনি। আমরা যারা নবকিশোর, অন্য অনেকের মতো আমাদের বালেগ করে তোলার দায়িত্ব স্কন্ধে তুলে নিয়েছিল বাদশা মিয়া কবিরাজের সহকারী, সার্কাসে তাঁবু থেকে পালিয়ে এসে মজমায় খেলা দেখিয়ে বেড়ানো সেই যুবক, নাম যার লাটের পুত কালাইয়া আমাদের কৈশরের আরেক বিস্ময় জাগানিয়া এক্রোবেট। শরীরের খাঁজ থেকে বাজিকরী খেলা আর মুখের ভাঁজ থেকে হাস্যরসের ঝুলি খুলতে খুলতে যে হরণ করে নিতো স্কুল, নাওয়া-খাওয়া, বাড়ি ফেরার জরুরত।

লাটের পুত কালাইয়া ছাড়াও আমাদের বালেগ করে তোলার অনেক অনুসঙ্গ-উপসঙ্গের সঙ্গে একটা রাস্তা আমাদের কৈশরে একদম অনিবার্য নিয়তির মতো আটকে ছিল। তার নাম সিনেমাহল রোড। বড় হতে হতে তার নাম রূপান্তরিত হলো বঙ্গবন্ধু সড়কে। এ এক বিস্ময়কর সড়ক। একমাত্র এই সড়কেই পাওয়া যেতো সেই সময়কার চমক জাগানিয়া আর উত্তেজনাপূর্ণ সব ভিউকার্ড ও পোস্টার। কার ছবি মিলত না সেখানে? দুনিয়ার তাবড় তাবড় তারকারা সেখানে ঝুলে থাকতো, টেবিলে পড়ে থাকতো, তাকের মধ্যে ওঁৎ পেতে থাকতো আমরা পকেটের পয়সা খসিয়ে তাদের কিনে নেব বলে। এই সড়কেই মিলতো রসময়গুপ্ত, গুপ্তবাবুর পরের জেনারেশনের বিপুল সাহিত্য। এই সড়কেই গুরু আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, তপন চৌধুরীর নতুন গানের ক্যাসেট, এই সড়কেই পকেটমারের কবলে পড়া, এই সড়কেই ষোড়ষীর হৃদি-প্রেমোদ্যাম নবগণিকার লাস্যভঙ্গির কাছে হার মানা।

এই সড়ক কী ঐশ্বর্যময়, তা জানে কেবল আশির হৃদয়, নব্বইয়ের বুক।

সড়কটির প্রবেশমুখেই লালদীঘি, পাবলিক লাইব্রেরি, কোর্টবিল্ডিং এলাকা। সড়কটির শেষ প্রান্তে টকি হাউজ সিনেমাহল, সড়কটির শেষপ্রান্তে বাঁকখালী নদী। আমাদের এই শহরে, আমাদের বালেগ হওয়ার সময়ে, আমাদের আনন্দ-আনজাম ছিল মূলত এইসব রাস্তা সিনেমাহল রোড, লাল দীঘির পাড়, পাবলিক লাইব্রেরি, কোর্টবিল্ডিং এলাকা, বাঁকখালী নদী, কস্তুরাঘাট, মাঝির ঘাট, লাবনীর চর, ঝিনুক মার্কেট সিবিচের মতো জায়গাগুলো। এখানেই জীবনের প্রথমার্ধের বিপুল বিস্ময় এমনভাবে তড়পাতো যে, এখন ভাবতে গেলেই মনে হয়, ওই দশকে ওই শহরের অলিতে-গলিতে জাদুকরের মতো হাঁটাহাঁটি করতো বিচিত্র সব চরিত্র।

তো, সে জাদুর শহরে সবচেয়ে বড় জাদুর ঘর ছিল টকি হাউজ সিনেমা হল। এই সিনেমা হল মূলত একটা সভ্যতার স্বাক্ষর। একটা শহরের গড়ে ওঠা ও ধ্বংস হওয়ার স্মৃতিবাহী এক নামখ- যেটি আজ নিশ্চিহ্ন বলা চলে। আমরা টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে এখানে সিনেমা দেখতে যেতাম। রাঙ্গা ভাবী, সত্যমিথ্যা, বেদের মেয়ে জোছনা, সুজনসখি, ভেজা চোখ, ডিসকো ডান্সার, টপ রঙবাজ, মরণের পরে, যতদূর মনে পড়ে এই হলে দেখেছিলাম। টকি হাউজ সিনেমা হলে একদম টাটকা ছবি খুব কমই আসতো। মাস দুয়েক বা তারও বেশি পুরনো হয়ে যাওয়া ছবিই বেশি আসতো। প্রায় প্রতি পক্ষেই পর্দায় নতুন ছবি লাগতো। নতুন ছবি আসলেই শহরজুড়ে মাইক নামিয়ে ঘোষণা হতো- হ্যাঁ ভাই… টকি হাউজ সিনেমাহলের রূপালি পর্দায়… চলিতেছে… । ভরাট ও নাটুকে গলায়, এমন ঢলে ঢলে, কায়দা করে, রসিয়ে রসিয়ে সিনেমা ও কলাকুশলীদের নাম বলা হতো যে, সে সিনেমা না দেখলে মানবজীবনই বৃথা। আমরা মাইকের পেছনে ছুটে ছুটে সিনেমার লিফলেট কুঁড়াতাম আর দুষ্টু ছেলেরা দলবেঁধে ঘোষকের কণ্ঠ নকল করে হেসে কুটি কুটি হতাম হ্যাঁ ভাই… চলিতেছে…টকি হাউজ সিনেমা হলের রূপালি পর্দায়…।

টকি হাউজ মূলত আমাদের শহরের একটা উৎসবের নাম। আমার মনে আছে, টকি হাউজের কারণে আমাদের শহরে কখনো রাত নামতো না। আমাদের শহর মানে তো ওই লাল দীঘির পাড়, সিনেমাহল রোড, কস্তুরাঘাট এলাকাটাই। টকি হাউজের কারণেই মূলত এ শহর জেগে থাকতো সবসময়। সারা শহর নিরব ও অন্ধকার, কিন্তু সিনেমাহল রোড থাকতো জমজমাট। নব্বই দশকের শেষ দিকে, ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করে টকি হাউজের জৌলুস। নিয়মিত রাত নামতে নামতে অন্ধকার ও নিরব হয়ে আসতে শুরু করে রাস্তাটি। কোত্থেকে কী যেন হয়ে গেল, বাংলাদেশের সিনেমার বাজার এমনভাবে পড়তে শুরু করে যে, সেটাকে আর কেউ টেনে তুলতে পারলো না। আশি-নব্বইয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হতো বছরে গড়ে একশটির মতো। আর তা বর্তমানে এসে ঠেকেছে গড় চল্লিশে। ওই সময় সারাদেশে সিনেমা হল ছিল অন্তত দেড় হাজারের মতো। আর এখন সারাদেশে সিনেমা হল সচল থাকে মাত্র ৬০ থেকে ৭০টি।

সেই ষাটের দশকে নির্মিত হওয়া টকি হাউজ সিনেমা হল, যার জৌলুসে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল কক্সবাজার শহর, সেটি এখন আর নেই। বন্ধ হয়ে আছে প্রায় ২৫ বছর। নব্বই দশকে শহরতলীর ঝিলংজায় নির্মিত হয়েছিল বিডিআর হল (অধুনা বিজিবি হল) এবং বাজারঘাটার দিগন্ত সিনেমা হল। সেই দুটি হলও নাকি বন্ধ হয়ে গেছে, শুনলাম।

আমাদের জাদুর শহরে, সিনেমার মতো এ প্রাচীণ জনপদে আমরা তো দেশখ্যাত সব ফিল্ম স্টারদের শ্যুটিং দেখে দেখে বড় হয়েছি। চলচ্চিত্রের এমন কোনো তারকা ছিল না, হর হপ্তায় যাদের পা পড়তো না এই শহরে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবাগান, কাটা পাহাড়, কলাতলি, বড়ছড়া ও হিমছড়ির নানা স্পটে জনারণ্যে ভিড় ঠেলে শ্যুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তো আমাদের হাজার সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

নায়করাজ রাজ্জাক, ববিতা, আলমগীর, শাবানা, রোজিনা, চম্পা, সুচরিতা, রুবেল, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, দিতি, মৌসুমী, সালমান শাহ, শাবনুর, শাবনাজ, শাহনাজ, তামান্না, পপি, অমিত হাসান, আমিন খান, জাহাঙ্গীর, আলেকজান্ডার বো, হুমায়ুন ফরিদি, এটিএম শামসুজ্জামান, রাজীব, জাম্বু, দিলদার, টেলিসামাদ প্রমুখ সিনেমা তারকাদের শ্যুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তো আমার একার ঝুলিতেই প্রচুর। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে তাদের ছবিই দেখতে যেতাম টকি হাউজ সিনেমা হলের পর্দায়।

কিন্তু সেই সিনেমার শহরের আজ কী দশা? একটিও সিনেমা হল নেই! অথচ শহরের কী শনৈ শনৈ উন্নতি ঘটেছে। কত কত মেগা প্রজেক্টে ভারি হয়ে উঠেছে তার ভূমি। উন্নয়নের তোপে রীতিমতো গঠন করতে হয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু “পর্যটন শহর” বলে তার যে গালভরা পরিচয়, সে পরিচয়ের প্রতিও কোনো সুবিচার হলো না।

অথচ সমুদ্র-নদী-পাহাড়ের এ শহর পৃথিবীতে ঘোষণা করতে পারতো তার ঐশ^র্যের কথা। সারা পৃথিবীকে আহ্বান করতে পারতো তার কীর্তি দিয়ে, তার চলমানতা দিয়ে। কিন্তু এ শহরকে স্থবির করে রাখা হয়েছে। যে শহরে ‘টকি হাউজ সিনেমা হল’ বন্ধ হয়ে যায় সে শহর স্থবির নয় তো কী? যে শহরে কিশোর-কিশোরীদের বালেগ করে তোলার মতো রাস্তা থাকে না, দোকান থাকে না, প্রতিষ্ঠান থাকে না, পার্ক থাকে না, সে শহরের মানুষেরা বড় হতে পারে, সে আমি বিশ্বাসই করি না। সে শহরের মানুষ স্রেফ শিশুতোষ চৈতন্যের মধ্যে খাবি খায় আর শিশুতোষ জ্ঞানের ক্ষুদ্রতা দিয়েই পৃথিবীকে মাপে। এ তো মধ্যযুগের চেয়েও ভয়ংকর!

কিন্তু কাউকে এই প্রশ্ন করতে দেখলাম না এ শহরকে স্থবির করে রেখে কার লাভ?

এ শহরকে একটা বিশ্বজনীন ও বিশ্বমননের সাংস্কৃতিক নগরীতে পরিণত করার লড়াই আমরা করে গেছি বহুদিন। এখনো সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। সমুদ্র তীরবর্তী এ জনপদের ইতিহাসের দিকে তাকালে আপনি এর ঐশ্বর্যের কাছে জানু পেতে বসবেন। আপনি এর প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকবেন। আপনি যদি একবার এর গৌরবকে অনুভব করতে পারেন তাহলে আপনিই অস্থির হয়ে উঠবেন সে গৌরবকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে।

একসময় নিয়মিত এ শহরে সার্কাসের দল আসতো। এক সময় কস্তুরাঘাটে ভিড়তো বড় বড় বৈদেশি জাহাজ। পৃথিবীর নামকরা পরিব্রাজকদের পা পড়তো এখানে। সারা পৃথিবীকে উদার বুক নিয়ে আমরা সম্ভাষণ জানাতাম। কিন্তু আমরা এমন কৃপণ হয়ে উঠলাম যে, নিজের শহরেরই সব অলঙ্কার একে একে কেড়ে নিয়েছি।

অথচ এই শহরে গড়ে ওঠার কথা ছিল, বিশ্বমানের ফিল্ম সিটি। এই শহরে থাকার কথা ছিল অন্তত ১০টা থিয়েটার, যেখানে দেশি-বিদেশি সিনেমা প্রদর্শিত হতো। থাকার কথা ছিল বিশ্বমানের আর্ট ইনস্টিটিউট, আর্ট ক্লাব যেখানে দেশিবিদেশি শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নিতো, তাদের ছবি ও আর্টওয়ার্ক প্রদর্শিত হতো। সমৃদ্ধ সমুদ্র জাদুঘর, একাধিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নাট্যদল, স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। লাইব্রেরি থাকার কথা ছিল কয়েকটা। নাইট ক্লাব, সার্কাসের দল থাকার কথা ছিল। নগরকীর্তনের মতো ভ্রাম্যমান অর্কেস্ট্রাদলের ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর কথা ছিল শহরের সর্বত্র। এ শহরে প্রবেশ করলেই মনে হতো, আপনি একটা অনন্ত উৎসবের দেশে চলে এসেছেন। উৎসবের কায়কেওস থেকে কারও দূরে যেতে ইচ্ছে হলেই তিনি আবার ডুব দিতে পারতেন হিমছড়ির পাহাড় বা অজ্ঞমেধা ক্যাংয়ের গাঢ় নিরবতার মধ্যেও।

এ কেবল সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের আকাক্সক্ষা নয়, একইসঙ্গে বিপুল অর্থনৈতিক বন্দোবস্তেরও আকাঙ্ক্ষা। বিশ্বের বুকে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার মতো, বিশ্বকে আহ্বান করার মতো একটা শহর গড়ে তোলার কালেক্টিভ স্বপ্নও বলা চলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, আমরা কেবল সেই স্বপ্নটা দেখে চলেছি। আমাদের আগের প্রজন্ম দেখেছে, এখন আমরা দেখছি, এরপর আমাদের পরের প্রজন্মও একই আকাক্সক্ষা বুকে নিয়ে বড় হবে। কিন্তু কক্সবাজার শহরের উন্নয়নের গুরুদায় যারা স্কন্ধে তুলে নিয়েছেন, তাদের চিন্তায় কী এর সামান্যও নড়াচড়া করে?

করলে তো ভাল, লড়াইটা একসঙ্গে করা যাবে। আর না করলে, একটা টকি হাউজ সিনেমা হলের মর্তবা বোঝাতে হয়তো দ্রুতই আয়োজন করতে হবে একটা গুরুতর পঞ্চায়েত বৈঠক বা একটা জমকালো সেমিনার।
(লেখাটি সংক্ষেপিত)

লেখক-
বাংলা সম্পাদক, নেত্র নিউজ।

মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে কক্সবাজার: মেজর জিয়ার আগমন ও প্রতিরোধের বাস্তবতা

কালাম আজাদ

১৯৭১ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহ। বাংলার ইতিহাসে এক অস্থির, অনিশ্চিত এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সেই অস্থির দিনগুলোতে পূর্ববাংলার ভূগোল যেমন ভেঙে পড়ে, তেমনি ভেঙে পড়ে আস্থার প্রচলিত কাঠামোও। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে বাঙালি জাতির উপর যে গণহত্যা শুরু হয়, তার অভিঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পূর্ব বাংলায়। চট্টগ্রাম ছিল সেই প্রথম আঘাতপ্রাপ্ত নগরগুলোর একটি। কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কালুরঘাটের দিকে নজর দেয়।

এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থানরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এই প্রেক্ষাপটে মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট অতিক্রম করে দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন এবং ট্রান্সমিটার সরিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

পটিয়ায় কিছুক্ষণ অবস্থানের পর মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর মীর শওকত আলী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ২৮ মার্চ সড়কপথে কক্সবাজারের পথে রওয়ানা দেন। কিন্তু যে বাস্তবতার মুখোমুখি তারা হন, তা ছিল যুদ্ধের প্রথম দিককার এক নির্মম সত্য—পরিচয়ের অনিশ্চয়তা। চকরিয়া থেকে রামু পর্যন্ত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এমন কঠোর পাহারা বসিয়েছিলেন, যেখানে সন্দেহই ছিল প্রধান নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে মেজর জিয়ার দল সেই পাহারার জালে আটকা পড়ে।

রামুর উত্তর মিঠাছড়িস্থ চা বাগানেও পাহারা বসানো হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে। কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যাতে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর কোনো ব্যক্তি জান নিয়ে কক্সবাজারের দিকে যেতে না পারে। নির্দেশ পালন করতে গিয়ে চকরিয়ায় ৪ জনকে চর সন্দেহে মেরে ফেলা হয় সংগ্রাম কমিটির নির্দেশে। এমনই কড়া পাহারা বসানো হয়, সে জালে মেজর জিয়াউর রহমান ও তার দল আটকা পড়ে।

২৮ মার্চ রামুর চা বাগানে মুক্তিযোদ্ধারা মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ সকলকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। তাদের গায়ে সামরিক পোশাক ছিল, কিন্তু তারা ব্যাজ খুলে ফেলায় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পলায়নরত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সেনা ভেবে ঘেরাও করে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘আঁরঅ বাড়ি চন্দনাইশ। এই অইলো মেজর জিয়া, যার ঘোষণা অঁনরা রেডিওতে শুন্নন’।

তখন ‘মেজর জিয়া আওয়ামী লীগ নেতার সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করলে আফসার কামাল চৌধুরী, ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী এগিয়ে এসে তাকে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেন।’ [মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম: আন্দোলন সংগ্রামের দিনগুলো—বায়ান্ন থেকে একাত্তর, কামরুল হাসান সম্পাদিত বিজয় স্মারক ২০১১, (কক্সবাজার: জেলা প্রশাসন, ১৬ ডিসেম্বর ২০১১), পৃ. ৭২-৭৩/ কালাম আজাদ: মুক্তিযুদ্ধে কক্সবাজার: জানা-অজানা তথ্য, বিজয় স্মারক ২০১২, (কক্সবাজার: জেলা প্রশাসন, ১৬ ডিসেম্বর ২০১২), পৃ. ৫২।]

এ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ‘বন্ধু ও শত্রু’ চিহ্নিত করার জটিলতাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। আফসার কামাল চৌধুরী ও ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর সহায়তায় এরপর তারা আবার কক্সবাজার শহরের পথে অগ্রসর হয়। পথে আর কোনো ঝামেলায় যাতে পড়তে না হয়, সে জন্য জিপে রামু-উখিয়া-টেকনাফ আসনের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীকে বসিয়ে রাখা হয়। জিয়া নিজেই জিপটি চালাচ্ছিলেন। পাশের আসনে অলি আহমদ।’ (Col. Oli Ahmad, `Revolution Military Personnel and the War of Liberation in Bangladesh, 2009, Dhaka: Annesha Prokashon, P. 30-31.) পরে ডাকবাংলাতে স্থাপিত কক্সবাজারে সংগ্রাম কমিটির কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়।

কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর সংগ্রাম কমিটির নিয়ন্ত্রণকক্ষে তাদের নেওয়া হয়। ইপিআর ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদেরকে কক্সবাজার পৌর প্রিপ্যারেটরি হাই স্কুল এবং মেজর জিয়া, মীর শওকত আলী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় থাকার ব্যবস্থা করে কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটি। বিশ্রাম শেষে মেজর জিয়া কক্সবাজারে অবস্থানরত ইপিআর (বাঙালি ও অবাঙালি)-এর খবর নিলেন এবং ইপিআর সুবেদার জোনাব আলীকে ডেকে আনলেন। স্থানীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও ইপিআরের অবস্থান সম্পর্কিত হয়ে বাঙালি ও অবাঙালি ইপিআর সদস্যদের মধ্যে বিভাজন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

জোনাব আলীর কাছ থেকে অবাঙালি ইপিআরের অবস্থান এবং তাদের তৎপরতা সম্পর্কে জেনে তাদেরকে খতম করার জন্য নির্দেশ দিলেন। তার নির্দেশ মোতাবেক কারাবন্দি অবাঙালি ইপিআর সৈন্যকে প্রথমে কক্সবাজার সরকারি হাই স্কুলের বিপরীতে নিয়ে মেরে ফেলতে চাইলে নানা কারণে সম্ভব না হওয়ায় রামুর পানেরছড়া ঢালায় নিয়ে গিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয় সুবেদার শাহনেওয়াজ খানসহ ১২ জন অবাঙালি ইপিআর সদস্যকে।

ওই দিন মেজর জিয়া কক্সবাজারের স্বনামধন্য উকিল অগ্নিযুগের বিপ্লবী জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর সাথে দেখা করেন। রহস্যাবৃত মাহমুদ হোসেন মেজর জিয়াকে অ্যাডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর ছেলে নিখিলেশ্বর চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। সেই মোতাবেক জিয়া ও অলি জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর বাসায় যান এবং জানতে পারেন, ছেলে তিন দিন আগেই লন্ডন চলে গেছেন। ধারেকাছেও কোথাও সপ্তম নৌবহর নেই।’

লেখক মহিউদ্দীন আহমদ ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ বইয়ে ‘ওই উকিলের ছেলে’ আমেরিকায় চলে গেছেন বলে উল্লেখ করে লিখেন—‘মাহমুদ কক্সবাজারে একজন উকিলের ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। সেই মোতাবেক জিয়া ও অলি ওই উকিলের বাসায় যান এবং জানতে পারেন, ওই উকিলের ছেলে তিন দিন আগেই আমেরিকায় চলে গেছেন। ধারে কাছে কোথাও নৌবহর নেই। ৩০ মার্চ জিয়া কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যান এবং দ্বিতীয় ঘোষণাটি দেন।’ (মহিউদ্দিন আহমেদ: আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১, পৃ. ৮২-৮৩)। যে ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর সাথে মেজর জিয়া ও অলির সাক্ষাতের প্রত্যক্ষদর্শী জহরলাল পাল চৌধুরী ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২৮ মার্চ মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন অলি আহমদসহ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেশ কয়েকজন সৈন্য নিয়ে কক্সবাজারে আসেন। ওই সময় মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ অগ্নিযুগের বিপ্লবী অ্যাডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর সাথে দেখা করতে তার বাসায় যান। ওই সময় আমি, স. আ. ম. শামসুল হুদা চৌধুরীর ছেলে ইউসুফ মোহাম্মদ শামসুল হুদা, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা সুভাষ চন্দ্র পাল, দেবব্রুত চৌধুরী, লালুসহ আরও বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলাম।’ (জহরলাল পাল চৌধুরী, ‘যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি তারা আমাদের চেয়ে ভালো থাকতে দেখে অপমানবোধ করি (কালাম আজাদ গৃহীত সাক্ষাৎকার), ৮ ডিসেম্বর ২০১৪, দৈনিক কক্সবাজার বাণী)।

২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত কক্সবাজার আওয়ামী লীগ ও কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির বৈঠকে মেজর জিয়া উপলব্ধি করেন যে, গেরিলা যুদ্ধ চালাতে হলে বহিরাগত সহায়তা অপরিহার্য। তাই কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির বৈঠকে বার্মার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাঁর পরামর্শমতে, কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নুর আহমদ এবং কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. শামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরীকে সাথে নিয়ে মংডু শহরে গিয়ে বার্মা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু বার্মা কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এই ব্যর্থতা কক্সবাজার অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। এ ব্যাপারে ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরীর স্মৃতিচারণ স্মরণযোগ্য—
“জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ এক বৈঠক বসেন। ২৯ মার্চ [২৮ মার্চ] রাত ৮টার পর জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় অনুষ্ঠিত হয় ওই বৈঠক। বৈঠকে কক্সবাজারের গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ছাত্র-যুবকদের ট্রেনিং দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। ওই বৈঠকে তিনি বার্মার সহযোগিতা না পেলে কক্সবাজার থেকে গেরিলা যুদ্ধ সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন। অ্যাডভোকেট নুর আহমদ সাহেবকে বার্মার সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে সমর্থন আদায় করতে অনুরোধ করেন। নুর আহমদ সাহেব ডা. শামসুদ্দিন সাহেবকে নিয়ে এ লক্ষ্যে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মংডু শহরে পৌঁছান। সমর্থন পাওয়া তো দূরের কথা; উল্টো মিয়ানমার সরকার তাদের নজরবন্দি করে রাখে।” (নজরুল ইসলাম চৌধুরী: যে কথা বলা হয়নি, বিজয় স্মারক ২০১৪, (কক্সবাজার: জেলা প্রশাসন, ডিসেম্বর ২০১৪), পৃ. ৪৪)।

পরে মেজর জিয়াউর রহমান ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ মীর শওকত আলীকে আরও কয়েকদিন কক্সবাজারে থাকার নির্দেশ দিয়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাটের দিকে রওয়ানা হন। মেজর জিয়া কক্সবাজার ত্যাগ করার পর মীর শওকত আলী পৌর প্রিপ্যারেটরি হাই স্কুল ও পিটিআই স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের তদারকি করেন।

মেজর মীর শওকত আলী কমান্ডার সেলিমুর রহমানের নেতৃত্বে পৌর প্রিপ্যারেটরি হাই স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণরত আড়াইশত মুক্তিযোদ্ধার সাথে ব্রিফিং করে তাদের মধ্য থেকে ১৮ জনকে নিয়ে ‘আলফা ট্রুপ’ নামে একটি দলে বিভক্ত করেন। আলফা ট্রুপ গঠনপূর্বক মেজর মীর শওকত আলী এ ট্রুপ গঠনের ইতিহাস বলতে গিয়ে বলেন, ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের পাক-ভারত যুদ্ধে মীর শওকতকে প্রধান করে একটি গ্রুপের নাম ছিল আলফা ট্রুপ।

কমান্ডার সেলিমুর রহমানের নেতৃত্বে ওই গ্রুপের সদস্য ছিলেন এ. কে. এম. মনসুর উল হক, মনজুর আলম মজনু, জালাল আহমদ, মোহাম্মদ আলী, আবদুল কাদের, কামাল উদ্দিন, আহম্মদ হোসেন, আল মামুন, শামসুল হুদা মান্নু, নুরুল নন্দা, মাস্টার শাহ আলম প্রমুখ। ট্রেনিং শেষে ওই মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপকে কন্ট্রোল রুম থেকে দশটি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল হস্তান্তর করা হয়।

এই সামরিক পুনর্গঠন মুক্তিযুদ্ধের বিকেন্দ্রীভূত কিন্তু সমন্বিত চরিত্রকে তুলে ধরে। কক্সবাজারে মেজর জিয়ার আগমন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে নিয়ে আসে—বিভ্রান্তি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, স্থানীয় পর্যায়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ এবং দ্রুত সামরিক পুনর্গঠন। এই তিনটি উপাদানই পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে একটি সংগঠিত ও সর্বাত্মক জনযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করে।

কালাম আজাদ
লেখক ও গবেষক