বে ইনসাইট রিপোর্ট
মধ্যরাতে যখন বিশ্বের বহু মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় চোখ রেখেছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নেমে আসে অন্য এক বাস্তবতা। টানা ভারী বৃষ্টিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আটজন রোহিঙ্গা। একই রাতে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়।
কিন্তু মৃত্যুর এই হিসাবের বাইরেও বড় হয়ে উঠছে আরেকটি প্রশ্ন- আজ রাতেও কি লাখো মানুষ পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বুকে নিয়েই ঘুমাতে যাবে?
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৪ জন রোহিঙ্গা অর্থাৎ ৮৪ হাজার ৩৮১টি পরিবার এখনও এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেগুলো বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
“শান্তি যেন কোথাও নেই”
“বেশি বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মানুষগুলো ভয়ে থাকে কখন পাহাড় ভেঙে পড়ে। আর আমাদের এখানে ভয় কখন পানি উঠে আসে। শান্তি যেন কোথাও নেই।”
উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদের কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্বের ভার।
ক্যাম্প-৫ তুলনামূলক সমতল এলাকায় হলেও টানা বৃষ্টিতে সেখানেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকেছে, চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে তুলনামূলক উঁচু জায়গায়।
বে ইনসাইটের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্যাম্প-৫-এর আরও তিন মাঝি—মনা মিয়া, শবির আহামদ ও দই মাঝি। তাঁদের ভাষ্য, শুধু এই ক্যাম্পেই অন্তত ২০০টি আশ্রয়ঘর প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ ব্লকের এ-৩ সাব-ব্লকে।
প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, “ক্যাম্প ইনচার্জের পক্ষ থেকে কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘরটাই তো আমাদের শেষ আশ্রয়। দুর্যোগ এলে সেটাও ছেড়ে যেতে হয়। আমাদের দুর্গতির যেন শেষ নেই।”
ক্যাম্প-৫-এর বাসিন্দা মনা মিয়া বলেন, “সারারাত বৃষ্টি হলেই ঘুম আসে না। কখন খবর আসে পাহাড় ধসে পড়ার, আবার কখন ঘরে পানি ঢুকে যায়, এই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। বাচ্চাদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে।”
একই ক্যাম্পের সাব মাঝি শবির আহামদ বলেন, “এবারের বৃষ্টিতে অনেক ঘরে পানি ঢুকেছে। মানুষ কাপড়, খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু করে রাখছে। কেউ কেউ আত্মীয়ের ঘরে গিয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করছে।”
আরেক সাব মাঝি দই মাঝি বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই ভয় নিয়ে থাকতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু যাওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা সবার জন্য নেই।”
তিন ঘণ্টায় তিন পাহাড়ধস
রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার তিনটি আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যু হয়।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং শিশুও।
‘বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই’
পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরে সোমবার সারদিনই বৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই দুপুরের দিকে নিজের আশ্রয়ঘরের দিকে কাঁধে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে ফিরছিলেন নুরুল ইসলাম।
মধ্যবয়সী এই রোহিঙ্গা বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) কার্যালয় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়। তবে অনেকেই সেই নির্দেশ মানতে চান না।
“যেখানে যেতে বলে, সেখানেও তেমন সুবিধা নেই। তাই অনেকেই যেতে চায় না,” বলেন তিনি।
সোমবার রাত কোথায় কাটাবেন এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুক্ষণ নীরব থেকে নুরুল ইসলাম বলেন, “দেখি, কোনো আত্মীয়ের ঘরে যেতে পারি কি না।”
ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি কী ধরনের সহায়তা চান- এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার ক্লান্তি।
তিনি বলেন, “বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই, ভাই।”
‘দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ এখনও ঝুঁকিতে’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে তিনটি পৃথক স্থানে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ক্যাম্প-৭-এ এক শিশু, ক্যাম্প-১১-তে চারজন এবং ক্যাম্প-১৫-এ তিনজন প্রাণ হারান।
তিনি জানান, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর মধ্যে ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।
“কমপক্ষে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ বর্তমানে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে”
মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। তবে গত দুই বছরে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তাঁর ভাষায়, অনেকেই বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিজেদের মতো করে আশ্রয় নির্মাণ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেও বসতি গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ক্যাম্প-১১-তে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেটিও এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নির্মিত আশ্রয়কে কেন্দ্র করে।
আরআরআরসি বলছেন, সবচেয়ে বড় সংকট হলো পর্যাপ্ত নিরাপদ জায়গার অভাব।
তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ জমির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার এখনও পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
৭৬টি দুর্যোগ, পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
ইউএনএইচসিআরের কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েট মোশারফ হোসেন জানান, ৪ থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে মানবিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শিবিরে ৭৬টি আবহাওয়াজনিত ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ২১টি ছিল পাহাড়ধস।
এসব ঘটনায় ৫ হাজার ২৪৯ জন রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন, আহত হয়েছেন ছয়জন এবং ৩৮৬ জনকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর মানবিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জরুরি সহায়তা, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বর্ষার আগেই প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু…
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা শুরুর আগেই বিভিন্ন সংস্থা পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, রিটেইনিং ওয়াল ও গাইড ওয়াল নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ, সরিয়ে নেওয়ার মহড়া এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরাই দুর্ঘটনার সময় প্রথম ঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রতিবেশীদের সতর্ক করা, মানুষ সরিয়ে নেওয়া, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তবে সংস্থাটি বলছে, এসব উদ্যোগ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হলেও তা পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
অর্থসংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রস্তুতি
ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখনও বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী বসতিগুলোর একটি। অনেক পরিবার খাড়া পাহাড়ের ঢালে বাস করছে এবং তাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের মতো পর্যাপ্ত জমিও নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থসংকট।
সংস্থাটি জানিয়েছে, অর্থায়নের ঘাটতির কারণে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়ঘর শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের পরিসর কমিয়ে আনতে হয়েছে।
২০২৬ সালের যৌথ মানবিক সাড়া পরিকল্পনার আওতায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা এবং তিন লাখের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের একাধিক কর্মসূচি ইতোমধ্যে সীমিত করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।
রেকর্ড বৃষ্টি, সামনে আরও শঙ্কা
কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত ৩৩ ঘণ্টায় ৩৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে উখিয়ায়। তবে সেখানে কত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।
আবহাওয়া অফিস বলছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের প্রভাবে আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
অর্থাৎ, পাহাড়ধসের আশঙ্কা এখনও কাটেনি।
আরেকটি দীর্ঘ রাত
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে এখন ভয় দুই রকম।
পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের আতঙ্ক ‘কখন মাটি ধসে ঘরের ওপর নেমে আসে’।
আর নিচু এলাকার মানুষের ভয় ‘কখন বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়’।
এক রাতে নয়জনের মৃত্যু হয়তো একটি সংখ্যা।
কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে এখনও ৩ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করছেন, যেগুলোকে মানবিক সংস্থাগুলো নিজেরাই বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে।
তাই কক্সবাজারে বর্ষার প্রতিটি রাত এখন শুধু একটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়,হাজারো পরিবারের কাছে সেটি ঘুম আর অনিশ্চয়তার মধ্যকার এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।




