বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা মেটাতে নতুন করে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ ও তার অংশীদার সংস্থাগুলো।
পাশাপাশি সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
বুধবার ঢাকায় জাতিসংঘ ভবনে ২০২৬ সালের হালনাগাদ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) উপস্থাপনকালে এ আহ্বান জানানো হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা, সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে। এতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ জরুরি সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে।
জেআরপি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত তহবিলের মধ্যে খাদ্য সহায়তার জন্য ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, আশ্রয় খাতে ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার, শিক্ষার জন্য ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার, স্বাস্থ্য খাতে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলার এবং জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নে ৩ কোটি ৫১ লাখ ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটে প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি টি. ক্লেমেন্টস, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রানিয়া দাগাশ-কামারা এবং ইউএন উইমেন-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা।
কেলি টি. ক্লেমেন্টস বলেন, “সম্পদ সীমিত হয়ে আসার এই সময়ে শরণার্থীদের দক্ষতা ও সহনশীলতা বাড়ানো আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা স্বনির্ভর হতে পারে এবং ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে পারে।”
রানিয়া দাগাশ-কামারা বলেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছে। দাতাদের অব্যাহত সহায়তা শরণার্থীদের জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে।”
অন্যদিকে নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা বলেন, “তহবিল সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে ক্যাম্পের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করেছে। নারী ও মেয়েরা বাস্তুচ্যুতির ফলে অতিরিক্ত ঝুঁকি ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।”
জাতিসংঘ জানিয়েছে, বর্তমানে ক্যাম্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার পুরোপুরি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ৪২ শতাংশ পরিবারের আয় অস্থায়ী ও অনিশ্চিত উৎসনির্ভর এবং মাত্র ২৩ শতাংশ পরিবার মানবিক কার্যক্রমের আওতায় নগদ অর্থভিত্তিক কাজে যুক্ত হতে পারছে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এ ধরনের নৌযাত্রা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। গত মাসে ২৭০ জনের বেশি যাত্রী বহনকারী একটি নৌকা ডুবে গেলে মাত্র ৯ জন জীবিত উদ্ধার হন।
জেআরপি উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তঃসরকারি সংস্থা বিষয়ক সচিব ও ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মান্যবর এম. ফরহাদুল ইসলাম এবং জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর উপস্থিত ছিলেন। ৫২টি বাংলাদেশি সংস্থাসহ মোট ৯৮টি মানবিক অংশীদার এই পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছে।
জাতিসংঘ পুনর্ব্যক্ত করেছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে নতুন ধরনের দুইতলা ঘর নির্মাণকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
স্থানীয়রা বলছে কংক্রিটের বেইজ, লোহার কাঠামো এবং পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, সব মিলিয়ে এই অবকাঠামো ‘অস্থায়ী নয়, বরং স্থায়ী বসতির ইঙ্গিত’।
আর এতে আপত্তি জানিয়ে বন বিভাগ বলছে, পাহাড়ও কাটা হয়েছে।
যদিও শরণার্থী কমিশন ও ইউএনএইচসিআর বলছে, এগুলো এখনো সম্পূর্ণ অস্থায়ী কাঠামো।
উখিয়ার কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পের এক্সটেনশন ‘ই’ ব্লকে অন্তত ৮৮৮টি দুইতলা শেল্টার নির্মাণ চলছে। যেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ কাজ শেষ। খোদ বন বিভাগ বলছে, নির্মাণকাজের জন্য ‘পাহাড় কেটে’ সমতল করা হয়েছে, পাশাপাশি তৈরি হয়েছে প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক।
বিষয় গুলো নিয়ে জানতে চাওয়া হয় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন এবং বন বিভাগ এর কাছে।
বন বিভাগের অভিযোগ: পাহাড় কেটে স্থাপনা
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এলাকায় পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য লোহার কাঠামোর (স্ট্রাকচারাল) দোতলা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি আমরা জেনেছি এবং এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি।
“এটি বন বিভাগের সংরক্ষিত জমি। কিন্তু ক্যাম্পের অভ্যন্তরের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকায় আমরা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। প্রায় কয়েক শত শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছে, ফলে খুব দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ এগোচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০-৯০০টির মতো শেল্টার নির্মাণের কাজ ৮০-৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
আব্দুল মান্নান বলেন, এই কাজের ফলে পাহাড় কাটা, গাছ নিধনসহ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু এত বড় পরিসরে কাজ হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “এলাকাটি আগে সংরক্ষিত বনভূমি ছিল। বর্তমানে সেখানে যেভাবে ভূমি সমতল করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আপনাদের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (RRRC) এবং ক্যাম্প ইনচার্জের বক্তব্যও নেওয়া উচিত।”
কমিশনারের বক্তব্য: “স্থায়ী কিছু নয়”
অন্যদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলছেন, এই কাঠামো নিয়ে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০২১-২২ সালের দিকে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদিত নকশার ভিত্তিতেই এই ধরনের শেল্টার তৈরি হচ্ছে।
তার ভাষায়, “লোহার কাঠামো ব্যবহার করা হলেও সেগুলো নাট-বল্টুর মাধ্যমে বসানো, যাতে সহজেই খুলে ফেলা যায়। এটি কোনো স্থায়ী স্থাপনা নয়।”
কংক্রিট ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “পুরোপুরি কংক্রিটের বেইজ নয়, মূলত ফ্লোরের মতো একটি ভিত্তি দেওয়া হচ্ছে, যাতে কাঠামো মাটিতে সরাসরি বসানো না লাগে।”
পাহাড় কাটার অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে আপত্তি ওঠায় সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইউএনএইচসিআর বলছে “নিরাপত্তার জন্য উন্নত নকশা”
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, নতুন শেল্টারগুলো মূলত দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য ডিজাইন করা।
সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ের যোগাযোগ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, শেল্টারে এখনো বাঁশ ও প্লাস্টিক শিটই প্রধান উপকরণ, সর্বোচ্চ ৩ ইঞ্চি ব্যাসের স্টিল পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পুরো কাঠামো নাট-বল্টুর মাধ্যমে যুক্ত, যাতে সহজে খুলে ফেলা যায়।
তার দাবি, “নির্মাণাধীন এসব শেল্টার কোনো স্থায়ী কাঠামো নয় এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী ধরনের অবস্থানের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। এই নকশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত। এটি নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্মিলিত মানবিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন। একইসঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে সম্মান জানায়, যেখানে নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বিবেচিত।”
স্থানীয়দের উদ্বেগ
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও নীতিগত অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট এক ফাঁক চোখে পড়ছে।
একদিকে বনভূমি কাটা, সড়ক নির্মাণ এবং দুইতলা কাঠামো, যা দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, এটি কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য উন্নত কিন্তু অস্থায়ী সমাধান।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী এই নির্মাণকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। তার মতে, “শক্ত অবকাঠামো তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাসের পথ তৈরি হবে, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।”
জনপ্রিয় গায়ক, গীতিকার, অভিনেতা ও উপস্থাপক তাহসান খান জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের (UNHCR) শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তাঁর দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে নবায়ন করেছেন।
ইউএনএইচসিআরের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রথম শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি শরণার্থী ইস্যুতে সচেতনতা তৈরি ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে কাজ করে আসছেন।
দায়িত্ব নবায়নের পর তাহসান বলেন, “রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর নয় বছর পার হয়েছে। একটি টেকসই সমাধান না আসা পর্যন্ত তাদের দুর্দশার প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল থাকা প্রয়োজন।”
তিনি জানান, শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে বহু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
আমি এমন সব পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি, যারা অকল্পনীয় ক্ষতি ও কষ্টের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি তাঁদের গল্পগুলো সবার কাছে তুলে ধরতে চাই।
বিবৃতিতে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, তাহসান দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থীদের পক্ষে একজন সক্রিয় কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছেন।
“তাঁর সম্পৃক্ততা এমন এক সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন, যা এই সময়ে আমাদের সবার প্রয়োজন। তাঁর নিয়োগের মেয়াদ বাড়াতে পেরে আমরা গর্বিত,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দশ লাখের বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক বছরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন তাহসান। তিনি ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন, শরণার্থী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বিশ্ব শরণার্থী দিবসসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন।
২০২৫ সালে ক্যাম্পের একাংশে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের স্থান পরিদর্শন করেন তিনি। ওই ঘটনায় হাজারো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হওয়ার বিষয়টি নিজের চোখে দেখেছেন বলে জানান।
সে সময় তাহসান বলেন, “শরণার্থীরা স্বেচ্ছায় নিরাপদে নিজ দেশে ফিরতে চায়। যতদিন তা সম্ভব না হয়, ততদিন আমাদের তাদের পাশে থাকতে হবে—সহায়তা, সুরক্ষা ও জীবনরক্ষাকারী সেবা দিয়ে।”
ইউএনএইচসিআরের কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “শরণার্থী সংকট মোকাবেলায় সংস্থাটির অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য আমি কৃতজ্ঞ, বিশেষ করে তাদের কাজের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিলে।”
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই কক্সবাজার জেলার ৩৩টি ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে বসবাস করছেন, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী আবাসন।
প্রায় নয় বছর ধরে এসব ক্যাম্পে বসবাস করা অনেক শরণার্থীর জন্য শিক্ষা, জীবিকা ও দীর্ঘমেয়াদি সুযোগের প্রবেশাধিকার সীমিত।
ইউএনএইচসিআরের ৩৬ জন শুভেচ্ছাদূতের একজন হিসেবে তাহসান এখন একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। শুভেচ্ছাদূতরা জনসমর্থন তৈরি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রয়োজন ও অধিকার তুলে ধরার মাধ্যমে সংস্থাটির কার্যক্রমকে এগিয়ে নেন।
বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর বলছে, তাহসানের দায়িত্ব নবায়নকে শরণার্থীদের প্রতি সংস্থাটির আস্থা ও যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটে আক্রান্ত মানুষগুলো বিশ্ববাসীর দৃষ্টি থেকে হারিয়ে না যায়।
কক্সবাজারের কুতুপালং বাজার থেকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে রফিকুল ইসলামকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় টেকনাফের কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের রাজাছড়া এলাকায়। ২ এপ্রিল সেখানে একটি ঘরে তাকে ২০ থেকে ২৫ জনের সঙ্গে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়। বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেই চলত নির্যাতন। রফিকুলের ভাষায়, “পশুর মতো বন্দী করে রাখা হয়েছিল, আশপাশের অনেক ঘরেই একইভাবে মানুষ আটকে ছিল।”
ধাপে ধাপে সমুদ্রে পাচার
৪ এপ্রিল রাতে রাজাছড়া সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ এলাকা থেকে ছোট মাছ ধরার নৌকায় করে তাদের সমুদ্রে নেওয়া হয়। পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে ছোট ট্রলার বদলে বড় ফিশিং ট্রলারে তোলা হয় তাদের, যা সেন্ট মার্টিনের অদূরে মিয়ানমারের জলসীমার দিকে অগ্রসর হয়।
এক ট্রলারে প্রায় ২৮০ জন
রফিকুল জানান, ট্রলারটিতে প্রায় ২৮০ জন মানুষ ছিল। এর মধ্যে ১৩ জন ছিল পাচারকারী ও নৌকার স্টাফ, ২১ জন রোহিঙ্গা নারী এবং চারজন শিশু। প্রায় দেড়শ জন রোহিঙ্গা এবং বাকিরা বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। সবাই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হয়েছিলেন।
মৃত্যুকূপে পরিণত কুঠুরি
রফিকুল বলেন, ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে। এ সময় পাচারকারীরা যাত্রীদের জোর করে ট্রলারের মাছ ও জাল রাখার চারটি সংকীর্ণ কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত মানুষের চাপে ও অক্সিজেনের অভাবে সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলে জানান রফিকুল।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন পাচারকারীরা যাত্রীদের হুমকি দেয়- ট্রলারের ডেকে থাকা কেউ কুঠুরিতে না নামলে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হবে। এর মধ্যেই বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক আর আর্তনাদ।
একটি পানির বোতলেই বাঁচার লড়াই
ডুবন্ত ট্রলার থেকে কোনোভাবে একটি দুই লিটারের পানির বোতল আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকেন রফিকুল। তার ভাষায়, “চারদিকে শুধু মানুষ ডুবছিল… আমি শুধু একটা বোতল ধরে ছিলাম… আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন।”
৯ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ তাকে সহ মোট ৯ জনকে উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ রয়েছেন।
আরেক বেঁচে ফেরা কণ্ঠ
উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গা যুবক মো. ইমরান জানান, ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে তিনি এই যাত্রায় বের হয়েছিলেন। ট্রলার ডুবে গেলে তিনি একটি পানির ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভেসে ছিলেন, পরে উদ্ধার পান।
আইনি ব্যবস্থা ও তদন্ত
এ ঘটনায় কোস্ট গার্ড বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেছে বলে জানান টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।
ওসি বলেন, উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জন দালালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ৩ জন ভিকটিমকে আদালতের মাধ্যমে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ: এটি শুধু দুর্ঘটনা নয়
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলছে, এই ঘটনা একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি, ক্যাম্পের কঠিন জীবন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং কমে যাওয়া মানবিক সহায়তা মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সংস্থা দুটি এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছে, আন্দামান সাগরে একটি নৌকা ডুবির ঘটনায় কমপক্ষে ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকরা আছেন।
সমাধান ছাড়া থামবে না মৃত্যুযাত্রা
শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও নৃবিজ্ঞানী রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ না হওয়া এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত না হলে এমন বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। পাচারকারীরা এই অসহায় পরিস্থিতিকে পুঁজি করে আরও মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সমুদ্র শুধু ঢেউ নয়
বাংলাদেশ যখন নতুন বছরকে বরণ করছে, তখন আন্দামান সাগরের এই মর্মান্তিক ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সমুদ্র শুধু নীল জলরাশি নয়, কখনো তা হয়ে ওঠে শত মানুষের নিঃশব্দ কবর।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হাম নয়, এখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভ্যারিসেলা জোস্টার ভাইরাসজনিত রোগ জলবসন্ত (চিকেনপক্স)।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই রোগের সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা ক্যাম্পের ঘনবসতি ও শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, “গত তিন মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জলবসন্তে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৭৬৯ জন। অথচ গত বছরের শেষ ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৫৫।”
তিনি বলেন, “তুলনামূলকভাবে হাম বা রুবেলার সংক্রমণ এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত শিশু পাওয়া গেছে ৪ জন এবং রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে ১ জন।”
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে হাম ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জলবসন্তের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, ক্যাম্পে বসবাসরত শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকাদান কার্যক্রম চলছে।
ঘনবসতি ও বাস্তবতা: দ্রুত ছড়াচ্ছে সংক্রমণ
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সংকীর্ণ বসবাস, একসঙ্গে অনেক মানুষের থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে না পারা—এসব কারণে জলবসন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা নূরজাহান বলেন, “আমার ছেলের শরীরে হঠাৎ ফুসকুড়ি ওঠে, পরে জ্বর আসে। এখন আলাদা করে রাখতে হচ্ছে, কিন্তু এক ঘরে সবাই থাকায় সেটা খুব কঠিন।”
আরেক অভিভাবক মোহাম্মদ ইদ্রিসের ভাষ্য, “একজনের হলে দ্রুত অন্যদেরও হয়ে যায়। বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
কী এই জলবসন্ত
চিকেন পক্স বা জলবসন্ত ভ্যারিসেলা-জোস্টার ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা সাধারণত শীতের শেষে ও বসন্তকালে বেশি দেখা যায়।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
লক্ষণ ও সংক্রমণের সময়কাল
জলবসন্তের লক্ষণ সাধারণত ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায় এবং ১ থেকে ২ সপ্তাহ স্থায়ী হয়।
প্রধান লক্ষণগুলো হলো- জ্বর মাথাব্যথা শরীর ম্যাজম্যাজ করা চুলকানিযুক্ত তরলপূর্ণ ছোট ফোসকা জলবসন্তের ধাপগুলো কীভাবে এগোয়
ইনকিউবেশন পিরিয়ড (সুপ্তাবস্থা): ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর ১০-২১ দিন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
প্রাথমিক লক্ষণ : ফুসকুড়ি ওঠার ১-২ দিন আগে জ্বর, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা ও মাথাব্যথা শুরু হয়।
ফুসকুড়ি বা ফোসকা পর্যায়:
প্রথমে লালচে দানা (র্যাশ) পরে তরলপূর্ণ ফোসকা শেষে শুকিয়ে খোসা (স্ক্যাব) হয়ে ঝরে পড়ে আক্রান্ত হলে করণীয় কী
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ব্যক্তির যত্নে কিছু বিষয় জরুরি-
১। আক্রান্তকে আলাদা রাখা ২। নখ ছোট রাখা, যাতে চুলকানোর ক্ষত না হয় ৩। প্রচুর পানি ও তরল খাবার গ্রহণ ৪। চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বর ও চুলকানির ওষুধ গ্রহণ ৫। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ৬। প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর
একই সঙ্গে সতর্কতা হিসেবে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা ফোসকা থেকে অতিরিক্ত পুঁজ বের হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন বাড়তি নজরদারি
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, ক্যাম্পে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেতনতা বাড়ানো, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং আলাদা রাখার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
নচেৎ, সীমিত জায়গায় বসবাসরত হাজারো মানুষের মধ্যে এই রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা বহু বছর ধরে নীরবে বহমান রয়েছে। এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্মদিন একই দিনে, ১ জানুয়ারি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি অনেক সময় হাস্যরসের জন্ম দিলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পরিচয় হারানোর গভীর বেদনা।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাতিসংঘের শরণার্থী নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সময় তাড়াহুড়া ও তথ্যের ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্মতারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে শিবিরে বসবাসরত প্রায় ৬৭ শতাংশ রোহিঙ্গার সরকারি নথিতে এই একই জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে।
নিবন্ধনের তাড়াহুড়ায় তৈরি ‘এক দিনের জন্ম’
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভিযান, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের মুখে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। হঠাৎ এই বিপুল জনস্রোত সামাল দিতে গিয়ে জাতিসংঘের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা।
অনেক শরণার্থী নিজেদের সঠিক জন্মতারিখ জানাতে পারেননি, আবার অনেক ক্ষেত্রে সময়ের চাপেই তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে একটি ‘ডিফল্ট’ তারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত একজন সাবেক নিবন্ধনকর্মীর ভাষায়, “তখন মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া, যেখানে সঠিক তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না।”
হাসির আড়ালে বিষণ্ণতা
শিবিরের বাসিন্দাদের জন্য ১ জানুয়ারি একদিকে যেমন ‘সম্মিলিত জন্মদিন’, অন্যদিকে এটি তাদের হারানো পরিচয়ের প্রতীক।
ক্যাম্প-৭–এর বাসিন্দা মোহাম্মদ ফারুক জানান, তার প্রকৃত জন্মদিন সেপ্টেম্বর মাসে হলেও সরকারি কাগজে ১ জানুয়ারি। প্রতি বছর এই দিনে একসঙ্গে শত শত মানুষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা কখনো হাস্যরসের জন্ম দনত। তিনি মন্তব্য করেন, “এক কিলোমিটার জুড়ে কেক লাগবে”।
কিন্তু বাস্তবে এটি তাদের জন্য কষ্টের। “এই তারিখটা দেখলে মনে হয় আমি কেউ নই”, বলেন তিনি।
পরিচয়পত্র: অস্তিত্বের শেষ প্রমাণ
রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের জন্য একটি কাগজের পরিচয়পত্রই এখন অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন। অনেকেই এই নথি প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখেন বা বালিশের নিচে সংরক্ষণ করেন।
তবে ভুল তথ্যের কারণে এই নথিই কখনো হয়ে উঠছে নতুন সমস্যার কারণ।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর কাছে ক্যাম্প-১২–এর বাসিন্দা মোহাম্মদ আনিস বলেন, চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে সব জায়গায় তাকে ভুল জন্মতারিখ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে আসার পর জাতিসংঘের কর্মীরা তার জন্মদিন জানতে চাননি। তিনি বলেন, “তারা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল তোমার বয়স কত? আমি বলেছিলাম ১৭।”
এরপর তাকে ১ জানুয়ারি জন্মতারিখ দিয়ে একটি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। নতুন আসা শরণার্থী হিসেবে তখন তিনি কোনো আপত্তি জানাতে সাহস পাননি।
তারপর থেকে এই ভুল জন্মতারিখ তাকে অনুসরণ করছে। সম্প্রতি চাকরির আবেদন করার সময়ও তাকে এই তারিখ ব্যবহার করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “তারিখটা ভুল, এটা আমাকে কষ্ট দেয়। একদিন হয়তো আমরা আমাদের আসল জন্মতারিখই ভুলে যাব।”
তথ্য সংশোধনের জটিলতা
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর কাছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, শরণার্থীরা চাইলে তথ্য সংশোধন করতে পারেন।
কিন্তু বাস্তবে তা সহজ নয়।
প্রতিবেদনে শিবিরের এক নারী জানান, কয়েক মাস চেষ্টা করেও তিনি তার জন্ম তারিখ সংশোধন করতে পারেননি। প্রশাসনিক জটিলতা, প্রমাণের অভাব এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া এই সংশোধনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
শুধু শিবির নয়, প্রবাসেও সমস্যা
এই ভুল তথ্যের প্রভাব শুধু শিবিরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে পুনর্বাসিত রোহিঙ্গারাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
রোহিঙ্গা লেখক মাইয়্যু আলী দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, তার পরিবারের এক সদস্য কানাডায় গিয়েও জন্মতারিখ পরিবর্তন করতে পারেননি। ফলে নতুন জীবনেও বহন করতে হচ্ছে পুরোনো ভুল।
তিনি বলেন, “এই মুছে ফেলার নীতিগুলো আমাদের নতুন জীবনেও প্রভাব ফেলে।”
ফেরার অনিশ্চয়তা, পরিচয়ের সংকট
রোহিঙ্গাদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয়, এই ভুল তথ্য তাদের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
কারণ তাদের শরণার্থী কার্ডের তথ্য মিয়ানমারের পুরোনো নথির সঙ্গে মিলবে না।
তবে বাস্তবতা হলো, ফেরার সম্ভাবনাই এখন অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্রিয়।
জন্মদিন নয়, প্রয়োজন নিজের মাটি
অনেকের কাছে তাই জন্মদিন এখন আর আনন্দের বিষয় নয়।
রোহিঙ্গা ফটোগ্রাফার রহিম উল্লাহর ভাষায়, “যতদিন নিজের কোনো মাটি না থাকবে, ততদিন কোনো জন্মদিন উদযাপন করতে চাই না।”
১ জানুয়ারি, বিশ্বের অনেকের কাছে নতুন বছরের শুরু। কিন্তু কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে এটি হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের এক নীরব প্রতীক।
হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই গল্প মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রহীনতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং ব্যক্তিগত অস্তিত্ব ও পরিচয়ের গভীর ক্ষয়।
কক্সবাজার — তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এর ছেলে নেজমেত্তিন বিলাল এরদোয়ান এবং ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান ফুটবল তারকা মেসুত ওজিল বৃহস্পতিবার এক দিনের সরকারি সফরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন।
সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে তারা ঢাকাগামী একটি বিশেষ ফ্লাইটে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। তাদের সঙ্গে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ছিল। বিমানবন্দরে জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান ও পুলিশ সুপার সাইদুর রহমান তাদের স্বাগত জানান।
পরে প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয় পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত তুর্কি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে।
প্রতিনিধিদলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্রতিনিধি দলে তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থার সভাপতি আব্দুল্লাহ এরেন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন। এছাড়া বিভিন্ন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরাও সফরে অংশ নেন।
কক্সবাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিলাল এরদোয়ান বলেন, “প্রত্যাবাসন অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই মানুষ তাদের নিজ ঘরে ফিরতে পারুক, যা তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনও শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করে।”
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শিক্ষা সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মৌলিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তিনি জানান, ২০১৭ সাল থেকে টিকা বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, আর তুর্কি দিয়ানেত ফাউন্ডেশন বিশেষভাবে মেয়েদের শিক্ষায় সহায়তা দিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, “আমি আশা করি এ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে এবং আজকের এই সফর আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, সহায়তা সংস্থা ও দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, যাতে তারা রোহিঙ্গাদের শিক্ষায় আরও জোরালোভাবে সহায়তা করে।”
রমজান উপলক্ষে মেসুত ওজিলের সফর প্রসঙ্গে বিলাল এরদোয়ান বলেন, ওজিল তার রমজানের প্রথম ইফতার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে করতে বেছে নিয়েছেন, যা মুসলিম বিশ্বে একটি শক্ত বার্তা দেবে। “রমজান আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়—সহমর্মিতা, আত্মসমালোচনা ও স্মরণের সময়। আমি আশা করি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রথম ইফতার বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়কে তাদের স্মরণ ও সহায়তায় উদ্বুদ্ধ করবে,” বলেন তিনি।
তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং সরকার ও জনগণের আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
পরে প্রতিনিধিদলটি উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৯-এ টিকা পরিচালিত তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল ও শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পরিদর্শন করে।
এরপর ওজিল রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচে অংশ নেন। ম্যাচ শেষে বিলাল এরদোয়ান, ওজিল ও প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারে যোগ দেন।
কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে যে ঈদের স্বপ্ন দেখেছিল তারা, সেই ঈদ এবারও কাটছে শরণার্থী শিবিরের টিন আর ত্রিপলের ঘরে। সময় শেষ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের, কিন্তু শেষ হয়নি রোহিঙ্গাদের অপেক্ষা।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আশার বার্তা দিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, নোবেলজয়ী পরিচিতি ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক ছিল তাঁর একটি বক্তব্য ‘সামনের ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি মিয়ানমারে গিয়ে করবে।’
কিন্তু সময় গড়িয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। সামনে ঈদও এসে গেছে। আর রোহিঙ্গারা রয়ে গেছে ঠিক সেখানেই—কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শিবিরে।
‘প্রতিশ্রুতির ঈদ’ অপেক্ষার আরেক বছর
উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে বসবাসরত ৪৫ বছর বয়সী আবদুস সালাম বলেন,“আমরা সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল এবার হয়তো সত্যি ফিরব। এখন বুঝি, কথাটা শুধু কথাই ছিল।”
শিবিরে ঈদ মানে উৎসব নয় বরং নতুন করে উপলব্ধি করা আরেকটি বছর হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। বাঁশ আর ত্রিপলের ঘরে ঈদের সকালে রান্না হয় সীমিত রেশনের খাবার। নেই আয়োজন, নেই গ্রামে ফেরা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ।
এক রোহিঙ্গা কিশোরীর কণ্ঠে ধরা পড়ে প্রজন্মগত সংকট, “আমি বাংলাদেশেই বড় হয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ আমার দেশ না, মিয়ানমারও আর চেনে না।”
ইউনূস অধ্যায়ের ইতি, ইস্যু রয়ে গেল
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইউনূস অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। কিন্তু এই সময়টাতেই রোহিঙ্গা সংকট আবারও অগ্রাধিকারের বাইরে চলে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানবাধিকারকর্মী কলিম উল্লাহ বলেন, “রোহিঙ্গারা এখন ভূরাজনীতির অনাথ। সবাই সহানুভূতির কথা বলে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে চায় না।”
২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আট বছরেও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেনি। ইউএনএইচসিআরের হিসাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাবে তা দেড় মিলিয়নের কাছাকাছি।
জাতীয় নীতিমালা নেই, প্রতিনিধিত্ব নেই
‘ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গা’র প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বলেন,“বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত ১৩ লাখ রোহিঙ্গার জন্য কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। প্রতিনিধিত্বমূলক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।” তিনি বলেন, ইউনূসের ওপর তারা আশাবাদী ছিলেন।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরুক।
‘আমরা মর্যাদা নিয়ে ফিরতে চাই’
রোহিঙ্গা আর্ট ক্লাবের অপারেশন ম্যানেজার ও চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, “আমরা চাই মর্যাদা আর নিরাপত্তা নিয়ে ফিরতে। ইউএন আর বাংলাদেশ সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা যেন আমাদের কমিউনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।”
ইউনূসের বক্তব্য: আবেগ না কৌশল?
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল আবেগপ্রবণ কোনো মন্তব্য, নাকি কৌশলগত বার্তা—এই প্রশ্ন ঘিরে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন গবেষকরা।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, প্রফেসর ইউনূসের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, প্রথমত, প্রফেসর ইউনূস এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন—‘আগামী বছর ঈদ আপনারা নিজ ভূমিতে করবেন’—এই কথাটা তিনি আবেগের বশে বলেননি।
তার ভাষায়, “উনি যে অবস্থানে ছিলেন—একটি দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, নোবেল লরিয়েট—এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আবেগে ভেসে এমন বক্তব্য দেওয়ার কথা নয়।”
তিনি মনে করেন, ইউনূসের বক্তব্যের পেছনে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “একটা সম্ভাবনা হচ্ছে—উনি সত্যিকার অর্থেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান শুরু করতে চেয়েছেন। অন্তত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটা শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছেন।”
আরেকটা সম্ভাবনা হচ্ছে—একটা মিডিয়া সেনসেশন তৈরি করা, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা। নোবেল লরিয়েট হিসেবে তিনি এসে এক বছরে সবকিছু ঠিক করে ফেলবেন—এই ধরনের একটা ইমেজ তৈরি করা।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কিন্তু বাস্তবতা হলো—এটা বাস্তবসম্মত ছিল না।”
সরকারের অবস্থান: ‘এটা প্রত্যাশা ছিল, প্রতিশ্রুতি নয়’
রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে প্রতিশ্রুতি নয়, প্রত্যাশার প্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছে সরকার।
বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যটি মূলত ঈদকে ঘিরে এই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা তুলে ধরার একটি মানবিক ভাষ্য ছিল।
মিজানুর রহমান বলেন, “এই অঞ্চলে ঈদের সময় মানুষ গ্রামে যায়, বাবা-মা ও দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গারা যেহেতু আট বছর ধরে এখানে আটকে আছে, সেই মানবিক আবেগ থেকেই বলা হয়েছে—আগামী ঈদে আপনারা আপনাদের বাড়িতে যাবেন।”
তার ভাষায়, “এটা ছিল একটা উইশ, কোনোভাবেই কমিটমেন্ট নয়।”
রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরে কমিশনার বলেন,“এই সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের হাতে নেই। এটা মূলত মিয়ানমার রাষ্ট্র এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ এখানে একটি অংশ মাত্র।” তিনি স্পষ্ট করেন,“যদি সমাধানটা বাংলাদেশের হাতে থাকত, তাহলে গত আট বছর ধরে এই সংকট ঝুলে থাকত না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ: আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইস্যুটি ‘জিইয়ে রাখার চেষ্টা’
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সীমিত সময়ের মধ্যেও রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবার দৃশ্যমান করেছে বলে দাবি করেন মিজানুর রহমান।
তার ভাষায়,“আমরা চেষ্টা করেছি। জাতিসংঘে একটি স্পেশাল কনফারেন্স হয়েছে। বাংলাদেশে তিন দিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের নজরে বিষয়টি আনা হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এসেছেন।” তিনি বলেন,“ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে আবার এঙ্গেজমেন্ট শুরু হয়েছে—এটা বড় বিষয়।”
কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।
এই ইস্যুটাকে আবার আলোচনায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি থাকে।
তার মতে, এটি একটি কন্টিনিউয়াস প্রসেস।“ যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে—এই বিশ্বাস আমাদের আছে।”
প্রত্যাবাসন ও তহবিল সংকট— ‘আশা ছাড়ছি না’
বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গা সংকটকে বারবার আন্তর্জাতিক টেবিলে তুলছে, সে ব্যাখ্যাও দেন কমিশনার। তিনি বলেন, “এর দুটি প্রধান কারণ—একটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন, আরেকটি হচ্ছে এখানে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা।”
তিনি জানান, “তহবিল সংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই মানুষগুলোর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।”
মিজানুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ সরকার এই ইস্যুটি সবসময় আন্তর্জাতিকভাবে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এটা যদি চলমান থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো না কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব—এই আশা আমরা করি।”
রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রাধিকারে রোহিঙ্গা সংকট নেই
নৃ-বিজ্ঞানের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটি তাদের নির্বাচন ইশতেহারে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরেনি।
যারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বা আসার সম্ভাবনায় আছে, তাদের ইশতেহারে রোহিঙ্গা সংকট কীভাবে সমাধান হবে—এ নিয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এটি দেখেই বোঝা যায়, এই সংকট তাদের প্রায়োরিটি এজেন্ডায় নেই।
তার মতে, এটি রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।“ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো রোহিঙ্গা সংকটকে একটি বড় জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখছে না। অথচ বাস্তবে এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।”
এ বিষয়ে রাজনৈতিক মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“প্রফেসর ইউনূস কী উদ্দেশ্যে বা কী পরিকল্পনা নিয়ে এই কথা বলেছিলেন, সেটা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে বাস্তবতা হলো—এত অল্প সময়ে, বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে, এই সংকটের কোনো দৃশ্যমান সমাধান সম্ভব ছিল না।”
তার ভাষায়, “এটা যদি কোনো অলৌকিক ব্যাপার হতো—আলাউদ্দিনের চেরাগ বা আশ্চর্য প্রদীপের মতো—তাহলে হয়তো সম্ভব হতো। বাস্তব দুনিয়ায় সেটা হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, উনার সময় শেষ হয়ে গেছে।” তবে তিনি বলেন, সংকটটি এখানেই শেষ নয়।“যেই সরকারই আসুক, এই বোঝা আমাদের ঘাড়েই থাকবে। এটাকে সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।”
‘রাখাইনে বৈধ সরকার নেই’
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, “মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক দাঙ্গা, সংঘাত ও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এখন অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।”
প্রধান উপদেষ্টার আগের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“ওই মন্তব্য হয়তো আবেগের জায়গা থেকে ছিল, অথবা তখনকার পরিস্থিতির আলোকে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলে গেছে।” তার মতে, সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাখাইনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। “এখন সেখানে কোনো বৈধ, কার্যকর সরকার নেই। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মতভাবে অনিশ্চিত।”
রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি, সরকারের পরিবর্তনে দায় শেষ হয় না
২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “এই চুক্তিটা কোনো বিশেষ সরকার বা দলের মধ্যে হয়নি। এটা হয়েছে দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তখন মিয়ানমারে ছিল সুচির এনএলডি সরকার, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সরকার বদলালেই চুক্তি অকার্যকর হয়ে যায়—এমন নয়। রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার চুক্তি করে, আর যে সরকারই আসুক তার দায়িত্ব সেই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।” তার মতে, নতুন সরকার চাইলে এই যুক্তি সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আবার অগ্রাধিকার তালিকায় আনতে পারে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়।
ই-মেইলে পাঠানো এক প্রতিক্রিয়ায় সংস্থাটির মুখপাত্র শারি নিজমান জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে আসছে—উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে তারা নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চায়। তবে সেই প্রত্যাবাসনের জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো প্রয়োজন, সেগুলো এখনো পূরণ হয়নি।
ইউএনএইচসিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের নিজেদের আদি এলাকায় বসবাসের সুযোগ, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার, মৌলিক সেবা ও জীবিকায় প্রবেশাধিকার এবং নাগরিকত্ব ও বৈধ পরিচয়পত্র পাওয়ার একটি স্পষ্ট পথ নিশ্চিত করা জরুরি।
সংস্থাটি বলছে, এই শর্তগুলো নিশ্চিত করা মূলত মিয়ানমারের পূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে—যা বর্তমান বাস্তবতায় অনুপস্থিত।
ইউএনএইচসিআর আরও জানায়, ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে আনুমানিক দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, সেখানে ব্যাপক সংঘর্ষ, আন্তঃসম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং কাঠামোগত বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে রাখাইনে বসবাসকারী আনুমানিক ৫ লাখ ৩৬ হাজার রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা, চলাচলের স্বাধীনতা ও নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান মানবিক সংস্থার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সংস্থাটি জানায়, তারা বাংলাদেশ সরকারকে মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা সেবায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং এমন উদ্যোগের পক্ষে থাকবে, যা রোহিঙ্গাদের স্বনির্ভরতা বাড়াবে ও ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করবে।
নতুন সরকারের সামনে রোহিঙ্গা সংকট আগের মতোই এক কঠিন বাস্তবতা। জাতীয় নীতিমালা, কূটনৈতিক আগ্রাসন ও বহুমুখী সমাধান ছাড়া এই সংকট কাটবে না—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।
এই মুহূর্তে নিশ্চিত শুধু একটাই—দিন ফুরিয়েছে ইউনূসের, কিন্তু রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার দিন এখনো আসেনি। আরেকটি ঈদ পেরিয়ে যাচ্ছে অপেক্ষার প্রহর গুনে।