‘মৃত্যু বুকে নিয়েই ঘুমায়’ সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা!

বে ইনসাইট রিপোর্ট

মধ্যরাতে যখন বিশ্বের বহু মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় চোখ রেখেছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নেমে আসে অন্য এক বাস্তবতা। টানা ভারী বৃষ্টিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আটজন রোহিঙ্গা। একই রাতে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়।

কিন্তু মৃত্যুর এই হিসাবের বাইরেও বড় হয়ে উঠছে আরেকটি প্রশ্ন- আজ রাতেও কি লাখো মানুষ পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বুকে নিয়েই ঘুমাতে যাবে?

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৪ জন রোহিঙ্গা অর্থাৎ ৮৪ হাজার ৩৮১টি পরিবার এখনও এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেগুলো বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

“শান্তি যেন কোথাও নেই”

“বেশি বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মানুষগুলো ভয়ে থাকে কখন পাহাড় ভেঙে পড়ে। আর আমাদের এখানে ভয় কখন পানি উঠে আসে। শান্তি যেন কোথাও নেই।”

উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদের কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্বের ভার।

ক্যাম্প-৫ তুলনামূলক সমতল এলাকায় হলেও টানা বৃষ্টিতে সেখানেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকেছে, চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে তুলনামূলক উঁচু জায়গায়।

বে ইনসাইটের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্যাম্প-৫-এর আরও তিন মাঝি—মনা মিয়া, শবির আহামদ ও দই মাঝি। তাঁদের ভাষ্য, শুধু এই ক্যাম্পেই অন্তত ২০০টি আশ্রয়ঘর প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ ব্লকের এ-৩ সাব-ব্লকে।

প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, “ক্যাম্প ইনচার্জের পক্ষ থেকে কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘরটাই তো আমাদের শেষ আশ্রয়। দুর্যোগ এলে সেটাও ছেড়ে যেতে হয়। আমাদের দুর্গতির যেন শেষ নেই।”

ক্যাম্প-৫-এর বাসিন্দা মনা মিয়া বলেন, “সারারাত বৃষ্টি হলেই ঘুম আসে না। কখন খবর আসে পাহাড় ধসে পড়ার, আবার কখন ঘরে পানি ঢুকে যায়, এই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। বাচ্চাদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে।”

একই ক্যাম্পের সাব মাঝি শবির আহামদ বলেন, “এবারের বৃষ্টিতে অনেক ঘরে পানি ঢুকেছে। মানুষ কাপড়, খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু করে রাখছে। কেউ কেউ আত্মীয়ের ঘরে গিয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করছে।”

আরেক সাব মাঝি দই মাঝি বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই ভয় নিয়ে থাকতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু যাওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা সবার জন্য নেই।”

তিন ঘণ্টায় তিন পাহাড়ধস

রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার তিনটি আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যু হয়।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং শিশুও।

‘বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই’

পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরে সোমবার সারদিনই বৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই দুপুরের দিকে নিজের আশ্রয়ঘরের দিকে কাঁধে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে ফিরছিলেন নুরুল ইসলাম।

মধ্যবয়সী এই রোহিঙ্গা বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) কার্যালয় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়। তবে অনেকেই সেই নির্দেশ মানতে চান না।

“যেখানে যেতে বলে, সেখানেও তেমন সুবিধা নেই। তাই অনেকেই যেতে চায় না,” বলেন তিনি।

সোমবার রাত কোথায় কাটাবেন এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুক্ষণ নীরব থেকে নুরুল ইসলাম বলেন, “দেখি, কোনো আত্মীয়ের ঘরে যেতে পারি কি না।”

ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি কী ধরনের সহায়তা চান- এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার ক্লান্তি।

তিনি বলেন, “বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই, ভাই।”

‘দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ এখনও ঝুঁকিতে’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে তিনটি পৃথক স্থানে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ক্যাম্প-৭-এ এক শিশু, ক্যাম্প-১১-তে চারজন এবং ক্যাম্প-১৫-এ তিনজন প্রাণ হারান।

তিনি জানান, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর মধ্যে ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

“কমপক্ষে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ বর্তমানে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে”

মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। তবে গত দুই বছরে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর ভাষায়, অনেকেই বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিজেদের মতো করে আশ্রয় নির্মাণ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেও বসতি গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ক্যাম্প-১১-তে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেটিও এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নির্মিত আশ্রয়কে কেন্দ্র করে।

আরআরআরসি বলছেন, সবচেয়ে বড় সংকট হলো পর্যাপ্ত নিরাপদ জায়গার অভাব।

তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ জমির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার এখনও পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।

৭৬টি দুর্যোগ, পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

ইউএনএইচসিআরের কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েট মোশারফ হোসেন জানান, ৪ থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে মানবিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শিবিরে ৭৬টি আবহাওয়াজনিত ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ২১টি ছিল পাহাড়ধস।

এসব ঘটনায় ৫ হাজার ২৪৯ জন রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন, আহত হয়েছেন ছয়জন এবং ৩৮৬ জনকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর মানবিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জরুরি সহায়তা, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বর্ষার আগেই প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু…

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা শুরুর আগেই বিভিন্ন সংস্থা পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, রিটেইনিং ওয়াল ও গাইড ওয়াল নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ, সরিয়ে নেওয়ার মহড়া এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরাই দুর্ঘটনার সময় প্রথম ঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রতিবেশীদের সতর্ক করা, মানুষ সরিয়ে নেওয়া, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে সংস্থাটি বলছে, এসব উদ্যোগ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হলেও তা পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

অর্থসংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রস্তুতি

ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখনও বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী বসতিগুলোর একটি। অনেক পরিবার খাড়া পাহাড়ের ঢালে বাস করছে এবং তাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের মতো পর্যাপ্ত জমিও নেই।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থসংকট।

সংস্থাটি জানিয়েছে, অর্থায়নের ঘাটতির কারণে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়ঘর শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের পরিসর কমিয়ে আনতে হয়েছে।

২০২৬ সালের যৌথ মানবিক সাড়া পরিকল্পনার আওতায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা এবং তিন লাখের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের একাধিক কর্মসূচি ইতোমধ্যে সীমিত করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।

রেকর্ড বৃষ্টি, সামনে আরও শঙ্কা

কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত ৩৩ ঘণ্টায় ৩৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে উখিয়ায়। তবে সেখানে কত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

আবহাওয়া অফিস বলছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের প্রভাবে আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

অর্থাৎ, পাহাড়ধসের আশঙ্কা এখনও কাটেনি।

আরেকটি দীর্ঘ রাত

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে এখন ভয় দুই রকম।

পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের আতঙ্ক ‘কখন মাটি ধসে ঘরের ওপর নেমে আসে’।

আর নিচু এলাকার মানুষের ভয় ‘কখন বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়’।

এক রাতে নয়জনের মৃত্যু হয়তো একটি সংখ্যা।

কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে এখনও ৩ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করছেন, যেগুলোকে মানবিক সংস্থাগুলো নিজেরাই বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে।

তাই কক্সবাজারে বর্ষার প্রতিটি রাত এখন শুধু একটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়,হাজারো পরিবারের কাছে সেটি ঘুম আর অনিশ্চয়তার মধ্যকার এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প : মৃত্যু ভয়ে বর্ষা এলো বলে

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

উখিয়ার ক্যাম্প-২০-এর পাহাড়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করলেই সেনোয়ারা বেগমের রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়।

কারণ সেনোয়ারার কাছে বর্ষার আগমন আর কেবল ঋতু পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি যেনো অনিশ্চয়তার ফিরে আসা।

বাঁশ, দড়ি ও ত্রিপলে তৈরি তাঁর ছোট্ট আশ্রয়টি একটি খাড়া পাহাড়ের ঢালের নিচে। দিনের বেলায় পাহাড়টিকে যতটা নিরীহ মনে হয়, টানা বৃষ্টির রাতে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। গত কয়েক বছরে এমন বহু পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তাই আকাশে কালো মেঘ জমলেই সেনোয়ারার মনে ফিরে আসে একটাই প্রশ্ন, এবারও কি পাহাড়টি টিকে থাকবে?

“কাছাকাছি নিরাপদ কোনো জায়গা নেই,” বলেন তিনি।

“সহায়তা সংস্থাগুলো যখন অন্যত্র যেতে বলে, তখন যে জায়গার কথা বলে, সেটা আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন আর পরিচিত পরিবেশ থেকে অনেক দূরে। আমরা সেখানে যেতে চাই না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালগুলো যদি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেত।”

সেনোয়ারার এই আশঙ্কা বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়। উখিয়া ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরে হাজারো পরিবার প্রতিদিন এমন বাস্তবতার মধ্যেই বসবাস করছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতিতে জায়গার তীব্র সংকটের কারণে বহু পরিবারকে আশ্রয় নিতে হয়েছে খাড়া পাহাড়ের ঢালে কিংবা তার ঠিক নিচে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বনভূমি কেটে গড়ে তোলা হয়েছে এসব বসতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠনও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর বর্ষা এলেই সেই ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

প্রতিটি ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের মাটি আরও আলগা হয়। কোথাও ছোট ছোট ফাটল দেখা দেয়, কোথাও ধসে পড়ে মাটির অংশ। অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি পুরো ঢাল ভেঙে চাপা পড়ে যেতে পারে একাধিক ঘর।

প্রতি বর্ষাতেই ফিরে আসে পুরোনো শঙ্কা

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

শুধু ২০২৪ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন, যা ওই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। আর চলতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।

বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের জনযোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, “২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৮০ জন।”

তিনি বলেন, “অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল এখনো যথাযথভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্ষাকালে শরণার্থী পরিবারগুলোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস সাধারণত কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করলে ঘটে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে সেই প্রায় সবগুলো কারণই বিদ্যমান- খাড়া ঢাল, বন উজাড়, দুর্বল মাটি, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অত্যধিক জনঘনত্ব।

তহবিল সংকট বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমান ঝুঁকি শুধু প্রাকৃতিক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মানবিক তহবিল সংকট।

সংস্থাটির ভাষায়, অর্থের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-হ্রাস কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, বাঁশের টেরেস নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়কেন্দ্র শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়মিত সংস্কার।

সীমিত অর্থায়নের কারণে মানবিক সংস্থাগুলোকে খাদ্য সহায়তা, পুষ্টি ও সুরক্ষার মতো জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ-প্রতিরোধমূলক অনেক উদ্যোগে কাটছাঁট করা হয়েছে।

এতে এমন বহু পাহাড়ি ঢাল রয়েছে, যেগুলো আগে নিয়মিত মেরামত ও পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল, কিন্তু এখন আর সেই কাজ আগের মতো সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানান্তরও সহজ সমাধান নয়

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটি সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।

শারি নিজমান বলেন, “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে স্থানান্তর করা দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।”

তিনি বলেন, “শিবিরগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। খালি জমি প্রায় নেই বললেই চলে। আবার অনেক পরিবার স্থানান্তরে অনীহা প্রকাশ করে, কারণ এতে তারা জীবিকার সুযোগ, বাজারে যাতায়াত এবং ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পর গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কা করে।”

ফলে অনেক পরিবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়েও একই জায়গায় থেকে যেতে বাধ্য হয়।

বৃষ্টির রাত মানেই নির্ঘুম অপেক্ষা

ক্যাম্প-৪-এর বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই তাঁদের পরিবারের মধ্যে উৎকণ্ঠা নেমে আসে।

“বৃষ্টি হলে আমি ঘুমাতে পারি না। সারারাত ভাবি, কখন পাহাড় ভেঙে পড়বে,” বলেন তিনি।

“আমি সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ের ঢালে থাকি। সব সময় ভয় নিয়ে থাকতে হয়।”

শিবিরের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকি কমানোর ছোট ছোট উদ্যোগও চোখে পড়ে। কোথাও পানি যাতে মাটি ধুয়ে না নেয়, সে জন্য ড্রেনের ওপর প্লাস্টিকের শিট বিছানো হয়েছে। কোথাও আশ্রয়ের পাশে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে। আবার কোথাও বাঁশের খুঁটি দিয়ে পাহাড়ের ঢালকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে এসবই মূলত সাময়িক ব্যবস্থা। টানা ভারী বর্ষণের সামনে এগুলোর কার্যকারিতা সীমিত।

প্রস্তুতির কথা বলছে প্রশাসন

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে প্রতিটি শিবিরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে জেলায় প্রায় ২৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সহকারী আবহাওয়াবিদ এ. বি. হান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। এতে পাহাড়ি ঢাল আরও নরম হয়ে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও তারা বিভিন্ন প্রকৌশলভিত্তিক ও প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার এবং মাটির ক্ষয় রোধে ভেটিভার ঘাস রোপণ।

তবে সংস্থাটির সতর্কবার্তা স্পষ্ট, জরুরি প্রস্তুতির পাশাপাশি পাহাড় স্থিতিশীল করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে ধারাবাহিক বিনিয়োগ না হলে প্রতি বর্ষাতেই একই সংকট ফিরে আসবে।

বর্ষা কেবল একটি ঋতু নয়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের হাজারো পরিবারের কাছে এটি এক দীর্ঘ পরীক্ষার সময়। তারা বৃষ্টি নামলে অনেকেই আকাশের দিকে তাকান না, তাকান পাহাড়ের দিকে।

কারণ তাঁদের কাছে প্রতিটি ভারী বর্ষণ মানে শুধু বৃষ্টির শব্দ নয়, তার সঙ্গে মিশে থাকে মাটি সরে যাওয়ার আশঙ্কা, রাতভর নির্ঘুম অপেক্ষা, আর ভোর পর্যন্ত বেঁচে থাকার প্রার্থনা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নীরবে বাড়ছে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হুমকি

আফজারা রিয়া

বর্ষা মানেই কক্সবাজারে স্বস্তির বৃষ্টি। ধুলোমাখা শহর ধুয়ে যায়, পাহাড়ে নামে সবুজের ছোঁয়া, সমুদ্র ফিরে পায় অন্যরকম সৌন্দর্য। কিন্তু এই বৃষ্টির সঙ্গেই প্রতি বছর নীরবে ফিরে আসে আরেকটি অদৃশ্য আতঙ্ক-ডেঙ্গু।

একটি মশা। কয়েক ফোঁটা জমে থাকা পানি। আর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে প্রাণঘাতী সংক্রমণ।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, কক্সবাজারে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এখন শহরে নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। আক্রান্তের সংখ্যা হোক কিংবা মৃত্যু দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই ক্যাম্পগুলো।

এমন বাস্তবতায় বর্ষা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ।

ঝুঁকি আছে,তবে প্রতিরোধ কঠিন নয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার বংশবিস্তার রোধ করা। তাই বাড়ি, ক্যাম্প বা আশপাশের কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা দেখা দিলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা।

ডেঙ্গুর কেন্দ্রবিন্দু এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২১ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৮১ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশই ছিলেন রোহিঙ্গা।

একই বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৭ জনের মধ্যে ৬ জনই ছিলেন ক্যাম্পের বাসিন্দা।

২০২৫ সালে সংক্রমণ কমে ৮ হাজার ৮৩৮ জনে নেমে এলেও চিত্র খুব একটা বদলায়নি। আক্রান্তদের মধ্যে ৬ হাজার ৩০৩ জনই রোহিঙ্গা, আর ১১টি মৃত্যুর মধ্যে ১০টিই ঘটেছে ক্যাম্পে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্ত ৪৫১ জনের মধ্যে ৩৩০ জনই রোহিঙ্গা। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর খবর না থাকলেও বর্ষার শুরুতেই স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকির বলে বিবেচনা করছে।

কেন এত ঝুঁকিতে ক্যাম্পগুলো?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে কয়েক লাখ মানুষের ঘনবসতি, সীমিত জায়গা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে এডিস মশার জন্য তৈরি হয়েছে আদর্শ প্রজননক্ষেত্র।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন,

আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, ডেঙ্গু আক্রান্তদের বড় অংশই রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, পানি জমে থাকা এবং দ্রুত সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্ষা সামনে রেখে রোগ নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে।

তার মতে, কুতুপালং-বালুখালী মেগা ক্যাম্প, ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশন, ক্যাম্প-৮ই, ক্যাম্প-১৩ ও ক্যাম্প-১৫ বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

ভুল ধারণাও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

ডা. ছাবের বলেন, এখনও অনেকেই মনে করেন এডিস মশা শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। বাস্তবতা ভিন্ন।

পরিষ্কার কিংবা অপরিষ্কার যে কোনো স্থির পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে।

তাই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না। ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা যে কোনো পানিযুক্ত বস্তু নিয়মিত পরিষ্কার বা উল্টে রাখতে হবে।

ক্যাম্পে চলছে সমন্বিত প্রস্তুতি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা মো. রিজওয়ানুল হক ভূঁইঞা বলেন,

বিশাল জনসংখ্যা এবং সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস, পানি জমে থাকা স্থান শনাক্তকরণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

ঝুঁকি শুধু ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ নয়

অনেকে মনে করেন ডেঙ্গু কেবল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সমস্যা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সেটি ভুল ধারণা।

২০২৪ সালে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৩৬৬ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৩৫।

অর্থাৎ কক্সবাজার সদরসহ জেলার প্রতিটি উপজেলাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় মানুষ এবং রোহিঙ্গাদের প্রতিদিনের চলাচলের কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পুরো জেলাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে সংকট

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়,

অনিয়মিত ভারী বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার ওঠানামা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি রোগ নয়; বছরের দীর্ঘ সময়ই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দিলে দেরি না করে পরীক্ষা করাতে হবে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সামান্য জ্বরকেও অবহেলা করা যাবে না।

হাসপাতাল প্রস্তুত, কিন্তু সবচেয়ে বড় ওষুধ সচেতনতা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শান্তনু জানান,

বর্তমানে সংক্রমণ কিছুটা কম থাকলেও আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। প্রয়োজনীয় স্যালাইন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রয়েছে। তবে ডেঙ্গুকে অবহেলা করা যাবে না। জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে এবং দিন-রাত সবসময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হাসপাতাল নয়, প্রতিরোধ।

ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর এর মতে, একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপ, একটি ডাবের খোসা কিংবা টবের নিচে জমে থাকা সামান্য পানিই কয়েক দিনের মধ্যে শত শত এডিস মশার জন্ম দিতে পারে। আর সেই মশাই কেড়ে নিতে পারে একটি প্রাণ।

রোহিঙ্গা ত্রাণ প্রকল্পঃ তহবিল অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ ইউএনএইচসিআরের বিরুদ্ধে

বে ইনসাইট রিপোর্ট

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর একাধিক মানবিক সহায়তা প্রকল্পে পরিকল্পনার দুর্বলতা, তহবিলের অপচয়, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের অভিযোগ উঠেছে।

জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর -ওআইওএস পরিচালিত এক অডিটে এসব অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ওই অডিট প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এইজ’ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি বলছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটের জন্য অনুদান ধারাবাহিকভাবে কমে আসার সময়েও বিভিন্ন প্রকল্পে এমন ব্যয় হয়েছে, যার অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও একই ধরনের কাজ একাধিকবার করা হয়েছে, কোথাও নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহারই হয়নি, আবার কোথাও বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে। ফলে সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

লক্ষ্যচ্যুত প্রকল্প, অপচয় হয়েছে অর্থ

অডিটে বলা হয়েছে, ইউএনএইচসিআরের বেশ কয়েকটি প্রকল্প সংস্থাটির ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একই ধরনের কার্যক্রম বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনার অভাবে একই উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যয় হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পদের অপচয়ে পরিণত হয়েছে।

অডিটকারীরা মন্তব্য করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন নির্ধারণ, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি।

অডিটে ত্রাণসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার ঘাটতি ও অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত প্রয়োজন মূল্যায়ন না করেই এমন কিছু সামগ্রী কেনা হয়েছে, যেগুলোর ব্যবহার শিবিরে প্রায় নেই বললেই চলে। উদাহরণ হিসেবে খাওয়ার জন্য চামচ, কাটাচামচ ও ছুরি কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গারা ঐতিহ্যগতভাবে হাত দিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন। তা সত্ত্বেও এসব সামগ্রী কিনতে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মার্কিন ডলার।

অডিটে আরও বলা হয়, এসব সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বারবার আপত্তি ও অভিযোগ ওঠার পরও ক্রয় পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এর ফলে ৬২ হাজারের বেশি কুকিং সেট গুদামেই পড়ে থাকে, যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার

কোটি টাকার হাসপাতাল নির্মাণ, কিন্তু ব্যবহার হয়নি

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত।

অডিটে দেখা যায়, উখিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবহারই করা হয়নি। একইভাবে ভাসানচরে নির্মিত ২০ শয্যার একটি ইনডোর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত ছিল।

শুধু ভবনই নয়, হাসপাতালটিতে স্থাপন করা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ৭৪ হাজার ৩০১ ডলারের এক্স-রে মেশিনও কার্যত অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল।

অডিটে বলা হয়, অবকাঠামো নির্মাণের আগে বাস্তব প্রয়োজন এবং পরিচালনা পরিকল্পনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি

রোহিঙ্গা শিবিরে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির অভাবও অডিটে উঠে এসেছে।

অডিটকারীরা বলেন, ২০২৪ সালে শিবিরে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং হেপাটাইটিস-সি রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেও ইউএনএইচসিআরের কোনো সমন্বিত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ছিল না।

মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিও ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে তীব্র পানিবাহিত ডায়রিয়া, কলেরা, খোসপাঁচড়া এবং উকুনের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সময়মতো ও কার্যকর মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ার তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেই খাতেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

মেয়াদোত্তীর্ণ সূঁচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই আবার বড় চুক্তি

অডিটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি ছিল চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে।

একটি প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ মেডিকেল সূঁচের গায়ে নতুন মেয়াদ লিখে সরবরাহ করেছিল। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকেই পরবর্তীতে প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের নতুন চুক্তি দেওয়া হয়।

এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যের সরবরাহকারী নির্বাচন করায় প্রায় ৯৭ হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৬০ লাখ ডলারের ওষুধ কর্মসূচিতে ওষুধের ঘাটতি, আবার কোথাও অতিরিক্ত মজুদ, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের ঘটনাও পাওয়া গেছে।

এদিকে প্রায় ৩৬ লাখ ডলারের পুষ্টি কর্মসূচি এবং ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের রোগী রেফারেল কর্মসূচিতেও উপকারভোগী নির্বাচন, নির্দেশিকা এবং হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা ধরা পড়ে।

হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারেও কোটি কোটি টাকার অপচয়

অডিটে কক্সবাজারের শিবির এলাকায় বন্য হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত টাওয়ার প্রকল্পকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রায় ২২ লাখ ডলার ব্যয়ে ৯৯টি হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী মূল্যায়নে এগুলোকে কার্যকর নয় বলে উল্লেখ করা হয়।

এর মধ্যে ৮৩টি টাওয়ারের ছাদ ঘূর্ণিঝড়-উপযোগী না হওয়ায় খুলে ফেলতে হয়, যাতে প্রায় ৫৬ হাজার ডলারের নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হয়। পরে টাওয়ারগুলোকে আরও টেকসই করতে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৬৭ হাজার ডলার ব্যয় করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালের আরেকটি মূল্যায়নে টাওয়ারের সংখ্যা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও অডিট পর্যন্ত মাত্র ১২টি টাওয়ার অপসারণ করা হয়েছিল।

একই ঠিকাদারের ওপর অতিনির্ভরতা, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কাজ

ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচনেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নির্মাণকাজ মূলত একজন ঠিকাদারকেই দেওয়া হয়। তার দর বাজারদরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি ছিল। এতে সম্ভাব্য ৬৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

শুধু তাই নয়, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের দর ৩৩ থেকে ৪৩ শতাংশ কম হলেও তাদের পরিবর্তে একই ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করা হয়।

এছাড়া ৩ কোটি ডলারের এলপিজি রিফিল, চুলা, প্রেসার কুকার, ইগনাইটার ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কাজও এমন একজন সরবরাহকারীকে দেওয়া হয়, যিনি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন না। পরে ওই প্রতিষ্ঠান আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

চুক্তি অনুযায়ী এলপিজি ডিপোর ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বহন করার কথা থাকলেও ইউএনএইচসিআর নিজেই ১৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। ওয়ারেন্টির আওতায় স্পার্ক লাইটার পাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত ৬৫ হাজার ডলারের লাইটারও কিনেছে সংস্থাটি।

অডিটকারীরা উল্লেখ করেছেন, ওই ঠিকাদারের দর ছিল বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। একই ধরনের কাজ কম খরচে করতে সক্ষম অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

জ্বালানি ও পরিবেশ প্রকল্পেও অতিরিক্ত ব্যয়

অডিটে জ্বালানি ও পরিবেশ খাতের প্রকল্পগুলোকেও ব্যয়বহুল ও অদক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৩৯ লাখ ডলারের জ্বালানি ও পরিবেশ কর্মসূচিতে বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ করানো হয়েছে।

২০২১ সালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিকাদারের দর বাজারদর ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ বেশি ছিল।

এরপর ২০২৩ সালে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই একই কাজের দর ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যাতে অতিরিক্ত ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলার ব্যয় হয়।

পরে বাজার যাচাই ছাড়াই চুক্তির মূল্য আরও ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়, ফলে অতিরিক্ত ২২ লাখ ডলার ব্যয় হয়।

এছাড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোয় স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছে অডিট।

রোহিঙ্গা শিবিরে এলপিজি সরবরাহেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।

একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রায় ৩ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়, যদিও সেটি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল না।

অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৫৫ লাখ ডলার বেশি মূল্যের এলপিজি রিফিল কেনা হয়। প্রেসার কুকার ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক পরীক্ষামূলক প্রকল্প শেষ হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় সম্ভাব্য প্রায় ২০ লাখ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগও হারানো হয়েছে।

অপ্রয়োজনীয় যানবাহন কেনা, অফিস ও গুদাম

যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অদক্ষতার চিত্র পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ১৬টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন ৫২টি কর্মসূচির গাড়ি প্রয়োজন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ইউএনএইচসিআর দিতে পারেনি।

অডিটে আরও উঠে এসেছে, ইউএনএইচসিআরের ১০৪টি গাড়ির মধ্যে ১০টি দীর্ঘ সময় ব্যবহার হয়নি। তারপরও এসব গাড়ির জন্য ৮০ হাজার ডলারের বেশি ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআরের নতুন অফিস ভবন নির্মাণেও একাধিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে অডিট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয়ে অফিস ভবন নির্মাণ করা হলেও জমির মালিকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

নির্মাণকাজ চলাকালে নকশা পরিবর্তন করে ভবনে তৃতীয় তলা যুক্ত করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর জমির মালিক ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ভাড়াচুক্তি ছিল না।

এরপরও নতুন ভবনটি পাঁচ মাস খালি পড়ে ছিল। সেই সময় পুরোনো অফিসের জন্য প্রতি মাসে ১১ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

এছাড়া আট বছর ধরে একটি অব্যবহৃত মোটেলের জন্য বছরে ১ লাখ ২৬ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে, যদিও অনেক কম খরচে বিকল্প জায়গা পাওয়া সম্ভব ছিল।

গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গুদাম ভাড়া নেওয়ায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাসানচরে একই কাজের জন্য একাধিক ব্যয়

অডিটে বলা হয়েছে, ভাসানচরে সরকার যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে ছিল, সেখানে ইউএনএইচসিআরও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে।

ফলে সরকার আগে থেকেই সৌরায়িত করে রাখা তিনটি স্থাপনায় আবারও একই ধরনের কাজ করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়াই ব্যয়বহুল ভোল্টেজ রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে।

একই এলাকায় একই ধরনের প্রকল্প

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নকারী অংশীদারদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে একই এলাকায় ১২৮টি পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ৫২টি পাম্পিং স্টেশন এবং ২০ হাজারেরও বেশি নলকূপ নির্মাণ করা হয়েছে।

অডিটকারীরা বলেছেন, সমন্বয় জোরদার করা গেলে এসব ব্যয়ের বড় অংশই এড়ানো সম্ভব ছিল।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে জরুরি সহায়তায় জোর

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর আট বছর পরও ইউএনএইচসিআরের ব্যয়ের অধিকাংশই তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল।

অডিট অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ জরুরি মানবিক সহায়তায় ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা এবং টেকসই সমাধানমুখী কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ।

অডিটকারীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে।

ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ‘নিউ এইজ’কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের গণসংযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, সংস্থাটি সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তার ভাষায়, অভ্যন্তরীণ অডিট সংস্থার কার্যক্রম মূল্যায়ন ও উন্নয়নের একটি নিয়মিত অংশ। অডিটে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও ব্যয় দক্ষতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শারি নিজমান বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দিতে ইউএনএইচসিআর কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট

বর্তমানে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক হিসাবে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসে।

তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সেই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিজস্ব অডিটে উঠে আসা এই অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ শুধু একটি সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনাই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির জবাবদিহি, দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করেন স্থানীয় একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

তথ্যসূত্র: ‘নিউ এইজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর (ওআইওএস) -এর অডিট রিপোর্ট।

“আমাদেরও দেশ আছে, আমরা দেশছাড়া মানুষ নই”

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের মতো বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারাও স্মরণ করছেন তাদের হারিয়ে যাওয়া দেশ, ভিটেমাটি, স্বজন ও অতীতের জীবনকে। তবে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নতুন করে জানাচ্ছেন নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবি, শরণার্থী নয়, মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চান তারা।

বে ইনসাইটের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে এ কথা বলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মো. জুবায়ের।

তার ভাষায়, বিশ্ব শরণার্থী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি পৃথিবীর সব শরণার্থীর বেদনা, হারিয়ে যাওয়া পরিচয় এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

“এই দিনটি আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় কেন আমরা শরণার্থী হয়েছি। আমরা আমাদের দেশ, সম্পত্তি, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি সবাইকে স্মরণ করি। আমরা কাঁদি। বিশ্বকে বলতে চাই, আমাদেরও দেশ আছে, আমরা দেশছাড়া মানুষ নই,” বলেন তিনি।

মো. জুবায়েরের অভিযোগ, মিয়ানমারে ধারাবাহিক নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণেই রোহিঙ্গারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি বলেন, “২০১৭ সালে এবং পরে ২০২৪ সালেও গণহত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে আমাদের বিতাড়িত করা হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা কখনোই শরণার্থী হতে চাইনি, এখনও চাই না।”

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, এটি স্থায়ী সমাধান নয়।”

রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে মো. জুবায়ের বলেন, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের অভাবের কারণেই প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না।

“বিশ্ব বাংলাদেশকে এমন কোনো সুযোগ বা পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারেনি, যাতে আমরা নিরাপদে আরাকানে ফিরতে পারি। ফলে আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও মর্যাদার সঙ্গে নিজের ভূমিতে ফিরতে পারেনি,” বলেন তিনি।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ক্যাম্প আসলে এক ধরনের কারাগার। অনেক ক্ষেত্রে কারাগারের চেয়েও এখানে অশান্তি বেশি। এখানে শান্তি নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই।”

তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পরিচয়ের প্রশ্ন।

“আমরা বলছি আমরা রোহিঙ্গা। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন জনগোষ্ঠী ও কর্তৃপক্ষ আমাদের ‘বাঙালি’ বলে। এই বিরোধের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। তাই আজও আমরা এই দুরবস্থার মধ্যে আছি,” বলেন তিনি।

আরাকানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মো. জুবায়ের। তার দাবি, সেখানে চলমান সংঘাত ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

“এখনও বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের স্বার্থে খেলা খেলছে। আরাকানের বিভিন্ন এলাকা দখল করা হচ্ছে। আমাদের ফিরে যাওয়ার মতো জায়গাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।

তবে সমাধানের বিষয়ে তিনি একটি বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তার মতে, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরাকানে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল বা সুরক্ষিত আশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটি শরণার্থী শিবির হলেও তারা সেখানে যেতে প্রস্তুত।

“পুরো বিশ্ব যদি আমাদের জন্য আরাকানে একটি নিরাপদ আস্তানা তৈরি করে দেয়, সেটা শরণার্থী শিবির হলেও আমাদের আপত্তি নেই। অন্তত সেটা আমাদের নিজ ভূমির কাছাকাছি হবে। আমরা সেখানে থাকতে রাজি,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন এই রোহিঙ্গা নেতা।

“আমরা বাঙালি জনগণকে আর কষ্ট দিতে চাই না। বাংলাদেশের কোনো প্রান্তিক এলাকায় বছরের পর বছর আটকে থাকতে চাই না। আমরা চাই সম্মানের সঙ্গে নিজের ভূমিতে ফিরে যেতে,” বলেন তিনি।

বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মো. জুবায়ের বলেন, শুধু রোহিঙ্গা সংকট নয়, ভবিষ্যতে যেন পৃথিবীর আর কোনো জনগোষ্ঠী শরণার্থী হতে বাধ্য না হয়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তার ভাষায়, “আমাদের অনুরোধ, বিশ্ব এমন প্রতিজ্ঞা করুক যাতে আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো মানুষ শরণার্থী না হয়। কারণ কেউই শরণার্থী হয়ে জন্মায় না, কেউ শরণার্থী হতে চায় না।”

প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান: শরণার্থী কমিশনার মিজানুর রহমান

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাংলাদেশ এখন তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধান একমাত্র নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।

মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর সবচেয়ে বড় ঢলে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি।

তার ভাষায়, “গত দুই-আড়াই বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। অন্যদিকে প্রতিবছর ক্যাম্পগুলোতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে না। ফলে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।”

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জনগণ ও সরকারকে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। তবে তিনি উল্লেখ করেন, নয় বছর পূর্ণ হতে চললেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে আরআরআরসি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম সেবা দিয়ে এখানে রাখা এবং পরে তাদের নিজ দেশে সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও আমরা প্রত্যাবাসন করতে পারিনি।”

তিনি এর জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও অনিরাপদ পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের পথে প্রধান বাধা বলে উল্লেখ করেন।

মিজানুর রহমান বলেন, “মিয়ানমারের নাগরিকরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তাদের নিজ দেশে এখনো এমন পরিবেশ তৈরি হয়নি যেখানে তারা নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে। রাখাইনের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের অনুকূল নয়।”

তিনি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ সরকারও প্রত্যাবাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আরআরআরসি বলেন, এই মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে জানানোর মতো বড় কোনো অগ্রগতি নেই। তবে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যাবাসন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করছে। আমরা আশা করি মিয়ানমার সরকার এবং রাখাইনে সক্রিয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে যাবে এবং প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।”

আড়াই লাখ রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাই

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিজানুর রহমান জানান, বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ সালেই প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গার পারিবারিক তথ্য (ফ্যামিলি ট্রি) মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল।

তিনি বলেন, “মিয়ানমার প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই করেছে। তবে সেটিও অনেক আগের বিষয়। এর মধ্যে পরিবারে নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে, কেউ মারা গেছে, অনেক পরিবার ভেঙে গেছে। ফলে যাচাই একটি চলমান প্রক্রিয়া।”

তার মতে, প্রত্যাবাসন শুরু হলে এসব তথ্য আবার হালনাগাদ করতে হবে। বর্তমানে জাতিসংঘের সহযোগিতায় পরিচালিত নিবন্ধন কার্যক্রম অনুযায়ী প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নিবন্ধিত রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’

ক্যাম্পগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে আরআরআরসি বলেন, এত বড় জনসংখ্যাকে সীমিত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিনি বলেন, “অনেক রোহিঙ্গা নিজ দেশে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে এখানে এসেছে। তাদের মধ্যে বিশেষ করে তরুণদের এক ধরনের মানসিক ট্রমা রয়েছে। তারপরও আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি।”

তিনি জানান, ক্যাম্প এলাকায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), পুলিশ, র‍্যাব, আনসার এবং সীমান্তে বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীরও সহযোগিতা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

স্থায়ী অবকাঠামো নয়, দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অভিযোগ সম্পর্কে মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি একটি ভুল ধারণা।

তার ভাষায়, “রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী আবাসন তৈরির কোনো সুযোগ নেই। কিছু জায়গায় ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন করা হচ্ছে। সেখানে বাঁশের পরিবর্তে স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এগুলো স্থায়ী নয়। নাট-বল্টু খুলে অল্প সময়ের মধ্যেই খুলে ফেলা যায়।”

তিনি জানান, পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ক্যাম্পগুলোতে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকে। ২০২৩ সালে ভূমিধস ও দুর্যোগে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছিল।

এর পর থেকে প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ক্যাম্প-ইন-চার্জদের (সিআইসি) নেতৃত্বে নিয়মিত প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়।

তিনি বলেন, “যেসব এলাকা ভূমিধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কাজটি কঠিন হলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমরা সফলভাবে এটি করতে পেরেছি। এবারও সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।”

দীর্ঘায়িত সংকটের ভার

আরআরআরসি মিজানুর রহমান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, বাংলাদেশ এখনও মানবিক দায়িত্ব পালন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কমে আসা আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কোনোভাবেই ক্যাম্পে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নয়; বরং মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।

“গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় এজেন্ডায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি” : রাহমান নাসির উদ্দিন

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

আগামী ২৫ আগস্ট পূর্ণ হবে রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ বড় ঢলের নয় বছর। প্রায় এক দশক পার হলেও প্রত্যাবাসনের কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন অনুপ্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস উপলক্ষে বে ইনসাইটের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন।

তিনি বলেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের মধ্যে হলেও প্রকৃত সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি হতে পারে।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “২০১৭ সালে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ছিল। এরপর গত নয় বছরে জন্মহার বিবেচনায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার করে জনসংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে অনুপ্রবেশও হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে আমি মনে করি।”

প্রত্যাবাসন ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ অবস্থায়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি “স্ট্যান্ডস্টিল” শব্দটি ব্যবহার করেন।

তার ভাষায়, “এটা এমন এক অবস্থা, যেখানে কোনো অগ্রগতিও নেই, আবার আনুষ্ঠানিকভাবে পিছিয়েও যায়নি। সামনে এগোচ্ছে না, পেছাচ্ছেও না।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের বড় ঢল নামার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি করে। এরপর টাস্কফোর্স গঠন, শারীরিক ব্যবস্থাপনা চুক্তিসহ দ্রুত নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালের নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের আগস্টে প্রত্যাবাসনের দুটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

“এর প্রধান কারণ ছিল মিয়ানমারের অনীহা এবং আন্তরিকতার অভাব। রোহিঙ্গারা জানতে চেয়েছিল তারা কোথায় থাকবে, নিরাপত্তা কে দেবে, তাদের ফেলে আসা সম্পদ ফেরত পাবে কি না। এসব প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর মিয়ানমার দিতে পারেনি,” বলেন তিনি।

কোভিড, অভ্যুত্থান ও যুদ্ধের ধাক্কা

রাহমান নাসির উদ্দিনের মতে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার পেছনে পরবর্তী ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ মহামারির পর পুরো বিষয়টি ধীর হয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তার বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ফলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যায়।”

তার মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নতুন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

“গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় এজেন্ডায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি,” বলেন তিনি।

হতাশ তরুণ প্রজন্ম

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই গবেষক বলেন, সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছে ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম।

“যে শিশুর বয়স ২০১৭ সালে ১০ বছর ছিল, তার বয়স এখন ১৯। যে কিশোরের বয়স ছিল ১৫, সে এখন ২৪ বছরের যুবক। তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কেটে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্যে,” বলেন তিনি।

তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা অনেককে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা কিংবা নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

“তারা খুবই হতাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে,” যোগ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ কমছে

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার তালিকায় আগের মতো নেই।

“ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাসহ নানা বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেছে। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যু ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে,” বলেন তিনি।

তবে শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকেই দায়ী করতে চান না তিনি।

তার মতে, “বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথেষ্ট কার্যকরভাবে বোঝাতে পারেনি যে এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।”

নতুন বাস্তবতায় নতুন নীতি প্রয়োজন

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান বলে মনে করেন রাহমান নাসির উদ্দিন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তা দ্রুত সম্ভব নয় বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, “ধরুন কাল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সিদ্ধান্ত নিল রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে। তবুও বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নেই।”

তার মতে, শুধু প্রত্যাবাসনের কথা বললে হবে না; পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের প্রস্তাব

সমাধানের অংশ হিসেবে তিনি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন।

“যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করে আরও বেশি রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের সুযোগ খুঁজতে হবে,” বলেন তিনি।

একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করারও পরামর্শ দেন।

তার ভাষায়, “১৫ লাখ মানুষকে শুধু সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে হবে না। তাদের এমন কাজে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হয়।”

ভাসানচরে পশুপালন, হস্তশিল্প ও অন্যান্য জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে রোহিঙ্গাদের দক্ষতা ও শ্রমকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

‘প্যাকেজ ডিল’ ভাবনার প্রস্তাব

রাহমান নাসির উদ্দিন আরও বলেন, যেহেতু সংকট দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা নেই, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা বা “প্যাকেজ ডিল” নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

“বাংলাদেশ যদি আরও কয়েক বছর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও অন্যভাবে এর দায় ভাগ করে নিতে হবে। সেটা হতে পারে বাণিজ্য সুবিধা, শিক্ষা বৃত্তি, শ্রমবাজারে সুযোগ বৃদ্ধি বা অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে,” বলেন তিনি।

তার মতে, প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই সংকট মোকাবিলায় পুরোনো অবস্থানের পাশাপাশি নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণের সময় এসেছে।

রোহিঙ্গাদের বাড়ি আর কত দূর?

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

“আমার ছেলে যখন বাংলাদেশে আসে, তখন তার বয়স পাঁচ বছর। এখন সে প্রায় চৌদ্দ। সে তার গ্রামের নাম জানে, কিন্তু কখনও নিজের গ্রাম দেখেনি।”

উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে বসে কথাগুলো বলছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থী আবদুস সালাম। কথার মাঝেই তিনি থেমে যান। চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়ের দিকে।
তার মতো লাখো রোহিঙ্গার জীবন এখন দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকা এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।

একদিকে মিয়ানমার যেখানে তাদের জন্ম, শিকড়, জমি-ঘর, স্মৃতি। অন্যদিকে বাংলাদেশ, যে দেশ তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী ঠিকানা দিতে পারেনি।

বিশ্ব যখন ২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস পালন করছে, তখন কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কাছে দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া বাড়ি, হারিয়ে যাওয়া পরিচয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের স্মরণ দিবস।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগেও কয়েক দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে আজ প্রায় নয় বছর পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়েছে।

সংখ্যা বাড়ছে, সংকটও বড় হচ্ছে

বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে সংকটটি দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।

“২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় ইনফ্লাক্সের সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ এসেছিল। এখন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের উপরে। গত দুই-আড়াই বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।”

তিনি বলেন, “প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা স্থির নেই, ক্রমাগত বাড়ছে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন অবশ্য মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

“২০১৭ সালে আমরা ১১ লাখাধিক রোহিঙ্গার কথা বলেছিলাম। এরপর গত নয় বছরে প্রতিবছর গড়ে ৩০ হাজার করে জনসংখ্যা বেড়েছে। জন্মহার থেকে মৃত্যুহার বাদ দিলেও দুই থেকে আড়াই লাখ নতুন মানুষ যুক্ত হয়েছে। তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে দেড় থেকে দুই লাখ নতুন অনুপ্রবেশকারী যোগ করলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি।”

তার মতে, “বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আবাসভূমি।”

‘আমাদেরও দেশ ছিল’

রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকমের সাথে কথা বলেছেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর সদস্য ডা. জুবায়ের।

তার কণ্ঠে ছিল বেদনা, ক্ষোভ ও প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

“২০ জুন পৃথিবীর সব শরণার্থীর জন্য একটি বিশেষ দিন। এই দিনে তারা স্মরণ করে কেন তারা শরণার্থী হয়েছে, কীভাবে তাদের দেশ হারিয়েছে, কারা তাদের দেশছাড়া করেছে।”

তিনি বলেন, “আমরাও এই দিনে আমাদের ফেলে আসা বাড়ি, জমি, কবরস্থান, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানদের স্মরণ করি। অনেকের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। অনেকেই আর বেঁচে নেই।”

ডা. জুবায়েরের মতে, বিশ্ব শরণার্থী দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত নতুন করে যেন আর কোনো জনগোষ্ঠী শরণার্থী না হয়।

“আমরা বিশ্বকে বলতে চাই, আমরা কখনো শরণার্থী হতে চাইনি। পৃথিবীর কোনো মানুষই শরণার্থী হতে চায় না।”

পরিচয়ের সংকট

রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিচয়ের প্রশ্ন, এ কথা বারবার তুলে ধরেন ডা. জুবায়ের।

“আমরা বলি আমরা রোহিঙ্গা। কিন্তু রাখাইনের মগরা বলে আমরা বাঙালি। মিয়ানমার রাষ্ট্র আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। আমাদের পরিচয় অস্বীকার করে।”

তার ভাষায়, “যে জনগোষ্ঠীর পরিচয় স্বীকৃত নয়, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন কীভাবে সম্ভব?”

তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাখাইনে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা আরাকান আর্মির সময়ও রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা পায়নি।

“আজও মগ আর মিলিটারি নিজেদের মতো খেলা খেলছে। আমরা মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছি।”

‘ক্যাম্প একটা কারাগার’

নয় বছরের শরণার্থী জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডা. জুবায়ের বলেন, “ক্যাম্প একটা কারাগার।”

তিনি বলেন, “কারাগারের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে খারাপ। এখানে মানুষের স্বাধীনতা সীমিত। কাজের সুযোগ সীমিত। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।”

তার ভাষায়, “আমরা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্ব যদি রাখাইনে আমাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করে, সেটা শরণার্থী শিবির হলেও আমরা যেতে প্রস্তুত। অন্তত সেটা আমাদের ভূমি হবে।”

নয় বছরে একজনও ফেরেনি

রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ছিল। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। ২০১৮ সালের শুরুতে হয় বাস্তবায়ন চুক্তি।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। নভেম্বরে চুক্তি, ডিসেম্বরে টাস্কফোর্স, জানুয়ারিতে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট এগ্রিমেন্ট। তখন মনে হয়েছিল দুই বছরের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে।”

কিন্তু তা হয়নি। ২০১৮ সালে প্রথম এবং ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

“কারণ মিয়ানমার নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-সম্পত্তি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দিতে পারেনি,” বলেন তিনি।

“বাংলাদেশও জোর করে কাউকে ফেরত পাঠাতে পারেনি। রোহিঙ্গারা যেতে রাজি না হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির কারণে তাদের জোর করে পাঠাতে পারে না।”

‘প্রত্যাবাসন এখন স্ট্যান্ডস্টিল’

রাহমান নাসির উদ্দিন প্রত্যাবাসন পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেন ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ হিসেবে।

“এটা সামনে যাচ্ছে না, পিছিয়েও যাচ্ছে না। এক ধরনের স্থবিরতা।”

তিনি বলেন, “কোভিড মহামারির পর পুরো প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে যায়। এরপর মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, গৃহযুদ্ধ, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন—সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যত থেমে গেছে।”

তার মতে, “বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের বাস্তব রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়।”

‘আমাদের লক্ষ্য প্রত্যাবাসন’

আরআরআরসি মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য কখনোই রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রাখা নয়। আমরা চাই তাদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করতে এবং সসম্মানে নিজ দেশে ফিরিয়ে দিতে।”

তিনি বলেন, “নয় বছর প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।”

এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
“প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ এখনও নেই।”

তিনি জানান, বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ সালেই প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল।

“তারা প্রায় আড়াই লাখ মানুষের তথ্য যাচাইও করেছে। কিন্তু যাচাই করা আর প্রত্যাবাসন শুরু করা এক বিষয় নয়।”

নতুন বাস্তবতা: আরাকান আর্মি

রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন আগের চেয়ে অনেক জটিল।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “২০১৭ সালে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে ছিল। এখন বাস্তবতা বদলে গেছে।”

তার মতে, “আজ যদি মিয়ানমার সরকারও প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়, প্রশ্ন হচ্ছে—সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা কি তাদের আছে?”

কারণ রাখাইনের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

“বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখে। কিন্তু আরাকান আর্মি কোনো রাষ্ট্র নয়। ফলে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যেতে পারে না।”

সহায়তা কমছে

মিজানুর রহমানের ভাষায়, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন অর্থসংকট।”
তিনি বলেন, “প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অর্থায়ন কমছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয়—সবখানে চাপ বাড়ছে।”

তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ সহায়তাকারী দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

“তাদের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতো না।”

হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজন্ম

ক্যাম্পে এখন এমন একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যারা কখনও মিয়ানমার দেখেনি।
২০১৭ সালে যে শিশুর বয়স ছিল ১০, সে এখন তরুণ। যার বয়স ছিল ১৫, সে এখন কর্মক্ষম যুবক। কিন্তু তাদের সামনে নেই কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশ তাদের নাগরিকত্ব দেবে না। মিয়ানমারও গ্রহণ করছে না। তারা এক ধরনের রাষ্ট্রহীন ভবিষ্যতের মধ্যে বড় হচ্ছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি হতাশা সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ, মানবপাচার ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমছে

একসময় রোহিঙ্গা সংকট ছিল বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে।

কিন্তু এখন ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনাসহ নানা সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার তালিকা থেকে নিচে নেমে যাচ্ছে।”

তার মতে, বাংলাদেশেরও কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

“আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথেষ্টভাবে বোঝাতে পারিনি যে এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়।”

বিকল্প পরিকল্পনা কি প্রয়োজন?

প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান—এ বিষয়ে সবাই একমত। কিন্তু প্রত্যাবাসন না হলে কী হবে? এই প্রশ্ন তুলছেন রাহমান নাসির উদ্দিন।

“বাংলাদেশের একমাত্র নীতি হচ্ছে প্রত্যাবাসন। কিন্তু যদি আগামী পাঁচ বা দশ বছরেও তা সম্ভব না হয়, তাহলে বিকল্প পরিকল্পনা কী?”

তিনি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন, সীমিত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নতুন ধরনের চুক্তির কথা বলেন।

“অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কিছু দেশ মানবিক পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের মানুষদের কিছু উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার বিষয়ও ভাবতে হবে।”

তার মতে, “১৫ লাখ মানুষকে বছরের পর বছর শুধু ত্রাণনির্ভর করে রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।”

বাড়ি আর কত দূর?

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসের আগের দিন সকালে কুতুপালং ক্যাম্পের সরু গলিতে কয়েকজন শিশু ঘুড়ি উড়াচ্ছিল।

তাদের একজনের হাতে ছিল কাগজের তৈরি একটি ছোট ঘুড়ি। ঘুড়িটি আকাশে উঠছিল, কিন্তু সুতো ছিল শক্ত করে বাঁধা।

রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার জীবনও যেন সেই ঘুড়ির মতো। স্বপ্ন আছে, স্মৃতি আছে, ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সুতো আটকে আছে যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি, পরিচয়ের সংকট এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার জটিল গিঁটে।

নয় বছর আগে যারা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের অনেক শিশুই আজ তরুণ। কেউ কখনও রাখাইন দেখেনি, কেউ শুধু বাবা-মায়ের মুখে নিজের গ্রামের গল্প শুনেছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসে তাই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পগুলো থেকে আবারও ভেসে আসে একই প্রশ্ন- রোহিঙ্গাদের বাড়ি আর কত দূর?

কোরবানি ছাড়াই ঈদ: রেশন কমায় ম্লান রোহিঙ্গা শিবিরের উৎসব

কক্সবাজার । বে ইনসাইট

টেকনাফের ২৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করেন ইয়াসিনতারা। এবারের ঈদে কোরবানি দেওয়ার কথা তাঁর কাছে এখন কল্পনার মতো।

তিনি বলেন, “আগে যখন মাথাপিছু ১২ ডলার করে খাদ্য সহায়তা পেতাম, তখন চাল-ডাল থেকে একটু বাঁচিয়ে মাছ বা মাংস কিনতে পারতাম। এখন ১০ ডলার দিয়ে কিছুই বাঁচে না। গরুর মাংস কেনা সম্ভব না। ঈদের দিন হয়তো একটা ব্রয়লার মুরগি কিনেই উৎসব বলতে হবে।”

ইয়াসিনতারার মতো একই বাস্তবতায় আছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের অধিকাংশ মানুষ। এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমের কাছে এবারের ঈদ সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে কঠিন সময় হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার কোরবানি তো দূরের কথা, পরবর্তী খাবার নিয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

গত এপ্রিল থেকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। আগে সব পরিবার সমানভাবে মাথাপিছু ১২ ডলার পেত। এখন ঝুঁকি ও অসহায়ত্বের মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা ভাগ করা হয়েছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো পাচ্ছে মাথাপিছু ১২ ডলার, মাঝারি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো ১০ ডলার এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো পাচ্ছে মাত্র ৭ ডলার।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “ক্যাম্পের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ আগের ১২ ডলারের কম সহায়তা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবার ১০ ডলার এবং ১৭ শতাংশ পরিবার ৭ ডলার পাচ্ছে। আগের তুলনায় বড় একটি অংশ এখন কম বাজেটে চলতে বাধ্য হচ্ছে।”

মা-বাবা ও চার বোনকে নিয়ে বসবাস করা রেজওয়ান জানান, তাঁদের পরিবার এখন মাথাপিছু ৭ ডলার সহায়তা পায়।

তিনি বলেন, “ঈদ উদযাপন এখন স্বপ্নের মতো। ঈদের আগে কিছু টাকা জোগাড় করতে পারলে হয়তো একটু গরুর মাংস কিনতে পারব, কিন্তু কোরবানি দেওয়া সম্ভব না।”

আগের সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “১২ ডলার পেলে কোনোভাবে সংসার চলত। এখন যা পাই, তাতে ঠিকমতো খাবারই জোটে না। কিছুদিন না খেয়েও থাকতে হয়। এই অসহায় অবস্থা থেকে কবে মুক্তি পাব জানি না।”

ক্যাম্প-২৭ এর মাঝি মো. কালাম বলেন, যাদের বিদেশে আত্মীয়স্বজন আছেন তারা ভাগে কোরবানিতে অংশ নিতে পারছেন। অল্প কিছু সচ্ছল ব্যক্তি আলাদাভাবে গরু কোরবানি দিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ মানুষের জন্য সেটিও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, “কখনও কখনও প্রায় ১০০ জন মিলে এক লাখ টাকার একটি গরু কিনে ভাগ করে নেয়। খাদ্য সহায়তা কমার পর এটাই প্রথম ঈদ, তাই মানুষের কষ্ট অনেক বেড়ে গেছে।”

আরআরআরসি কার্যালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন এনজিও সংস্থাও এবার কোরবানির গরু ও মাংস বিতরণের পরিমাণ কমিয়েছে।

তবে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, অন্তত ন্যূনতম পর্যায়ে মাংস বিতরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, “প্রায় এক মাস আগে অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় পরিমাণ কম হলেও আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি পরিবারকে অন্তত এক কেজি মাংস পৌঁছে দিতে।”

তিনি জানান, মূলত বিভিন্ন ইসলামিক সংস্থা কোরবানির পশুর ব্যবস্থা করছে।

তবে টেকনাফ এলাকার ক্যাম্পগুলোতে সহায়তা পৌঁছানো কঠিন বলে উল্লেখ করেন আরআরআরসি।

তিনি বলেন, “ওই এলাকায় যাতায়াত খরচ বেশি। ফলে অনেক সংস্থা সেখানে যেতে আগ্রহ দেখায় না।”

আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংকট তৈরি হওয়ায় দাতাদের মনোযোগও বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে।

“মানুষের আবেগ বা মনোযোগ সবসময় এক জায়গায় থাকে না। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থাও এখন অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।”

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়েছে।

তিনি বলেন, “ঈদের দিনে সন্তানদের প্লেটে কোরবানির মাংস তুলে দিতে না পেরে অনেক বাবা-মা হতাশায় ভুগছেন।”

তবে জুবায়েরের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত আনন্দের ঈদ হবে তখনই, যেদিন তারা নিজ ভূমি রাখাইনে নিরাপদে ফিরতে পারবে।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ অঞ্চল গঠন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

এদিকে মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র যখন ঈদ উৎসবের প্রস্তুতি চলছে, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতার গল্প—দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতি, কমে আসা সহায়তা আর টিকে থাকার সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষের নীরব ঈদের গল্প।

৭১০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাইলো জাতিসংঘঃ ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হচ্ছে’

বে ইনসাইট । ডেস্ক

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা মেটাতে নতুন করে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ ও তার অংশীদার সংস্থাগুলো।

পাশাপাশি সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

বুধবার ঢাকায় জাতিসংঘ ভবনে ২০২৬ সালের হালনাগাদ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) উপস্থাপনকালে এ আহ্বান জানানো হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা, সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে। এতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ জরুরি সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে।

জেআরপি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত তহবিলের মধ্যে খাদ্য সহায়তার জন্য ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, আশ্রয় খাতে ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার, শিক্ষার জন্য ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার, স্বাস্থ্য খাতে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলার এবং জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নে ৩ কোটি ৫১ লাখ ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটে প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি টি. ক্লেমেন্টস, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রানিয়া দাগাশ-কামারা এবং ইউএন উইমেন-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা।

কেলি টি. ক্লেমেন্টস বলেন, “সম্পদ সীমিত হয়ে আসার এই সময়ে শরণার্থীদের দক্ষতা ও সহনশীলতা বাড়ানো আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা স্বনির্ভর হতে পারে এবং ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে পারে।”

রানিয়া দাগাশ-কামারা বলেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছে। দাতাদের অব্যাহত সহায়তা শরণার্থীদের জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে।”

অন্যদিকে নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা বলেন, “তহবিল সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে ক্যাম্পের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করেছে। নারী ও মেয়েরা বাস্তুচ্যুতির ফলে অতিরিক্ত ঝুঁকি ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।”

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বর্তমানে ক্যাম্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার পুরোপুরি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ৪২ শতাংশ পরিবারের আয় অস্থায়ী ও অনিশ্চিত উৎসনির্ভর এবং মাত্র ২৩ শতাংশ পরিবার মানবিক কার্যক্রমের আওতায় নগদ অর্থভিত্তিক কাজে যুক্ত হতে পারছে।

সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এ ধরনের নৌযাত্রা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। গত মাসে ২৭০ জনের বেশি যাত্রী বহনকারী একটি নৌকা ডুবে গেলে মাত্র ৯ জন জীবিত উদ্ধার হন।

জেআরপি উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তঃসরকারি সংস্থা বিষয়ক সচিব ও ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মান্যবর এম. ফরহাদুল ইসলাম এবং জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর উপস্থিত ছিলেন। ৫২টি বাংলাদেশি সংস্থাসহ মোট ৯৮টি মানবিক অংশীদার এই পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছে।

জাতিসংঘ পুনর্ব্যক্ত করেছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।