টেকনাফের ওপারে মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে বিমান হামলা

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রায় সাত মাস বিরতির পর বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। বুধবারের হামলার বিস্ফোরণের শব্দ বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তজুড়ে শোনা যায়। এতে সীমান্তবর্তী জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার কিছু পরে পরপর চারটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় টেকনাফের জাদিমুরা থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে।

শাহপরীর দ্বীপের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাম বলেন, প্রথম বিস্ফোরণের সময় তাঁর মনে হয়েছিল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। এরপর পরপর চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন এবং নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের ভেতরে আগুনের শিখা দেখতে পান।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ বলেন, দীর্ঘদিন শান্ত থাকার পর রাখাইনে আবারও সংঘর্ষ ও বিমান হামলা শুরু হয়েছে। এর প্রভাব সীমান্তের বাংলাদেশি জনপদেও অনুভূত হচ্ছে। বিস্ফোরণের শব্দে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ছবিঃ সংগৃহীত

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আনিক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ টেকনাফ সীমান্তে শোনা গেছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, প্রশাসনের কাছে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের সময় মর্টার শেল বিস্ফোরণ ও ভারী গোলাগুলির শব্দ উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তজুড়ে শোনা গিয়েছিল। এরপর কয়েক মাস ধরে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান অভিযান অনেকটাই কমে গিয়েছিল। বুধবারের হামলার মধ্য দিয়ে আবারও সেই নীরবতা ভাঙল।

রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক দাবি করেছে, বুধবার বুথিডং উপজেলার কিয়েত মাউক তাউং (মুসলিম) গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ও একটি ওয়াই-১২ (Y-12) উড়োজাহাজ ব্যবহার করে দুটি ৫০০ পাউন্ডের বোমা নিক্ষেপ করে।

সংস্থাটির দাবি, ওই হামলায় প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি এবং ১২ বছর বয়সী দুই শিশু আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুয়ে দুল আরমিন, মার মাত আর রাউত এবং উ আরমিন হু সাং। তাদের মধ্যে সুয়ে দুল আরমিনের বাম পায়ের উরুর হাড় ভেঙে গেছে বলে জানানো হয়েছে। অন্য শিশুটি তলপেটে এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ডান ভ্রুর কাছে স্প্লিন্টারের আঘাত পেয়েছেন। গুরুতর আহত শিশুটিকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।

ছবিঃ সংগৃহীত

গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক আরও দাবি করেছে, ভারী বৃষ্টির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা হামলার আগে যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনতে পাননি। পরপর দুটি বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পর পুরো গ্রাম কেঁপে ওঠে এবং বিস্ফোরণের অভিঘাত ও স্প্লিন্টারে অন্তত ১০টি মুসলিম পরিবারের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।

তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে গত ২৪ জুন মংডু শহরে দুটি ৫০০ পাউন্ডের বোমা নিক্ষেপ করা হয় বলে একই সূত্রের দাবি। এতে দুই শিক্ষার্থী আহত হন এবং ১০টির বেশি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এছাড়া ১৭ জুন কিয়াউকতাও শহর ও লান মা দাও গ্রামে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বিমান হামলায় নয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং অন্তত ১৮ জন আহত হন বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাখাইনের বিভিন্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলার মাত্রা আবারও বেড়েছে। এতে বেসামরিক মানুষের হতাহত এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে কয়েকটি রোহিঙ্গা-সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বুথিডং ও মংডুতে সাম্প্রতিক বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ছবিঃ সংগৃহীত