রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নীরবে বাড়ছে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হুমকি

আফজারা রিয়া

বর্ষা মানেই কক্সবাজারে স্বস্তির বৃষ্টি। ধুলোমাখা শহর ধুয়ে যায়, পাহাড়ে নামে সবুজের ছোঁয়া, সমুদ্র ফিরে পায় অন্যরকম সৌন্দর্য। কিন্তু এই বৃষ্টির সঙ্গেই প্রতি বছর নীরবে ফিরে আসে আরেকটি অদৃশ্য আতঙ্ক-ডেঙ্গু।

একটি মশা। কয়েক ফোঁটা জমে থাকা পানি। আর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে প্রাণঘাতী সংক্রমণ।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, কক্সবাজারে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এখন শহরে নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। আক্রান্তের সংখ্যা হোক কিংবা মৃত্যু দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই ক্যাম্পগুলো।

এমন বাস্তবতায় বর্ষা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ।

ঝুঁকি আছে,তবে প্রতিরোধ কঠিন নয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার বংশবিস্তার রোধ করা। তাই বাড়ি, ক্যাম্প বা আশপাশের কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা দেখা দিলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা।

ডেঙ্গুর কেন্দ্রবিন্দু এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২১ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৮১ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশই ছিলেন রোহিঙ্গা।

একই বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৭ জনের মধ্যে ৬ জনই ছিলেন ক্যাম্পের বাসিন্দা।

২০২৫ সালে সংক্রমণ কমে ৮ হাজার ৮৩৮ জনে নেমে এলেও চিত্র খুব একটা বদলায়নি। আক্রান্তদের মধ্যে ৬ হাজার ৩০৩ জনই রোহিঙ্গা, আর ১১টি মৃত্যুর মধ্যে ১০টিই ঘটেছে ক্যাম্পে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্ত ৪৫১ জনের মধ্যে ৩৩০ জনই রোহিঙ্গা। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর খবর না থাকলেও বর্ষার শুরুতেই স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকির বলে বিবেচনা করছে।

কেন এত ঝুঁকিতে ক্যাম্পগুলো?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে কয়েক লাখ মানুষের ঘনবসতি, সীমিত জায়গা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে এডিস মশার জন্য তৈরি হয়েছে আদর্শ প্রজননক্ষেত্র।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন,

আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, ডেঙ্গু আক্রান্তদের বড় অংশই রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, পানি জমে থাকা এবং দ্রুত সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্ষা সামনে রেখে রোগ নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে।

তার মতে, কুতুপালং-বালুখালী মেগা ক্যাম্প, ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশন, ক্যাম্প-৮ই, ক্যাম্প-১৩ ও ক্যাম্প-১৫ বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

ভুল ধারণাও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

ডা. ছাবের বলেন, এখনও অনেকেই মনে করেন এডিস মশা শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। বাস্তবতা ভিন্ন।

পরিষ্কার কিংবা অপরিষ্কার যে কোনো স্থির পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে।

তাই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না। ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা যে কোনো পানিযুক্ত বস্তু নিয়মিত পরিষ্কার বা উল্টে রাখতে হবে।

ক্যাম্পে চলছে সমন্বিত প্রস্তুতি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা মো. রিজওয়ানুল হক ভূঁইঞা বলেন,

বিশাল জনসংখ্যা এবং সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস, পানি জমে থাকা স্থান শনাক্তকরণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

ঝুঁকি শুধু ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ নয়

অনেকে মনে করেন ডেঙ্গু কেবল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সমস্যা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সেটি ভুল ধারণা।

২০২৪ সালে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৩৬৬ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৩৫।

অর্থাৎ কক্সবাজার সদরসহ জেলার প্রতিটি উপজেলাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় মানুষ এবং রোহিঙ্গাদের প্রতিদিনের চলাচলের কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পুরো জেলাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে সংকট

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়,

অনিয়মিত ভারী বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার ওঠানামা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি রোগ নয়; বছরের দীর্ঘ সময়ই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দিলে দেরি না করে পরীক্ষা করাতে হবে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সামান্য জ্বরকেও অবহেলা করা যাবে না।

হাসপাতাল প্রস্তুত, কিন্তু সবচেয়ে বড় ওষুধ সচেতনতা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শান্তনু জানান,

বর্তমানে সংক্রমণ কিছুটা কম থাকলেও আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। প্রয়োজনীয় স্যালাইন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রয়েছে। তবে ডেঙ্গুকে অবহেলা করা যাবে না। জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে এবং দিন-রাত সবসময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হাসপাতাল নয়, প্রতিরোধ।

ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর এর মতে, একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপ, একটি ডাবের খোসা কিংবা টবের নিচে জমে থাকা সামান্য পানিই কয়েক দিনের মধ্যে শত শত এডিস মশার জন্ম দিতে পারে। আর সেই মশাই কেড়ে নিতে পারে একটি প্রাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *