বে ইনসাইট রিপোর্ট
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর একাধিক মানবিক সহায়তা প্রকল্পে পরিকল্পনার দুর্বলতা, তহবিলের অপচয়, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের অভিযোগ উঠেছে।
জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর -ওআইওএস পরিচালিত এক অডিটে এসব অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ওই অডিট প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এইজ’ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটের জন্য অনুদান ধারাবাহিকভাবে কমে আসার সময়েও বিভিন্ন প্রকল্পে এমন ব্যয় হয়েছে, যার অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও একই ধরনের কাজ একাধিকবার করা হয়েছে, কোথাও নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহারই হয়নি, আবার কোথাও বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে। ফলে সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
লক্ষ্যচ্যুত প্রকল্প, অপচয় হয়েছে অর্থ
অডিটে বলা হয়েছে, ইউএনএইচসিআরের বেশ কয়েকটি প্রকল্প সংস্থাটির ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একই ধরনের কার্যক্রম বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনার অভাবে একই উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যয় হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পদের অপচয়ে পরিণত হয়েছে।
অডিটকারীরা মন্তব্য করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন নির্ধারণ, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি।

অডিটে ত্রাণসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার ঘাটতি ও অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত প্রয়োজন মূল্যায়ন না করেই এমন কিছু সামগ্রী কেনা হয়েছে, যেগুলোর ব্যবহার শিবিরে প্রায় নেই বললেই চলে। উদাহরণ হিসেবে খাওয়ার জন্য চামচ, কাটাচামচ ও ছুরি কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গারা ঐতিহ্যগতভাবে হাত দিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন। তা সত্ত্বেও এসব সামগ্রী কিনতে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মার্কিন ডলার।
অডিটে আরও বলা হয়, এসব সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বারবার আপত্তি ও অভিযোগ ওঠার পরও ক্রয় পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এর ফলে ৬২ হাজারের বেশি কুকিং সেট গুদামেই পড়ে থাকে, যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার।
কোটি টাকার হাসপাতাল নির্মাণ, কিন্তু ব্যবহার হয়নি
প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত।
অডিটে দেখা যায়, উখিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবহারই করা হয়নি। একইভাবে ভাসানচরে নির্মিত ২০ শয্যার একটি ইনডোর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত ছিল।
শুধু ভবনই নয়, হাসপাতালটিতে স্থাপন করা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ৭৪ হাজার ৩০১ ডলারের এক্স-রে মেশিনও কার্যত অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল।
অডিটে বলা হয়, অবকাঠামো নির্মাণের আগে বাস্তব প্রয়োজন এবং পরিচালনা পরিকল্পনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি
রোহিঙ্গা শিবিরে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির অভাবও অডিটে উঠে এসেছে।
অডিটকারীরা বলেন, ২০২৪ সালে শিবিরে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং হেপাটাইটিস-সি রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেও ইউএনএইচসিআরের কোনো সমন্বিত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ছিল না।
মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিও ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে তীব্র পানিবাহিত ডায়রিয়া, কলেরা, খোসপাঁচড়া এবং উকুনের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সময়মতো ও কার্যকর মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ার তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেই খাতেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
মেয়াদোত্তীর্ণ সূঁচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই আবার বড় চুক্তি
অডিটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি ছিল চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে।
একটি প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ মেডিকেল সূঁচের গায়ে নতুন মেয়াদ লিখে সরবরাহ করেছিল। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকেই পরবর্তীতে প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের নতুন চুক্তি দেওয়া হয়।
এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যের সরবরাহকারী নির্বাচন করায় প্রায় ৯৭ হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় ৬০ লাখ ডলারের ওষুধ কর্মসূচিতে ওষুধের ঘাটতি, আবার কোথাও অতিরিক্ত মজুদ, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের ঘটনাও পাওয়া গেছে।
এদিকে প্রায় ৩৬ লাখ ডলারের পুষ্টি কর্মসূচি এবং ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের রোগী রেফারেল কর্মসূচিতেও উপকারভোগী নির্বাচন, নির্দেশিকা এবং হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা ধরা পড়ে।
হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারেও কোটি কোটি টাকার অপচয়
অডিটে কক্সবাজারের শিবির এলাকায় বন্য হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত টাওয়ার প্রকল্পকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রায় ২২ লাখ ডলার ব্যয়ে ৯৯টি হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী মূল্যায়নে এগুলোকে কার্যকর নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
এর মধ্যে ৮৩টি টাওয়ারের ছাদ ঘূর্ণিঝড়-উপযোগী না হওয়ায় খুলে ফেলতে হয়, যাতে প্রায় ৫৬ হাজার ডলারের নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হয়। পরে টাওয়ারগুলোকে আরও টেকসই করতে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৬৭ হাজার ডলার ব্যয় করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের আরেকটি মূল্যায়নে টাওয়ারের সংখ্যা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও অডিট পর্যন্ত মাত্র ১২টি টাওয়ার অপসারণ করা হয়েছিল।
একই ঠিকাদারের ওপর অতিনির্ভরতা, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কাজ
ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচনেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
অডিটে বলা হয়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নির্মাণকাজ মূলত একজন ঠিকাদারকেই দেওয়া হয়। তার দর বাজারদরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি ছিল। এতে সম্ভাব্য ৬৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
শুধু তাই নয়, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের দর ৩৩ থেকে ৪৩ শতাংশ কম হলেও তাদের পরিবর্তে একই ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করা হয়।
এছাড়া ৩ কোটি ডলারের এলপিজি রিফিল, চুলা, প্রেসার কুকার, ইগনাইটার ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কাজও এমন একজন সরবরাহকারীকে দেওয়া হয়, যিনি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন না। পরে ওই প্রতিষ্ঠান আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
চুক্তি অনুযায়ী এলপিজি ডিপোর ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বহন করার কথা থাকলেও ইউএনএইচসিআর নিজেই ১৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। ওয়ারেন্টির আওতায় স্পার্ক লাইটার পাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত ৬৫ হাজার ডলারের লাইটারও কিনেছে সংস্থাটি।
অডিটকারীরা উল্লেখ করেছেন, ওই ঠিকাদারের দর ছিল বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। একই ধরনের কাজ কম খরচে করতে সক্ষম অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
জ্বালানি ও পরিবেশ প্রকল্পেও অতিরিক্ত ব্যয়
অডিটে জ্বালানি ও পরিবেশ খাতের প্রকল্পগুলোকেও ব্যয়বহুল ও অদক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় ৩৯ লাখ ডলারের জ্বালানি ও পরিবেশ কর্মসূচিতে বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ করানো হয়েছে।
২০২১ সালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিকাদারের দর বাজারদর ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ বেশি ছিল।
এরপর ২০২৩ সালে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই একই কাজের দর ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যাতে অতিরিক্ত ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলার ব্যয় হয়।
পরে বাজার যাচাই ছাড়াই চুক্তির মূল্য আরও ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়, ফলে অতিরিক্ত ২২ লাখ ডলার ব্যয় হয়।
এছাড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোয় স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছে অডিট।
রোহিঙ্গা শিবিরে এলপিজি সরবরাহেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।
একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রায় ৩ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়, যদিও সেটি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল না।
অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৫৫ লাখ ডলার বেশি মূল্যের এলপিজি রিফিল কেনা হয়। প্রেসার কুকার ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক পরীক্ষামূলক প্রকল্প শেষ হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় সম্ভাব্য প্রায় ২০ লাখ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগও হারানো হয়েছে।
অপ্রয়োজনীয় যানবাহন কেনা, অফিস ও গুদাম
যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অদক্ষতার চিত্র পাওয়া গেছে।
অডিটে বলা হয়, ১৬টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন ৫২টি কর্মসূচির গাড়ি প্রয়োজন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ইউএনএইচসিআর দিতে পারেনি।
অডিটে আরও উঠে এসেছে, ইউএনএইচসিআরের ১০৪টি গাড়ির মধ্যে ১০টি দীর্ঘ সময় ব্যবহার হয়নি। তারপরও এসব গাড়ির জন্য ৮০ হাজার ডলারের বেশি ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।
কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআরের নতুন অফিস ভবন নির্মাণেও একাধিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে অডিট।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয়ে অফিস ভবন নির্মাণ করা হলেও জমির মালিকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
নির্মাণকাজ চলাকালে নকশা পরিবর্তন করে ভবনে তৃতীয় তলা যুক্ত করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর জমির মালিক ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ভাড়াচুক্তি ছিল না।
এরপরও নতুন ভবনটি পাঁচ মাস খালি পড়ে ছিল। সেই সময় পুরোনো অফিসের জন্য প্রতি মাসে ১১ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।
এছাড়া আট বছর ধরে একটি অব্যবহৃত মোটেলের জন্য বছরে ১ লাখ ২৬ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে, যদিও অনেক কম খরচে বিকল্প জায়গা পাওয়া সম্ভব ছিল।
গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গুদাম ভাড়া নেওয়ায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাসানচরে একই কাজের জন্য একাধিক ব্যয়
অডিটে বলা হয়েছে, ভাসানচরে সরকার যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে ছিল, সেখানে ইউএনএইচসিআরও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে।
ফলে সরকার আগে থেকেই সৌরায়িত করে রাখা তিনটি স্থাপনায় আবারও একই ধরনের কাজ করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়াই ব্যয়বহুল ভোল্টেজ রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে।
একই এলাকায় একই ধরনের প্রকল্প
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নকারী অংশীদারদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে একই এলাকায় ১২৮টি পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ৫২টি পাম্পিং স্টেশন এবং ২০ হাজারেরও বেশি নলকূপ নির্মাণ করা হয়েছে।
অডিটকারীরা বলেছেন, সমন্বয় জোরদার করা গেলে এসব ব্যয়ের বড় অংশই এড়ানো সম্ভব ছিল।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে জরুরি সহায়তায় জোর
রোহিঙ্গা সংকট শুরুর আট বছর পরও ইউএনএইচসিআরের ব্যয়ের অধিকাংশই তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল।
অডিট অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ জরুরি মানবিক সহায়তায় ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা এবং টেকসই সমাধানমুখী কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ।
অডিটকারীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে।
ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ‘নিউ এইজ’কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের গণসংযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, সংস্থাটি সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তার ভাষায়, অভ্যন্তরীণ অডিট সংস্থার কার্যক্রম মূল্যায়ন ও উন্নয়নের একটি নিয়মিত অংশ। অডিটে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও ব্যয় দক্ষতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শারি নিজমান বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দিতে ইউএনএইচসিআর কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট
বর্তমানে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক হিসাবে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসে।
তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সেই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিজস্ব অডিটে উঠে আসা এই অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ শুধু একটি সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনাই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির জবাবদিহি, দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করেন স্থানীয় একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।
তথ্যসূত্র: ‘নিউ এইজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর (ওআইওএস) -এর অডিট রিপোর্ট।