বে ইনসাইট । কক্সবাজার
উখিয়ার ক্যাম্প-২০-এর পাহাড়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করলেই সেনোয়ারা বেগমের রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়।
কারণ সেনোয়ারার কাছে বর্ষার আগমন আর কেবল ঋতু পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি যেনো অনিশ্চয়তার ফিরে আসা।
বাঁশ, দড়ি ও ত্রিপলে তৈরি তাঁর ছোট্ট আশ্রয়টি একটি খাড়া পাহাড়ের ঢালের নিচে। দিনের বেলায় পাহাড়টিকে যতটা নিরীহ মনে হয়, টানা বৃষ্টির রাতে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। গত কয়েক বছরে এমন বহু পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তাই আকাশে কালো মেঘ জমলেই সেনোয়ারার মনে ফিরে আসে একটাই প্রশ্ন, এবারও কি পাহাড়টি টিকে থাকবে?
“কাছাকাছি নিরাপদ কোনো জায়গা নেই,” বলেন তিনি।
“সহায়তা সংস্থাগুলো যখন অন্যত্র যেতে বলে, তখন যে জায়গার কথা বলে, সেটা আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন আর পরিচিত পরিবেশ থেকে অনেক দূরে। আমরা সেখানে যেতে চাই না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালগুলো যদি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেত।”
সেনোয়ারার এই আশঙ্কা বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়। উখিয়া ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরে হাজারো পরিবার প্রতিদিন এমন বাস্তবতার মধ্যেই বসবাস করছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতিতে জায়গার তীব্র সংকটের কারণে বহু পরিবারকে আশ্রয় নিতে হয়েছে খাড়া পাহাড়ের ঢালে কিংবা তার ঠিক নিচে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বনভূমি কেটে গড়ে তোলা হয়েছে এসব বসতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠনও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর বর্ষা এলেই সেই ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
প্রতিটি ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের মাটি আরও আলগা হয়। কোথাও ছোট ছোট ফাটল দেখা দেয়, কোথাও ধসে পড়ে মাটির অংশ। অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি পুরো ঢাল ভেঙে চাপা পড়ে যেতে পারে একাধিক ঘর।
প্রতি বর্ষাতেই ফিরে আসে পুরোনো শঙ্কা
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

শুধু ২০২৪ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন, যা ওই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। আর চলতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের জনযোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, “২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৮০ জন।”
তিনি বলেন, “অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল এখনো যথাযথভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্ষাকালে শরণার্থী পরিবারগুলোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস সাধারণত কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করলে ঘটে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে সেই প্রায় সবগুলো কারণই বিদ্যমান- খাড়া ঢাল, বন উজাড়, দুর্বল মাটি, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অত্যধিক জনঘনত্ব।
তহবিল সংকট বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমান ঝুঁকি শুধু প্রাকৃতিক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মানবিক তহবিল সংকট।
সংস্থাটির ভাষায়, অর্থের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-হ্রাস কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, বাঁশের টেরেস নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়কেন্দ্র শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়মিত সংস্কার।
সীমিত অর্থায়নের কারণে মানবিক সংস্থাগুলোকে খাদ্য সহায়তা, পুষ্টি ও সুরক্ষার মতো জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ-প্রতিরোধমূলক অনেক উদ্যোগে কাটছাঁট করা হয়েছে।
এতে এমন বহু পাহাড়ি ঢাল রয়েছে, যেগুলো আগে নিয়মিত মেরামত ও পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল, কিন্তু এখন আর সেই কাজ আগের মতো সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানান্তরও সহজ সমাধান নয়
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটি সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।

শারি নিজমান বলেন, “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে স্থানান্তর করা দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি বলেন, “শিবিরগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। খালি জমি প্রায় নেই বললেই চলে। আবার অনেক পরিবার স্থানান্তরে অনীহা প্রকাশ করে, কারণ এতে তারা জীবিকার সুযোগ, বাজারে যাতায়াত এবং ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পর গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কা করে।”
ফলে অনেক পরিবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়েও একই জায়গায় থেকে যেতে বাধ্য হয়।
বৃষ্টির রাত মানেই নির্ঘুম অপেক্ষা
ক্যাম্প-৪-এর বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই তাঁদের পরিবারের মধ্যে উৎকণ্ঠা নেমে আসে।
“বৃষ্টি হলে আমি ঘুমাতে পারি না। সারারাত ভাবি, কখন পাহাড় ভেঙে পড়বে,” বলেন তিনি।
“আমি সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ের ঢালে থাকি। সব সময় ভয় নিয়ে থাকতে হয়।”
শিবিরের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকি কমানোর ছোট ছোট উদ্যোগও চোখে পড়ে। কোথাও পানি যাতে মাটি ধুয়ে না নেয়, সে জন্য ড্রেনের ওপর প্লাস্টিকের শিট বিছানো হয়েছে। কোথাও আশ্রয়ের পাশে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে। আবার কোথাও বাঁশের খুঁটি দিয়ে পাহাড়ের ঢালকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসবই মূলত সাময়িক ব্যবস্থা। টানা ভারী বর্ষণের সামনে এগুলোর কার্যকারিতা সীমিত।
প্রস্তুতির কথা বলছে প্রশাসন
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে প্রতিটি শিবিরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে জেলায় প্রায় ২৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সহকারী আবহাওয়াবিদ এ. বি. হান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। এতে পাহাড়ি ঢাল আরও নরম হয়ে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও তারা বিভিন্ন প্রকৌশলভিত্তিক ও প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার এবং মাটির ক্ষয় রোধে ভেটিভার ঘাস রোপণ।
তবে সংস্থাটির সতর্কবার্তা স্পষ্ট, জরুরি প্রস্তুতির পাশাপাশি পাহাড় স্থিতিশীল করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে ধারাবাহিক বিনিয়োগ না হলে প্রতি বর্ষাতেই একই সংকট ফিরে আসবে।
বর্ষা কেবল একটি ঋতু নয়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের হাজারো পরিবারের কাছে এটি এক দীর্ঘ পরীক্ষার সময়। তারা বৃষ্টি নামলে অনেকেই আকাশের দিকে তাকান না, তাকান পাহাড়ের দিকে।
কারণ তাঁদের কাছে প্রতিটি ভারী বর্ষণ মানে শুধু বৃষ্টির শব্দ নয়, তার সঙ্গে মিশে থাকে মাটি সরে যাওয়ার আশঙ্কা, রাতভর নির্ঘুম অপেক্ষা, আর ভোর পর্যন্ত বেঁচে থাকার প্রার্থনা।