সৈকতের ‘৮২ লাখ টাকার চাকরি’র গল্প: পেওনিয়ার বলছে, সবই ছিল ভুয়া

বিশেষ প্রতিবেদক । বে ইনসাইট

গত ৬ মে হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে কক্সবাজারের তরুণ রাকিবুল ইসলাম সৈকতের একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি। সঙ্গে চমক জাগানো দাবি, বিশ্বখ্যাত আমেরিকান ফিনটেক প্রতিষ্ঠান পেওনিয়ার-এ বছরে ৭০ হাজার মার্কিন ডলারের চাকরি পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮২ লাখ টাকা।

খবরটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ এবং অনলাইন পোর্টালে। দাবির পক্ষে ‘প্রমাণ’ হিসেবে প্রচার করা হয় পেওনিয়ারের লোগোযুক্ত একটি কথিত অফার লেটারও।

কিন্তু গল্পে প্রথম ফাটল ধরে খুব দ্রুতই।

প্রথম সন্দেহের সূত্র

ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘পেওনিয়ার বাংলাদেশ অফিশিয়াল’ নামে প্রায় দেড় লাখ সদস্যের একটি জনপ্রিয় ফেসবুক গ্রুপে সতর্কবার্তা দেন গ্রুপটির অ্যাডমিন রাশেদুল হাসান।

তিনি লিখেন,
“আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেওনিয়ারের নিয়োগ সংক্রান্ত একটি ছবি ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি। আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে, এই তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অননুমোদিত। ওই নিয়োগপত্র এবং দাবিকৃত তথ্যগুলো মোটেও আসল নয়।”

এই পোস্টের পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, আসলেই কি সৈকত পেওনিয়ারে চাকরি পেয়েছেন, নাকি পুরো বিষয়টি সাজানো?

সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামে ‘বে ইনসাইট’।

খোদ পেওনিয়ার যা জানালো

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে সরাসরি পেওনিয়ার-এর গ্লোবাল পিআর টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে বে ইনসাইট। ইমেইলে জানতে চাওয়া হয়, রাকিবুল ইসলাম সৈকত নামে কোনো বাংলাদেশি তরুণকে প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই চাকরির অফার দিয়েছে কি না।

কয়েকদিন পর পেওনিয়ারের পিআর প্রতিনিধিত্বকারী হিমাংশু গাখার (Himanshu Gakhar) এক জবাবে স্পষ্ট ভাষায় জানান:

“যোগাযোগের জন্য ধন্যবাদ। আমরা পেওনিয়ারের পিআর দেখভাল করছি এবং আপনার অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে জানাচ্ছি, রাকিবুল ইসলাম সৈকত নামে কোনো ব্যক্তি বর্তমানে এই কোম্পানিতে কর্মরত নন। পাশাপাশি, পেওনিয়ার এই ব্যক্তিকে কোনো ধরনের চাকরির প্রস্তাব বা অফিসিয়াল চিঠিও ইস্যু করেনি।”

শুধু তাই নয়, এর আগেই ৮ মে পেওনিয়ারের সিনিয়র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার নাফিউর রহমানও বে ইনসাইটকে বলেন,

“না, এটি সত্য নয়। আমাদের সাইবার সিকিউরিটি টিম ইতোমধ্যেই এই মিথ্যা দাবির পোস্টগুলো সরানোর কাজ শুরু করেছে।”

অর্থাৎ, যে নিয়োগপত্র দেখিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তৈরি করা হয়েছিল, সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া।

নীরব সৈকত, বাড়ছে প্রশ্ন

পেওনিয়ারের গ্লোবাল টিম থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রাকিবুল ইসলাম সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বে ইনসাইট। তবে অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এরপরই সামনে আসে বড় প্রশ্ন, কেন এমন একটি ভুয়া অফার লেটার তৈরি করা হলো?

এটি কি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা, নাকি এর পেছনে ছিল আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য?

“এ ধরনের ভুয়া পরিচয় ভবিষ্যতে বড় জালিয়াতির পথ খুলে দিতে পারে”

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অপরাধ ও সাইবার আইন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাজমুজ সাকিব বে ইনসাইটকে বলেন,

“যেহেতু পেওনিয়ার নিজেই বিষয়টি অস্বীকার করেছে, তাই এটি স্পষ্টতই প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে এ ধরনের ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে ভবিষ্যতে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ, বিনিয়োগ সংগ্রহ কিংবা ডিজিটাল জালিয়াতির মতো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।”

কেন উদ্বেগ বাড়ছে?

পেওনিয়ার বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সার ও রিমোট কর্মীদের অর্থ লেনদেনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কোনো সরাসরি অফিস না থাকলেও দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

প্রযুক্তিখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির চেষ্টা দেশের উদীয়মান ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

শেষ পর্যন্ত যা রইল

কক্সবাজারের তরুণ সৈকতের ‘৮২ লাখ টাকার চাকরি’র গল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তব নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ভুয়া প্রচারণা বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু একটি ‘ভাইরাল পোস্ট’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ডিজিটাল অর্থনীতি, রিমোট জব এবং ফ্রিল্যান্সিং নির্ভর নতুন প্রজন্মের কর্মবাজারে ভুয়া অফার লেটার কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

এ কারণেই সাইবার জালিয়াতি রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আরও সক্রিয় নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেনা কর্মকর্তা হত্যাঃ ২০ মাসের বিচার প্রক্রিয়া শেষে চারজনের প্রাণদণ্ড, ৯ জনের যাবজ্জীবন

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের বহুল আলোচিত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মো. হেলাল উদ্দিন, নুরুল আমিন, মো. নাছির উদ্দিন ও মোর্শেদ আলম। তাদের মধ্যে মোর্শেদ আলম পলাতক রয়েছেন। তারা সবাই চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের বাসিন্দা।

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ এক বছর আট মাস ধরে চলা আলোচিত এ মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন।

বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন ও দেশের সেবায় গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তার পরিবার, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র এবং দেশবাসী-সবারই প্রত্যাশা ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।”

তিনি বলেন, আদালত কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও মামলার সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সবকিছু পর্যালোচনার পর চারজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

বাদীপক্ষের আরেক আইনজীবী আহসান সেজান বলেন, রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আসামিদের আচরণ ও চেহারায় অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল স্পষ্ট।

তিনি বলেন, “লেফটেন্যান্ট তানজিম ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। মানুষের জানমাল রক্ষা ও আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।”

তিনি জানান, হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলার রায়ই বুধবার ঘোষণা হয়েছে। রায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় ১৩ জনকে অতিরিক্ত ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আহসান সেজান বলেন, আদালতের রায়ে তারা “মোটামুটি সন্তুষ্ট”। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে সামাজিক ন্যায়বিচার, জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিচারক উল্লেখ করেছেন, প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন সাজাপ্রাপ্ত না হন, সেটিও বিচার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি আরও বলেন, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামিপক্ষের জেরা—উভয় দিক বিবেচনায় নিয়েই আদালত এ রায় দিয়েছেন। খালাস পাওয়া পাঁচজনের বিষয়ে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের অনেক আইনজীবী দাবি করেছেন, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

মামলার পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির আইনজীবী তাহসিন সিফাত বলেন, “এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। বিশেষ করে পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অস্ত্র আইনে পৃথক সাজা দেওয়ায় আমরা মনে করছি, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।”

২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মইজ্জ্যারপাড়া এলাকায় ডাকাতবিরোধী অভিযানে গিয়ে নিহত হন ২৩ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন।

টাঙ্গাইলের বাসিন্দা তানজিম বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ২০২২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে আর্মি সার্ভিস কোরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও শোকের জন্ম দেয়।

ঘটনার দুই দিন পর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ হত্যা ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। একই ঘটনায় চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করেন।

পরে মামলাগুলোর তদন্তভার দেওয়া হয় চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরীর ওপর। তদন্ত শেষে পুলিশ দুই মামলায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। প্রাথমিক এজাহারে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তদন্তে নতুন কয়েকজনের নাম উঠে আসায় তাদের আসামি করা হয়।

‘হাতিটিকে গুলি করা হয় চোখে’

রামু ও চকরিয়ার পাহাড়ি জনপদে যেন শনিবার রাতটা নেমে এসেছিল এক গভীর শোক হয়ে।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের পূর্ণগ্রাম এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে একটি মা হাতি।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রায় এক মাস আগে হাতিটিকে চোখে গুলি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোর পর শনিবার রাত ১১টার দিকে নিঃশব্দে থেমে যায় তার জীবন।

পূর্ণগ্রামটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এলাকা। স্থানীয় লোকজন শনিবার বিকেলে প্রথমে আহত হাতিটিকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তখনও তার নিঃশ্বাস চলছিল, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট ছিল না। পাশে ঘুরছিল তার তিন বছরের ছোট্ট শাবক। মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বারবার ডাকছিল, সে যেন বুঝতে পারছিল না কেন মা আর উঠছে না।

খবর পেয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ঈদগাঁও রেঞ্জের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

ঈদগাঁও রেঞ্জ কর্মকর্তা উজ্জ্বল হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা হাতিটিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় পান। দ্রুত চিকিৎসার জন্য ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় তিনি পৌঁছাতে পারেননি। তার পরামর্শ অনুযায়ী বনকর্মীরা ওষুধ প্রয়োগ করেন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। রাত ১১টার দিকে নিভে যায় বনজঙ্গলের এক মায়ের জীবন।

কিন্তু সেই রাতের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি আসে এরপর।

মা হাতিটির মৃত্যুর কিছুক্ষণ পর পাহাড় থেকে নেমে আসে ১০ থেকে ১২টি বুনো হাতির একটি পাল। তারা মৃত হাতিটির চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। শুঁড় উঁচিয়ে ডাকতে থাকে, গর্জন করতে থাকে, যেন নিজেদের ভাষায় শোক জানাচ্ছিল সঙ্গী হারানোর বেদনা। তারপর ধীরে ধীরে আবার ফিরে যায় পাহাড়ের অন্ধকারে।

রোববার হাতিটির মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় রামু থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছে বন বিভাগ।

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান ময়নাতদন্ত শেষে জানান, হাতিটির বাঁ চোখে প্রায় ১০ ইঞ্চি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। সেখান থেকে একাধিক সিসার ছররা উদ্ধার করা হয়েছে। তার ভাষায়, স্থানীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হাতিটিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়েছিল। চোখের ভেতরে ছররা আটকে থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে মৃত্যু হয় প্রাণীটির।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ও রামু-ঈদগাঁওয়ের পাহাড়ি বনে একটি আহত হাতি শাবকসহ ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন খবর তারা পাচ্ছিলেন। কিন্তু বহু খোঁজ করেও তখন হাতিটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত মানুষ তাকে খুঁজে পেলেও, বাঁচাতে পারল না।

আর পাহাড়ি অরণ্যে হয়তো আজও কোথাও মাকে খুঁজে ফিরছে সেই ছোট্ট শাবকটি।

হামঃ ‘বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না’

আফজারা রিয়া । নুরুল হাসান

শুক্রবার রাত তখন গভীর। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের হাম ওয়ার্ডে নিভু নিভু আলো। কিন্তু ঘুম নেই কারও চোখে।

এক কোণে ছয় মাসের শিশুকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে বসে আছেন মা ক্রিপাও ম্রো। শিশুটির ছোট্ট শরীর জ্বরে কাঁপছে বারবার। কখনো কাশি, কখনো কান্না আর প্রতিবারই মায়ের মুখে ফুটে উঠছে আতঙ্কের ছাপ।

শিশুটির নাম ইরুই ম্রো। ঠিকমতো চোখও খুলতে পারছে না সে। দুই দিন আগে আলীকদমে শুরু হয়েছিল জ্বর, সর্দি আর কাশি। প্রথমে নেওয়া হয় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত পাঠানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

তিন দিন ধরে ঘুমাননি ক্রিপাও ম্রো। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে তার মনে, “কি হবে?”

কেবল ইরুই নয়, হাম ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি বেডেই ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য আতঙ্ক আর নির্ঘুম রাতের গল্প।

২০ শয্যার ছোট্ট ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ জন শিশু। জায়গা না থাকায় একটি বেডেই গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে তিন থেকে চারজন রোগীকে। কেউ সন্তানের কপালে ঠান্ডা পানি দিচ্ছেন, কেউ বুকের ওঠানামা দেখে বুঝতে চাইছেন শ্বাস ঠিক আছে কি না। অসুস্থ শিশুদের কান্না আর মায়েদের উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ।

কেউ মহেশখালী থেকে, কেউ চকরিয়া, ঈদগাঁও কিংবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে সন্তানকে কোলে নিয়ে ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। কেউ কান্না চেপে রাখতে পারছেন না। আবার কেউ সন্তানের জ্বর সামান্য কমলেই নীরবে শুকরিয়া আদায় করছেন।

এক সপ্তাহে ভর্তি ১৫৮ শিশু

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ বলছে, গত এক সপ্তাহে হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১৫৮ শিশু। প্রতিদিন গড়ে ২২ জনের বেশি রোগী আসছে শুধু হাম আক্রান্ত হয়ে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,

১০ মে ভর্তি হয় ২৫ জন শিশু, মারা যায় ২ জন
১১ মে ভর্তি হয় ৩০ জন
১২ মে ২৩ জন
১৩ মে ১৮ জন
১৪ মে আবারও ৩০ জন
১৫ মে ১৭ জন
১৬ মে ভর্তি হয় ১৫ জন শিশু

এই ধারাবাহিক প্রবাহই বলে দিচ্ছে, কক্সবাজারে এখনো কমেনি হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

ওয়ার্ডের ভেতরে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক শিশুকে। রাতভর সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে থাকছেন মায়েরা। কেউ বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখছেন, কেউ আবার সারারাত জেগে পানি দিচ্ছেন কপালে।

“বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না”

মহেশখালীর গোরকঘাটা থেকে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ছেনুয়ারা। চার দিন আগে তার শিশুর শরীরে ধরা পড়ে হাম। এখন কিছুটা জ্বর কমলেও শুরু হয়েছে শ্বাসকষ্ট।

সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিনি বলেন, “হামটা একটু ভালো হয়েছে, কিন্তু এখন শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।”

পাশের বেডে বসে ছিলেন ১৭ বছর বয়সী আবেদা। কোলে তার ৯ মাসের শিশু। মাঝে মাঝে সন্তানের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছছিলেন তিনি।

“আমার বাচ্চাটা কিছু খেতে পারছে না। খাওয়ালেই বমি করছে। এখন নাকে নল দিয়ে খাবার দিচ্ছি,” বলেন আবেদা।

আবেদা, ছেনুয়ারা কিংবা ক্রিপাও ম্রো প্রত্যেক মায়ের গল্প যেন একই সুতোয় বাঁধা। সন্তানকে বাঁচিয়ে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার লড়াই।

দুই হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ১৭ শিশুর

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষভাগ থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৪১ জন শিশু। এর মধ্যে মারা গেছে ১৭ জন।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা মহেশখালীতে ৪০১ জন। এরপর রয়েছে চকরিয়া ৩১৫ জন এবং রামু ২০৭ জন।

তবে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রামু উপজেলায়। সেখানে মারা গেছে ৭ শিশু। এর মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু সন্দেহজনক হিসেবে ধরা হলেও একজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হামজনিত জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালের সক্ষমতার ওপরও বাড়ছে চাপ।

ঘুমহীন এক ওয়ার্ডের দীর্ঘ রাত

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে রাত নামে ঠিকই, কিন্তু ঘুম নামে না মায়েদের চোখে।

একদিকে জায়গা সংকট, অন্যদিকে প্রতিদিন বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সব মিলিয়ে হাসপাতালজুড়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব আতঙ্ক। তবু প্রতিটি মা বুকের ভেতর একটিই আশা নিয়ে সন্তানের পাশে বসে থাকেন, হয়তো সকালে জ্বরটা একটু কমবে। হয়তো শিশুটি আবার চোখ খুলে তাকাবে। হয়তো তাকে সুস্থ করেই ঘরে ফিরতে পারবেন।

চকরিয়ার ওসি- ইউএনওকে ‘খাটিয়ায় শোয়ানোর’ হুঁশিয়ারি উপজেলা বিএনপি সভাপতির

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

কক্সবাজারের চকরিয়ায় থানার ওসি, ইউএনওসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হকের বিরুদ্ধে।

রোববার (১০ মে) এক অনুষ্ঠানে দেওয়া তার বক্তব্য ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বক্তব্যে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ না হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।

আমাদের হাতে আসা ওই অনুষ্ঠানের একটি ভিডিওতে চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি তার বক্তব্যে বলেন, চকরিয়া থানা সবকিছু দেবে না, চকরিয়া থানা থেকে সবকিছু আমাদের আদায় করতে হবে। আমাদেরটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমাদেরটা কয়লামন্ত্রী না, পানিমন্ত্রী না। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছি।

তিনি বলেন, ‘ও ওসি তুই যদি আর হতা ন হনুস রাতিয়া গাট্টি গোল গরা পরিবো।’ অর্থাৎ ওসি, তুই যদি আমার কথা না শুনিস কাপড়চোপড় বেঁধে রাখতে হবে। তিনি বলেন, একইভাবে ইউএনও অফিসের কোনো কর্মকর্তা যদি আমাদের কথা না শোনে, তাহলে রাতে গাট্টি (কাপড়চোপড়) বেঁধে রাখার চেষ্টা করো।

এনামুল হক বলেন, আরও বড় বড় কর্মকর্তা যারা আছে, অফিসার-পিয়ন (কর্মকর্তা) আছে, আলটিমেটাম দেবেন, এই কাজটা করে দিবি। ১৫ দিন সময় দেবেন। এর ভেতর যদি না করিস, মসজিদ থেকে খাটিয়া আনবো, তোকে ওখানে শুয়াবো। তারপর হয় আমিরাবাদ, না হয় কক্সবাজার পাঠিয়ে দেব। তোর আর থাকতে হবে না। এই হচ্ছে আমাদের করণীয়।

এ সময় অবৈধভাবে মাছের ঘেরে না যাওয়ার জন্য সবাইকে নিষেধ করেন বিএনপির এ নেতা। তবে, বৈধভাবে সবাইকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

রোববার (১০ মে) রাতে চকরিয়া উপজেলা বিএনপি আয়োজিত আজিজনগর চেয়ারম্যান লেকস্থ একটি পিকনিক প্রোগ্রামে উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন।

এ সময় তার পাশে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম. মোবারক আলী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফখরুদ্দীন ফরায়েজি, পৌরসভা বিএনপির সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, নুরুল আমিন কাউন্সিলর, বিএনপি নেতা সাজ্জাদ হোসেন, আবুল হাসেমসহ চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা।

জানতে চাইলে এ বক্তব্যের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক।

তিনি বে ইনসাইটকে বলেন, “আমি বলেছি, হ্যাঁ এই কথাগুলো আমি বলেছি, কিন্তু আপনারা যে অর্থে নিয়েছেন, ওই অর্থে বলি নাই। এটা আমি এই অর্থে বলেছি যে আমাদের যদি বৈধ কোনো কথা না শোনা হয়, তাহলে এটা প্রযোজ্য হবে।”

তিনি দাবি করেন, বক্তব্যটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নয়, বরং একটি পিকনিকে দেওয়া হয়েছিল এবং সেটিকে ভিন্ন অর্থে প্রচার করা হচ্ছে। এখানে তো কোনো সাংবাদিক যায়নি।

প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এনাম বলেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে এই বক্তৃতা দিই নাই। একটা পিকনিকে আমরা এই কথাগুলো বলেছি।”

তিনি বলেন, বিষয়টি ছিল “বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্নে” এবং “আমাদের ছেলেদের যদি অবৈধভাবে কেউ হয়রানি করে, তাহলে সে হয়তো চকরিয়াতে চাকরি করবে না”— এই প্রেক্ষাপটে আমি মন্তব্য করেছিলাম।

এনাম আরও বলেন, “আমি এ কথা তাকে (সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে) বলেছি। কে বা কারা এটাকে নিয়ে মিটিং করে এই বক্তৃতা করেছে— এটাই।”

আলাপকালে প্রতিবেদক উল্লেখ করেন, ঘটনাটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। জবাবে এনাম বলেন, “রাইট, রাইট।”

“আমাদের এলাকা হোম মিনিস্টারের এলাকা। জনগণই তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছেন। তাই কোনো বৈধ কাজ যদি তারা করে না দেন, তাহলে ইউএনও-ওসির এমন পরিণতির কথা বলেছি।”

এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চকরিয়ার নতুন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহীন দেলোয়ার বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। এটা ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামত। উনি ভালো বলতে পারবেন কেনো বলেছেন।”

চকরিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ মনির হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

আরাকান আর্মির হাত থেকে ফিরলো ১৪ জেলে

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির হাতে আটক হওয়া ১৪ জন জেলেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে দাবী করে বিবৃতি দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এদের মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশি এবং একজন রোহিঙ্গা রয়েছেন।

শুক্রবার নাফ নদীর শূন্যরেখায় আরাকান আর্মির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে জেলেদের গ্রহণ করে বিজিবির একটি দল। পরে তাদের টেকনাফ জেটিঘাটে নিয়ে আসা হয়।

বিজিবি জানিয়েছে, ২০২৫-২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে এসব জেলে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম করে মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশ করেন। এ সময় তাদের আটক করে আরাকান আর্মি। পরে বিভিন্ন সময়ে তাদের মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংগঠনটির নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পে রাখা হয়।

বিজিবির দাবী, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মানবিক দিক বিবেচনায় কক্সবাজার রিজিয়নের বিজিবি আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। দীর্ঘদিনের সমন্বয় ও প্রচেষ্টার পর পর্যায়ক্রমে আটক জেলেদের ফেরত আনার বিষয়ে অগ্রগতি হয় বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।

বর্তমানে দেশে ফিরিয়ে আনা জেলেদের পরিচয় যাচাই ও পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন।

টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সবসময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। মানবিক সংকট মোকাবিলায় পেশাদারিত্ব, আন্তরিকতা ও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে আটক জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।”

তিনি বলেন, এখনও মিয়ানমারে আটক থাকা অন্য জেলেদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বিজিবির এই উদ্যোগে আটক জেলেদের পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলেও জানানো হয়েছে।

কক্সবাজারের প্রশাসনিক বিবর্তন: মহকুমা থেকে জেলা, নতুন মানচিত্রের পথে মাতামুহুরী

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজার শুধু দেশের পর্যটন রাজধানীই নয়, প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকেও এটি বাংলাদেশের অন্যতম পরিবর্তনশীল অঞ্চল। ব্রিটিশ আমলে একটি ছোট মহকুমা হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই জনপদ এখন নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভৌগোলিক বিস্তার, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার প্রয়োজনেই বারবার বদলেছে জেলার মানচিত্র।

সবশেষ সেই পরিবর্তনের ধারায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও একটি নাম, “মাতামুহুরী উপজেলা”।

মহকুমা থেকে জেলার যাত্রা

১৮৫৪ সালে কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ থানা নিয়ে গঠিত হয় কক্সবাজার মহকুমা। পরে প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী এসব এলাকা ভেঙে নতুন থানা সৃষ্টি করা হয়। মহেশখালী থেকে আলাদা হয় কুতুবদিয়া, টেকনাফ থেকে উখিয়া এবং কক্সবাজার সদর থেকে রামু।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৫৯ সালে কক্সবাজার শহরকে টাউন কমিটিতে উন্নীত করা হয়। পরে ১৯৭২ সালে এটি পৌরসভায় রূপ নেয়।

অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ কক্সবাজার মহকুমাকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত করা হয়। এর মাধ্যমে প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই উপকূলীয় এলাকা নতুন পরিচয় পায়।

উপজেলা ব্যবস্থার সূচনা

স্বাধীনতার পর এরশাদ সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় ১৯৮৩ সালে দেশের বিভিন্ন থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। সেই সময় কক্সবাজার জেলার প্রধান থানাগুলোও উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

চকরিয়া, উখিয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, রামু ও মহেশখালী, সবগুলোই তখন উপজেলা কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে স্থানীয় প্রশাসনকে জনগণের আরও কাছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

চকরিয়া: বৃহৎ উপজেলা থেকে বিভাজনের ইতিহাস

কক্সবাজার জেলার প্রশাসনিক বিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি চকরিয়া। ১৭৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই থানা ছিল জেলার অন্যতম বৃহৎ প্রশাসনিক অঞ্চল।

উপকূল, পাহাড় ও বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকা নিয়ে গঠিত হওয়ায় সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক চাপ বাড়তে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের ২৩ এপ্রিল চকরিয়ার সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় পেকুয়া উপজেলা।

উজানটিয়া, পেকুয়া, টৈটং, মগনামা, রাজাখালী, বড়বাকিয়া ও শিলখালী ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা গঠনের মাধ্যমে চকরিয়ার প্রশাসনিক পরিসর ছোট করা হয়।

নতুন ‘মাতামুহুরী উপজেলা’

দীর্ঘদিনের দাবির পর আবারও ভাঙছে চকরিয়া উপজেলার সীমানা।

২০২৬ সালের ৭ মে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে চকরিয়ার সাত ইউনিয়ন নিয়ে “মাতামুহুরী উপজেলা” গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।

প্রস্তাবিত ইউনিয়নগুলো হলো—শাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, ভেওলা মানিকচর, ঢেমুশিয়া, বদরখালী ও কোনাখালী।

স্থানীয়দের দাবি, মাতামুহুরী নদীঘেঁষা এসব ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিকভাবে অবহেলিত ছিল। চকরিয়া উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জনসেবায় ভোগান্তির কারণে পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।

নিকার বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন মিললেও এখনো এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে এলাকাগুলো এখনও চকরিয়া উপজেলার অংশ হিসেবেই রয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্র বলছে, গেজেট প্রকাশ ও চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদনের পরই নতুন উপজেলা কার্যকর হবে।

ঈদগাঁও: সর্বশেষ কার্যকর উপজেলা

কক্সবাজার জেলার সর্বশেষ কার্যকর উপজেলা হলো ঈদগাঁও। ২০২১ সালের ২৬ জুলাই কক্সবাজার সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে এটি গঠিত হয়।

এর মাধ্যমে জেলার উপজেলা সংখ্যা দাঁড়ায় নয়টিতে।

বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো

বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় কার্যকর উপজেলা রয়েছে—

  • কক্সবাজার সদর
  • ঈদগাঁও
  • উখিয়া
  • টেকনাফ
  • চকরিয়া
  • পেকুয়া
  • মহেশখালী
  • কুতুবদিয়া
  • রামু

মাতামুহুরী উপজেলা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেলে জেলার প্রশাসনিক মানচিত্রে যুক্ত হবে দশম উপজেলা।

বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারের প্রশাসনিক বিবর্তনের ইতিহাস আসলে এই অঞ্চলের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধিরই প্রতিফলন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ এবং উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ভবিষ্যতে জেলায় আরও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ফের হামের থাবা, কক্সবাজার হাসপাতালে আরো দুই শিশুসহ এখন পর্যন্ত ২০ শিশুর মৃত্যু

স্বাস্থ্য বিট । বে ইনসাইট

কক্সবাজারে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেইসাথে গেলো তিন দিনে হুহু করে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। জেলা সদর হাসপাতালে তিনদিনে ভর্তি হয়েছে ৯৪ জন শিশু।

গতকাল মারা যাওয়া শিশুরা হলো রামু উপজেলার মিজানুর রহমানের ৮ মাস বয়সী পুত্র আতিকুর রহমান এবং একই এলাকার জাবেদের ৬ মাস বয়সী কন্যা ওয়াজিফা।

রোববার (৩ মে) কক্সবাজার সদর হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শান্তনু ঘোষ।

ডা. ঘোষ জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু দুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এবং তাদের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ জানিয়েছে, ওয়াজিফাকে গত ২৪ এপ্রিল ভর্তি করা হয় এবং ৩ মে সকাল ৮টায় তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে আতিকুর রহমানকে ৩ মে ভর্তি করার পর একই দিন রাত ৯টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত সন্দেহে নতুন করে ২৭ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে মোট ৭৯ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত হামে সন্দেহভাজন হিসেবে ২০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯ জন রোহিঙ্গা শিশু। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৮৮৩ জন শিশু।

অন্যদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ মে পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় মোট ১,৪৫২ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।

পাহাড়ি ভূমি বিক্রি করতে পাহাড়ে মন্দির নির্মাণ করান আবুল হোসেন

আফজারা রিয়া নুরুল হাসান

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের একটি পাহাড়চূড়ায় ছোট্ট একটি মন্দির। দূর থেকে এটি শান্ত ধর্মীয় আশ্রয়স্থল মনে হলেও, কাছে গেলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কাটা পাহাড়, দ্রুত গড়ে ওঠা বসতি এবং জমি ভাগ করে বিক্রির অঘোষিত এক বাণিজ্য।

সরকারি নথি অনুযায়ী, খুরুশকুল ইউনিয়নের প্রায় ৩০ শতাংশ জমি সংরক্ষিত বনভূমি, যার পরিমাণ প্রায় ৮০০ একর। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, এই বনভূমির বড় অংশই এখন বিলুপ্তপ্রায়। পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে, গাছ উজাড় করা হয়েছে, আর সেই জমি ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে বিক্রি করা হচ্ছে।

বে ইনসাইট অনুসন্ধান করে পেয়েছে, খুরুশকুলের পুলিশ্যাঘোনা এলাকায় একটি মন্দিরকে কেন্দ্র করে ‘নিরাপত্তার প্রতীক’ হিসেবে দেখিয়ে আশপাশের বনভূমি বিক্রি করার তথ্য।

সম্প্রতি খুরুস্কুলের পূর্ব হামজার ডেইলে পুলিশ্যার ঘোনা নামক পাহাড়ে নির্মিত ওই সার্বজনীন শ্রী শ্রী শিব কালী মন্দিরের সেবায়েত নয়ন দাশের মরদেহ পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর বেরিয়ে আসে পাহাড় বিক্রির এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মন্দিরের প্রবেশ মুখেই সাইনবোর্ডে লেখা জমিদাতা আবুল হোসেন। সাইনবোর্ডে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ থাকা সুকুমার ব্রহ্মচারীর কাছে জানতে চাওয়া হয় এই জমিদাতার বিষয়টি সম্পর্কে। তিনি বলেন, ৫-৬ বছর আগে ১০ গন্ডা জায়গা আবুল হোসেন আমাকে দান করেছিলেন মন্দির নির্মাণ করার জন্য।

কিন্তু সুকুমার ব্রহ্মচারীর বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানায়। তাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন তার এক বেয়াই। তার বেয়াইয়ের ওই পাহাড়ে দুই গন্ডা জায়গা রয়েছে বলে জানান সুকুমার।

“মন্দির আছে, সমস্যা হবে না”

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন ক্রেতা জানান, আবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তি তাদের কাছে প্রতি গন্ডা ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় এসব সরকারি বনভূমী বিক্রি করেছেন। এসব লেনদেন নোটারি করা কাগজের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলেও দাবি তাদের।

একজন ক্রেতার মতে, “মন্দির আছে, মানুষ আছে, এমন জায়গা দেখিয়ে বলা হয়েছে এখানে সমস্যা হবে না। তাই জমি কিনেছি।”

স্থানীয়দের ধারণা, ইতোমধ্যে অন্তত ৬০০ পরিবার সেখানে জায়গা কিনেছে। পুরো এলাকায় কাটা হচ্ছে পাহাড়, দখল বুঝাতে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে ঝুপড়ি ঘর।

এক ৫০ বছর বয়সী এক নারী (সঙ্গত কারণে নাম প্রকাশ করা হয়নি) জানান, “ছয় বছর আগে আমি ৮ গন্ডা জমি কিনেছি, প্রতি গন্ডা ২৫ হাজার টাকা করে। নোটারি দলিল করা হয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, কম দামে এখানে ছাড়া আর কোথায় পাবো?”

পাশেই থাকা আরেক নারী বলেন, “মন্দির হওয়ার পর আমরা প্রায় ২৫ পরিবার একসঙ্গে জমি কিনেছি। আমরাই প্রথম। সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। আমি ২ গন্ডা জমি নিয়েছিলাম ২৫ হাজার টাকা করে।”

এমন বেশ কিছু নোটারি করা দলিল হাতে এসেছে বে ইনসাইটের। যা যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অস্বীকার

অভিযুক্ত আবুল হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, “আমাদের পরিবার বহু বছর ধরে এই জমির দখলে ছিল। আমি জমি বিক্রি করিনি। বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছি এবং মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা দিয়েছি।”

সরকারি জমি ব্যবহারের জন্য তিনি কিভাবে সুযোগ করে দিয়েছেন, জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, আমি ফরেস্ট ভিলেজার, আমাকে এই পাহাড়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো ১৬-১৭ বছর আগে।

তবে বনবিভাগ বলছে, এই ধরণের কিছুই তাদের নেই।

প্রশ্ন উঠছে, সংরক্ষিত বনভূমি কীভাবে নোটারির মাধ্যমে হস্তান্তর হয় এবং সেই সুযোগে কীভাবে একটি আবাসন এলাকা গড়ে ওঠে?

এলাকাবাসীদের অনেকেই বলেছেন, আবুল হোসেনের রেজিস্ট্রি জমি রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে। তাই পার্শ্ববর্তী হিসেবে এই সরকারি বনভূমি তার পরিবার দখল করে বিক্রি করছেন। এরজন্য আবুল হোসেন বন বিভাগের কর্মকর্তাদেরও টাকা দিয়েছেন।

দালাল চক্র ও টার্গেটেড বিক্রি

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ক্রেতা বে ইনসাইটকে জানান, আবুল হোসেনের সঙ্গে দালাল হিসেবে কাজ করছেন চিত্ত রুদ্র ও রনি নামের দুই যুবক, যারা কক্সবাজার শহরে থাকেন। তারা মন্দিরের জন্য জমি ‘দান’ করা হয়েছে, এমন প্রচারণা চালিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে জমি বিক্রিতে সহায়তা করছেন এবং এর বিনিময়ে অর্থ নিচ্ছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, মন্দির নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে জমি বিক্রি সহজ করা।

প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা, বন উজাড়

সরেজমিনে খুরুশকুল-চৌফলদণ্ডী সড়কের পূর্ব পাশে অন্তত ২০-২৫টি স্থানে পাহাড় কাটার দৃশ্য দেখা গেছে। একইসঙ্গে চলছে গাছ নিধন।

স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহিম মাস্টার বলেন, “সংরক্ষিত বনভূমির অর্ধেকের বেশি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই কোনো পাহাড়ই অবশিষ্ট থাকবে না।”

বন বিভাগের খুরুশকুল বিট অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তারা হামলার শিকার হন। সীমিত জনবল ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কার্যকর অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

একজন বন প্রহরীর ভাষায়, “আমরা গেলে তারা দলবেঁধে আসে। নিরাপত্তা ছাড়া অভিযান চালানো সম্ভব না।”

নতুন বিট কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানিয়েছেন, একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তিনিও স্বীকার করেন, “এখানে এখন খুব বেশি বনভূমি অবশিষ্ট নেই।”

এই বিটে আগে দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তাকে পাহাড় কাটার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ফলে পুরো ব্যবস্থাপনাই এখন প্রশ্নের মুখে।

এমনকি পুলিশ্যার ঘোনা এলাকায় মন্দির নির্মাণ ও আশপাশের পাহাড়ি ভূমি বিক্রির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানায় খুরুশকুলের বিট কর্মকর্তা কামরুল হাসান।

নোটারি দলিল: বৈধতা নিয়ে সংশয়

বিভিন্ন ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া নোটারি দলিল যাচাই করে দেখা গেছে, এসব দলিলের মাধ্যমে বনভূমি ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষিত সরকারি জমি নোটারির মাধ্যমে হস্তান্তর আইনগতভাবে বৈধ কি না, তা নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

খুরুশকুল যেনো এখন শুধু বনভূমি হারানোর গল্প নয়, এটি এক রূপান্তরের চিত্র, যেখানে ধর্মীয় স্থাপনা, দরিদ্র মানুষের আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রভাবশালী চক্রের জমি বাণিজ্য একসঙ্গে চলছে।

মানুষের দখলে ৩৪ হাজার একর বন: রামুতে ফের বন্য হাতির আক্রমণে মা ও শিশুকন্যার মৃত্যু

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের রামু উপজেলায় ফের বন্য হাতির আক্রমণে এক মা ও তার তিন বছর বয়সী শিশুকন্যার মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার দিকে খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পশ্চিম খুনিয়াপালং এলাকার সৈয়দ কলোনীতে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন ছেমন আরা (২৫) এবং তার মেয়ে আসমা বিবি। তারা স্থানীয়ভাবে বসবাসরত মো. একরাম মিয়ার স্ত্রী ও সন্তান।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জয়নাল আবেদিন বাবুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ভোরের দিকে তিনটি বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। হাতিরা কয়েকটি বসতঘরের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং আশপাশের গাছপালা উপড়ে ফেলতে শুরু করে।

“হঠাৎ বিকট শব্দে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। একরাম মিয়াও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বের হন। এ সময় দুটি হাতি তাদের দিকে তেড়ে এলে তিনি বড় ছেলেকে নিয়ে পেছনের দিকে সরে গিয়ে বাঁচতে পারলেও তার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে সামনে পড়ে যান,” বলেন তিনি।

ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

পালানোর সুযোগ ছিল না

ইউপি সদস্যের ভাষ্য, হাতির পালটি ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক, ফলে সামনে পড়ে গেলে পালানোর সুযোগ ছিল না। তাণ্ডব চালানোর সময় হাতিরা আশপাশের আম ও কাঁঠাল খেয়ে পরে পাশের পাহাড়ে চলে যায়।

স্থানীয়দের বরাদ দিয়ে ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদিন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে খাবারের সন্ধানে হাতির পাল খুনিয়াপালং ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করছে, যা জনজীবনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ধোয়াপালং রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. তোসাদ্দেক হোসেন বলেন, “ঘটনার পর হাতির পালটিকে তাড়িয়ে গভীর বনে পাঠানো হয়েছে। তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

দখল আর বসতিতে সংকুচিত বনভূমিঃ বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত

বন বিভাগের তথ্য বলছে, এ অঞ্চলে মানুষ-হাতি সংঘাত নতুন নয়।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন জানান, তাদের অধীনে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার একর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং আরও প্রায় ১১ হাজার একর বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে। এছাড়া বনের ভেতরেও বিচ্ছিন্নভাবে বসতি গড়ে উঠেছে।

“আজকের ঘটনাস্থলটি ক্যাম্প থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের বনে। তবে বনের ভেতরে বসবাসকারী অনেকেই ঝুঁকিতে আছেন,” বলেন তিনি।

২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণাঞ্চলে ৬০ থেকে ৭০টি হাতি ছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৪টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর বিপরীতে মানুষ মারা গেছে অন্তত ৮ জন।

অন্যদিকে, উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের হিসাবে উত্তরের বনে ৭০ থেকে ৮০টি হাতি ছিল। গত এক বছরে একটি হাতি মারা গেছে, তবে গত দশকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহে সময় লাগবে।

তিনি জানান, ৭৪ হাজার একর বনভূমির মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার একর দখল হয়ে গেছে, যা নিয়ে মামলা চলছে।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন উজাড়, বসতি সম্প্রসারণ এবং খাদ্যসংকটের কারণে হাতিরা ক্রমেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নেকম’-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমান বলেন, “হাতির বিচরণক্ষেত্র কমে গেছে, খাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। তাই তারা লোকালয়ে চলে আসছে।”

তিনি আরও বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে বনভূমিতে চাষাবাদ করলেও ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পান না। ফলে কেউ কেউ হাতি ঠেকাতে বিদ্যুৎ ফাঁদ বা গুলি ব্যবহার করেন, এতে হাতিও মারা যাচ্ছে।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।