কক্সবাজারে পাহাড়ধসের বিভীষিকা, একরাতেই প্রাণ গেল ৯ জনের

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রবল বর্ষণে একের পর এক পাহাড়ধসে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও কক্সবাজার শহরে পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত নয়জন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী (ক্যাম্প-১৫) রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের চারটি স্থানে এবং কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনও কাটেনি। অনেক রোহিঙ্গা পরিবার পাহাড়ের ঢালে বসবাস করায় নতুন করে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে রাত দেড়টার দিকে উখিয়ার জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে কামাল হোসেনের ঘরের ওপর। ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে মারা যান কামাল হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমাইরা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। একই পরিবারের আরও দুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর কিছুক্ষণ পর, রাত দুইটার দিকে কুতুপালংয়ের ৭ নম্বর আশ্রয়শিবিরের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে মারা যায় সাত বছর বয়সী একরাম। সে রশিদ উল্লাহর ছেলে।

রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরের সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই ভাই—রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ভোর পর্যন্ত অভিযান চালায়। ভারী বৃষ্টি ও কাদার কারণে উদ্ধারকাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে ভোর সাড়ে চারটার দিকে কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়। আলী আকবর (৫০) নামে ওই ব্যক্তির বাড়ির ওপর পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।

সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান,  আলী আকবর ও পরিবারের আরও দুজন মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরিবারের অন্য দুই সদস্য চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাম্পে মাইকিং করে সতর্কবার্তাও প্রচার করা হচ্ছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা কিংবা খাড়া ঢালে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টানা বর্ষণে মাটি নরম হয়ে গেলে মুহূর্তেই ধসে পড়ে পাহাড়ের অংশ, আর ঘুমন্ত মানুষের জন্য তা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী ফাঁদ।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ তাতেও প্রকাশ্য বিভক্তি কক্সবাজার আওয়ামী লীগে

প্রতিবেদক | বে ইনসাইট

কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই নীরব কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। তবে মাঠে না থাকলেও দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সম্প্রতি টেলিগ্রামে ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঝড়।

জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ দলীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন, কেউ আবার অতীতের নির্বাচনী ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য, এমনকি আর্থিক অনিয়ম নিয়েও অভিযোগ তুলছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দলটির ভেতরে থাকা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে।

অডিওতে কী শোনা গেছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানকে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। সেখানে তিনি নাম উল্লেখ না করলেও বক্তব্যের বিভিন্ন অংশে কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমানকে ইঙ্গিত করেছেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মনে করছেন।

অডিওতে মুজিবুর রহমান বলেন, দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, ব্যক্তিগত মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তিনি তার পক্ষেই কাজ করেছেন। এমনকি নিজের নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে।

তিনি শেখ হাসিনাকে বলেন-

আপনি আমাকে মেয়র নির্বাচন করার জন্য দেন নাই, যাকে দিছেন তার পক্ষে আমি কাজ করে তাকে নির্বাচিত করেছি। তারপরদিন আমার সঙ্গে বেইমানি… আমার আপন চাচাতো ভাই নির্বাচন করছিল, শুধু আপনার দিকে তাকিয়ে আমি পরিবারের সঙ্গে বেইমানি করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি।

কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আরও বলেন-

এখনো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লিখতেছে। কই, জামাতের বিরুদ্ধে তো কেউ লেখে না।

অডিওতে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি শেখ হাসিনাকে জানান, তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ এবং চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে পাঠাতে সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকার কথাও উল্লেখ করেন।

মাহবুবুর রহমানের পাল্টা জবাব

অডিও প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমান নিজের ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন।

তিনি দাবি করেন, বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না করায় তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। একই পোস্টে তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, মুজিবুর রহমানই বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে দেশে অবস্থান করছেন।

মাহবুবুর রহমান আরও লেখেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে ইতোমধ্যে তার একাধিকবার কথা হয়েছে এবং দলীয় প্রধান সবকিছু জানেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মুজিবুর রহমান নৌকা প্রতীকের পরিবর্তে অন্য প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে তার কাছে প্রমাণ রয়েছে, যা সময়মতো প্রকাশ করবেন। তিনি সেখানে লিখেন- ‘তিনি হ্যালমেট মার্কায় জগদীশকে ভোট দিয়েছে।’ পাশাপাশি গত দুই বছরে দলীয় কর্মীদের সহায়তার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও তোলেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি স্ট্যাটাসে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যুবলীগ নেতাদের প্রকাশ্য অবস্থান

বিতর্কে যোগ দিয়েছেন জেলা যুবলীগের কয়েকজন নেতাও।

যুবলীগ নেতা শোয়াইব ইফতেখার এক ফেসবুক পোস্টে মাহবুবুর রহমানের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক সংকটের সময়ে সাবেক মেয়র দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যারা নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তাদের দলে রাখা হলে আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে পারবে না।

অন্যদিকে যুবলীগ নেতা মোনাফ সিকদারও একটি ফেসবুক পোস্টে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে কটাক্ষ করে লেখেন, টেলিগ্রাম গ্রুপে তাকে সহযোগিতা করা নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে তিনি মুজিবুর রহমানের রোষানলে পড়েছেন।

এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আরও কয়েকজন নেতা বিভিন্ন পোস্টে কোনো না কোনো পক্ষের সমর্থনে অবস্থান নিয়েছেন। কোথাও সাংগঠনিক শুদ্ধির দাবি উঠেছে, কোথাও আবার বর্তমান নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রকাশ্যে দলীয় বিভক্তি

গত কয়েক দিনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দলটির অন্তত দুটি স্পষ্ট অবস্থান তৈরি হয়েছে।

একটি অংশ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে সাংগঠনিকভাবে প্রয়োজনীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরছে।

অন্য অংশটি সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমানকে কেন্দ্র করে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, কক্সবাজারে তৃণমূলের বড় একটি অংশ এখনও তার নেতৃত্বে আস্থা রাখে।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।

কথা বলতে রাজি নন কেউ

বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক বর্তমান ও সাবেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

তাদের কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ সম্ভব হলেও কেউই গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কেউ কেউ বলেন, “এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে চাই না।”

অন্যদিকে, যাদের অনেকেই সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদেরই ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ নিয়ে একাধিক প্রকাশ্য পোস্ট দেখা গেছে।

পুরোনো দ্বন্দ্বের নতুন প্রকাশ?

তবে দলটির স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছে বে ইনসাইটের সাথে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ার পর দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে টেলিগ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক যোগাযোগই এখন অনেক নেতার প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেই প্ল্যাটফর্মেই নেতৃত্ব, আনুগত্য, অতীতের নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসছে।

ফলে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল দলীয় বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তা দৃশ্যমান রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

তবে ফেসবুকে দেওয়া বিভিন্ন পোস্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নেতাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নীরবে বাড়ছে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হুমকি

আফজারা রিয়া

বর্ষা মানেই কক্সবাজারে স্বস্তির বৃষ্টি। ধুলোমাখা শহর ধুয়ে যায়, পাহাড়ে নামে সবুজের ছোঁয়া, সমুদ্র ফিরে পায় অন্যরকম সৌন্দর্য। কিন্তু এই বৃষ্টির সঙ্গেই প্রতি বছর নীরবে ফিরে আসে আরেকটি অদৃশ্য আতঙ্ক-ডেঙ্গু।

একটি মশা। কয়েক ফোঁটা জমে থাকা পানি। আর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে প্রাণঘাতী সংক্রমণ।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, কক্সবাজারে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এখন শহরে নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। আক্রান্তের সংখ্যা হোক কিংবা মৃত্যু দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই ক্যাম্পগুলো।

এমন বাস্তবতায় বর্ষা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ।

ঝুঁকি আছে,তবে প্রতিরোধ কঠিন নয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার বংশবিস্তার রোধ করা। তাই বাড়ি, ক্যাম্প বা আশপাশের কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা দেখা দিলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা।

ডেঙ্গুর কেন্দ্রবিন্দু এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২১ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৮১ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশই ছিলেন রোহিঙ্গা।

একই বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৭ জনের মধ্যে ৬ জনই ছিলেন ক্যাম্পের বাসিন্দা।

২০২৫ সালে সংক্রমণ কমে ৮ হাজার ৮৩৮ জনে নেমে এলেও চিত্র খুব একটা বদলায়নি। আক্রান্তদের মধ্যে ৬ হাজার ৩০৩ জনই রোহিঙ্গা, আর ১১টি মৃত্যুর মধ্যে ১০টিই ঘটেছে ক্যাম্পে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্ত ৪৫১ জনের মধ্যে ৩৩০ জনই রোহিঙ্গা। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর খবর না থাকলেও বর্ষার শুরুতেই স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকির বলে বিবেচনা করছে।

কেন এত ঝুঁকিতে ক্যাম্পগুলো?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে কয়েক লাখ মানুষের ঘনবসতি, সীমিত জায়গা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে এডিস মশার জন্য তৈরি হয়েছে আদর্শ প্রজননক্ষেত্র।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন,

আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, ডেঙ্গু আক্রান্তদের বড় অংশই রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, পানি জমে থাকা এবং দ্রুত সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্ষা সামনে রেখে রোগ নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে।

তার মতে, কুতুপালং-বালুখালী মেগা ক্যাম্প, ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশন, ক্যাম্প-৮ই, ক্যাম্প-১৩ ও ক্যাম্প-১৫ বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

ভুল ধারণাও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

ডা. ছাবের বলেন, এখনও অনেকেই মনে করেন এডিস মশা শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। বাস্তবতা ভিন্ন।

পরিষ্কার কিংবা অপরিষ্কার যে কোনো স্থির পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে।

তাই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না। ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা যে কোনো পানিযুক্ত বস্তু নিয়মিত পরিষ্কার বা উল্টে রাখতে হবে।

ক্যাম্পে চলছে সমন্বিত প্রস্তুতি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা মো. রিজওয়ানুল হক ভূঁইঞা বলেন,

বিশাল জনসংখ্যা এবং সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস, পানি জমে থাকা স্থান শনাক্তকরণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

ঝুঁকি শুধু ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ নয়

অনেকে মনে করেন ডেঙ্গু কেবল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সমস্যা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সেটি ভুল ধারণা।

২০২৪ সালে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৩৬৬ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৩৫।

অর্থাৎ কক্সবাজার সদরসহ জেলার প্রতিটি উপজেলাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় মানুষ এবং রোহিঙ্গাদের প্রতিদিনের চলাচলের কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পুরো জেলাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে সংকট

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়,

অনিয়মিত ভারী বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার ওঠানামা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি রোগ নয়; বছরের দীর্ঘ সময়ই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দিলে দেরি না করে পরীক্ষা করাতে হবে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সামান্য জ্বরকেও অবহেলা করা যাবে না।

হাসপাতাল প্রস্তুত, কিন্তু সবচেয়ে বড় ওষুধ সচেতনতা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শান্তনু জানান,

বর্তমানে সংক্রমণ কিছুটা কম থাকলেও আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। প্রয়োজনীয় স্যালাইন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রয়েছে। তবে ডেঙ্গুকে অবহেলা করা যাবে না। জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে এবং দিন-রাত সবসময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হাসপাতাল নয়, প্রতিরোধ।

ডা. মহীউদ্দীন আলমগীর এর মতে, একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপ, একটি ডাবের খোসা কিংবা টবের নিচে জমে থাকা সামান্য পানিই কয়েক দিনের মধ্যে শত শত এডিস মশার জন্ম দিতে পারে। আর সেই মশাই কেড়ে নিতে পারে একটি প্রাণ।

কক্সবাজার শহরে কাজে বেরোনো একজন নারীর হঠাৎ শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তিনি কী করবেন?

ইনসাইট রিপোর্ট । কক্সবাজার

কক্সবাজার শহরে কাজে বেরোনো একজন নারীর হঠাৎ শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তিনি কী করবেন?

দ্রুত বাসায় ফিরবেন? কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে অনুমতি চাইবেন? নাকি প্রয়োজন চেপে রেখে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন?

প্রশ্নটা অস্বস্তিকর। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহরের বাস্তবতা অনেকটাই এমন।

এটি শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত অস্বস্তির গল্প নয়।এটি একটি শহরের জনস্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা এবং নাগরিক সেবার বাস্তব চিত্র।

প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এবং কয়েক লাখ স্থানীয় মানুষের চলাচলের এই শহরে পর্যাপ্ত, পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর গণশৌচাগার থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মৌলিক নাগরিক সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ – পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা এখনো অনেকটাই অপরিকল্পিত, অসম্পূর্ণ এবং ইজারানির্ভর।

বে ইনসাইটের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সৈকত এলাকার কিছু টয়লেট ও চেঞ্জিং রুম ব্যবহারযোগ্য থাকলেও অনেক স্থানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কোথাও দরজায় ঝুলছে তালা, আবার কোথাও অবকাঠামো তৈরি হলেও তা এখনো মানুষের কাজে লাগছে না।

সুগন্ধা পয়েন্টের নতুন চেঞ্জিং রুম ও টয়লেট তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকলেও লাবণীসহ অন্যান্য স্থানে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শহরের বড়বাজার এলাকার একটি পাবলিক টয়লেট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। অন্যদিকে আইবিপি মাঠ এলাকায় নতুন টয়লেট নির্মাণ হলেও সেটি এখনো মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।

জান্নাতুল আয়েশা কাজ করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। তিনি বলেন, “কাজে বের হলে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু মাঝপথে শৌচাগারের প্রয়োজন হলে কোথায় যাব, সেটা নিয়েই চিন্তায় থাকতে হয়। সব জায়গায় তো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে ঢুকে শৌচাগার ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় প্রয়োজন থাকলেও চেপে রাখতে হয়।”

পর্যটকদের অভিযোগও একই ধরনের।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন আসাদুল্লাহ রহমান। বার্মিজ মার্কেট এলাকায় এসে তাঁর মেয়ের হঠাত শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানান।

আসাদুল্লাহ রহমান বলেন, দ্রুত হোটেলে ফিরতে যাচ্ছিলাম, তখন পরে গেলাম রাস্তার জ্যামে।

এই পর্যটকের ভাষায়, “বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে আসেন। পাবলিক টয়লেট সবার জন্য প্রয়োজনীয় একটি সেবা। এটা সবসময় চালু ও পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত।”

কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষক ঈপসীতা চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু টয়লেট বানালেই হবে না। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। অনেক জায়গায় ব্যবহারই করা যায় না।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু নাগরিক দুর্ভোগের বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “পর্যটন এলাকায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর পাবলিক টয়লেট না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করে। এতে শুধু পরিবেশ দূষণই বাড়ে না, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ, কলেরা ও বিভিন্ন ধরনের অন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ সময় শৌচাগার ব্যবহার চেপে রাখার কারণে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে মূত্রনালির সংক্রমণ, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।”

পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের অধীনে থাকা টয়লেটগুলোর একটি অংশ সচল রয়েছে এবং বাকি স্থাপনাগুলো ধাপে ধাপে চালু করার চেষ্টা চলছে।

কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ বলেন, “কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের টয়লেট ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নাপিতাপুকুরের টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত করে চালু রাখা হয়েছে। বড়বাজারের টয়লেটটি ইজারায় কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটি বন্ধ রয়েছে।

তবে সেটি বন্ধের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাশেই বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য টয়লেট থাকায় অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত এই টয়লেটের ব্যবহারকারী কম। তাই কেউ ইজারাও নিতে চায় না। আর আইবিপি মাঠের টয়লেটের নির্মাণকাজ শেষ হলে দ্রুত চালু করা হবে।”

অন্যদিকে জেলা পরিষদ জানিয়েছে, সৈকত এলাকার লাবণী, সুগন্ধা ও ইনানি পয়েন্টের টয়লেটগুলো ইজারা অথবা খাস আদায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রহমত উল্লাহর ভাষ্য, “পর্যটকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান টয়লেটগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় চলছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই।

একটি মৌলিক নাগরিক সেবা কি ইজারার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে?

আইনজীবী সেজান এহসান প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো ব্যবসায়ী দায়িত্ব নিতে আগ্রহী না হন, তাহলে কি একটি শহরের মানুষ এবং পর্যটকরা সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন?

“কারণ, পাবলিক টয়লেট কোনো ব্যবসা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অবকাঠামো।”

আইনজীবী সেজান এহসান এর মতে, বাস্তবতা হলো, কক্সবাজারে হঠাৎ একজন নারীর শৌচাগারের প্রয়োজন হলে তার সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে দ্রুত বাসা, হোটেল কিংবা পরিচিত কোনো স্থানে ছুটতে হয়।

“এটি শুধু সেবার সংকট নয়। এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অগ্রাধিকারেরও একটি সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।”

তিনি বলেন, কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহর, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি গন্তব্য। অথচ এখানকার পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো টেকসই জনসেবার বদলে নির্ভর করছে ইজারা ব্যবস্থার ওপর। ফলে কোথাও সেবা আছে, কোথাও নেই; কোথাও স্থাপনা আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই।

“একটি শহরের মৌলিক সেবা যদি ইজারাদার পাওয়া-না পাওয়ার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি আর শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়। সেটি নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।”

আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রতিভা দাশ বলেন, কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বমানের শহরের পরিচয় শুরু হয় সবচেয়ে মৌলিক জায়গা থেকে।

প্রতিভা দাশ বলেন, একজন নারী যেন শহরের যেকোনো প্রান্তে দ্বিধাহীনভাবে, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে একটি পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি শহর সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব হয়ে ওঠে।

“কারণ, যে শহর প্রতিদিন লাখো মানুষের আতিথেয়তা করে, সেই শহরে একটি কার্যকর পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়,এটি রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব।”

বরাদ্দ বাতিল হলেও সোনাদিয়া পুরোপুরি বুঝিয়ে দেয়নি বেজা, দখল-ধ্বংসে বিপন্ন দ্বীপ

বে ইনসাইট রিপোর্ট

এক সময় সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে সেখানে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতার সুযোগে এখন দখল, বন উজাড় ও অবৈধ পর্যটন বাণিজ্যের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়েছে দ্বীপটির অনন্য বাস্তুতন্ত্র।

পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের মুখে বেজার জন্য দেওয়া জমির বরাদ্দ বাতিল করা হলেও প্রায় দুই বছর পরও দ্বীপের পুরো নিয়ন্ত্রণ পায়নি বন বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রশাসনিক অচলাবস্থাই সোনাদিয়ার বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।

সরকার ২০১৯ সালে মাত্র ১ হাজার ১ টাকা সালামিতে সোনাদিয়া দ্বীপের ৯ হাজার ৪৬৭ একর জমি দীর্ঘমেয়াদে বেজাকে বরাদ্দ দেয়। পরিকল্পনা ছিল দ্বীপের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় ইকোট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার। ভারতীয় মাহিন্দ্রা গ্রুপকে যুক্ত করে প্রায় ৫০০ একর এলাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

তবে সরকারের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) তখনই সতর্ক করেছিল, ব্যাপক পর্যটন কার্যক্রম শুরু হলে অতিথি পাখির আবাস, সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়া এবং দ্বীপের নাজুক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হোটেল-মোটেল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ বর্জ্য বৃদ্ধি করে অপূরণীয় পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তীতে পরিবেশবাদীদের আপত্তি ও আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয় বেজার বন্দোবস্ত বাতিল করে জমি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বরাদ্দ বাতিল হলেও সাতটি মৌজার মধ্যে মাত্র তিনটির নিয়ন্ত্রণ আমরা ফিরে পেয়েছি। বাকি অংশ এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো দ্বীপে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।”

তার ভাষায়, “মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বেজার বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত মামলা এখনো চলমান থাকায় প্রক্রিয়াটি শেষ হয়নি। যে এলাকাগুলো আমাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, সেখানেই সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা, বন পোড়ানো ও দখলের ঘটনা ঘটছে।”

তিনি জানান, দক্ষিণ কুতুবজুম ও পানদ্বীপ মৌজায় বন ধ্বংসের ঘটনা সবচেয়ে বেশি।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল প্যারাবন কেটে রিসোর্ট নির্মাণ, চিংড়ি ঘের তৈরি এবং অবৈধ পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।

গত ২ এপ্রিল বন বিভাগ বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের ৩০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে। তাদের দাবি, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এসব মামলা করা হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে।

তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বন বিভাগের মামলায় নাম আসা শেখ কামাল বলেন, “সোনাদিয়া দ্বীপে আমার কোনো রিসোর্ট নেই। আমি প্যারাবনও দখল করিনি।”

অন্যদিকে বিএনপি নেতা জাহেদুল হক নাহিদ বলেন, “জীবনে কোনো দিন সোনাদিয়া দ্বীপে যাইনি। সেখানে আমার রিসোর্ট থাকবে কীভাবে?”

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ জন দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে জমা দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “গত মাসে অভিযান চালিয়ে পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫টি অবৈধ রিসোর্ট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় পুলিশ ও নৌবাহিনীসহ শতাধিক সদস্য এতে অংশ নেন।”

‘বাংলাদেশের অন্যতম অক্ষত দ্বীপ’

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দারের মতে, সোনাদিয়া দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি।

তিনি বলেন, “সোনাদিয়া সত্যিকার অর্থে একটি ক্রিটিক্যাল ইকোলজিক্যাল এলাকা। এখানে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী প্রজনন করে, বসবাস করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অন্য অনেক উপকূলীয় এলাকার তুলনায় এখানকার জীববৈচিত্র্য এখনো অনেকটাই অক্ষত।”

তার মতে, দ্বীপটিতে একদিকে বিস্তীর্ণ বালুকাময় সৈকত, অন্যদিকে কর্দমাক্ত উপকূল ও প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের বিরল সমন্বয় রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না।

“এখানে বালিয়াড়ি আছে, কেয়াবন আছে, সাগরলতা আছে। উপকূলের যেসব উদ্ভিদ অনেক জায়গা থেকে হারিয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকটাই এখনো সোনাদিয়ায় টিকে আছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, অপরিকল্পিত পর্যটন চালু করা হলে দ্বীপের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও নাজুক বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাবে।

“পর্যটন হতে পারে, তবে সেটি অবশ্যই সীমিত পরিসরে এবং পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে। এখন যেভাবে ম্যানগ্রোভ বন কেটে বা পুড়িয়ে চিংড়ি প্রকল্প করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তার মতে, সোনাদিয়া নিয়ে যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার আগে দ্বীপটির পরিবেশগত ধারণক্ষমতা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে সেই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা। বরাদ্দ বাতিলের পরও বেজার কাছ থেকে পুরো জমি বুঝে না পাওয়ায় বন বিভাগ কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আর সেই সুযোগেই প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে সোনাদিয়ার বন, বালিয়াড়ি ও জীববৈচিত্র্য।

মাতারবাড়ী এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু উত্তোলন: ‘শত কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ’, হাইকোর্টে রিট

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক (পোর্ট এক্সেস রোড) নির্মাণ প্রকল্পে বালু উত্তোলন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হয়েছে।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন এ রিট আবেদন করেন। আবেদনে মহেশখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং বালুর মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

রিট আবেদন গ্রহণ করে হাইকোর্ট আগামী ২১ জুন শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।

রিটের নথিতে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর ভিত্তিমূল্য বা রয়্যালটি ৬ টাকা ৯৪ পয়সা। তবে ড্রেজিং ব্যয় বাবদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা সমন্বয়ের পর কার্যত প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৩৭ পয়সা।

রিটকারীর দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে প্রকল্পের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তোকিউ-এমআইএল-জেভি’ বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

রিটে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ মোট আটজনকে বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব সুবিধা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রিট আবেদনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেন। তবে অনুমোদনের আগে কোনো বিকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়নি এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সম্পন্ন হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া মহেশখালী উপকূল থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র এবং এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও ন্যায্য রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সংবিধান ও আইনের দাবি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।”

তিনি বলেন, রিটে বালু উত্তোলনের অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

সোহানা শারমিনের ভাষ্য, “ড্রেজিং ব্যয় সমন্বয়ের নামে রাষ্ট্রকে প্রতি ঘনফুটে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা রয়্যালটি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকল্পে ব্যবহৃত বালুর জন্য সরকারের কাছ থেকেই তুলনামূলক অনেক বেশি মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এসব কারণেই আদালতের কাছে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।”

তবে রিটে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

উখিয়াঃ অভাব-অনটনের জেরে স্বামীর ‘ছুরিকাঘাতে’ স্ত্রী ‘খুন’

বে ইনসাইট ডেস্ক

অভাব-অনটন আর দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তিন সন্তানের জননীর প্রাণ। কক্সবাজারের উখিয়ায় স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটির পর রক্তাক্ত মরদেহ কাঁধে করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে অভিযুক্ত স্বামীকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পাগলিরবিল এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনার তথ্য জানিয়েছেন উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান।

নিহত পারভীন আক্তার (২৮) হলদিয়াপালং ইউনিয়নের পাতাবাড়ি এলাকার আবদুল গফুরের মেয়ে। অভিযুক্ত স্বামী আবদুল আলম (৩২) পাগলিরবিল এলাকার শামসুল আলমের ছেলে। তিনি পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন।

নিহতের ছোট বোন ইয়াসমিন আক্তার দাবী করেন, গভীর রাতে বাড়ি ফিরে আবদুল আলম ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে ঘুম থেকে উঠে খাবার খাওয়ার সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি পারভীনকে মারধর করেন। পরে পারভীন রাগ করে বাবার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলে পেছন থেকে তার ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করা হয়।

গুরুতর আহত অবস্থায় পারভীনকে কাঁধে করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ অভিযুক্তকে থানায় নিয়ে যায়।

উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান জানান, উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। অভিযুক্ত স্বামী এবং তার মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

নিহতের ভাই সৌদি প্রবাসী কামাল উদ্দিন জানান, দম্পতির সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরিবারে অভাব-অনটন ও পারিবারিক অশান্তি বিরাজ করছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বোরহান উদ্দিন বলেন, পারিবারিক আর্থিক সংকটকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে।

এদিকে উখিয়া থানার ওসি জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের অভাব, অশান্তি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত রূপ নিল ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডিতে। আর সেই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে রইল দম্পতির তিন সন্তান, যারা এক মুহূর্তেই হারাল তাদের মাকে।

মেরিন ফিশারিজ রিসার্চ সেন্টারে কালভার্ট নির্মাণঃ সাত ফুট উঁচু ঢাল থেকে মাটি ধসে দুই শ্রমিক নিহত

বে ইনসাইট ডেস্ক

কক্সবাজারের দরিয়ানগর এলাকায় কালভার্ট নির্মাণকাজের সময় মাটিচাপা পড়ে দুই শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও একজন শ্রমিক আহত হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চ সেন্টার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, খবর পেয়ে উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে যান।

সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, একটি নালার ওপর কালভার্ট নির্মাণের জন্য ভিত্তির কাজ চলছিল। এ সময় প্রায় সাত ফুট উঁচু পাশের ঢাল থেকে মাটি ধসে নিচে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর পড়ে। পরে স্থানীয় লোকজন ও সহকর্মীরা তাদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে থাকা শ্রমিক আব্দুল খালেক জানান, নিহত মোহাম্মদ ইলিয়াস তার চাচাতো ভাই এবং মো. রাকিব তার ভাগিনা। আহত মো. শাহজাহানও তাদের স্বজন।

তিনি বলেন, কালভার্ট নির্মাণের জন্য বেইজ বা ভিত্তির কাজ করার সময় হঠাৎ ওপর থেকে মাটি ধসে পড়ে তিনজন চাপা পড়েন। পরে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ও আহত তিন শ্রমিকই চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নের বাসিন্দা।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, ঘটনাস্থলটি পাহাড়ি এলাকার মতো হলেও সেখানে কোনো বড় পাহাড় নেই। ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজনের চলাচলের সুবিধার জন্য নালার ওপর কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছিল।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মো ইলিয়াস জানান, শ্রমিকদের কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়ায় কাজ করানো হচ্ছিলো। নাহয় এতো কম উঁচু ঢালের মাটি পড়ে মারা যাওয়ার কথা না।

এবারের জ্যৈষ্ঠ বদলে দিয়েছে অতীতের সব হিসাব-নিকাশ

আফজারা রিয়া

জ্যৈষ্ঠ মানেই গরম। কিন্তু এবারের জ্যৈষ্ঠ যেন অতীতের সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। সকাল গড়ানোর আগেই রোদের তেজ, আর দুপুরের আগেই ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। ফ্যানের বাতাসও যেন গরম, রাস্তাঘাট উত্তপ্ত, আর বাইরে বের হওয়া এক ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রঘেঁষা শহর কক্সবাজারেও মিলছে না সেই চিরচেনা স্বস্তি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো কক্সবাজারেও বাড়ছে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা। যদিও জেলায় এখনো হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ঘটনা রেকর্ড হয়নি, তবুও গরমজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন চিকিৎসক ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।

গরমজনিত অসুস্থতা বাড়ছে

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রিপন চৌধুরী জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। তবে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা ও অতিরিক্ত গরমজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, শ্রমিক, কৃষক, জেলে, রিকশাচালকসহ যারা দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।”

তার মতে, হিট স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, বিভ্রান্তি এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

গরম থেকে সুরক্ষায় তিনি দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, পর্যাপ্ত পানি ও খাবার স্যালাইন পান করা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করলে নিয়মিত বিরতিতে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন।

সবচেয়ে বেশি কষ্টে খেটে খাওয়া মানুষ

গরমের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষরা।

কক্সবাজার শহরের রিকশাচালক আবদুল কাদের বলেন, “দুপুরের দিকে রাস্তায় থাকা খুব কষ্ট হয়ে যায়। মাথা গরম হয়ে যায়, শরীর দুর্বল লাগে। মাঝেমধ্যে ছায়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতে হয়।”

শহরের বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, “আগে ফ্যান চালালেই আরাম পাওয়া যেত। এখন ঘরের ভেতরেও গরম লাগে। বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তায় থাকি।”

সমুদ্রসৈকতে কর্মরত এক ফটোগ্রাফার জানান, দীর্ঘ সময় রোদে থাকতে হওয়ায় প্রচুর পানি পান করতে হয়। তা না হলে মাথাব্যথা ও ক্লান্তি শুরু হয়।

কক্সবাজারে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কতটা?

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, বৃহস্পতিবার (৪ জুন) জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

তিনি বলেন, “সাধারণত তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে তাপপ্রবাহ চলছে বলে ধরা হয়। তখন হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেশি থাকে। বর্তমানে কক্সবাজারে তাপপ্রবাহ নেই। তবে তাপপ্রবাহ না থাকলেও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

তার মতে, কক্সবাজারে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি গরম অনুভূত হয়। ফলে দীর্ঘ সময় খোলা রোদে কাজ করা ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কেন এত গরম?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মৌসুমি গরমের ফল নয়; এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত ৩০ বছরের গড় তাপমাত্রা বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে কক্সবাজার অঞ্চলে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩১ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।”

তার মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং গরমের স্থায়িত্বও দীর্ঘ হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এল নিনো পরিস্থিতি।

এল নিনো কী, কক্সবাজারে এর প্রভাব কী হতে পারে?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা World Meteorological Organization (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, আগামী মাসগুলোতে এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনো সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে আব্দুল হান্নান বলেন, “মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে এল নিনো বলা হয়। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরণে পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি খরা, তাপপ্রবাহ এবং অস্বাভাবিক গরমের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “এল নিনো সরাসরি কক্সবাজারের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে না। তবে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর এর প্রভাব পড়ে। কক্সবাজার যেহেতু উপকূলীয় অঞ্চল, তাই তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার ধরণে এর পরোক্ষ প্রভাব দেখা যেতে পারে।”

তার মতে, সমুদ্রের কারণে কক্সবাজারের তাপমাত্রা তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত থাকলেও এল নিনো শক্তিশালী হলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম অনুভূত হতে পারে।

স্থানীয় পরিবেশও বাড়াচ্ছে তাপমাত্রা

জলবায়ু কর্মী জিমরাম মোহাম্মদ সায়েক মনে করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশগত পরিবর্তনও তাপমাত্রা বৃদ্ধির বড় কারণ।

তিনি বলেন, “দ্রুত নগরায়ণের ফলে গাছপালা ও খোলা জায়গা কমছে, পুকুর-জলাশয় ভরাট হচ্ছে। অন্যদিকে কংক্রিটের দালানকোঠা দিনভর তাপ শোষণ করে পরিবেশকে আরও গরম করে তুলছে।”

তার ভাষায়, “অতিরিক্ত এসি ব্যবহারের ফলে বাইরে তাপ নির্গত হচ্ছে। একসময় যেসব এলাকায় সবুজ আর জলাশয় ছিল, সেখানে এখন কংক্রিটের আধিপত্য। এ কারণেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে।”

সতর্কবার্তা ভবিষ্যতের জন্য

এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে হিট স্ট্রোকের বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সম্ভাব্য এল নিনো পরিস্থিতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। অন্যথায় উপকূলীয় এই শহরেও তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি আগামী দিনে আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবাদী হয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আসছে কক্সবাজারে

বে ইনসাইট ডেস্ক

দীর্ঘদিন পর কক্সবাজারে আবারও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে কক্সবাজার ফিল্ম সোসাইটি। ‘কক্সবাজার টকিজ’ শিরোনামের ধারাবাহিক আয়োজনের প্রথম পর্বে আগামী ৫ ও ৬ জুন শহরের শহীদ সুভাষ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে প্রদর্শিত হবে ছয়টি আলোচিত চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি। আয়োজকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র উৎসব নয়; বরং সিনেমা ও শিল্পচর্চার ওপর সাম্প্রতিক আক্রমণ এবং সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী অবস্থান।

বুধবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার ফিল্ম সোসাইটির নেতারা জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে সিনেমা ও শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্র বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। সেই প্রেক্ষাপটে ‘কক্সবাজার টকিজ’ আয়োজনের মাধ্যমে তারা শিল্প ও চলচ্চিত্রচর্চার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।

কক্সবাজার ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত বলেন, “আর্ট সবার জন্য। সিনেমা আজকের বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ভাষা। মানুষের হাতে থাকা মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসগুলোই প্রমাণ করে, এভরিহোয়্যার ইজ ফিল্ম। তাই নতুন প্রজন্মকে চলচ্চিত্র থেকে দূরে রাখার কোনো সুযোগ নেই।”

তিনি বলেন, কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম বিনোদননগরী হিসেবে পরিচিত। অথচ এখানে এখন কোনো সিনেমা হল নেই। সমুদ্রসৈকত কেন্দ্রিক পর্যটনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিনোদনের ক্ষেত্রও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই মানুষকে আবার সিনেমার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার ফিল্ম সোসাইটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জাহিন ফারুক আমিন বলেন, “কক্সবাজারের মতো প্রাণবন্ত শহরে দীর্ঘদিন ধরে কোনো সিনেমা হল নেই। একসময় থাকা তিনটি সিনেমা হলও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এখানকার মানুষের জন্য চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। সেই শূন্যতা থেকেই এই উদ্যোগ।”

দুই দিনব্যাপী আয়োজনে ৫ জুন বিকেল ৩টায় উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হবে মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’। এরপর প্রদর্শিত হবে শাহীন দিল-রিয়াজ নির্মিত ডকুফিকশন ‘দ্য প্রজেকশনিস্ট’। সন্ধ্যা ৭টায় থাকবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’।

৬ জুন বিকেল ৩টায় দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে দেখানো হবে ধ্রুব হাসান পরিচালিত ‘ফাতিমা’। ইরানের ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ক্রিস্টাল সিমোর্গ পুরস্কারপ্রাপ্ত এ চলচ্চিত্র মুক্তিযুদ্ধকে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার একটি প্রয়াস। এরপর প্রদর্শিত হবে ফজলে রাব্বি নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘তাদাত্ম অন্বেষ্ণণঃ দ্যা ইন্টার্নাল জার্নি’।

দুই দিনের আয়োজনের সমাপনী প্রদর্শনী হিসেবে ৬ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দেখানো হবে তানিম নূর পরিচালিত বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে বলে জানান আয়োজকরা।

চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নিতে প্রতিদিনের জন্য ১০০ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। অনলাইন ও ভেন্যু—দুই মাধ্যমেই নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা জানান, কক্সবাজার ফিল্ম সোসাইটির লক্ষ্য কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শন নয়; বরং চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রশিক্ষণ, চলচ্চিত্রবিষয়ক বিভিন্ন কলাকৌশল চর্চা এবং ভবিষ্যতে কক্সবাজারে আবারও সিনেমা হল ফিরিয়ে আনার দাবিকে শক্তিশালী করা।

তারা বলেন, “আমরা মানুষকে আবার সিনেমায় ফেরাতে চাই। কক্সবাজারে চলচ্চিত্রচর্চার নতুন যাত্রা শুরু হোক- এই প্রত্যাশাই আমাদের।”