‘মৃত্যু বুকে নিয়েই ঘুমায়’ সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা!

বে ইনসাইট রিপোর্ট

মধ্যরাতে যখন বিশ্বের বহু মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় চোখ রেখেছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নেমে আসে অন্য এক বাস্তবতা। টানা ভারী বৃষ্টিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আটজন রোহিঙ্গা। একই রাতে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়।

কিন্তু মৃত্যুর এই হিসাবের বাইরেও বড় হয়ে উঠছে আরেকটি প্রশ্ন- আজ রাতেও কি লাখো মানুষ পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বুকে নিয়েই ঘুমাতে যাবে?

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৪ জন রোহিঙ্গা অর্থাৎ ৮৪ হাজার ৩৮১টি পরিবার এখনও এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেগুলো বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

“শান্তি যেন কোথাও নেই”

“বেশি বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মানুষগুলো ভয়ে থাকে কখন পাহাড় ভেঙে পড়ে। আর আমাদের এখানে ভয় কখন পানি উঠে আসে। শান্তি যেন কোথাও নেই।”

উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদের কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্বের ভার।

ক্যাম্প-৫ তুলনামূলক সমতল এলাকায় হলেও টানা বৃষ্টিতে সেখানেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকেছে, চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে তুলনামূলক উঁচু জায়গায়।

বে ইনসাইটের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্যাম্প-৫-এর আরও তিন মাঝি—মনা মিয়া, শবির আহামদ ও দই মাঝি। তাঁদের ভাষ্য, শুধু এই ক্যাম্পেই অন্তত ২০০টি আশ্রয়ঘর প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ ব্লকের এ-৩ সাব-ব্লকে।

প্রধান মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, “ক্যাম্প ইনচার্জের পক্ষ থেকে কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘরটাই তো আমাদের শেষ আশ্রয়। দুর্যোগ এলে সেটাও ছেড়ে যেতে হয়। আমাদের দুর্গতির যেন শেষ নেই।”

ক্যাম্প-৫-এর বাসিন্দা মনা মিয়া বলেন, “সারারাত বৃষ্টি হলেই ঘুম আসে না। কখন খবর আসে পাহাড় ধসে পড়ার, আবার কখন ঘরে পানি ঢুকে যায়, এই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। বাচ্চাদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে।”

একই ক্যাম্পের সাব মাঝি শবির আহামদ বলেন, “এবারের বৃষ্টিতে অনেক ঘরে পানি ঢুকেছে। মানুষ কাপড়, খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু করে রাখছে। কেউ কেউ আত্মীয়ের ঘরে গিয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করছে।”

আরেক সাব মাঝি দই মাঝি বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই ভয় নিয়ে থাকতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু যাওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা সবার জন্য নেই।”

তিন ঘণ্টায় তিন পাহাড়ধস

রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার তিনটি আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যু হয়।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং শিশুও।

‘বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই’

পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরে সোমবার সারদিনই বৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই দুপুরের দিকে নিজের আশ্রয়ঘরের দিকে কাঁধে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে ফিরছিলেন নুরুল ইসলাম।

মধ্যবয়সী এই রোহিঙ্গা বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) কার্যালয় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়। তবে অনেকেই সেই নির্দেশ মানতে চান না।

“যেখানে যেতে বলে, সেখানেও তেমন সুবিধা নেই। তাই অনেকেই যেতে চায় না,” বলেন তিনি।

সোমবার রাত কোথায় কাটাবেন এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুক্ষণ নীরব থেকে নুরুল ইসলাম বলেন, “দেখি, কোনো আত্মীয়ের ঘরে যেতে পারি কি না।”

ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি কী ধরনের সহায়তা চান- এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার ক্লান্তি।

তিনি বলেন, “বার্মায় নিজের ঘরটাতেই ফিরতে চাই, ভাই।”

‘দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ এখনও ঝুঁকিতে’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে তিনটি পৃথক স্থানে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ক্যাম্প-৭-এ এক শিশু, ক্যাম্প-১১-তে চারজন এবং ক্যাম্প-১৫-এ তিনজন প্রাণ হারান।

তিনি জানান, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর মধ্যে ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

“কমপক্ষে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ বর্তমানে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে”

মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। তবে গত দুই বছরে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর ভাষায়, অনেকেই বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিজেদের মতো করে আশ্রয় নির্মাণ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেও বসতি গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ক্যাম্প-১১-তে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেটিও এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নির্মিত আশ্রয়কে কেন্দ্র করে।

আরআরআরসি বলছেন, সবচেয়ে বড় সংকট হলো পর্যাপ্ত নিরাপদ জায়গার অভাব।

তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ জমির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার এখনও পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।

৭৬টি দুর্যোগ, পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

ইউএনএইচসিআরের কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েট মোশারফ হোসেন জানান, ৪ থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে মানবিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শিবিরে ৭৬টি আবহাওয়াজনিত ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ২১টি ছিল পাহাড়ধস।

এসব ঘটনায় ৫ হাজার ২৪৯ জন রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন, আহত হয়েছেন ছয়জন এবং ৩৮৬ জনকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর মানবিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জরুরি সহায়তা, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বর্ষার আগেই প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু…

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা শুরুর আগেই বিভিন্ন সংস্থা পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, রিটেইনিং ওয়াল ও গাইড ওয়াল নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ, সরিয়ে নেওয়ার মহড়া এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরাই দুর্ঘটনার সময় প্রথম ঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রতিবেশীদের সতর্ক করা, মানুষ সরিয়ে নেওয়া, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে সংস্থাটি বলছে, এসব উদ্যোগ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হলেও তা পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

অর্থসংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রস্তুতি

ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখনও বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী বসতিগুলোর একটি। অনেক পরিবার খাড়া পাহাড়ের ঢালে বাস করছে এবং তাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের মতো পর্যাপ্ত জমিও নেই।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থসংকট।

সংস্থাটি জানিয়েছে, অর্থায়নের ঘাটতির কারণে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়ঘর শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের পরিসর কমিয়ে আনতে হয়েছে।

২০২৬ সালের যৌথ মানবিক সাড়া পরিকল্পনার আওতায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা এবং তিন লাখের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের একাধিক কর্মসূচি ইতোমধ্যে সীমিত করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।

রেকর্ড বৃষ্টি, সামনে আরও শঙ্কা

কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত ৩৩ ঘণ্টায় ৩৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে উখিয়ায়। তবে সেখানে কত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

আবহাওয়া অফিস বলছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের প্রভাবে আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

অর্থাৎ, পাহাড়ধসের আশঙ্কা এখনও কাটেনি।

আরেকটি দীর্ঘ রাত

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে এখন ভয় দুই রকম।

পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের আতঙ্ক ‘কখন মাটি ধসে ঘরের ওপর নেমে আসে’।

আর নিচু এলাকার মানুষের ভয় ‘কখন বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়’।

এক রাতে নয়জনের মৃত্যু হয়তো একটি সংখ্যা।

কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে এখনও ৩ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করছেন, যেগুলোকে মানবিক সংস্থাগুলো নিজেরাই বন্যা ও পাহাড়ধসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে।

তাই কক্সবাজারে বর্ষার প্রতিটি রাত এখন শুধু একটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়,হাজারো পরিবারের কাছে সেটি ঘুম আর অনিশ্চয়তার মধ্যকার এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।

কক্সবাজারে পাহাড়ধসের বিভীষিকা, একরাতেই প্রাণ গেল ৯ জনের

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রবল বর্ষণে একের পর এক পাহাড়ধসে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও কক্সবাজার শহরে পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত নয়জন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী (ক্যাম্প-১৫) রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের চারটি স্থানে এবং কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনও কাটেনি। অনেক রোহিঙ্গা পরিবার পাহাড়ের ঢালে বসবাস করায় নতুন করে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে রাত দেড়টার দিকে উখিয়ার জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে কামাল হোসেনের ঘরের ওপর। ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে মারা যান কামাল হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমাইরা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। একই পরিবারের আরও দুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর কিছুক্ষণ পর, রাত দুইটার দিকে কুতুপালংয়ের ৭ নম্বর আশ্রয়শিবিরের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে মারা যায় সাত বছর বয়সী একরাম। সে রশিদ উল্লাহর ছেলে।

রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরের সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই ভাই—রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ভোর পর্যন্ত অভিযান চালায়। ভারী বৃষ্টি ও কাদার কারণে উদ্ধারকাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে ভোর সাড়ে চারটার দিকে কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়। আলী আকবর (৫০) নামে ওই ব্যক্তির বাড়ির ওপর পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।

সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান,  আলী আকবর ও পরিবারের আরও দুজন মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরিবারের অন্য দুই সদস্য চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাম্পে মাইকিং করে সতর্কবার্তাও প্রচার করা হচ্ছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা কিংবা খাড়া ঢালে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টানা বর্ষণে মাটি নরম হয়ে গেলে মুহূর্তেই ধসে পড়ে পাহাড়ের অংশ, আর ঘুমন্ত মানুষের জন্য তা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী ফাঁদ।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প : মৃত্যু ভয়ে বর্ষা এলো বলে

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

উখিয়ার ক্যাম্প-২০-এর পাহাড়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করলেই সেনোয়ারা বেগমের রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়।

কারণ সেনোয়ারার কাছে বর্ষার আগমন আর কেবল ঋতু পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি যেনো অনিশ্চয়তার ফিরে আসা।

বাঁশ, দড়ি ও ত্রিপলে তৈরি তাঁর ছোট্ট আশ্রয়টি একটি খাড়া পাহাড়ের ঢালের নিচে। দিনের বেলায় পাহাড়টিকে যতটা নিরীহ মনে হয়, টানা বৃষ্টির রাতে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। গত কয়েক বছরে এমন বহু পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তাই আকাশে কালো মেঘ জমলেই সেনোয়ারার মনে ফিরে আসে একটাই প্রশ্ন, এবারও কি পাহাড়টি টিকে থাকবে?

“কাছাকাছি নিরাপদ কোনো জায়গা নেই,” বলেন তিনি।

“সহায়তা সংস্থাগুলো যখন অন্যত্র যেতে বলে, তখন যে জায়গার কথা বলে, সেটা আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন আর পরিচিত পরিবেশ থেকে অনেক দূরে। আমরা সেখানে যেতে চাই না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালগুলো যদি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেত।”

সেনোয়ারার এই আশঙ্কা বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়। উখিয়া ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরে হাজারো পরিবার প্রতিদিন এমন বাস্তবতার মধ্যেই বসবাস করছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতিতে জায়গার তীব্র সংকটের কারণে বহু পরিবারকে আশ্রয় নিতে হয়েছে খাড়া পাহাড়ের ঢালে কিংবা তার ঠিক নিচে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বনভূমি কেটে গড়ে তোলা হয়েছে এসব বসতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠনও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর বর্ষা এলেই সেই ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

প্রতিটি ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের মাটি আরও আলগা হয়। কোথাও ছোট ছোট ফাটল দেখা দেয়, কোথাও ধসে পড়ে মাটির অংশ। অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি পুরো ঢাল ভেঙে চাপা পড়ে যেতে পারে একাধিক ঘর।

প্রতি বর্ষাতেই ফিরে আসে পুরোনো শঙ্কা

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

শুধু ২০২৪ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন, যা ওই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। আর চলতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।

বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের জনযোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, “২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শিবিরগুলোতে ভূমিধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৮০ জন।”

তিনি বলেন, “অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল এখনো যথাযথভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্ষাকালে শরণার্থী পরিবারগুলোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস সাধারণত কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করলে ঘটে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে সেই প্রায় সবগুলো কারণই বিদ্যমান- খাড়া ঢাল, বন উজাড়, দুর্বল মাটি, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অত্যধিক জনঘনত্ব।

তহবিল সংকট বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমান ঝুঁকি শুধু প্রাকৃতিক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মানবিক তহবিল সংকট।

সংস্থাটির ভাষায়, অর্থের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-হ্রাস কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, বাঁশের টেরেস নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়কেন্দ্র শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়মিত সংস্কার।

সীমিত অর্থায়নের কারণে মানবিক সংস্থাগুলোকে খাদ্য সহায়তা, পুষ্টি ও সুরক্ষার মতো জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ-প্রতিরোধমূলক অনেক উদ্যোগে কাটছাঁট করা হয়েছে।

এতে এমন বহু পাহাড়ি ঢাল রয়েছে, যেগুলো আগে নিয়মিত মেরামত ও পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল, কিন্তু এখন আর সেই কাজ আগের মতো সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানান্তরও সহজ সমাধান নয়

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটি সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।

শারি নিজমান বলেন, “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে স্থানান্তর করা দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।”

তিনি বলেন, “শিবিরগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। খালি জমি প্রায় নেই বললেই চলে। আবার অনেক পরিবার স্থানান্তরে অনীহা প্রকাশ করে, কারণ এতে তারা জীবিকার সুযোগ, বাজারে যাতায়াত এবং ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পর গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কা করে।”

ফলে অনেক পরিবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়েও একই জায়গায় থেকে যেতে বাধ্য হয়।

বৃষ্টির রাত মানেই নির্ঘুম অপেক্ষা

ক্যাম্প-৪-এর বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই তাঁদের পরিবারের মধ্যে উৎকণ্ঠা নেমে আসে।

“বৃষ্টি হলে আমি ঘুমাতে পারি না। সারারাত ভাবি, কখন পাহাড় ভেঙে পড়বে,” বলেন তিনি।

“আমি সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ের ঢালে থাকি। সব সময় ভয় নিয়ে থাকতে হয়।”

শিবিরের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকি কমানোর ছোট ছোট উদ্যোগও চোখে পড়ে। কোথাও পানি যাতে মাটি ধুয়ে না নেয়, সে জন্য ড্রেনের ওপর প্লাস্টিকের শিট বিছানো হয়েছে। কোথাও আশ্রয়ের পাশে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে। আবার কোথাও বাঁশের খুঁটি দিয়ে পাহাড়ের ঢালকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে এসবই মূলত সাময়িক ব্যবস্থা। টানা ভারী বর্ষণের সামনে এগুলোর কার্যকারিতা সীমিত।

প্রস্তুতির কথা বলছে প্রশাসন

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে প্রতিটি শিবিরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে জেলায় প্রায় ২৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সহকারী আবহাওয়াবিদ এ. বি. হান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। এতে পাহাড়ি ঢাল আরও নরম হয়ে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও তারা বিভিন্ন প্রকৌশলভিত্তিক ও প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার এবং মাটির ক্ষয় রোধে ভেটিভার ঘাস রোপণ।

তবে সংস্থাটির সতর্কবার্তা স্পষ্ট, জরুরি প্রস্তুতির পাশাপাশি পাহাড় স্থিতিশীল করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে ধারাবাহিক বিনিয়োগ না হলে প্রতি বর্ষাতেই একই সংকট ফিরে আসবে।

বর্ষা কেবল একটি ঋতু নয়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের হাজারো পরিবারের কাছে এটি এক দীর্ঘ পরীক্ষার সময়। তারা বৃষ্টি নামলে অনেকেই আকাশের দিকে তাকান না, তাকান পাহাড়ের দিকে।

কারণ তাঁদের কাছে প্রতিটি ভারী বর্ষণ মানে শুধু বৃষ্টির শব্দ নয়, তার সঙ্গে মিশে থাকে মাটি সরে যাওয়ার আশঙ্কা, রাতভর নির্ঘুম অপেক্ষা, আর ভোর পর্যন্ত বেঁচে থাকার প্রার্থনা।

রোহিঙ্গা ত্রাণ প্রকল্পঃ তহবিল অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ ইউএনএইচসিআরের বিরুদ্ধে

বে ইনসাইট রিপোর্ট

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর একাধিক মানবিক সহায়তা প্রকল্পে পরিকল্পনার দুর্বলতা, তহবিলের অপচয়, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের অভিযোগ উঠেছে।

জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর -ওআইওএস পরিচালিত এক অডিটে এসব অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ওই অডিট প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এইজ’ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি বলছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটের জন্য অনুদান ধারাবাহিকভাবে কমে আসার সময়েও বিভিন্ন প্রকল্পে এমন ব্যয় হয়েছে, যার অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও একই ধরনের কাজ একাধিকবার করা হয়েছে, কোথাও নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহারই হয়নি, আবার কোথাও বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে। ফলে সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

লক্ষ্যচ্যুত প্রকল্প, অপচয় হয়েছে অর্থ

অডিটে বলা হয়েছে, ইউএনএইচসিআরের বেশ কয়েকটি প্রকল্প সংস্থাটির ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একই ধরনের কার্যক্রম বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনার অভাবে একই উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যয় হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পদের অপচয়ে পরিণত হয়েছে।

অডিটকারীরা মন্তব্য করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন নির্ধারণ, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি।

অডিটে ত্রাণসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার ঘাটতি ও অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত প্রয়োজন মূল্যায়ন না করেই এমন কিছু সামগ্রী কেনা হয়েছে, যেগুলোর ব্যবহার শিবিরে প্রায় নেই বললেই চলে। উদাহরণ হিসেবে খাওয়ার জন্য চামচ, কাটাচামচ ও ছুরি কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গারা ঐতিহ্যগতভাবে হাত দিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন। তা সত্ত্বেও এসব সামগ্রী কিনতে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মার্কিন ডলার।

অডিটে আরও বলা হয়, এসব সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বারবার আপত্তি ও অভিযোগ ওঠার পরও ক্রয় পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এর ফলে ৬২ হাজারের বেশি কুকিং সেট গুদামেই পড়ে থাকে, যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার

কোটি টাকার হাসপাতাল নির্মাণ, কিন্তু ব্যবহার হয়নি

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত।

অডিটে দেখা যায়, উখিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবহারই করা হয়নি। একইভাবে ভাসানচরে নির্মিত ২০ শয্যার একটি ইনডোর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত ছিল।

শুধু ভবনই নয়, হাসপাতালটিতে স্থাপন করা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ৭৪ হাজার ৩০১ ডলারের এক্স-রে মেশিনও কার্যত অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল।

অডিটে বলা হয়, অবকাঠামো নির্মাণের আগে বাস্তব প্রয়োজন এবং পরিচালনা পরিকল্পনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি

রোহিঙ্গা শিবিরে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির অভাবও অডিটে উঠে এসেছে।

অডিটকারীরা বলেন, ২০২৪ সালে শিবিরে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং হেপাটাইটিস-সি রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেও ইউএনএইচসিআরের কোনো সমন্বিত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ছিল না।

মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিও ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে তীব্র পানিবাহিত ডায়রিয়া, কলেরা, খোসপাঁচড়া এবং উকুনের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সময়মতো ও কার্যকর মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ার তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেই খাতেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

মেয়াদোত্তীর্ণ সূঁচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই আবার বড় চুক্তি

অডিটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি ছিল চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে।

একটি প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ মেডিকেল সূঁচের গায়ে নতুন মেয়াদ লিখে সরবরাহ করেছিল। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকেই পরবর্তীতে প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের নতুন চুক্তি দেওয়া হয়।

এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যের সরবরাহকারী নির্বাচন করায় প্রায় ৯৭ হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৬০ লাখ ডলারের ওষুধ কর্মসূচিতে ওষুধের ঘাটতি, আবার কোথাও অতিরিক্ত মজুদ, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের ঘটনাও পাওয়া গেছে।

এদিকে প্রায় ৩৬ লাখ ডলারের পুষ্টি কর্মসূচি এবং ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের রোগী রেফারেল কর্মসূচিতেও উপকারভোগী নির্বাচন, নির্দেশিকা এবং হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা ধরা পড়ে।

হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারেও কোটি কোটি টাকার অপচয়

অডিটে কক্সবাজারের শিবির এলাকায় বন্য হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত টাওয়ার প্রকল্পকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রায় ২২ লাখ ডলার ব্যয়ে ৯৯টি হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী মূল্যায়নে এগুলোকে কার্যকর নয় বলে উল্লেখ করা হয়।

এর মধ্যে ৮৩টি টাওয়ারের ছাদ ঘূর্ণিঝড়-উপযোগী না হওয়ায় খুলে ফেলতে হয়, যাতে প্রায় ৫৬ হাজার ডলারের নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হয়। পরে টাওয়ারগুলোকে আরও টেকসই করতে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৬৭ হাজার ডলার ব্যয় করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালের আরেকটি মূল্যায়নে টাওয়ারের সংখ্যা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও অডিট পর্যন্ত মাত্র ১২টি টাওয়ার অপসারণ করা হয়েছিল।

একই ঠিকাদারের ওপর অতিনির্ভরতা, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কাজ

ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচনেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নির্মাণকাজ মূলত একজন ঠিকাদারকেই দেওয়া হয়। তার দর বাজারদরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি ছিল। এতে সম্ভাব্য ৬৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

শুধু তাই নয়, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের দর ৩৩ থেকে ৪৩ শতাংশ কম হলেও তাদের পরিবর্তে একই ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করা হয়।

এছাড়া ৩ কোটি ডলারের এলপিজি রিফিল, চুলা, প্রেসার কুকার, ইগনাইটার ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কাজও এমন একজন সরবরাহকারীকে দেওয়া হয়, যিনি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন না। পরে ওই প্রতিষ্ঠান আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

চুক্তি অনুযায়ী এলপিজি ডিপোর ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বহন করার কথা থাকলেও ইউএনএইচসিআর নিজেই ১৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। ওয়ারেন্টির আওতায় স্পার্ক লাইটার পাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত ৬৫ হাজার ডলারের লাইটারও কিনেছে সংস্থাটি।

অডিটকারীরা উল্লেখ করেছেন, ওই ঠিকাদারের দর ছিল বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। একই ধরনের কাজ কম খরচে করতে সক্ষম অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

জ্বালানি ও পরিবেশ প্রকল্পেও অতিরিক্ত ব্যয়

অডিটে জ্বালানি ও পরিবেশ খাতের প্রকল্পগুলোকেও ব্যয়বহুল ও অদক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৩৯ লাখ ডলারের জ্বালানি ও পরিবেশ কর্মসূচিতে বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ করানো হয়েছে।

২০২১ সালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিকাদারের দর বাজারদর ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ বেশি ছিল।

এরপর ২০২৩ সালে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই একই কাজের দর ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যাতে অতিরিক্ত ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলার ব্যয় হয়।

পরে বাজার যাচাই ছাড়াই চুক্তির মূল্য আরও ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়, ফলে অতিরিক্ত ২২ লাখ ডলার ব্যয় হয়।

এছাড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোয় স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছে অডিট।

রোহিঙ্গা শিবিরে এলপিজি সরবরাহেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।

একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রায় ৩ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়, যদিও সেটি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল না।

অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৫৫ লাখ ডলার বেশি মূল্যের এলপিজি রিফিল কেনা হয়। প্রেসার কুকার ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক পরীক্ষামূলক প্রকল্প শেষ হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় সম্ভাব্য প্রায় ২০ লাখ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগও হারানো হয়েছে।

অপ্রয়োজনীয় যানবাহন কেনা, অফিস ও গুদাম

যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অদক্ষতার চিত্র পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ১৬টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন ৫২টি কর্মসূচির গাড়ি প্রয়োজন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ইউএনএইচসিআর দিতে পারেনি।

অডিটে আরও উঠে এসেছে, ইউএনএইচসিআরের ১০৪টি গাড়ির মধ্যে ১০টি দীর্ঘ সময় ব্যবহার হয়নি। তারপরও এসব গাড়ির জন্য ৮০ হাজার ডলারের বেশি ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআরের নতুন অফিস ভবন নির্মাণেও একাধিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে অডিট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয়ে অফিস ভবন নির্মাণ করা হলেও জমির মালিকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

নির্মাণকাজ চলাকালে নকশা পরিবর্তন করে ভবনে তৃতীয় তলা যুক্ত করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর জমির মালিক ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ভাড়াচুক্তি ছিল না।

এরপরও নতুন ভবনটি পাঁচ মাস খালি পড়ে ছিল। সেই সময় পুরোনো অফিসের জন্য প্রতি মাসে ১১ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

এছাড়া আট বছর ধরে একটি অব্যবহৃত মোটেলের জন্য বছরে ১ লাখ ২৬ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে, যদিও অনেক কম খরচে বিকল্প জায়গা পাওয়া সম্ভব ছিল।

গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গুদাম ভাড়া নেওয়ায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাসানচরে একই কাজের জন্য একাধিক ব্যয়

অডিটে বলা হয়েছে, ভাসানচরে সরকার যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে ছিল, সেখানে ইউএনএইচসিআরও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে।

ফলে সরকার আগে থেকেই সৌরায়িত করে রাখা তিনটি স্থাপনায় আবারও একই ধরনের কাজ করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়াই ব্যয়বহুল ভোল্টেজ রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে।

একই এলাকায় একই ধরনের প্রকল্প

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নকারী অংশীদারদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে একই এলাকায় ১২৮টি পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ৫২টি পাম্পিং স্টেশন এবং ২০ হাজারেরও বেশি নলকূপ নির্মাণ করা হয়েছে।

অডিটকারীরা বলেছেন, সমন্বয় জোরদার করা গেলে এসব ব্যয়ের বড় অংশই এড়ানো সম্ভব ছিল।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে জরুরি সহায়তায় জোর

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর আট বছর পরও ইউএনএইচসিআরের ব্যয়ের অধিকাংশই তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল।

অডিট অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ জরুরি মানবিক সহায়তায় ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা এবং টেকসই সমাধানমুখী কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ।

অডিটকারীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে।

ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ‘নিউ এইজ’কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের গণসংযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, সংস্থাটি সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তার ভাষায়, অভ্যন্তরীণ অডিট সংস্থার কার্যক্রম মূল্যায়ন ও উন্নয়নের একটি নিয়মিত অংশ। অডিটে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও ব্যয় দক্ষতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শারি নিজমান বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দিতে ইউএনএইচসিআর কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট

বর্তমানে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক হিসাবে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসে।

তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সেই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিজস্ব অডিটে উঠে আসা এই অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ শুধু একটি সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনাই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির জবাবদিহি, দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করেন স্থানীয় একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

তথ্যসূত্র: ‘নিউ এইজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর (ওআইওএস) -এর অডিট রিপোর্ট।

সীমান্তের মৃত্যুর ‘বিচার’ কে করবে?

ইনসাইট রিপোর্ট

হোসনে আরা বেগম সেদিন দুপুরে রান্না করছিলেন।

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের ছোট্ট বাড়িটিতে তখন অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক জীবন চলছিল। চুলায় হাঁড়ি বসানো ছিল। পরিবারের সদস্যরা যার যার কাজে ব্যস্ত।

হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে একটি বিস্ফোরণ।

মিয়ানমারের ভেতরে চলমান সংঘর্ষ থেকে ছুটে আসা একটি মর্টারশেল এসে আঘাত করে তার রান্নাঘরে। ঘটনাস্থলেই মারা যান হোসনে আরা।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে।

কিন্তু তার ছেলে মো. ইব্রাহিমের কাছে এখনো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি মৃত্যুর নয়, বিচার নিয়ে।

“মা তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু মা হত্যার বিচারটাও কি হবে না?”

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ২৭১ কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য প্রশ্ন।

কেউ মর্টারশেলের আঘাতে নিহত হয়েছেন। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়েছেন। কেউ পাহাড়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন, আর ফিরে আসেননি।

প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন হয়েছে। কিছু পরিবার সামান্য আর্থিক সহায়তাও পেয়েছে।

কিন্তু এরপর?

মামলার অগ্রগতি নেই। দায় নির্ধারণ নেই। ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই কোনো দৃশ্যমান বিচারিক প্রক্রিয়াও।

ফলে সীমান্তবাসীর কাছে মৃত্যু যেন একটি পরিচিত বাস্তবতা। আর বিচার, একটি দূরবর্তী সম্ভাবনা।

রান্নাঘরে মর্টারশেল, মৃত্যু সনদে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’

২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘুমধুম ইউনিয়নের একটি বাড়িতে রান্না করছিলেন হোসনে আরা বেগম।

সেদিন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল। সেই সংঘর্ষের মধ্যেই একটি মর্টারশেল বাংলাদেশের ভেতরে এসে পড়ে।

মর্টারশেলে নিহত হোসনে আরা বেগম

বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন হোসনে আরা এবং এক রোহিঙ্গা শ্রমিক।

হাসপাতালের নথি ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ফোরণজনিত আঘাতের কথা উল্লেখ থাকলেও পরে পরিবার দেখতে পায়, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’।

ছেলে মো. ইব্রাহিমের কাছে বিষয়টি এখনো বোধগম্য নয়।

“মিয়ানমার থেকে বোমা এসে মানুষ মারা গেলে সেটা কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়?”

তার প্রশ্ন শুধু নিজের মায়ের মৃত্যুকে ঘিরে নয়। এটি সীমান্তের বহু পরিবারের অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি।

হোসনে আরার স্বামী বাদশা মিয়া মামলা করেছিলেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

পরিবারের ভাষ্য, একপর্যায়ে তাদের বলা হয়েছিল আসামি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

এরপর আর কোনো খবর তারা পায়নি।

২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই

হুজাইফার বয়স ছিল মাত্র ১২। বাড়ির উঠানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল সে। হঠাৎ সীমান্তের দিক থেকে আসা একটি গুলি তার শরীরে লাগে।

গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে চট্টগ্রাম, পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। ২৭ দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মারা যায় শিশুটি।

গুলি আসার সময় উঠানের যেখানে মেয়ে খেলছিলো, তাই দেখাচ্ছিলো জসীম উদ্দিন। ছবি- শাহীন মোবারক।

বাবা জসীম উদ্দিন এখনো ছেলের ব্যবহৃত কিছু জিনিস সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

তিনি বলেন, “সে তো কোনো যুদ্ধ করতেছিল না। একটা শিশু ছিল। তারপরও গুলি এসে তার জীবন নিয়ে গেল।”

ঘটনার সময় আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরএসওর মধ্যে গোলাগুলি চলছিল বলে স্থানীয়রা জানান।

পরিবার মামলা করেনি।

কারণ তারা জানে না, কার বিরুদ্ধে মামলা করবে।

“বিচার চাইব কার কাছে?”, প্রশ্ন করেন জসীম উদ্দিন।

সন্তানের মুখ দেখতে পারলোনা বাবা

২৪ মে। তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় কলাবাগানে কাজ করতে গিয়েছিলেন কয়েকজন শ্রমিক।

হঠাৎ বিস্ফোরণ। ঘটনাস্থলেই নিহত হন শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা, অক্যমং তংচঙ্গ্যা ও চিক্যং তংচঙ্গ্যা।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়ার ফাত্রাঝিরি এলাকার বাসিন্দা তিনজনই নিজ নিজ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তি।

শৈফুচিং মারা যাও্যার এক সপ্তাহ পর সন্তান জন্ম দেন স্ত্রী মাকিংচিং। ছবি- শাহীন মোবারক

শৈফুচিংয়ের স্ত্রী মাকিংচিংয়ের সন্তান জন্ম হয়েছে মাত্র সাত দিন আগে। সন্তানের মুখ দেখার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে স্বামীকে হারান তিনি।

“কলা বিক্রি করে টাকা আনার কথা ছিল। কিন্তু আর ফিরে আসল না।”

সরকারি সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন মাত্র কয়েক হাজার টাকা।

তারপর আর কিছু নয়। না কোনো মামলা। না কোনো তদন্তের খবর। না কোনো ক্ষতিপূরণ।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য অংসাই মারমা বলেন, “এটা ছিল খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরও দুজন মারা গেললো। তিনটি পরিবার একসঙ্গে নিঃস্ব হয়ে গেছে ভাই।”

‘কথা বলে লাভ কী?’

একই ঘটনায় স্বামী অক্যমং তংচঙ্গ্যাকে হারিয়েছেন দুকমালা তংচঙ্গ্যা। কিন্তু তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান না।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য, রাষ্ট্রের প্রতি তার ক্ষোভ এতটাই গভীর যে তিনি মনে করেন, কথা বলে কোনো লাভ নেই।

রাগে ক্ষোভে কথা বলেনা দুকমালা। ছবি- নুরুল হাসান।

দুকমালা তংচঙ্গ্যা দূর থেকে চিৎকার করে বলেন, “বিচার তো পাইনি। উল্টো এখন আমাদেরই দোষ দেওয়া হয়।”

এই নীরবতা সীমান্তবাসীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।

তারা দেখেছেন, মানুষ মারা যায়, আহত হয়, নিখোঁজ হয়; কিন্তু কোনো ঘটনার কোনো বিচারিক পরিণতি হয় না।

নিখোঁজ মানুষেরও খোঁজ নেই

ওয়ামং চাকমা প্রায় চার মাস ধরে নিখোঁজ।

ওয়ামং চাকমার স্ত্রী উসাসিং চাকমা জানান, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। তারপর আর ফিরে আসেননি।

চার মাসেও ফিরে আসেনি উসাসিং চাকমার নিখোঁজ স্বামী ওয়ামং চাকমা। ছবি- শাহীন মোবারক

বেঁচে আছেন কি না, তাও জানে না পরিবার। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পরিবার কোনো মামলা পর্যন্ত করেনি।

কারণ তাদের ধারণা, এতে কোনো ফল হবে না।

উসাসিং চাকমা বলেন, “পুলিশ ও বিজিবির সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা জানিয়েছে যে ওই এলাকায় যেতে পারবে না। ওয়ামং বর্তমানে বেঁচে আছেন কি না, তাও কোনো খবর নেই।”

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, সীমান্ত এলাকায় নিখোঁজ হওয়া অন্তত দুটি ঘটনার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি হয়েছে।

তিনি বলেন, “সুমন তঞ্চঙ্গ্যা এবং ওয়াইমং চাকমা নামে দুইজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বিষয়গুলো তদন্তাধীন আছে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, সীমান্তের দুর্গম এলাকায় তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতা সীমিত।

“সীমান্ত এলাকায় আইনগতভাবে বিজিবি মূল দায়িত্ব পালন করে। কোনো ঘটনা ঘটলে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হয়।”

নিজের দেশেই পা হারালেন হানিফ

টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মো. হানিফ নিজের মাছের ঘেরে যাওয়ার পথে মাইন বিস্ফোরণে একটি পা হারান।

ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের ভেতরেই। নাফ নদীর পাড়ে নিজের ঘেরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি।

পা হারানো মো. হানিফ। ছবি- নুরুল হাসান

হঠাৎ বিস্ফোরণ। এক মুহূর্তে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় একটি পা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিজিবির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন।

কিন্তু এরপর আর কোনো সহায়তা পাননি। এখন স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ছোট ভাইয়ের আয়ের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।

হানিফ জানান, নাফ নদীর আগে যে ঘের বা প্রজেক্টগুলো আছে, সেখানে বাঁধ থেকে প্রায় ২০ ফুট ভেতরে এই বিস্ফোরণ ঘটে। তাঁর মতে, মাইনগুলো আরও ভেতর পর্যন্ত ছড়ানো থাকতে পারে।

বর্তমানে তিনি কর্মহীন অবস্থায় বাড়িতেই থাকেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী ও একটি সন্তান রয়েছে। তিনি তাঁর মা-বাবার থেকে আলাদা থাকেন এবং বর্তমানে তাঁর ছোট ভাইয়ের উপার্জনেই পুরো সংসার চলছে।

মো. হানিফ বলেন, “মামলা করব কার বিরুদ্ধে? পুলিশও তো আসে নাই।”

সীমান্তের ভেতরে কী ঘটছে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্ত্রধারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর আনাগোনা রয়েছে।

কেউ রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথা বলেন। কেউ বলেন আরাকান আর্মির সদস্যদের কথা।

ছবি- নুরুল হাসান

আবার কেউ বলেন, কে কোন পক্ষের সেটা সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় নেই।

ফলে পাহাড়ে কাজ করতে যাওয়া, গবাদিপশু চরানো কিংবা বাগানে যাওয়াও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়ার ফাত্রাঝিরি এলাকার বাসিন্দা উলাসিং তংচঙ্গ্যা বলেন, “পাহাড়ে না গেলে আমাদের খাবার জোটে না। কিন্তু এখন গেলে মৃত্যুর ভয়।”

উলাসিং তংচঙ্গ্যার ভাষায়, এই এলাকার মানুষ পাহাড়ে কলা, পেঁপে, আদা, আম, কাঁঠাল এবং পানের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পাহাড়ে না যেতে পারলে তাদের খাবার জোটে না। বর্তমানে সেখানে যেতে না পারার কারণে তারা চরম আর্থিক ও খাদ্য সংকটে পড়েছেন।

বিজিবি কী বলছে?

৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খাইরুল আলম বলেন, সীমান্তে পাওয়া মাইনগুলোর উৎস নিয়ে তদন্ত চলছে।

প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির সংঘর্ষের সময় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু মাইন পুঁতে রাখা বা ফেলে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, “বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে চাই না।”

বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

“বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে যেন স্পর্শ না করে দ্রুত বিজিবিকে জানায়।”

তিনি আরও বলেন, সীমান্তের অনেক পাহাড়ি এলাকায় শূন্যরেখা স্পষ্ট নয়।

ফলে স্থানীয়রা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা বাংলাদেশের ভেতরে আছেন, নাকি সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য পাশে চলে গেছেন।

বিচারহীনতার এই চক্র কেন?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ সীমান্তের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি।

ছবি- শাহীন মোবারক

“সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা চলছে। সেখানে আরাকান আর্মি আছে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

“কিন্তু বাস্তবে সীমান্তের মানুষরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছে। সবাই জানে কী ঘটছে, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে খুব কম আলোচনা হয়।”

তার মতে, সীমান্তের এসব মানুষ কার্যত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকদের মধ্যে পড়ে।

“শহরের মানুষ নিরাপদে থাকে। সীমান্তের মানুষদের ঝুঁকি নিয়েই বাঁচতে হয়।”

আলতাফ পারভেজ বলেন, এই সীমান্তের মানুষগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। তারা ক্ষমতার রাজনীতির অংশ নয়। তাই তাদের মৃত্যু নির্বাচনী ইস্যু হয় না।

রাষ্ট্রের করণীয় কী?

মিয়ানমারের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।

কারণ অধিকাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠী।

“আরাকান আর্মির মতো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরাসরি বিচারিক ব্যবস্থা নিতে পারে না। কিন্তু সীমান্তে মাইন শনাক্তকরণ, মাইন অপসারণ এবং প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।”

তার মতে, বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করা।

সীমান্তের মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?

হোসনে আরা। হুজাইফা। শৈফুচিং। অক্যমং। চিক্যং। ওয়ামং। হানিফ।

এগুলো কেবল কয়েকটি নাম।

কিন্তু এই নামগুলোর ভেতর লুকিয়ে আছে সীমান্তবাসীর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা, ভয় এবং বিচারহীনতার ইতিহাস।

তারা যুদ্ধ করেনি। তারা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য নয়। তারা কেবল নিজেদের ঘরে ছিল, জমিতে কাজ করছিল, মাছ ধরছিল, সন্তান লালন করছিল।

কিন্তু যুদ্ধের মূল্য দিতে হয়েছে তাদেরই।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ভেতরে একজন নাগরিক যদি মর্টারশেলে মারা যান, গুলিতে নিহত হন, মাইন বিস্ফোরণে পঙ্গু হন বা নিখোঁজ হয়ে যান- তবে সেই ঘটনার দায় কার?

“আর যদি দায় নির্ধারণই না হয়, তাহলে বিচার আসবে কোথা থেকে? এক কথায় রাষ্ট্রকেই তাঁর নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে।”

সীমান্তে মানুষ মরছে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন হারিয়ে যাচ্ছে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাও, এবং সেটিই হয়তো এই গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

আব্দুল মন্নান প্রশ্ন তোলেন, “সীমান্তের মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?”

কক্সবাজার শহরে কাজে বেরোনো একজন নারীর হঠাৎ শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তিনি কী করবেন?

ইনসাইট রিপোর্ট । কক্সবাজার

কক্সবাজার শহরে কাজে বেরোনো একজন নারীর হঠাৎ শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তিনি কী করবেন?

দ্রুত বাসায় ফিরবেন? কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে অনুমতি চাইবেন? নাকি প্রয়োজন চেপে রেখে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন?

প্রশ্নটা অস্বস্তিকর। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহরের বাস্তবতা অনেকটাই এমন।

এটি শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত অস্বস্তির গল্প নয়।এটি একটি শহরের জনস্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা এবং নাগরিক সেবার বাস্তব চিত্র।

প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এবং কয়েক লাখ স্থানীয় মানুষের চলাচলের এই শহরে পর্যাপ্ত, পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর গণশৌচাগার থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মৌলিক নাগরিক সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ – পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা এখনো অনেকটাই অপরিকল্পিত, অসম্পূর্ণ এবং ইজারানির্ভর।

বে ইনসাইটের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সৈকত এলাকার কিছু টয়লেট ও চেঞ্জিং রুম ব্যবহারযোগ্য থাকলেও অনেক স্থানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কোথাও দরজায় ঝুলছে তালা, আবার কোথাও অবকাঠামো তৈরি হলেও তা এখনো মানুষের কাজে লাগছে না।

সুগন্ধা পয়েন্টের নতুন চেঞ্জিং রুম ও টয়লেট তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকলেও লাবণীসহ অন্যান্য স্থানে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শহরের বড়বাজার এলাকার একটি পাবলিক টয়লেট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। অন্যদিকে আইবিপি মাঠ এলাকায় নতুন টয়লেট নির্মাণ হলেও সেটি এখনো মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।

জান্নাতুল আয়েশা কাজ করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। তিনি বলেন, “কাজে বের হলে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু মাঝপথে শৌচাগারের প্রয়োজন হলে কোথায় যাব, সেটা নিয়েই চিন্তায় থাকতে হয়। সব জায়গায় তো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে ঢুকে শৌচাগার ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় প্রয়োজন থাকলেও চেপে রাখতে হয়।”

পর্যটকদের অভিযোগও একই ধরনের।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন আসাদুল্লাহ রহমান। বার্মিজ মার্কেট এলাকায় এসে তাঁর মেয়ের হঠাত শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানান।

আসাদুল্লাহ রহমান বলেন, দ্রুত হোটেলে ফিরতে যাচ্ছিলাম, তখন পরে গেলাম রাস্তার জ্যামে।

এই পর্যটকের ভাষায়, “বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে আসেন। পাবলিক টয়লেট সবার জন্য প্রয়োজনীয় একটি সেবা। এটা সবসময় চালু ও পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত।”

কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষক ঈপসীতা চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু টয়লেট বানালেই হবে না। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। অনেক জায়গায় ব্যবহারই করা যায় না।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু নাগরিক দুর্ভোগের বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “পর্যটন এলাকায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর পাবলিক টয়লেট না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করে। এতে শুধু পরিবেশ দূষণই বাড়ে না, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ, কলেরা ও বিভিন্ন ধরনের অন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ সময় শৌচাগার ব্যবহার চেপে রাখার কারণে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে মূত্রনালির সংক্রমণ, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।”

পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের অধীনে থাকা টয়লেটগুলোর একটি অংশ সচল রয়েছে এবং বাকি স্থাপনাগুলো ধাপে ধাপে চালু করার চেষ্টা চলছে।

কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ বলেন, “কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের টয়লেট ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নাপিতাপুকুরের টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত করে চালু রাখা হয়েছে। বড়বাজারের টয়লেটটি ইজারায় কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটি বন্ধ রয়েছে।

তবে সেটি বন্ধের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাশেই বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য টয়লেট থাকায় অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত এই টয়লেটের ব্যবহারকারী কম। তাই কেউ ইজারাও নিতে চায় না। আর আইবিপি মাঠের টয়লেটের নির্মাণকাজ শেষ হলে দ্রুত চালু করা হবে।”

অন্যদিকে জেলা পরিষদ জানিয়েছে, সৈকত এলাকার লাবণী, সুগন্ধা ও ইনানি পয়েন্টের টয়লেটগুলো ইজারা অথবা খাস আদায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রহমত উল্লাহর ভাষ্য, “পর্যটকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান টয়লেটগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় চলছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই।

একটি মৌলিক নাগরিক সেবা কি ইজারার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে?

আইনজীবী সেজান এহসান প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো ব্যবসায়ী দায়িত্ব নিতে আগ্রহী না হন, তাহলে কি একটি শহরের মানুষ এবং পর্যটকরা সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন?

“কারণ, পাবলিক টয়লেট কোনো ব্যবসা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অবকাঠামো।”

আইনজীবী সেজান এহসান এর মতে, বাস্তবতা হলো, কক্সবাজারে হঠাৎ একজন নারীর শৌচাগারের প্রয়োজন হলে তার সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে দ্রুত বাসা, হোটেল কিংবা পরিচিত কোনো স্থানে ছুটতে হয়।

“এটি শুধু সেবার সংকট নয়। এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অগ্রাধিকারেরও একটি সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।”

তিনি বলেন, কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহর, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি গন্তব্য। অথচ এখানকার পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো টেকসই জনসেবার বদলে নির্ভর করছে ইজারা ব্যবস্থার ওপর। ফলে কোথাও সেবা আছে, কোথাও নেই; কোথাও স্থাপনা আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই।

“একটি শহরের মৌলিক সেবা যদি ইজারাদার পাওয়া-না পাওয়ার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি আর শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়। সেটি নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।”

আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রতিভা দাশ বলেন, কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বমানের শহরের পরিচয় শুরু হয় সবচেয়ে মৌলিক জায়গা থেকে।

প্রতিভা দাশ বলেন, একজন নারী যেন শহরের যেকোনো প্রান্তে দ্বিধাহীনভাবে, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে একটি পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি শহর সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব হয়ে ওঠে।

“কারণ, যে শহর প্রতিদিন লাখো মানুষের আতিথেয়তা করে, সেই শহরে একটি কার্যকর পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়,এটি রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব।”

রোহিঙ্গাদের বাড়ি আর কত দূর?

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

“আমার ছেলে যখন বাংলাদেশে আসে, তখন তার বয়স পাঁচ বছর। এখন সে প্রায় চৌদ্দ। সে তার গ্রামের নাম জানে, কিন্তু কখনও নিজের গ্রাম দেখেনি।”

উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে বসে কথাগুলো বলছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থী আবদুস সালাম। কথার মাঝেই তিনি থেমে যান। চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়ের দিকে।
তার মতো লাখো রোহিঙ্গার জীবন এখন দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকা এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।

একদিকে মিয়ানমার যেখানে তাদের জন্ম, শিকড়, জমি-ঘর, স্মৃতি। অন্যদিকে বাংলাদেশ, যে দেশ তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী ঠিকানা দিতে পারেনি।

বিশ্ব যখন ২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস পালন করছে, তখন কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কাছে দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া বাড়ি, হারিয়ে যাওয়া পরিচয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের স্মরণ দিবস।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগেও কয়েক দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে আজ প্রায় নয় বছর পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়েছে।

সংখ্যা বাড়ছে, সংকটও বড় হচ্ছে

বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে সংকটটি দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।

“২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় ইনফ্লাক্সের সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ এসেছিল। এখন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের উপরে। গত দুই-আড়াই বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।”

তিনি বলেন, “প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা স্থির নেই, ক্রমাগত বাড়ছে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন অবশ্য মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

“২০১৭ সালে আমরা ১১ লাখাধিক রোহিঙ্গার কথা বলেছিলাম। এরপর গত নয় বছরে প্রতিবছর গড়ে ৩০ হাজার করে জনসংখ্যা বেড়েছে। জন্মহার থেকে মৃত্যুহার বাদ দিলেও দুই থেকে আড়াই লাখ নতুন মানুষ যুক্ত হয়েছে। তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে দেড় থেকে দুই লাখ নতুন অনুপ্রবেশকারী যোগ করলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি।”

তার মতে, “বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আবাসভূমি।”

‘আমাদেরও দেশ ছিল’

রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকমের সাথে কথা বলেছেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর সদস্য ডা. জুবায়ের।

তার কণ্ঠে ছিল বেদনা, ক্ষোভ ও প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

“২০ জুন পৃথিবীর সব শরণার্থীর জন্য একটি বিশেষ দিন। এই দিনে তারা স্মরণ করে কেন তারা শরণার্থী হয়েছে, কীভাবে তাদের দেশ হারিয়েছে, কারা তাদের দেশছাড়া করেছে।”

তিনি বলেন, “আমরাও এই দিনে আমাদের ফেলে আসা বাড়ি, জমি, কবরস্থান, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানদের স্মরণ করি। অনেকের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। অনেকেই আর বেঁচে নেই।”

ডা. জুবায়েরের মতে, বিশ্ব শরণার্থী দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত নতুন করে যেন আর কোনো জনগোষ্ঠী শরণার্থী না হয়।

“আমরা বিশ্বকে বলতে চাই, আমরা কখনো শরণার্থী হতে চাইনি। পৃথিবীর কোনো মানুষই শরণার্থী হতে চায় না।”

পরিচয়ের সংকট

রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিচয়ের প্রশ্ন, এ কথা বারবার তুলে ধরেন ডা. জুবায়ের।

“আমরা বলি আমরা রোহিঙ্গা। কিন্তু রাখাইনের মগরা বলে আমরা বাঙালি। মিয়ানমার রাষ্ট্র আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। আমাদের পরিচয় অস্বীকার করে।”

তার ভাষায়, “যে জনগোষ্ঠীর পরিচয় স্বীকৃত নয়, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন কীভাবে সম্ভব?”

তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাখাইনে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা আরাকান আর্মির সময়ও রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা পায়নি।

“আজও মগ আর মিলিটারি নিজেদের মতো খেলা খেলছে। আমরা মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছি।”

‘ক্যাম্প একটা কারাগার’

নয় বছরের শরণার্থী জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডা. জুবায়ের বলেন, “ক্যাম্প একটা কারাগার।”

তিনি বলেন, “কারাগারের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে খারাপ। এখানে মানুষের স্বাধীনতা সীমিত। কাজের সুযোগ সীমিত। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।”

তার ভাষায়, “আমরা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্ব যদি রাখাইনে আমাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করে, সেটা শরণার্থী শিবির হলেও আমরা যেতে প্রস্তুত। অন্তত সেটা আমাদের ভূমি হবে।”

নয় বছরে একজনও ফেরেনি

রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ছিল। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। ২০১৮ সালের শুরুতে হয় বাস্তবায়ন চুক্তি।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। নভেম্বরে চুক্তি, ডিসেম্বরে টাস্কফোর্স, জানুয়ারিতে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট এগ্রিমেন্ট। তখন মনে হয়েছিল দুই বছরের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে।”

কিন্তু তা হয়নি। ২০১৮ সালে প্রথম এবং ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

“কারণ মিয়ানমার নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-সম্পত্তি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দিতে পারেনি,” বলেন তিনি।

“বাংলাদেশও জোর করে কাউকে ফেরত পাঠাতে পারেনি। রোহিঙ্গারা যেতে রাজি না হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির কারণে তাদের জোর করে পাঠাতে পারে না।”

‘প্রত্যাবাসন এখন স্ট্যান্ডস্টিল’

রাহমান নাসির উদ্দিন প্রত্যাবাসন পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেন ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ হিসেবে।

“এটা সামনে যাচ্ছে না, পিছিয়েও যাচ্ছে না। এক ধরনের স্থবিরতা।”

তিনি বলেন, “কোভিড মহামারির পর পুরো প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে যায়। এরপর মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, গৃহযুদ্ধ, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন—সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যত থেমে গেছে।”

তার মতে, “বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের বাস্তব রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়।”

‘আমাদের লক্ষ্য প্রত্যাবাসন’

আরআরআরসি মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য কখনোই রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রাখা নয়। আমরা চাই তাদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করতে এবং সসম্মানে নিজ দেশে ফিরিয়ে দিতে।”

তিনি বলেন, “নয় বছর প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।”

এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
“প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ এখনও নেই।”

তিনি জানান, বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ সালেই প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল।

“তারা প্রায় আড়াই লাখ মানুষের তথ্য যাচাইও করেছে। কিন্তু যাচাই করা আর প্রত্যাবাসন শুরু করা এক বিষয় নয়।”

নতুন বাস্তবতা: আরাকান আর্মি

রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন আগের চেয়ে অনেক জটিল।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “২০১৭ সালে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে ছিল। এখন বাস্তবতা বদলে গেছে।”

তার মতে, “আজ যদি মিয়ানমার সরকারও প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়, প্রশ্ন হচ্ছে—সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা কি তাদের আছে?”

কারণ রাখাইনের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

“বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখে। কিন্তু আরাকান আর্মি কোনো রাষ্ট্র নয়। ফলে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যেতে পারে না।”

সহায়তা কমছে

মিজানুর রহমানের ভাষায়, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন অর্থসংকট।”
তিনি বলেন, “প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অর্থায়ন কমছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয়—সবখানে চাপ বাড়ছে।”

তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ সহায়তাকারী দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

“তাদের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতো না।”

হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজন্ম

ক্যাম্পে এখন এমন একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যারা কখনও মিয়ানমার দেখেনি।
২০১৭ সালে যে শিশুর বয়স ছিল ১০, সে এখন তরুণ। যার বয়স ছিল ১৫, সে এখন কর্মক্ষম যুবক। কিন্তু তাদের সামনে নেই কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশ তাদের নাগরিকত্ব দেবে না। মিয়ানমারও গ্রহণ করছে না। তারা এক ধরনের রাষ্ট্রহীন ভবিষ্যতের মধ্যে বড় হচ্ছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি হতাশা সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ, মানবপাচার ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমছে

একসময় রোহিঙ্গা সংকট ছিল বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে।

কিন্তু এখন ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনাসহ নানা সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার তালিকা থেকে নিচে নেমে যাচ্ছে।”

তার মতে, বাংলাদেশেরও কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

“আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথেষ্টভাবে বোঝাতে পারিনি যে এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়।”

বিকল্প পরিকল্পনা কি প্রয়োজন?

প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান—এ বিষয়ে সবাই একমত। কিন্তু প্রত্যাবাসন না হলে কী হবে? এই প্রশ্ন তুলছেন রাহমান নাসির উদ্দিন।

“বাংলাদেশের একমাত্র নীতি হচ্ছে প্রত্যাবাসন। কিন্তু যদি আগামী পাঁচ বা দশ বছরেও তা সম্ভব না হয়, তাহলে বিকল্প পরিকল্পনা কী?”

তিনি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন, সীমিত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নতুন ধরনের চুক্তির কথা বলেন।

“অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কিছু দেশ মানবিক পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের মানুষদের কিছু উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার বিষয়ও ভাবতে হবে।”

তার মতে, “১৫ লাখ মানুষকে বছরের পর বছর শুধু ত্রাণনির্ভর করে রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।”

বাড়ি আর কত দূর?

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসের আগের দিন সকালে কুতুপালং ক্যাম্পের সরু গলিতে কয়েকজন শিশু ঘুড়ি উড়াচ্ছিল।

তাদের একজনের হাতে ছিল কাগজের তৈরি একটি ছোট ঘুড়ি। ঘুড়িটি আকাশে উঠছিল, কিন্তু সুতো ছিল শক্ত করে বাঁধা।

রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার জীবনও যেন সেই ঘুড়ির মতো। স্বপ্ন আছে, স্মৃতি আছে, ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সুতো আটকে আছে যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি, পরিচয়ের সংকট এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার জটিল গিঁটে।

নয় বছর আগে যারা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের অনেক শিশুই আজ তরুণ। কেউ কখনও রাখাইন দেখেনি, কেউ শুধু বাবা-মায়ের মুখে নিজের গ্রামের গল্প শুনেছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসে তাই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পগুলো থেকে আবারও ভেসে আসে একই প্রশ্ন- রোহিঙ্গাদের বাড়ি আর কত দূর?

বরাদ্দ বাতিল হলেও সোনাদিয়া পুরোপুরি বুঝিয়ে দেয়নি বেজা, দখল-ধ্বংসে বিপন্ন দ্বীপ

বে ইনসাইট রিপোর্ট

এক সময় সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে সেখানে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতার সুযোগে এখন দখল, বন উজাড় ও অবৈধ পর্যটন বাণিজ্যের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়েছে দ্বীপটির অনন্য বাস্তুতন্ত্র।

পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের মুখে বেজার জন্য দেওয়া জমির বরাদ্দ বাতিল করা হলেও প্রায় দুই বছর পরও দ্বীপের পুরো নিয়ন্ত্রণ পায়নি বন বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রশাসনিক অচলাবস্থাই সোনাদিয়ার বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।

সরকার ২০১৯ সালে মাত্র ১ হাজার ১ টাকা সালামিতে সোনাদিয়া দ্বীপের ৯ হাজার ৪৬৭ একর জমি দীর্ঘমেয়াদে বেজাকে বরাদ্দ দেয়। পরিকল্পনা ছিল দ্বীপের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় ইকোট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার। ভারতীয় মাহিন্দ্রা গ্রুপকে যুক্ত করে প্রায় ৫০০ একর এলাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

তবে সরকারের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) তখনই সতর্ক করেছিল, ব্যাপক পর্যটন কার্যক্রম শুরু হলে অতিথি পাখির আবাস, সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়া এবং দ্বীপের নাজুক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হোটেল-মোটেল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ বর্জ্য বৃদ্ধি করে অপূরণীয় পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তীতে পরিবেশবাদীদের আপত্তি ও আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয় বেজার বন্দোবস্ত বাতিল করে জমি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বরাদ্দ বাতিল হলেও সাতটি মৌজার মধ্যে মাত্র তিনটির নিয়ন্ত্রণ আমরা ফিরে পেয়েছি। বাকি অংশ এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো দ্বীপে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।”

তার ভাষায়, “মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বেজার বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত মামলা এখনো চলমান থাকায় প্রক্রিয়াটি শেষ হয়নি। যে এলাকাগুলো আমাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, সেখানেই সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা, বন পোড়ানো ও দখলের ঘটনা ঘটছে।”

তিনি জানান, দক্ষিণ কুতুবজুম ও পানদ্বীপ মৌজায় বন ধ্বংসের ঘটনা সবচেয়ে বেশি।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল প্যারাবন কেটে রিসোর্ট নির্মাণ, চিংড়ি ঘের তৈরি এবং অবৈধ পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।

গত ২ এপ্রিল বন বিভাগ বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের ৩০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে। তাদের দাবি, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এসব মামলা করা হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে।

তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বন বিভাগের মামলায় নাম আসা শেখ কামাল বলেন, “সোনাদিয়া দ্বীপে আমার কোনো রিসোর্ট নেই। আমি প্যারাবনও দখল করিনি।”

অন্যদিকে বিএনপি নেতা জাহেদুল হক নাহিদ বলেন, “জীবনে কোনো দিন সোনাদিয়া দ্বীপে যাইনি। সেখানে আমার রিসোর্ট থাকবে কীভাবে?”

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ জন দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে জমা দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “গত মাসে অভিযান চালিয়ে পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫টি অবৈধ রিসোর্ট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় পুলিশ ও নৌবাহিনীসহ শতাধিক সদস্য এতে অংশ নেন।”

‘বাংলাদেশের অন্যতম অক্ষত দ্বীপ’

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দারের মতে, সোনাদিয়া দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি।

তিনি বলেন, “সোনাদিয়া সত্যিকার অর্থে একটি ক্রিটিক্যাল ইকোলজিক্যাল এলাকা। এখানে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী প্রজনন করে, বসবাস করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অন্য অনেক উপকূলীয় এলাকার তুলনায় এখানকার জীববৈচিত্র্য এখনো অনেকটাই অক্ষত।”

তার মতে, দ্বীপটিতে একদিকে বিস্তীর্ণ বালুকাময় সৈকত, অন্যদিকে কর্দমাক্ত উপকূল ও প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের বিরল সমন্বয় রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না।

“এখানে বালিয়াড়ি আছে, কেয়াবন আছে, সাগরলতা আছে। উপকূলের যেসব উদ্ভিদ অনেক জায়গা থেকে হারিয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকটাই এখনো সোনাদিয়ায় টিকে আছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, অপরিকল্পিত পর্যটন চালু করা হলে দ্বীপের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও নাজুক বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাবে।

“পর্যটন হতে পারে, তবে সেটি অবশ্যই সীমিত পরিসরে এবং পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে। এখন যেভাবে ম্যানগ্রোভ বন কেটে বা পুড়িয়ে চিংড়ি প্রকল্প করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তার মতে, সোনাদিয়া নিয়ে যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার আগে দ্বীপটির পরিবেশগত ধারণক্ষমতা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে সেই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা। বরাদ্দ বাতিলের পরও বেজার কাছ থেকে পুরো জমি বুঝে না পাওয়ায় বন বিভাগ কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আর সেই সুযোগেই প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে সোনাদিয়ার বন, বালিয়াড়ি ও জীববৈচিত্র্য।

মাতারবাড়ী এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু উত্তোলন: ‘শত কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ’, হাইকোর্টে রিট

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক (পোর্ট এক্সেস রোড) নির্মাণ প্রকল্পে বালু উত্তোলন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হয়েছে।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন এ রিট আবেদন করেন। আবেদনে মহেশখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং বালুর মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

রিট আবেদন গ্রহণ করে হাইকোর্ট আগামী ২১ জুন শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।

রিটের নথিতে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর ভিত্তিমূল্য বা রয়্যালটি ৬ টাকা ৯৪ পয়সা। তবে ড্রেজিং ব্যয় বাবদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা সমন্বয়ের পর কার্যত প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৩৭ পয়সা।

রিটকারীর দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে প্রকল্পের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তোকিউ-এমআইএল-জেভি’ বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

রিটে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ মোট আটজনকে বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব সুবিধা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রিট আবেদনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেন। তবে অনুমোদনের আগে কোনো বিকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়নি এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সম্পন্ন হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া মহেশখালী উপকূল থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র এবং এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও ন্যায্য রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সংবিধান ও আইনের দাবি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।”

তিনি বলেন, রিটে বালু উত্তোলনের অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

সোহানা শারমিনের ভাষ্য, “ড্রেজিং ব্যয় সমন্বয়ের নামে রাষ্ট্রকে প্রতি ঘনফুটে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা রয়্যালটি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকল্পে ব্যবহৃত বালুর জন্য সরকারের কাছ থেকেই তুলনামূলক অনেক বেশি মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এসব কারণেই আদালতের কাছে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।”

তবে রিটে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব সমুদ্র দিবস: জীবন ও জীবিকার উৎস আজ সংকটে

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রতিদিন ভোরে নাজিরারটেকের জেলেরা তাদের নৌকা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমান। তাদের বাবারা যেমন গিয়েছেন, দাদারাও তেমনি গিয়েছেন। কিন্তু সমুদ্রটা যেন আর আগের মতো নেই। মাছের পরিমাণ কমে গেছে, পানির রং বদলেছে, আর প্রবীণ জেলেদের ভাষায়—সমুদ্রের গন্ধও আর আগের মতো নেই।

বিশ্ব মহাসাগর দিবসে তাই কক্সবাজার উদ্‌যাপন করছে না; বরং নিজের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

যে পরিসংখ্যান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই

২০২৪ সালে ব্র্যাক পরিচালিত একটি বেসলাইন জরিপে উঠে আসে উদ্বেগজনক তথ্য। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন গড়ে ৩৪ দশমিক ৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ এবং বিভিন্ন ধরনের পলিথিনে ভরে যাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের বালুচর।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সৈকতসংলগ্ন প্রায় ৫০০টি হোটেল ও গেস্টহাউসের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে কার্যকর পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) রয়েছে। বাকি অধিকাংশ স্থাপনার বর্জ্য পানি শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে সেই সমুদ্রে, যা দেখতে লাখো পর্যটক কক্সবাজারে আসেন এবং যার ওপর নির্ভর করে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা।

ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সৈকত

দূষণের পাশাপাশি আরেকটি নীরব সংকট হচ্ছে উপকূল ভাঙন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণাগুলো বলছে, কক্সবাজার উপকূলে ভৌগোলিক পরিবর্তনের গতি বেড়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে অনেক প্রাকৃতিক পাহাড়ি ছড়া ও জলপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্ষার পানি সরাসরি সৈকত অতিক্রম করে সাগরে গিয়ে পড়ছে এবং বালুচর দ্রুত ক্ষয় করছে।

গবেষকদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ পুনরুদ্ধার এবং উপকূলজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ বন্ধ করা না গেলে এই ক্ষয়রোধ করা কঠিন হবে।

ঝুঁকিতে একটি জেলার জীবন-জীবিকা

এটি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি কক্সবাজারের অর্থনীতি ও মানুষের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। মাছ ধরা, পর্যটন, লবণ চাষ, চিংড়ি ও মৎস্যখাত—সবকিছুই নির্ভর করছে একটি সুস্থ সমুদ্রের ওপর।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা ইতোমধ্যে সতর্ক করছেন, দূষিত পানি ও নোংরা সৈকত পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করবে, যার প্রভাব পড়বে হাজারো ব্যবসা ও লাখো মানুষের কর্মসংস্থানে। অন্যদিকে জেলেদের জন্য সংকট আরও তাৎক্ষণিক—সমুদ্রের অবক্ষয় মানেই জালে কম মাছ।

তবে আশার আলোও আছে। রামুতে একটি পুনর্ব্যবহার কারখানা কঠিন প্লাস্টিক বর্জ্যকে কাঠ ও নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তর করছে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা সৈকত পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছেন। সুযোগ পেলে সমুদ্র নিজেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

কক্সবাজারের পরিচয় কেবল একটি সৈকতের সঙ্গে নয়; এটি গড়ে উঠেছে একটি মহাসাগরকে ঘিরে। বিশ্ব মহাসাগর দিবসে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরাই কি সেই প্রজন্ম, যারা এই সমুদ্রকে রক্ষা করবে, নাকি সেই প্রজন্ম, যারা নিজেদের বর্জ্যের নিচে তাকে ধীরে ধীরে ডুবে যেতে দেখবে।