সংকুচিত বন, সঙ্কটে হাতি

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালংয়ে ভোরের অন্ধকার তখনও পুরো কাটেনি। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে স্থানীয়দের। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তিনটি বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে বসতঘরের দেয়াল ভাঙতে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বাসিন্দারা।

কিন্তু পালানোর সুযোগ পাননি ছেমন আরা ও তার তিন বছরের মেয়ে আসমা বিবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতির সামনে পড়ে ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়। এরপর আম-কাঁঠাল খেয়ে হাতির পালটি পাশের পাহাড়ি বনে ফিরে যায়।

এই ঘটনা নতুন নয়। বরং কক্সবাজারে মানুষ ও হাতির সংঘাত এখন এক গভীর পরিবেশগত সংকটের প্রতীক হয়ে উঠছে, যেখানে একদিকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মানুষ, অন্যদিকে সংকুচিত আবাসস্থলে আটকে পড়া মহাবিপন্ন এশীয় হাতি।

বন কমছে, বাড়ছে সংঘাত

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগ মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২০৩টি বন্য হাতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৫টি শাবক। ২০১৬ সালের জাতীয় জরিপে দেশে মোট বন্য হাতির সংখ্যা ধরা হয়েছিল ২৬৮টি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এদের “মহাবিপন্ন” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতির সংখ্যা যতটা না বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে তাদের বিচরণক্ষেত্র।

কক্সবাজারে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী অভয়ারণ্য, ঈদগাঁওয়ের ব্যাঙডেবা বনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই প্রায় ১৮ হাজার ৬০০ হেক্টর বনভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বনভূমির বড় অংশ এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, দখল ও বিচ্ছিন্ন বসতিতে আক্রান্ত।

তার ভাষায়, “বনের ভেতরেও মানুষ বসবাস করছে। ফলে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।”

রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমির ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

বন বিভাগ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ২০০ একর বনভূমি সম্পূর্ণ উজাড় হয়েছে। আরও কয়েক হাজার একর এলাকায় গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জ্বালানি সংগ্রহ, বসতি নির্মাণ ও অবকাঠামো তৈরির কারণে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র এক মূল্যায়নে বলা হয়, ক্যাম্পসংলগ্ন অন্তত ৭ হাজার ২২০ হেক্টর বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে পুনর্বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার একর এলাকায় নতুন গাছ লাগানো হয়েছে।

তবে বন গবেষকরা বলছেন, একটি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেলে কেবল গাছ লাগিয়ে সেই বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

হাতির করিডর ভেঙে দিচ্ছে উন্নয়ন

মানুষ-হাতি সংঘাতের আরেকটি বড় কারণ উন্নয়ন প্রকল্প।

কক্সবাজার-দোহাজারী রেললাইন চালুর পর হাতির অন্তত ১৬টি চলাচল পথ ও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পরিবেশবিদদের অভিযোগ। এছাড়া সড়ক, বসতি, কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্ত অবকাঠামো হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা তৈরি করছে।

ফলে হাতির পাল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নেকম’-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমানের মতে, হাতি সাধারণত মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক নয়। কিন্তু চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা খাদ্যসংকট তৈরি হলে তারা বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

এক দশকে অন্তত ৬০ হাতির মৃত্যু

মানুষের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছে হাতিও।

গত এক দশকে কক্সবাজার অঞ্চলে অন্তত ৬০টি হাতি মারা গেছে বলে বন বিভাগ ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে অন্তত ২৪টি হাতি। গুলিতে আহত বা নিহত হয়েছে আরও কয়েকটি।

২০২০ সালে ঈদগড়ে গুলিতে নিহত হয় পরিচিত একটি স্ত্রী হাতি “গণেশবতী”। ২০২১ সালে রামুতে বিদ্যুতায়িত ফাঁদে মারা যায় একটি শাবক।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষায় অনেক সময় স্থানীয়রা অবৈধ বিদ্যুৎ ফাঁদ ব্যবহার করেন। এতে সংঘাত আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নেকম-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমান বলেন, “মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবসময় ক্ষতিপূরণ পায় না। ফলে কেউ কেউ প্রতিশোধমূলকভাবে বিদ্যুৎ ফাঁদ বা গুলি ব্যবহার করে।”

সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্ন কার্যকারিতা নিয়ে

বন বিভাগ বলছে, সংঘাত কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ২০২২-২০২৮ মেয়াদের ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’
  • রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলপিজি সরবরাহ কর্মসূচি
  • হাতির করিডর পুনরুদ্ধার
  • পুনর্বনায়ন
  • বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণ
  • স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা কার্যক্রম

গত তিন বছরে অন্তত ৫২টি বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণের তথ্য দিয়েছে বন বিভাগ। এছাড়া কয়েক হাজার হেক্টর এলাকায় বনায়নও করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যার সমাধান ছাড়া সংঘাত কমানো কঠিন।

তাদের মতে, হাতির নিরাপদ চলাচলের করিডর পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

কারণ কক্সবাজারের বন এখন শুধু একটি পরিবেশগত সম্পদ নয়, এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের শেষ আশ্রয়গুলোর একটি।

হামঃ ‘বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না’

আফজারা রিয়া । নুরুল হাসান

শুক্রবার রাত তখন গভীর। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের হাম ওয়ার্ডে নিভু নিভু আলো। কিন্তু ঘুম নেই কারও চোখে।

এক কোণে ছয় মাসের শিশুকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে বসে আছেন মা ক্রিপাও ম্রো। শিশুটির ছোট্ট শরীর জ্বরে কাঁপছে বারবার। কখনো কাশি, কখনো কান্না আর প্রতিবারই মায়ের মুখে ফুটে উঠছে আতঙ্কের ছাপ।

শিশুটির নাম ইরুই ম্রো। ঠিকমতো চোখও খুলতে পারছে না সে। দুই দিন আগে আলীকদমে শুরু হয়েছিল জ্বর, সর্দি আর কাশি। প্রথমে নেওয়া হয় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত পাঠানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

তিন দিন ধরে ঘুমাননি ক্রিপাও ম্রো। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে তার মনে, “কি হবে?”

কেবল ইরুই নয়, হাম ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি বেডেই ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য আতঙ্ক আর নির্ঘুম রাতের গল্প।

২০ শয্যার ছোট্ট ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ জন শিশু। জায়গা না থাকায় একটি বেডেই গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে তিন থেকে চারজন রোগীকে। কেউ সন্তানের কপালে ঠান্ডা পানি দিচ্ছেন, কেউ বুকের ওঠানামা দেখে বুঝতে চাইছেন শ্বাস ঠিক আছে কি না। অসুস্থ শিশুদের কান্না আর মায়েদের উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ।

কেউ মহেশখালী থেকে, কেউ চকরিয়া, ঈদগাঁও কিংবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে সন্তানকে কোলে নিয়ে ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। কেউ কান্না চেপে রাখতে পারছেন না। আবার কেউ সন্তানের জ্বর সামান্য কমলেই নীরবে শুকরিয়া আদায় করছেন।

এক সপ্তাহে ভর্তি ১৫৮ শিশু

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ বলছে, গত এক সপ্তাহে হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১৫৮ শিশু। প্রতিদিন গড়ে ২২ জনের বেশি রোগী আসছে শুধু হাম আক্রান্ত হয়ে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,

১০ মে ভর্তি হয় ২৫ জন শিশু, মারা যায় ২ জন
১১ মে ভর্তি হয় ৩০ জন
১২ মে ২৩ জন
১৩ মে ১৮ জন
১৪ মে আবারও ৩০ জন
১৫ মে ১৭ জন
১৬ মে ভর্তি হয় ১৫ জন শিশু

এই ধারাবাহিক প্রবাহই বলে দিচ্ছে, কক্সবাজারে এখনো কমেনি হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

ওয়ার্ডের ভেতরে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক শিশুকে। রাতভর সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে থাকছেন মায়েরা। কেউ বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখছেন, কেউ আবার সারারাত জেগে পানি দিচ্ছেন কপালে।

“বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না”

মহেশখালীর গোরকঘাটা থেকে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ছেনুয়ারা। চার দিন আগে তার শিশুর শরীরে ধরা পড়ে হাম। এখন কিছুটা জ্বর কমলেও শুরু হয়েছে শ্বাসকষ্ট।

সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিনি বলেন, “হামটা একটু ভালো হয়েছে, কিন্তু এখন শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। বাচ্চাটার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।”

পাশের বেডে বসে ছিলেন ১৭ বছর বয়সী আবেদা। কোলে তার ৯ মাসের শিশু। মাঝে মাঝে সন্তানের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছছিলেন তিনি।

“আমার বাচ্চাটা কিছু খেতে পারছে না। খাওয়ালেই বমি করছে। এখন নাকে নল দিয়ে খাবার দিচ্ছি,” বলেন আবেদা।

আবেদা, ছেনুয়ারা কিংবা ক্রিপাও ম্রো প্রত্যেক মায়ের গল্প যেন একই সুতোয় বাঁধা। সন্তানকে বাঁচিয়ে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার লড়াই।

দুই হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ১৭ শিশুর

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষভাগ থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৪১ জন শিশু। এর মধ্যে মারা গেছে ১৭ জন।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা মহেশখালীতে ৪০১ জন। এরপর রয়েছে চকরিয়া ৩১৫ জন এবং রামু ২০৭ জন।

তবে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রামু উপজেলায়। সেখানে মারা গেছে ৭ শিশু। এর মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু সন্দেহজনক হিসেবে ধরা হলেও একজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হামজনিত জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালের সক্ষমতার ওপরও বাড়ছে চাপ।

ঘুমহীন এক ওয়ার্ডের দীর্ঘ রাত

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে রাত নামে ঠিকই, কিন্তু ঘুম নামে না মায়েদের চোখে।

একদিকে জায়গা সংকট, অন্যদিকে প্রতিদিন বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সব মিলিয়ে হাসপাতালজুড়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব আতঙ্ক। তবু প্রতিটি মা বুকের ভেতর একটিই আশা নিয়ে সন্তানের পাশে বসে থাকেন, হয়তো সকালে জ্বরটা একটু কমবে। হয়তো শিশুটি আবার চোখ খুলে তাকাবে। হয়তো তাকে সুস্থ করেই ঘরে ফিরতে পারবেন।

কক্সবাজারে ছাত্রদল কমিটি নিয়ে বিতর্ক: সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে, এখন আসে ‘বিমানে চড়ে’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটি ঘোষণা ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর কেন্দ্র থেকে সরাসরি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও কাউন্সিল না হওয়া, পদবণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব এবং তৃণমূলের কর্মীদের বঞ্চনার অভিযোগে সংগঠনটির ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই বছর ধরে কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের কোনো কার্যকর কমিটি ছিল না। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হঠাৎ করেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছয় সদস্যের একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করে। তবে কমিটি ঘোষণার আগে কোনো কাউন্সিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় সংগঠনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।

পদবণ্টন নিয়ে ক্ষোভ, সড়কে বিক্ষোভ

ঘোষিত কমিটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের দাবি, তৃণমূলের মতামত নেওয়া হয়নি, দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় কর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি এবং গ্রুপভিত্তিক বিবেচনায় পদ দেওয়া হয়েছে।

কমিটি ঘোষণার পরপরই কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। শহরের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়, এতে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী জানান, কক্সবাজার ছাত্রদলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই গ্রুপিং বা অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে। নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেছে- ‘আমি নিরুপায়’

পদবঞ্চিত নেতা মিজানুল আলম বলেন, “ফাহিম সাবেক কমিটিতে আমার সহযোদ্ধা ছিলো। সে আসতে পারলে আমি কেনো আসতে পারবো না। সে তো আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তাঁর বয়স এখন ৪১/৪২। আমার বয়স ৩৬। যদি কক্সবাজারের জেলা ছাত্র দলের আওতাধীন আমাদের যে ২৭ টি ইউনিট আছে, সেখান থেকে সুপার ৪ বা সুপার ৫ করা হয়, সেখানে আমি সভাপতি হবো।

তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রীয় ছাত্র দলের সভাপতি আমার ফোন রিসিভ করে ক্ষমা চেয়েছে, সে আমাকে বলেছে- ‘আমি নিরুপায়, আমার কোনো উপায় ছিলো না, আমি নিরুপায়, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি পারি নাই, আমার হাত-পা বাঁধা’ সেরকম বলেছিলো। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ভাই কথা বলেছেন, সেক্রেটারি ফোন ধরে নি। ওনি বলেছেন, ‘আমরা অসহায়, আমরা নিরুপায়। আমাদেরকে উপর থেকে যেভাবে বলে দেওয়া হয়েছে ওভাবে দেওয়া হয়েছে।’”

কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কথা বলছেন নতুন সভাপতি

জেলা ছাত্রদলের নবনির্বাচিত কমিটি কতোতম জানতে চাইলে সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, “এখন সঠিক বলতে পারবোনা। আপনাকে পরে জানাচ্ছি।”

কাউন্সিল না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় কমিটি একযোগে এই কমিটি ঘোষনা করেছে, এগুলো কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত। তাই এই প্রশ্ন তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে।”

পদবঞ্চিতদের প্রতিবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পদ শুধু দুইটি, কিন্তু যোগ্য প্রার্থী তো অনেক। সেখান থেকে বাছাই করতে হয়। তাই সবাইকে তো দেয়া সম্ভব না। যারা জেলা কমিটির পদ পায়নি, তারা যোগ্য হলে অবশ্যই কলেজ কমিটি আছে, শহর কমিটি আছে, উপজেলা কমিটি আছে, সেখানে আসবে।”

পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যোগ্য ও নিয়মিত ছাত্রদের মাধ্যমে কমিটি পূর্ণা করা হবে।”

‘বিমানে চড়ে এসে শোভাযাত্রা’, সমালোচনা সাবেক নেতার

জেলা ছাত্রদলের সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমাদের সময় এমন রেওয়াজ ছিলোনা। বিমানে চড়ে এসে মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা করা ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্য নয়। কক্সবাজারে এই রেওয়াজ শুরু হয় ২০১২ সালের দিকে কাউন্সিল ছাড়া ছাত্রলীগের কমিটি হলে, তখন সভাপতি সেক্রেটারি ঢাকা থেকে বিমানে চড়ে এসে এখানে বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনা নেয়া শুরু হয়।”

সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে

ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটির সর্বশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব আসে ১৯৯৩ সালে। ওই কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন আকতার চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হন বদরুল হুদা সিদ্দিকী। এরপর দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জেলা ছাত্রদলের আর কোনো নির্বাচিত কমিটি হয়নি।

বর্তমানে কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওই সময়ের সভাপতি আকতার চৌধুরী। সাম্প্রতিক কমিটি গঠন ও কাউন্সিলবিহীন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রবণতা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছে বে ইনসাইট।

তিনি বলেন, “এটা তো আসলে সাংগঠনিক বিধিমালার ভিত্তিতে চলে। অ্যাট দ্যাট টাইম আমাদের সময়কালে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছি প্রত্যক্ষ ভোটে। এরপর থেকে সাংগঠনিক বিধিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে যেহেতু নির্বাচন কেন্দ্রিক যারা এমপি ক্যান্ডিডেট থাকেন তাদের কতগুলো কনস্টিটিউয়েন্সি থাকে, এটার উপরে নির্বাচন সহযোগিতার কারণে সাংগঠনিক ছাত্রদলকে ওভাবে সাজানো হয়েছে। পরবর্তীতে যতটুকু দেখলাম আর কি… এরপর থেকে দেখলাম যে টোটালি সেন্ট্রালের উপর চলে গেছে, স্থানীয় প্রতি নির্বাচনের পদ্ধতি কিছু রাখে নাই।”

বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটি নির্ধারণের বিষয়টি কেমন দেখেন—এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি সমালোচনা না করে বলেন, “আমিও তো একজন সংগঠনের কর্মী, মূল দলের এখন সাংগঠন যেগুলি আছে সাধারণত এটা আমাদের সহযোগী সংগঠন হিসেবে তাদেরকে ব্যক্তিবদ্ধভাবে সেন্ট্রালি এখন করে এটা।”

এই প্রবণতা সংগঠনের ভেতরে কোন্দল বাড়াচ্ছে কি না—এ বিষয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেন, “আমি আসলে এই বিষয়ে সরাসরি কিছু এভাবে বলতে চাচ্ছি না। যেহেতু দীর্ঘকালীন একটা ফ্যাসিজমের ভিতরে সাংগঠনিক যে মানে কাজগুলো করার কথা ছিল সেভাবে করতে পারে নাই বলে, আমার কাছে মনে হয়েছে যে তারা সাংগঠনিকভাবে যে বিধিতে সংগঠনকে বোঝানোর কথা সে সুযোগটা তারা পায় নাই। সেটা বিএনপির ক্ষেত্রে হতে পারে, যুবদলের ক্ষেত্রে হতে পারে। তারপরে ছাত্রদল তো সেম একটি অবস্থায় ছিল।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার হলে সংগঠনগুলো আবার নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরবে।

“তো এখন যেহেতু একটা গণতান্ত্রিক সরকার দেশে প্রতিষ্ঠিত। তো বিএনপিও গণতন্ত্রের চর্চাটা আগের যে বিধি সে অনুসারে করবে এবং অঙ্গ সংগঠনগুলো সেভাবে চলবে। সহযোগী সংগঠন সেভাবে চলবে। এটাই আশা করছি। যেহেতু এখন গণতন্ত্র চর্চার একটা সুযোগ হয়েছে। আগে সুযোগ ছিল না।”

নিজের নেতৃত্বকাল প্রসঙ্গে আকতার চৌধুরী বলেন, “আমি প্রথমে ৯০ সালে আহ্বায়ক হয়েছি। আবার নির্বাচনের মাধ্যমে আমি জেলা ছাত্রদল সভাপতি হয়েছি। একবার ৯১ সালে আরেকবার ৯৩ সালে।”

‘ইলেকশন নয়, সিলেকশন’

জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাশেদুল হক রাসেল বলেন, “সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিলো ৭ম কমিটির। সেটি সীগাল হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাও ইলেকশন নয় সিলেকশন হয়েছিলো। ওইসময় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলো সৈয়দ আহমদ উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলো হাবিব উল্লাহ।”

সংকটের নতুন রূপ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংগঠনগুলোর কমিটি গঠন নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়। কাউন্সিলবিহীন কমিটি, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক বলেন, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার কথা বলা হলেও, তাতে বিরোধ কমবে নাকি আরও বাড়বে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কংক্রিট- লোহার ঘর নির্মাণ: বিতর্ক

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে নতুন ধরনের দুইতলা ঘর নির্মাণকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

স্থানীয়রা বলছে কংক্রিটের বেইজ, লোহার কাঠামো এবং পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, সব মিলিয়ে এই অবকাঠামো ‘অস্থায়ী নয়, বরং স্থায়ী বসতির ইঙ্গিত’।

আর এতে আপত্তি জানিয়ে বন বিভাগ বলছে, পাহাড়ও কাটা হয়েছে।

যদিও শরণার্থী কমিশন ও ইউএনএইচসিআর বলছে, এগুলো এখনো সম্পূর্ণ অস্থায়ী কাঠামো।

উখিয়ার কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পের এক্সটেনশন ‘ই’ ব্লকে অন্তত ৮৮৮টি দুইতলা শেল্টার নির্মাণ চলছে। যেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ কাজ শেষ। খোদ বন বিভাগ বলছে, নির্মাণকাজের জন্য ‘পাহাড় কেটে’ সমতল করা হয়েছে, পাশাপাশি তৈরি হয়েছে প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক।

বিষয় গুলো নিয়ে জানতে চাওয়া হয় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন এবং বন বিভাগ এর কাছে।

বন বিভাগের অভিযোগ: পাহাড় কেটে স্থাপনা

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এলাকায় পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য লোহার কাঠামোর (স্ট্রাকচারাল) দোতলা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি আমরা জেনেছি এবং এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি।

“এটি বন বিভাগের সংরক্ষিত জমি। কিন্তু ক্যাম্পের অভ্যন্তরের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকায় আমরা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। প্রায় কয়েক শত শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছে, ফলে খুব দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ এগোচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০-৯০০টির মতো শেল্টার নির্মাণের কাজ ৮০-৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

আব্দুল মান্নান বলেন, এই কাজের ফলে পাহাড় কাটা, গাছ নিধনসহ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু এত বড় পরিসরে কাজ হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “এলাকাটি আগে সংরক্ষিত বনভূমি ছিল। বর্তমানে সেখানে যেভাবে ভূমি সমতল করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আপনাদের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (RRRC) এবং ক্যাম্প ইনচার্জের বক্তব্যও নেওয়া উচিত।”

কমিশনারের বক্তব্য: “স্থায়ী কিছু নয়”

অন্যদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলছেন, এই কাঠামো নিয়ে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, ২০২১-২২ সালের দিকে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদিত নকশার ভিত্তিতেই এই ধরনের শেল্টার তৈরি হচ্ছে।

তার ভাষায়, “লোহার কাঠামো ব্যবহার করা হলেও সেগুলো নাট-বল্টুর মাধ্যমে বসানো, যাতে সহজেই খুলে ফেলা যায়। এটি কোনো স্থায়ী স্থাপনা নয়।”

কংক্রিট ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “পুরোপুরি কংক্রিটের বেইজ নয়, মূলত ফ্লোরের মতো একটি ভিত্তি দেওয়া হচ্ছে, যাতে কাঠামো মাটিতে সরাসরি বসানো না লাগে।”

পাহাড় কাটার অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে আপত্তি ওঠায় সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।

ইউএনএইচসিআর বলছে “নিরাপত্তার জন্য উন্নত নকশা”

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, নতুন শেল্টারগুলো মূলত দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য ডিজাইন করা।

সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ের যোগাযোগ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, শেল্টারে এখনো বাঁশ ও প্লাস্টিক শিটই প্রধান উপকরণ, সর্বোচ্চ ৩ ইঞ্চি ব্যাসের স্টিল পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পুরো কাঠামো নাট-বল্টুর মাধ্যমে যুক্ত, যাতে সহজে খুলে ফেলা যায়।

তার দাবি, “নির্মাণাধীন এসব শেল্টার কোনো স্থায়ী কাঠামো নয় এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী ধরনের অবস্থানের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। এই নকশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত। এটি নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্মিলিত মানবিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন। একইসঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে সম্মান জানায়, যেখানে নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বিবেচিত।”

স্থানীয়দের উদ্বেগ

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও নীতিগত অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট এক ফাঁক চোখে পড়ছে।

একদিকে বনভূমি কাটা, সড়ক নির্মাণ এবং দুইতলা কাঠামো, যা দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, এটি কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য উন্নত কিন্তু অস্থায়ী সমাধান।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী এই নির্মাণকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। তার মতে, “শক্ত অবকাঠামো তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাসের পথ তৈরি হবে, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।”

পাহাড়ি ভূমি বিক্রি করতে পাহাড়ে মন্দির নির্মাণ করান আবুল হোসেন

আফজারা রিয়া নুরুল হাসান

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের একটি পাহাড়চূড়ায় ছোট্ট একটি মন্দির। দূর থেকে এটি শান্ত ধর্মীয় আশ্রয়স্থল মনে হলেও, কাছে গেলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কাটা পাহাড়, দ্রুত গড়ে ওঠা বসতি এবং জমি ভাগ করে বিক্রির অঘোষিত এক বাণিজ্য।

সরকারি নথি অনুযায়ী, খুরুশকুল ইউনিয়নের প্রায় ৩০ শতাংশ জমি সংরক্ষিত বনভূমি, যার পরিমাণ প্রায় ৮০০ একর। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, এই বনভূমির বড় অংশই এখন বিলুপ্তপ্রায়। পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে, গাছ উজাড় করা হয়েছে, আর সেই জমি ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে বিক্রি করা হচ্ছে।

বে ইনসাইট অনুসন্ধান করে পেয়েছে, খুরুশকুলের পুলিশ্যাঘোনা এলাকায় একটি মন্দিরকে কেন্দ্র করে ‘নিরাপত্তার প্রতীক’ হিসেবে দেখিয়ে আশপাশের বনভূমি বিক্রি করার তথ্য।

সম্প্রতি খুরুস্কুলের পূর্ব হামজার ডেইলে পুলিশ্যার ঘোনা নামক পাহাড়ে নির্মিত ওই সার্বজনীন শ্রী শ্রী শিব কালী মন্দিরের সেবায়েত নয়ন দাশের মরদেহ পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর বেরিয়ে আসে পাহাড় বিক্রির এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মন্দিরের প্রবেশ মুখেই সাইনবোর্ডে লেখা জমিদাতা আবুল হোসেন। সাইনবোর্ডে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ থাকা সুকুমার ব্রহ্মচারীর কাছে জানতে চাওয়া হয় এই জমিদাতার বিষয়টি সম্পর্কে। তিনি বলেন, ৫-৬ বছর আগে ১০ গন্ডা জায়গা আবুল হোসেন আমাকে দান করেছিলেন মন্দির নির্মাণ করার জন্য।

কিন্তু সুকুমার ব্রহ্মচারীর বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানায়। তাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন তার এক বেয়াই। তার বেয়াইয়ের ওই পাহাড়ে দুই গন্ডা জায়গা রয়েছে বলে জানান সুকুমার।

“মন্দির আছে, সমস্যা হবে না”

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন ক্রেতা জানান, আবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তি তাদের কাছে প্রতি গন্ডা ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় এসব সরকারি বনভূমী বিক্রি করেছেন। এসব লেনদেন নোটারি করা কাগজের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলেও দাবি তাদের।

একজন ক্রেতার মতে, “মন্দির আছে, মানুষ আছে, এমন জায়গা দেখিয়ে বলা হয়েছে এখানে সমস্যা হবে না। তাই জমি কিনেছি।”

স্থানীয়দের ধারণা, ইতোমধ্যে অন্তত ৬০০ পরিবার সেখানে জায়গা কিনেছে। পুরো এলাকায় কাটা হচ্ছে পাহাড়, দখল বুঝাতে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে ঝুপড়ি ঘর।

এক ৫০ বছর বয়সী এক নারী (সঙ্গত কারণে নাম প্রকাশ করা হয়নি) জানান, “ছয় বছর আগে আমি ৮ গন্ডা জমি কিনেছি, প্রতি গন্ডা ২৫ হাজার টাকা করে। নোটারি দলিল করা হয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, কম দামে এখানে ছাড়া আর কোথায় পাবো?”

পাশেই থাকা আরেক নারী বলেন, “মন্দির হওয়ার পর আমরা প্রায় ২৫ পরিবার একসঙ্গে জমি কিনেছি। আমরাই প্রথম। সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। আমি ২ গন্ডা জমি নিয়েছিলাম ২৫ হাজার টাকা করে।”

এমন বেশ কিছু নোটারি করা দলিল হাতে এসেছে বে ইনসাইটের। যা যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অস্বীকার

অভিযুক্ত আবুল হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, “আমাদের পরিবার বহু বছর ধরে এই জমির দখলে ছিল। আমি জমি বিক্রি করিনি। বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছি এবং মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা দিয়েছি।”

সরকারি জমি ব্যবহারের জন্য তিনি কিভাবে সুযোগ করে দিয়েছেন, জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, আমি ফরেস্ট ভিলেজার, আমাকে এই পাহাড়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো ১৬-১৭ বছর আগে।

তবে বনবিভাগ বলছে, এই ধরণের কিছুই তাদের নেই।

প্রশ্ন উঠছে, সংরক্ষিত বনভূমি কীভাবে নোটারির মাধ্যমে হস্তান্তর হয় এবং সেই সুযোগে কীভাবে একটি আবাসন এলাকা গড়ে ওঠে?

এলাকাবাসীদের অনেকেই বলেছেন, আবুল হোসেনের রেজিস্ট্রি জমি রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে। তাই পার্শ্ববর্তী হিসেবে এই সরকারি বনভূমি তার পরিবার দখল করে বিক্রি করছেন। এরজন্য আবুল হোসেন বন বিভাগের কর্মকর্তাদেরও টাকা দিয়েছেন।

দালাল চক্র ও টার্গেটেড বিক্রি

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ক্রেতা বে ইনসাইটকে জানান, আবুল হোসেনের সঙ্গে দালাল হিসেবে কাজ করছেন চিত্ত রুদ্র ও রনি নামের দুই যুবক, যারা কক্সবাজার শহরে থাকেন। তারা মন্দিরের জন্য জমি ‘দান’ করা হয়েছে, এমন প্রচারণা চালিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে জমি বিক্রিতে সহায়তা করছেন এবং এর বিনিময়ে অর্থ নিচ্ছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, মন্দির নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে জমি বিক্রি সহজ করা।

প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা, বন উজাড়

সরেজমিনে খুরুশকুল-চৌফলদণ্ডী সড়কের পূর্ব পাশে অন্তত ২০-২৫টি স্থানে পাহাড় কাটার দৃশ্য দেখা গেছে। একইসঙ্গে চলছে গাছ নিধন।

স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহিম মাস্টার বলেন, “সংরক্ষিত বনভূমির অর্ধেকের বেশি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই কোনো পাহাড়ই অবশিষ্ট থাকবে না।”

বন বিভাগের খুরুশকুল বিট অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তারা হামলার শিকার হন। সীমিত জনবল ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কার্যকর অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

একজন বন প্রহরীর ভাষায়, “আমরা গেলে তারা দলবেঁধে আসে। নিরাপত্তা ছাড়া অভিযান চালানো সম্ভব না।”

নতুন বিট কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানিয়েছেন, একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তিনিও স্বীকার করেন, “এখানে এখন খুব বেশি বনভূমি অবশিষ্ট নেই।”

এই বিটে আগে দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তাকে পাহাড় কাটার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ফলে পুরো ব্যবস্থাপনাই এখন প্রশ্নের মুখে।

এমনকি পুলিশ্যার ঘোনা এলাকায় মন্দির নির্মাণ ও আশপাশের পাহাড়ি ভূমি বিক্রির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানায় খুরুশকুলের বিট কর্মকর্তা কামরুল হাসান।

নোটারি দলিল: বৈধতা নিয়ে সংশয়

বিভিন্ন ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া নোটারি দলিল যাচাই করে দেখা গেছে, এসব দলিলের মাধ্যমে বনভূমি ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষিত সরকারি জমি নোটারির মাধ্যমে হস্তান্তর আইনগতভাবে বৈধ কি না, তা নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

খুরুশকুল যেনো এখন শুধু বনভূমি হারানোর গল্প নয়, এটি এক রূপান্তরের চিত্র, যেখানে ধর্মীয় স্থাপনা, দরিদ্র মানুষের আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রভাবশালী চক্রের জমি বাণিজ্য একসঙ্গে চলছে।

ইউনূস সরকারকে ইউনিসেফ- “আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না”

বে ইনসাইট ডেস্ক

ঢাকার একটি শিশু হাসপাতালের মেঝেতে কনিকা আক্তারের কান্না থামছে না। পাশে দাঁড়িয়ে তার স্বামী মোহাম্মদ জাকির স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন তাদের ৬ মাস বয়সী মেয়ে রুহির দিক, যে এখন হাম ওয়ার্ডের একটি বিছানায় শুয়ে আছে।

রুহির যমজ বোন রিসা একই দিনেই হামে মারা গেছে। এখন রুহি সেই একই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন, যেখানে তার বোন শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল।

জাকিরের একটি প্রশ্ন হাসপাতালের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়- “যে আমার মেয়ের মতোই দেখতে, তাকে আমি কীভাবে কবর দেব?”

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ (Science.org) ঠিক এভাবেই শুরু করে বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করা হাম নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে উঠে এসেছে হাম নিয়ে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ভয়াবহ হাম (Measles) মহামারির মুখোমুখি, যেখানে মধ্য মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী এবং ২৫০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল শিশু রোগীতে উপচে পড়ছে। সেখানে শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগী, নিথর দেহ, আর মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়া শিশুর দৃশ্য এখন সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংকটের মূল কারণ: টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন

‘সায়েন্স’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭৫ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশ দীর্ঘদিন উচ্চ টিকাদান হার বজায় রাখলেও, এই প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের বিপ্লব-পরবর্তী টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয়।

বিপ্লবের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে।

ইউনিসেফ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সতর্ক করে দেয় যে এটি টিকাদান ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারি সৃষ্টি করতে পারে।

“আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না”

‘সায়েন্স’ কে বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন।
তার ভাষায়, “আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না।

তবে নতুন দরপত্র ব্যবস্থা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায় এবং টিকার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

২০২৫ সালে পরিকল্পিত অতিরিক্ত এমআর ক্যাম্পেইনও বাতিল হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী (পরে অপসারিত), ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯% উপযুক্ত শিশু হাম টিকা পেয়েছে।

শূন্যতা থেকে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ

প্রাদুর্ভাব শুরু হয় জানুয়ারিতে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে। এরপর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে।

এখন পর্যন্ত ২১,০০০-এর বেশি হাসপাতালে ভর্তি রোগী শনাক্ত হয়েছে।

২৩ এপ্রিল WHO সতর্ক করে জানায়, এই সংক্রমণ মিয়ানমার ও ভারতের দিকে ছড়িয়ে পড়ার “উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি” রয়েছে।

WHO একে বাংলাদেশের “হাম নির্মূলের পূর্ববর্তী অগ্রগতির বিপরীত যাত্রা” হিসেবে বর্ণনা করে

অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা: পরিস্থিতির বহুগুণ জটিলতা

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ২৮% শিশু খর্বাকৃত এবং ১০% শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।

ভিটামিন এ-এর ঘাটতি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে তিনটি জাতীয় ভিটামিন এ কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কম অর্থায়নপ্রাপ্ত হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো এই চাপ সামলাতে পারছে না।

আইইডিসিআর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন ‘সায়েন্স’কে বলেন, “এটি শুধু টিকাদানের ঘাটতি নয়, একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।”

সরকারের পদক্ষেপ ও নতুন সংকট ব্যবস্থাপনা

নতুন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয়।

এপ্রিল মাসে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু হয় এবং WHO ও Gavi-এর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

৫ এপ্রিল জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয় এবং ২০ এপ্রিল জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়। ভিটামিন এ বিতরণও পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান গতিতে এই ক্যাম্পেইন দ্রুত সংক্রমণ থামাতে পারবে না।

দোষারোপ, তদন্ত

সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেন।

রানা ফ্লাওয়ার্সও বলেন, এই টেন্ডার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তদন্ত হওয়া উচিত।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান ‘সায়েন্স’কে বলেন, সরকার ব্যবস্থাকে “স্বচ্ছতা ও পক্ষপাতমুক্ত কাঠামো”তে আনতে চেয়েছিল।

তিনি স্বীকার করেন, “হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ এ শিশুদের মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি।”

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ তার প্রতিবেদনে লিখেছে, ঢাকার হাসপাতাল থেকে গ্রামাঞ্চলের ক্লিনিক পর্যন্ত একই চিত্র, শিশুদের জীবন, যা একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কাছে হার মানছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয় রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা, টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন এবং কাঠামোগত দুর্বলতা মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন এক জনস্বাস্থ্য সংকটে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রভাব শুধু দেশ নয়—আঞ্চলিক পর্যায়েও বিস্তার লাভ করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মানুষের দখলে ৩৪ হাজার একর বন: রামুতে ফের বন্য হাতির আক্রমণে মা ও শিশুকন্যার মৃত্যু

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের রামু উপজেলায় ফের বন্য হাতির আক্রমণে এক মা ও তার তিন বছর বয়সী শিশুকন্যার মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার দিকে খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পশ্চিম খুনিয়াপালং এলাকার সৈয়দ কলোনীতে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন ছেমন আরা (২৫) এবং তার মেয়ে আসমা বিবি। তারা স্থানীয়ভাবে বসবাসরত মো. একরাম মিয়ার স্ত্রী ও সন্তান।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জয়নাল আবেদিন বাবুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ভোরের দিকে তিনটি বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। হাতিরা কয়েকটি বসতঘরের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং আশপাশের গাছপালা উপড়ে ফেলতে শুরু করে।

“হঠাৎ বিকট শব্দে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। একরাম মিয়াও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বের হন। এ সময় দুটি হাতি তাদের দিকে তেড়ে এলে তিনি বড় ছেলেকে নিয়ে পেছনের দিকে সরে গিয়ে বাঁচতে পারলেও তার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে সামনে পড়ে যান,” বলেন তিনি।

ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

পালানোর সুযোগ ছিল না

ইউপি সদস্যের ভাষ্য, হাতির পালটি ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক, ফলে সামনে পড়ে গেলে পালানোর সুযোগ ছিল না। তাণ্ডব চালানোর সময় হাতিরা আশপাশের আম ও কাঁঠাল খেয়ে পরে পাশের পাহাড়ে চলে যায়।

স্থানীয়দের বরাদ দিয়ে ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদিন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে খাবারের সন্ধানে হাতির পাল খুনিয়াপালং ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করছে, যা জনজীবনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ধোয়াপালং রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. তোসাদ্দেক হোসেন বলেন, “ঘটনার পর হাতির পালটিকে তাড়িয়ে গভীর বনে পাঠানো হয়েছে। তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

দখল আর বসতিতে সংকুচিত বনভূমিঃ বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত

বন বিভাগের তথ্য বলছে, এ অঞ্চলে মানুষ-হাতি সংঘাত নতুন নয়।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন জানান, তাদের অধীনে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার একর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং আরও প্রায় ১১ হাজার একর বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে। এছাড়া বনের ভেতরেও বিচ্ছিন্নভাবে বসতি গড়ে উঠেছে।

“আজকের ঘটনাস্থলটি ক্যাম্প থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের বনে। তবে বনের ভেতরে বসবাসকারী অনেকেই ঝুঁকিতে আছেন,” বলেন তিনি।

২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণাঞ্চলে ৬০ থেকে ৭০টি হাতি ছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৪টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর বিপরীতে মানুষ মারা গেছে অন্তত ৮ জন।

অন্যদিকে, উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের হিসাবে উত্তরের বনে ৭০ থেকে ৮০টি হাতি ছিল। গত এক বছরে একটি হাতি মারা গেছে, তবে গত দশকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহে সময় লাগবে।

তিনি জানান, ৭৪ হাজার একর বনভূমির মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার একর দখল হয়ে গেছে, যা নিয়ে মামলা চলছে।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন উজাড়, বসতি সম্প্রসারণ এবং খাদ্যসংকটের কারণে হাতিরা ক্রমেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নেকম’-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমান বলেন, “হাতির বিচরণক্ষেত্র কমে গেছে, খাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। তাই তারা লোকালয়ে চলে আসছে।”

তিনি আরও বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে বনভূমিতে চাষাবাদ করলেও ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পান না। ফলে কেউ কেউ হাতি ঠেকাতে বিদ্যুৎ ফাঁদ বা গুলি ব্যবহার করেন, এতে হাতিও মারা যাচ্ছে।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

শিক্ষক-সংকটে ধুঁকছে কক্সবাজারের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো: খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারে মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও প্রশাসনিক সংকটে চলছে। জেলার ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শুধু কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া বাকি ৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।

একইসঙ্গে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদেও রয়েছে বড় ধরনের শূন্যতা। শুধু টেকনাফ এজাহার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনো বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই। এমনকি দুই শিফটের প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-তেও নেই সহকারী প্রধান শিক্ষক।

বিষয়ভিত্তিক সহকারি শিক্ষক পদের ক্ষেত্রেও আছে ভয়াবহ সংকট। কোথাও কোথাও খন্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ মোট ৪৯টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৩৩ জন, শূন্য ১৬টি। কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ৪৯টির মধ্যে কর্মরত ৩৩, শূন্য ১৬টি।

রামু খিজারি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ২৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৫ জন, শূন্য ১৯টি। মহেশখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১৫টির মধ্যে কর্মরত ৬, শূন্য ০৯টি। কুতুবদিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১৫টির মধ্যে কর্মরত ৫, শূন্য ১০টি।

এছাড়া উখিয়া বহুমুখী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১৪টির মধ্যে কর্মরত ১০, শূন্য ৪টি ; চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ২৫ টির মধ্যে কর্মরত ১০, শূন্য ১৫টি; চকরিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ২৫টির মধ্যে কর্মরত ১১, শূন্য ১৪টি এবং টেকনাফ এজাহার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১০টির মধ্যে কর্মরত ৪, শূন্য ৬টি।

অর্থাৎ পুরো জেলায় ১৫৩ সহকারি শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছে ৯১ জন আর শূণ্য পদ আছে ৬২টি। ৮২ সিনিয়র সহকারি শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছে ৩৫ জন আর শূণ্য আছে ৪৭ জন।

তবে ব্যতিক্রম হলো পেকুয়া জিএমসি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এখানে ০৯টি পদের মধ্যে ৯ জনই কর্মরত আছে।

কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষক রাম মোহন সেন বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, “অনেকগুলো সেকশন সামলানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক সংখ্যা মাঝেমধ্যে আরও কমে যায়। নিয়মিত অধিদপ্তরে সব তথ্য পাঠানো হয়।”

তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক দূর-দূরান্তের জেলা থেকে এখানে যোগদান করেন। পরে বদলি নিয়ে চলে যাওয়ায় সংকট আরও বাড়ে।

সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে তিনি বলেন, “পদ আছে, কিন্তু পদায়ন নেই। আমাদের স্কুলে দুই শিফটের জন্য দুইজন সহকারী প্রধান শিক্ষকের পোস্ট আছে।”

কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনুপম দাশ বলেন, বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “আমাদের ২০টি সেকশন। গণিত শিক্ষকের ছয়জন থাকার কথা, কিন্তু আছেন মাত্র দুইজন। এতগুলো সেকশনে দুইজন শিক্ষক কীভাবে পাঠদান করবেন?”

তার ভাষায়, বাধ্য হয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে গণিত ক্লাস নিতে হয়, এতে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

“এখন প্রায়ই বলতে হয়—স্যার, আরেকটা ক্লাসে একটু যান। অমুক স্যার আসেননি, অমুক ছুটিতে আছেন। শিক্ষক স্বল্পতার মধ্যে এভাবে চালানো খুব কঠিন।”

মহেশখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, শিক্ষক সংকট এতটাই তীব্র যে খণ্ডকালীন শিক্ষক ছাড়া বিদ্যালয় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, “খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া উপায় নেই, না হলে স্কুল বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা চারজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোনোরকমে স্কুল চালাচ্ছি।”

বিদ্যালয়গুলোর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, শূন্য পদ দ্রুত পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।

তিনি বলেন, “শূন্য পদের তথ্য নিয়মিত সরকারকে পাঠানো হয়। দ্রুত পদ পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়।”

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের স্থানীয় প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় বাইরের জেলার শিক্ষকরা নিয়োগ পান, কিন্তু পরে বদলি নিয়ে চলে যান।

“স্থানীয় শিক্ষার্থীরা যদি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বেশি অংশ নিয়ে টিকতে পারে, তাহলে নিজ এলাকায় পোস্টিং দেওয়া সহজ হবে। নিজের এলাকায় থেকে নিজের এলাকার মানুষের সেবা করতে পারবে।”

কক্সবাজার উপকূলের নতুন স্বপ্ন ‘সামুদ্রিক শৈবাল’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া সৈকতে একসময় ঝিনুক কুড়িয়েই সংসারে সামান্য সহায়তা করতেন আনোয়ারা বেগম। মহেশখালী চ্যানেলের তীর থেকে সংগ্রহ করা সেই ঝিনুক বিক্রি করতে তিনি যেতেন শহরের বড়বাজারের বার্মিজ মার্কেটে, যেখানে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন প্রধান ক্রেতা।

সেই বাজারেই প্রথম তাঁর চোখে পড়ে কালো, চুলের মতো দেখতে এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল, যা দেখতে অনেকটা কালো সেমাইয়ের মতো। রাখাইন সম্প্রদায়ের রান্নায় ব্যবহৃত এই শৈবাল মূলত মিয়ানমার থেকে আসত।

আনোয়ারা ও তাঁর সঙ্গীরা দ্রুত বুঝতে পারেন, ভাটার সময় সৈকতে যে সামুদ্রিক আগাছার মতো উদ্ভিদ তারা দেখেন, সেটিই আসলে বাজারে বিক্রি হওয়া এই শৈবাল। চাহিদা দেখে তারা সৈকত থেকে সেই শৈবাল সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেন।

এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক বিজ্ঞানী তাঁদের কাছে শৈবাল চাষের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। শুরুতে অবাক হলেও পরে প্রশিক্ষণ ও চারা পেয়ে ধীরে ধীরে তাঁরা শৈবাল চাষে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে আনোয়ারা বেগম সপ্তাহে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন এই শৈবাল চাষ থেকে।

তিনি বলেন, “আগে সংসারের কাজ ছাড়া নিজের কোনো আয় ছিল না। এখন নভেম্বর থেকে টানা সাত মাস শৈবাল চাষ করা যায়। মাসে দুইবার ফসল তোলা যায়। কাজও খুব কম। বাঁশ, দড়ি আর চারা পানিতে বসিয়ে দিলেই ১৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়।

তিনি জানান, তিনি এখন দুই ধরনের শৈবাল চাষ করেন। একটি কালো, অন্যটি সবুজ। স্থানীয় রাখাইন বাজার ছাড়াও লামা, আলীকদমসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় এসব বিক্রি হয়।

ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে চাষ

বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক শৈবালের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক চাষ।

প্রথমদিকে অল্প কয়েকটি পরিবার প্রশিক্ষণ পেলেও এখন শুধু বারি-এর মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কৃষক নিয়মিত চারা পাচ্ছেন। এছাড়া জাইকা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় আরও প্রায় ৫০০ মানুষ কক্সবাজারে শৈবাল চাষ করছেন।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজারের তুলনায় উৎপাদন এখনও অনেক কম। বড় অর্ডার এলেও কৃষকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যায় না।

নুনিয়াছড়ার আরেক চাষি মরিয়ম বেগম বলেন, “চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে আমরা ঠিকমতো সরবরাহই দিতে পারছি না।”

গবেষণা থেকে বাণিজ্যে

কক্সবাজারে শৈবাল চাষ সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি বারি-এর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ।

তিনি ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শৈবাল চাষ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগ্রহ তৈরি করেন।

মোস্তাক বলেন, মূলত দুই ধরনের শৈবাল চাষ হচ্ছে, কালো, চুলের মতো ‘গ্রাসিলারিয়া’ এবং সবুজ, লেটুস পাতার মতো ‘উলভা’।

তিনি বলেন, “শৈবাল বিশ্বজুড়ে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনীসহ নানা শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ।”

তিনি জানান, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, ইনানী সৈকত ও কক্সবাজার উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেই শৈবাল জন্মায়।

শৈবালে বিটা ক্যারোটিন, বি ভিটামিন, ভিটামিন সি, ডি, ই ও কে রয়েছে। এটি সরাসরি খাওয়া যায়, আবার এর থেকে তৈরি আগার আইসক্রিম, মেয়োনিজ, ওষুধের ক্যাপসুল, মলম, ক্রিম, টুথপেস্ট, চকোলেট, লিপস্টিক, এমনকি রঙ তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।

মোস্তাক বলেন, গ্রাসিলারিয়ার চারা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা গেলেও উলভার চারা ‘বারি’ সরবরাহ করে। এই উলভা জাতটি জাপান থেকে আনা হয়েছে এবং এর বাজার চাহিদা বেশি।

চাষের জন্য কৃষকদের বাঁশ, ১০ মিটার দড়ি ও শৈবালের চারা দেওয়া হয়।

বাড়ছে উৎপাদন, বাড়ছে বাজার

বারি-এর গবেষণা সহকারী মাকসুদুল হক বলেন, গত বছর তারা এক হাজার দড়ি বিতরণ করেছিলেন, এ বছর তা বাড়িয়ে দুই হাজার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “প্রতি দড়ি থেকে মাসে প্রায় দুই কেজি উলভা উৎপাদন হয়। নুনিয়াছড়ায় আমরা খুঁটি-দড়ি পদ্ধতি এবং ভাসমান ভেলা, দুই পদ্ধতিতেই চাষ করছি।”

চাষি শফি আলম বলেন, তিনি ও তাঁর পরিবার লামা, আলীকদম এবং বান্দরবান শহরে শৈবাল বিক্রি করেন।

“শুকনো কালো শৈবাল কেজি ৩০০ টাকা, তাজা কালো শৈবাল ১০০ টাকা এবং শুকনো সবুজ শৈবাল ১,০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়,” বলেন তিনি।

ব্যবসায়ীদেরও আগ্রহ

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীও এখন কৃষকদের কাছ থেকে শৈবাল কিনে ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং কক্সবাজারের পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে সরবরাহ করছেন।

মেসার্স আলমগীর স্টোরের মালিক মো. নোমান বলেন, গত বছর তিনি দেড় লাখ টাকার শুকনো সবুজ শৈবাল কিনেছিলেন।

তিনি বলেন, “আমার মতো আরও চার-পাঁচজন ব্যবসায়ী এখন এই ব্যবসায় আছেন। কিন্তু কৃষকরা চাহিদামতো সরবরাহ দিতে পারছেন না। এজন্য আমরা নিজেরাও কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি, যাতে তারা উৎপাদন বাড়াতে পারেন।”

নোমান জানান, তিনি সবুজ শৈবাল অন্তত ১,৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তাঁর প্রধান ক্রেতা কক্সবাজারের কয়েকটি পাঁচ তারকা হোটেল। এছাড়া বিদেশ থেকেও অর্ডার আসে।

কক্সবাজারে ৪৮ ঘণ্টায় ৬ মরদেহ, অপহরণে মুক্তিপণ: পুলিশের দাবী আইনশৃঙ্খলা ‘স্বাভাবিক’ রয়েছে

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারে গত মঙ্গল ও বুধবার মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ছয়টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এবং একই সময়ে এক ইউপি সদস্যকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনার অভিযোগ ঘিরে জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার বলছেন, আইনশৃঙ্খলা “স্বাভাবিক” রয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।

সামগ্রিক বিষয়ের প্রেক্ষিতে বে ইনসাইট জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অপরাধ তো ঘটবেই, এটা বাস্তবতা। তবে আমরা সর্বোচ্চ তৎপরতা ও আমাদের সব মেকানিজম ব্যবহার করে কাজ করছি, যেন প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা যায়।”

পাহাড়ে ঝুলন্ত সেবায়েতের মরদেহ

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর নয়ন দাশ (৩৫) নামে এক মন্দির সেবায়েতের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ ছমিউদ্দিন জানান, বুধবার দুপুরে পূর্ব হামজার ডেইল এলাকার একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহটি পাওয়া যায়।

নয়ন দাশ ওই এলাকার নাগ পঞ্চমী মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার দোহাজারীর বাসিন্দা।

পরিবারের ভাষ্য, ১৯ এপ্রিল রাতে অজ্ঞাত কয়েকজন তাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন।

ওসি বলেন, “ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা নিশ্চিত হওয়া যাবে।”

টেকনাফে তিন যুবকের মরদেহ, ‘ডাকাত-মানবপাচারকারী’ দাবি পুলিশের

টেকনাফের বাহারছড়ার গহীন পাহাড় থেকে তিন যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ, যাদের ‘ডাকাতি ও মানবপাচার চক্রের সদস্য’ বলে দাবি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে উত্তর শীলখালী পাহাড়ে কাঠুরিয়ারা মরদেহগুলো দেখতে পান।

নিহতরা হলেন মুজিব উল্লাহ, নুরুল বশর ও রবিউল আওয়াল।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়, অপর দুজন হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

টেকনাফ থানার ওসি (তদন্ত) কামাল হোসেন বলেন, “অপহরণ ও মানবপাচারকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এ ঘটনা ঘটতে পারে।”

স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য, যেখানে জিম্মি করে রাখার ঘটনাও ঘটে।

ইউপি সদস্য অপহরণ, মুক্তিপণ না ‘উদ্ধার’ দ্বন্দ্বে দুই বক্তব্য

রামুর ঈদগাঁও–ঈদগড় সড়ক থেকে অপহৃত ইউপি সদস্য রুস্তম আলী (৪১) একই দিন রাতে ফিরে এলেও তার মুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

পরিবারের দাবি, ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হলেও দরকষাকষির পর ৮ লাখ টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে।

রুস্তম আলীর চাচা বলেন, “নির্ধারিত স্থানে নগদ টাকা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।”

তবে রামু থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলছেন, “অভিযান চালিয়েই তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, মুক্তিপণের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।”

পুলিশ সূত্র জানায়, রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং অপহরণের পেছনে পুরোনো বিরোধ বা অপরাধ জগতের দ্বন্দ্ব থাকতে পারে।

মুক্তিপণের পর উদ্ধার দেখিয়ে পুলিশ কোনো ক্রেডিট দেখাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার বলেন, “এই বিষয়ে এই মুহূর্তে আমার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। আমি জেনে আপনাকে জানাতে পারব।”

চকরিয়ায় বেড়িবাঁধে যুবকের মরদেহ

চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হাজিয়ান এলাকায় মাতামুহুরী নদীর বেড়িবাঁধ থেকে সাকিব (২৬) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ধারণা, তাকে হত্যা করে সেখানে ফেলে রাখা হয়েছে।

চকরিয়া থানার ওসি মনির হোসেন বলেন, “ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।”

রামুতে গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ

রামুর চাকমারকুল ইউনিয়নে তানিয়া আক্তার (২১) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

পরিবারের দাবি, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

রামু থানার ওসি জানান, “ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।”

পুলিশের অবস্থান: ‘আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক’

এতসব ঘটনার পরও জেলা পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার বলেন, “আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক আছে। তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়, তবে আমরা প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।”

উদ্বেগে স্থানীয়রা

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অপহরণ, ডাকাতি ও মানবপাচার দীর্ঘদিন ধরে চললেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

ঈদগাঁও–ঈদগড় সড়ককে ‘আতঙ্কের রুট’ হিসেবে উল্লেখ করে সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন, দিনের আলোয় একজন জনপ্রতিনিধি অপহরণের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।

তাদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ ছাড়া এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।