কক্সবাজারে পাহাড়ধসের বিভীষিকা, একরাতেই প্রাণ গেল ৯ জনের

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রবল বর্ষণে একের পর এক পাহাড়ধসে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও কক্সবাজার শহরে পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত নয়জন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী (ক্যাম্প-১৫) রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের চারটি স্থানে এবং কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনও কাটেনি। অনেক রোহিঙ্গা পরিবার পাহাড়ের ঢালে বসবাস করায় নতুন করে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে রাত দেড়টার দিকে উখিয়ার জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে কামাল হোসেনের ঘরের ওপর। ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে মারা যান কামাল হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমাইরা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। একই পরিবারের আরও দুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর কিছুক্ষণ পর, রাত দুইটার দিকে কুতুপালংয়ের ৭ নম্বর আশ্রয়শিবিরের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে মারা যায় সাত বছর বয়সী একরাম। সে রশিদ উল্লাহর ছেলে।

রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরের সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই ভাই—রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ভোর পর্যন্ত অভিযান চালায়। ভারী বৃষ্টি ও কাদার কারণে উদ্ধারকাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে ভোর সাড়ে চারটার দিকে কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু হয়। আলী আকবর (৫০) নামে ওই ব্যক্তির বাড়ির ওপর পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।

সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান,  আলী আকবর ও পরিবারের আরও দুজন মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরিবারের অন্য দুই সদস্য চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাম্পে মাইকিং করে সতর্কবার্তাও প্রচার করা হচ্ছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা কিংবা খাড়া ঢালে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টানা বর্ষণে মাটি নরম হয়ে গেলে মুহূর্তেই ধসে পড়ে পাহাড়ের অংশ, আর ঘুমন্ত মানুষের জন্য তা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী ফাঁদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *