সীমান্তের মৃত্যুর ‘বিচার’ কে করবে?

ইনসাইট রিপোর্ট

হোসনে আরা বেগম সেদিন দুপুরে রান্না করছিলেন।

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের ছোট্ট বাড়িটিতে তখন অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক জীবন চলছিল। চুলায় হাঁড়ি বসানো ছিল। পরিবারের সদস্যরা যার যার কাজে ব্যস্ত।

হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে একটি বিস্ফোরণ।

মিয়ানমারের ভেতরে চলমান সংঘর্ষ থেকে ছুটে আসা একটি মর্টারশেল এসে আঘাত করে তার রান্নাঘরে। ঘটনাস্থলেই মারা যান হোসনে আরা।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে।

কিন্তু তার ছেলে মো. ইব্রাহিমের কাছে এখনো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি মৃত্যুর নয়, বিচার নিয়ে।

“মা তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু মা হত্যার বিচারটাও কি হবে না?”

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ২৭১ কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য প্রশ্ন।

কেউ মর্টারশেলের আঘাতে নিহত হয়েছেন। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়েছেন। কেউ পাহাড়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন, আর ফিরে আসেননি।

প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন হয়েছে। কিছু পরিবার সামান্য আর্থিক সহায়তাও পেয়েছে।

কিন্তু এরপর?

মামলার অগ্রগতি নেই। দায় নির্ধারণ নেই। ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই কোনো দৃশ্যমান বিচারিক প্রক্রিয়াও।

ফলে সীমান্তবাসীর কাছে মৃত্যু যেন একটি পরিচিত বাস্তবতা। আর বিচার, একটি দূরবর্তী সম্ভাবনা।

রান্নাঘরে মর্টারশেল, মৃত্যু সনদে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’

২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘুমধুম ইউনিয়নের একটি বাড়িতে রান্না করছিলেন হোসনে আরা বেগম।

সেদিন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল। সেই সংঘর্ষের মধ্যেই একটি মর্টারশেল বাংলাদেশের ভেতরে এসে পড়ে।

মর্টারশেলে নিহত হোসনে আরা বেগম

বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন হোসনে আরা এবং এক রোহিঙ্গা শ্রমিক।

হাসপাতালের নথি ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ফোরণজনিত আঘাতের কথা উল্লেখ থাকলেও পরে পরিবার দেখতে পায়, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’।

ছেলে মো. ইব্রাহিমের কাছে বিষয়টি এখনো বোধগম্য নয়।

“মিয়ানমার থেকে বোমা এসে মানুষ মারা গেলে সেটা কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়?”

তার প্রশ্ন শুধু নিজের মায়ের মৃত্যুকে ঘিরে নয়। এটি সীমান্তের বহু পরিবারের অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি।

হোসনে আরার স্বামী বাদশা মিয়া মামলা করেছিলেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

পরিবারের ভাষ্য, একপর্যায়ে তাদের বলা হয়েছিল আসামি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

এরপর আর কোনো খবর তারা পায়নি।

২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই

হুজাইফার বয়স ছিল মাত্র ১২। বাড়ির উঠানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল সে। হঠাৎ সীমান্তের দিক থেকে আসা একটি গুলি তার শরীরে লাগে।

গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে চট্টগ্রাম, পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। ২৭ দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মারা যায় শিশুটি।

গুলি আসার সময় উঠানের যেখানে মেয়ে খেলছিলো, তাই দেখাচ্ছিলো জসীম উদ্দিন। ছবি- শাহীন মোবারক।

বাবা জসীম উদ্দিন এখনো ছেলের ব্যবহৃত কিছু জিনিস সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

তিনি বলেন, “সে তো কোনো যুদ্ধ করতেছিল না। একটা শিশু ছিল। তারপরও গুলি এসে তার জীবন নিয়ে গেল।”

ঘটনার সময় আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরএসওর মধ্যে গোলাগুলি চলছিল বলে স্থানীয়রা জানান।

পরিবার মামলা করেনি।

কারণ তারা জানে না, কার বিরুদ্ধে মামলা করবে।

“বিচার চাইব কার কাছে?”, প্রশ্ন করেন জসীম উদ্দিন।

সন্তানের মুখ দেখতে পারলোনা বাবা

২৪ মে। তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় কলাবাগানে কাজ করতে গিয়েছিলেন কয়েকজন শ্রমিক।

হঠাৎ বিস্ফোরণ। ঘটনাস্থলেই নিহত হন শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা, অক্যমং তংচঙ্গ্যা ও চিক্যং তংচঙ্গ্যা।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়ার ফাত্রাঝিরি এলাকার বাসিন্দা তিনজনই নিজ নিজ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তি।

শৈফুচিং মারা যাও্যার এক সপ্তাহ পর সন্তান জন্ম দেন স্ত্রী মাকিংচিং। ছবি- শাহীন মোবারক

শৈফুচিংয়ের স্ত্রী মাকিংচিংয়ের সন্তান জন্ম হয়েছে মাত্র সাত দিন আগে। সন্তানের মুখ দেখার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে স্বামীকে হারান তিনি।

“কলা বিক্রি করে টাকা আনার কথা ছিল। কিন্তু আর ফিরে আসল না।”

সরকারি সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন মাত্র কয়েক হাজার টাকা।

তারপর আর কিছু নয়। না কোনো মামলা। না কোনো তদন্তের খবর। না কোনো ক্ষতিপূরণ।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য অংসাই মারমা বলেন, “এটা ছিল খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরও দুজন মারা গেললো। তিনটি পরিবার একসঙ্গে নিঃস্ব হয়ে গেছে ভাই।”

‘কথা বলে লাভ কী?’

একই ঘটনায় স্বামী অক্যমং তংচঙ্গ্যাকে হারিয়েছেন দুকমালা তংচঙ্গ্যা। কিন্তু তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান না।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য, রাষ্ট্রের প্রতি তার ক্ষোভ এতটাই গভীর যে তিনি মনে করেন, কথা বলে কোনো লাভ নেই।

রাগে ক্ষোভে কথা বলেনা দুকমালা। ছবি- নুরুল হাসান।

দুকমালা তংচঙ্গ্যা দূর থেকে চিৎকার করে বলেন, “বিচার তো পাইনি। উল্টো এখন আমাদেরই দোষ দেওয়া হয়।”

এই নীরবতা সীমান্তবাসীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।

তারা দেখেছেন, মানুষ মারা যায়, আহত হয়, নিখোঁজ হয়; কিন্তু কোনো ঘটনার কোনো বিচারিক পরিণতি হয় না।

নিখোঁজ মানুষেরও খোঁজ নেই

ওয়ামং চাকমা প্রায় চার মাস ধরে নিখোঁজ।

ওয়ামং চাকমার স্ত্রী উসাসিং চাকমা জানান, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। তারপর আর ফিরে আসেননি।

চার মাসেও ফিরে আসেনি উসাসিং চাকমার নিখোঁজ স্বামী ওয়ামং চাকমা। ছবি- শাহীন মোবারক

বেঁচে আছেন কি না, তাও জানে না পরিবার। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পরিবার কোনো মামলা পর্যন্ত করেনি।

কারণ তাদের ধারণা, এতে কোনো ফল হবে না।

উসাসিং চাকমা বলেন, “পুলিশ ও বিজিবির সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা জানিয়েছে যে ওই এলাকায় যেতে পারবে না। ওয়ামং বর্তমানে বেঁচে আছেন কি না, তাও কোনো খবর নেই।”

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, সীমান্ত এলাকায় নিখোঁজ হওয়া অন্তত দুটি ঘটনার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি হয়েছে।

তিনি বলেন, “সুমন তঞ্চঙ্গ্যা এবং ওয়াইমং চাকমা নামে দুইজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বিষয়গুলো তদন্তাধীন আছে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, সীমান্তের দুর্গম এলাকায় তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতা সীমিত।

“সীমান্ত এলাকায় আইনগতভাবে বিজিবি মূল দায়িত্ব পালন করে। কোনো ঘটনা ঘটলে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হয়।”

নিজের দেশেই পা হারালেন হানিফ

টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মো. হানিফ নিজের মাছের ঘেরে যাওয়ার পথে মাইন বিস্ফোরণে একটি পা হারান।

ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের ভেতরেই। নাফ নদীর পাড়ে নিজের ঘেরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি।

পা হারানো মো. হানিফ। ছবি- নুরুল হাসান

হঠাৎ বিস্ফোরণ। এক মুহূর্তে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় একটি পা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিজিবির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন।

কিন্তু এরপর আর কোনো সহায়তা পাননি। এখন স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ছোট ভাইয়ের আয়ের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।

হানিফ জানান, নাফ নদীর আগে যে ঘের বা প্রজেক্টগুলো আছে, সেখানে বাঁধ থেকে প্রায় ২০ ফুট ভেতরে এই বিস্ফোরণ ঘটে। তাঁর মতে, মাইনগুলো আরও ভেতর পর্যন্ত ছড়ানো থাকতে পারে।

বর্তমানে তিনি কর্মহীন অবস্থায় বাড়িতেই থাকেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী ও একটি সন্তান রয়েছে। তিনি তাঁর মা-বাবার থেকে আলাদা থাকেন এবং বর্তমানে তাঁর ছোট ভাইয়ের উপার্জনেই পুরো সংসার চলছে।

মো. হানিফ বলেন, “মামলা করব কার বিরুদ্ধে? পুলিশও তো আসে নাই।”

সীমান্তের ভেতরে কী ঘটছে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্ত্রধারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর আনাগোনা রয়েছে।

কেউ রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথা বলেন। কেউ বলেন আরাকান আর্মির সদস্যদের কথা।

ছবি- নুরুল হাসান

আবার কেউ বলেন, কে কোন পক্ষের সেটা সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় নেই।

ফলে পাহাড়ে কাজ করতে যাওয়া, গবাদিপশু চরানো কিংবা বাগানে যাওয়াও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়ার ফাত্রাঝিরি এলাকার বাসিন্দা উলাসিং তংচঙ্গ্যা বলেন, “পাহাড়ে না গেলে আমাদের খাবার জোটে না। কিন্তু এখন গেলে মৃত্যুর ভয়।”

উলাসিং তংচঙ্গ্যার ভাষায়, এই এলাকার মানুষ পাহাড়ে কলা, পেঁপে, আদা, আম, কাঁঠাল এবং পানের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পাহাড়ে না যেতে পারলে তাদের খাবার জোটে না। বর্তমানে সেখানে যেতে না পারার কারণে তারা চরম আর্থিক ও খাদ্য সংকটে পড়েছেন।

বিজিবি কী বলছে?

৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খাইরুল আলম বলেন, সীমান্তে পাওয়া মাইনগুলোর উৎস নিয়ে তদন্ত চলছে।

প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির সংঘর্ষের সময় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু মাইন পুঁতে রাখা বা ফেলে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, “বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে চাই না।”

বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

“বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে যেন স্পর্শ না করে দ্রুত বিজিবিকে জানায়।”

তিনি আরও বলেন, সীমান্তের অনেক পাহাড়ি এলাকায় শূন্যরেখা স্পষ্ট নয়।

ফলে স্থানীয়রা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা বাংলাদেশের ভেতরে আছেন, নাকি সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য পাশে চলে গেছেন।

বিচারহীনতার এই চক্র কেন?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ সীমান্তের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি।

ছবি- শাহীন মোবারক

“সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা চলছে। সেখানে আরাকান আর্মি আছে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

“কিন্তু বাস্তবে সীমান্তের মানুষরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছে। সবাই জানে কী ঘটছে, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে খুব কম আলোচনা হয়।”

তার মতে, সীমান্তের এসব মানুষ কার্যত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকদের মধ্যে পড়ে।

“শহরের মানুষ নিরাপদে থাকে। সীমান্তের মানুষদের ঝুঁকি নিয়েই বাঁচতে হয়।”

আলতাফ পারভেজ বলেন, এই সীমান্তের মানুষগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। তারা ক্ষমতার রাজনীতির অংশ নয়। তাই তাদের মৃত্যু নির্বাচনী ইস্যু হয় না।

রাষ্ট্রের করণীয় কী?

মিয়ানমারের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।

কারণ অধিকাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠী।

“আরাকান আর্মির মতো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরাসরি বিচারিক ব্যবস্থা নিতে পারে না। কিন্তু সীমান্তে মাইন শনাক্তকরণ, মাইন অপসারণ এবং প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।”

তার মতে, বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করা।

সীমান্তের মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?

হোসনে আরা। হুজাইফা। শৈফুচিং। অক্যমং। চিক্যং। ওয়ামং। হানিফ।

এগুলো কেবল কয়েকটি নাম।

কিন্তু এই নামগুলোর ভেতর লুকিয়ে আছে সীমান্তবাসীর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা, ভয় এবং বিচারহীনতার ইতিহাস।

তারা যুদ্ধ করেনি। তারা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য নয়। তারা কেবল নিজেদের ঘরে ছিল, জমিতে কাজ করছিল, মাছ ধরছিল, সন্তান লালন করছিল।

কিন্তু যুদ্ধের মূল্য দিতে হয়েছে তাদেরই।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ভেতরে একজন নাগরিক যদি মর্টারশেলে মারা যান, গুলিতে নিহত হন, মাইন বিস্ফোরণে পঙ্গু হন বা নিখোঁজ হয়ে যান- তবে সেই ঘটনার দায় কার?

“আর যদি দায় নির্ধারণই না হয়, তাহলে বিচার আসবে কোথা থেকে? এক কথায় রাষ্ট্রকেই তাঁর নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে।”

সীমান্তে মানুষ মরছে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন হারিয়ে যাচ্ছে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাও, এবং সেটিই হয়তো এই গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

আব্দুল মন্নান প্রশ্ন তোলেন, “সীমান্তের মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?”

টেকনাফের ঘরে ঘরে মায়ের আর্তনাদ ‘আমার ছেলে কই’?

আব্দুর রহমান, টেকনাফ | কক্সবাজার

কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রের ঢেউ কখনো শুধু পানি নয়, কখনো তা বয়ে আনে কান্না, হারিয়ে যাওয়ার গল্প, আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস। টেকনাফের উপকূলে আজ ঢেউ ভাঙে ঠিকই, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে মিশে থাকে অসংখ্য মায়ের আর্তনাদ “আমার ছেলে কই?”

শাহপরীর দ্বীপের সরু গলিতে, বিকেলের মাঠে, কিংবা নাফ নদীর পাড়ে, যেখানে একসময় শিশুদের হাসি, ফুটবলের দৌড় আর স্বপ্নের উড়ান ছিল, সেখানে এখন অনিশ্চয়তার ছায়া।

টেকনাফে এখন রাত নামলেই শুধু অন্ধকার নামে না, নামে আতঙ্ক। সমুদ্রপথে ভেসে যায় স্বপ্ন, আর তীরে বসে থাকে পরিবার। কেবল অপেক্ষায়, প্রতীক্ষায়, আর অবিরাম কান্নায়।

প্রলোভনের ফাঁদে নিখোঁজ আনাছ

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের কিশোর মোহাম্মদ আনাছ। বয়স মাত্র ১৪। স্থানীয় হাজি বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ফুটবল ছিল তার স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নই তাকে ঠেলে দেয় অন্ধকারে।

বিদেশে ফুটবল খেলার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় দালালচক্র তাকে ঘর থেকে বের করে আনে। পরে মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় আরেক দালাল চক্রের কাছে। সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাকে তুলে নেওয়া হয় একটি নৌকায়।

পরিবারের সঙ্গে শেষ যোগাযোগ হয় একটি ফোন কলে। ওপার থেকে দাবি করা হয় তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ। না দিলে হত্যার হুমকি।

ধারদেনা করে সেই টাকা জোগাড় করে পরিবার। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আনাছ আর ফেরেনি।

“টাকা দিলাম, ছেলেকে পেলাম না”

আনাছের মা ছমুদা বেগমের কণ্ঠে এখনও অপেক্ষা আর হতাশা:

ফুটবল খেলার কথা বলে আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। পরে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে তিন লাখ টাকা নিল। এখনো আমার ছেলেকে ফেরত দেয়নি। পুলিশের কাছেও গেছি, কোনো বিচার পাইনি।

পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত দালালরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আনাছের মা ছমুদা বেগম বলেন, “মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা ‘দালাল’ ইব্রাহীমের কথা মতো তার ভাতিজা স্থানীয় মো. ফারুকসহ স্বজনকে তিন লাখ টাকা দিই। তবে এখনও ছেলেকে ফিরে পাইনি। এ বিষয়ে স্থানীয় পুলিশসহ জনপ্রতিনিধির কাছে অভিযোগ দিয়েছি, তবে কোনো সুরাহা হয়নি।”

খেলতে গিয়ে আর ফেরা হয়নি

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উত্তরপাড়ার একটি সাধারণ পরিবার। সেখানেই থাকতেন আব্দুর রহমান। সবার মতোই স্বাভাবিক জীবন, ছিলো হাসি, গল্প আর স্বপ্নে ভরা দিনগুলো।

কিন্তু একদিন বিকেলে খেলতে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি।

প্রথমে পরিবার ভেবেছিল, হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও গেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, রাত পেরিয়ে দিন কিন্তু আব্দুর রহমানের কোনো খোঁজ মেলেনি। উদ্বেগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় আতঙ্কে।

কয়েকদিন পর হঠাৎ করেই আসে সেই ফোন কল, অচেনা নম্বর অপর প্রান্তে অচেনা কণ্ঠ। সেখান থেকেই জানা যায়, স্থানীয় দালালচক্রের মাধ্যমে তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে।

এরপর শুরু হয় দুঃস্বপ্নের আরেক অধ্যায়।

আব্দুর রহমানের ভাই আব্দুস সালাম বলেন,

ওকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর আমাদের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করে। না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমরা তো গরিব মানুষ, এত টাকা জোগাড় করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পরিবারের প্রতিটি দিন এখন অনিশ্চয়তায় কাটে। ফোনের অপেক্ষা, কোনো খবরের আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা, সবকিছু যেন এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।

আব্দুর রহমান বেঁচে আছে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরও আজ তাদের কাছে অজানা।

পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ চিত্র

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী:

  • ২০১৬–২০২৫ পর্যন্ত কক্সবাজারে ৩,১৩৪ জন মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করা হয়েছে
  • তাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা
  • ১১৫টি মামলা হয়েছে উখিয়া-টেকনাফ থানায়
  • আসামি করা হয়েছে প্রায় ১,১০০ জনকে
  • আটক হয়েছে প্রায় ৬০০ পাচারকারী

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে সাগর থেকে ২৬৩ জন নারী-শিশুসহ যাত্রীকে উদ্ধার করে নৌবাহিনী। আটক করা হয় পাচারচক্রের ১০ সদস্যকে।

নতুন রুট: ছোট ট্রলার থেকে গভীর সমুদ্র- যেভাবে সক্রিয় দালালচক্র

সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপের ঘোলার চর এলাকা ঘিরে পাচার তৎপরতা নতুন করে বেড়েছে বলে অভিযোগ।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি কয়েকটি ধাপে কাজ করে।

প্রথম ধাপে, স্থানীয় দালালরা গ্রামের কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করে। কেউ ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখায়, কেউ বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে খেলতে বের হওয়া বা ঘরের বাইরে থাকা অবস্থায় সরাসরি অপহরণ করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে, ভুক্তভোগীদের দ্রুত গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিবার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগেই তাদের উপকূলীয় নির্জন পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে ছোট ট্রলার।

তৃতীয় ধাপে, রাতের আঁধারে এসব ট্রলারে করে তাদের গভীর সমুদ্রে নেওয়া হয়। সেখানে অপেক্ষমান বড় জাহাজ বা ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়, যেগুলো মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

চতুর্থ ধাপে শুরু হয় মুক্তিপণের খেলা। ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, বিদেশে অবস্থানরত চক্রের সদস্যরা ফোন করে কয়েক লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে নির্যাতন, এমনকি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের কান্না বা নির্যাতনের শব্দও ফোনে শোনানো হয়, যাতে পরিবার দ্রুত টাকা জোগাড় করে।

পঞ্চম ধাপে, মুক্তিপণ আদায়ের পরও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের আর খোঁজ মেলে না। কেউ নিখোঁজ থাকে, কেউ মারা গেছে, এমন আশঙ্কা থেকে যায় পরিবারের মধ্যে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বে ইনসাইট জানতে পারে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্থানীয় দালালদের পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে। স্থানীয়ভাবে যারা লোক সংগ্রহ করে, তারা বিদেশে থাকা চক্রের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করে এবং পরে মুক্তিপণের অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়।

ভুক্তভোগী পরিবার গুলোর দাবি, এদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে কাজ করে আসছে এবং এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় সহজে আইনের আওতায় আসছে না।

এই প্রক্রিয়ায় অনেককে জোরপূর্বক নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাতের আঁধারে ১৫ পয়েন্টে পাচার

টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে নিয়মিত পাচার চলছে বলে খোঁজ পেয়েছে প্রতিবেদক। এসব কাজে জড়িত রয়েছে একটি সুসংগঠিত দালাল নেটওয়ার্ক।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে একাধিক স্থানীয় দালালের নাম, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

অভিযুক্ত দালালদের তালিকা

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে।

তারা হলেন- মোহাম্মদ তাহের, মোহাম্মদ ইসমাইল, শাহাব মিয়া, মো. আজগর, নুরুল নবী, হেলাল উদ্দিন, মো. ফেরুজ, পোয়া মাঝি, শওকত আলম, নজির আহমেদ, আবু তাহের, মাম্মা, নজরুল পুতু, লাল মিয়া, শাহজান মিয়া, সৈয়দ উল্লাহ, মো. শামীম কাসু, মো. ফয়সাল, আব্দুল আমিন, মো: হোসন, প্রকাশ মাহসন, মো. হাসান (প্রকাশ আতুড়ি), রেজাউল করিম (মোরাদ), মাহামুদুল হক, মোহাম্মদ আমিন (প্রকাশ বদ্দা মাঝি), আজিজুল হক, মোহাম্মদ দেলোয়ার, জামাল হোছন এবং মোহাম্মদ রফিক (প্রকাশ বার্মায়া রফিক)।

তবে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

পুলিশের অবস্থান: “অভিযান চলছে”

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন:

মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। এটি প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ তৎপর। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়াগামী ট্রলার সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

অপেক্ষার প্রহর

টেকনাফের উপকূলজুড়ে এখন এক অদৃশ্য আতঙ্ক। সাগরের ঢেউ যেমন ফিরে আসে, তেমনি কি ফিরবে হারিয়ে যাওয়া সন্তানেরা?

আনাছের মা এখনও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রতিটি শব্দে চমকে ওঠেন, হয়তো এবার ফিরবে তার ছেলে। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, সেই আশা ততই ফিকে হয়ে আসছে।

একটা প্রলোভন, একটা ডাকে সাড়া। “বিদেশে খেলতে যাবে?” এরপরই নিখোঁজ হয়ে যায় আনাছের মতো শত শত কিশোর।

ঘর থেকে বের হওয়া সেই ছোট্ট পা, ফিরে আসে না আর। ফোন আসে, দাবি আসে, ভয় আসে। ফিরে আসে না শুধু মানুষটা।

কক্সবাজার হাসপাতালের লিফট দুর্ঘটনা: ‘মারাত্মক ত্রুটি’ বলছেন যন্ত্র প্রকৌশলীরা

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে লিফটের নিচে চার দিন নিখোঁজ থাকা এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সামনে এসেছে লিফটের সম্ভাব্য মারাত্মক ত্রুটির প্রশ্ন। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে কয়েকজন যন্ত্র প্রকৌশলী বলছেন, লিফটের দরজা যেভাবে খোলা হয়েছে, তা স্বাভাবিক কোনো নিরাপদ লিফটে হওয়ার কথা নয়।

নিহত কোহিনূর আক্তারের ঘটনায় পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ বে ইনসাইট কয়েকজন যন্ত্র প্রকৌশলীর কাছে পাঠিয়ে মতামত নেয়। তারা জানান, ফুটেজে দেখা যায়, নারীটি চতুর্থ তলায় এসে লিফটের দরজা জোর করে খুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন এবং পরে লিফট শ্যাফটে পড়ে যান বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যন্ত্র প্রকৌশলীদের মতে, আধুনিক লিফটে সাধারণত ইন্টারলক সিস্টেম থাকে। অর্থাৎ লিফটের কেবিন নির্দিষ্ট তলায় উপস্থিত না থাকলে দরজা খোলার কথা নয়। একইভাবে দরজা খোলা থাকলে লিফট চলতে পারে না। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাই লিফট দুর্ঘটনা প্রতিরোধের মূল ভিত্তি।

যন্ত্র প্রকৌশলী হাসিনুর রেজা চঞ্চল বলেন, “যদি লিফট পঞ্চম তলায় থাকে, তাহলে চতুর্থ তলায় দাঁড়িয়ে এত সহজে দরজা খোলা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। দরজা খুলতে গেলে সাধারণত শক্ত ইন্টারলক বাধা দেয়। যদি জোর প্রয়োগে দরজা খুলে যায় এবং নিচে শ্যাফট খোলা থাকে, তাহলে সেটি লিফটের মারাত্মক ত্রুটির ইঙ্গিত।”

এ ধরনের লিফটে সেন্সর, ডোর লক ও একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু দরজা খুলে সরাসরি শ্যাফটে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে সেটি বোঝায় যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো হয় কাজ করছিল না, নয়তো লিফটটি দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি।

প্রকৌশলী সুষ্ময় বড়ুয়া জানান, কোনো ব্যক্তি জোর প্রয়োগ করলে কখনও কখনও দরজা আংশিক খুলে যেতে পারে। কিন্তু তখনও লিফটের কেবিন সেই তলায় না থাকলে সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।
তাদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই বোঝায় লিফটটি নিরাপদ ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলতে পারে।

তারা বলেন, হাসপাতাল, শপিং মল বা জনসমাগমস্থলের ভবনে ব্যবহৃত লিফটের নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। অন্যথায় এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।

এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তাগিন মাহমুদ সোহেল জানান, হাসপাতালের লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, “লিফটটি আমরা মাসে একবার পরিদর্শন করি।”

লিফটের সম্ভাব্য ত্রুটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনেক সময় দরজা খোলা যায়। তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখবো। আগামীকাল আমাদের একটি টিম সরেজমিনে গিয়ে লিফটটি পরীক্ষা করবে।”

এদিকে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজন অভিযোগ করেছেন, লিফটের সেন্সর ঠিকমতো কাজ না করার বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই নানা অভিযোগ ছিল। তাদের দাবি, অনেক সময় দরজা ঠিকমতো খোলে না বা দরজা খুললেও লিফট সেই তলায় থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সিসিটিভিতে দেখা ঘটনাটি সত্যিই প্রযুক্তিগত ত্রুটির ফল হয়, তাহলে এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয় বরং জননিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিতও হতে পারে।

এ কারণে লিফটের ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের মান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

কী বলছে পুলিশ
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দিন বলেন, “নারীটি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তিন দিন আগে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তার সন্ধানে অনুসন্ধান শুরু করি এবং তথ্য সংগ্রহ করছিলাম।”

তিনি বলেন, “শনিবার খবর পাই হাসপাতালের লিফটের নিচে একটি মরদেহ পড়ে আছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় মরদেহটি উদ্ধার করে।”

ওসি জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে ঘটনার দিন কোহিনূর লিফটে করে চতুর্থ তলায় যান এবং পরে আবার ফিরে এসে লিফটের দরজা জোর করে খোলার চেষ্টা করেন। এরপর লিফটে ওঠার সময় তার পা পিছলে গিয়ে শ্যাফটে পড়ে যেতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

“তবে এটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে,” বলেন তিনি।

কী বলছে পরিবার
নিহতের ভাশুরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “চার দিন ধরে আমরা বিভিন্ন জায়গায় কোহিনূরকে খুঁজেছি। পুলিশ এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)কেও বিষয়টি জানিয়েছি।”

তিনি বলেন, “আজ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বুঝতে পারি, নিখোঁজ হওয়ার দিন তিনি চতুর্থ তলায় লিফটে ঢুকেছিলেন। এরপর তাকে আর বের হতে দেখা যায়নি।”

মামুন বলেন, “এটি সত্যিই লিফট দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে সেটি সঠিকভাবে তদন্ত করে বের করা উচিত।”

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তাগিন মাহমুদ সোহেল বলেন, নিখোঁজের অভিযোগ পুলিশের কাছে যাওয়ার পর শনিবার সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে।

তিনি বলেন, “বুধবারের ফুটেজে দেখা যায়, দুপুর প্রায় ১টার দিকে তিনি চতুর্থ তলায় লিফট থেকে বের হয়ে আসেন। কিছুক্ষণ পর লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি আবার ফিরে এসে দুই হাত দিয়ে দরজা জোর করে খুলে ফেলেন এবং পেছন দিকে ঘুরে লিফটে ঢোকেন। এরপর তাকে আর কোনো তলায় নামতে দেখা যায়নি।”

তিনি আরও বলেন, “পরে ফুটেজ পর্যালোচনার পর হাসপাতালের কর্মীরা লিফটের নিচে গিয়ে খোঁজ করলে সেখানে কোহিনূরের আংশিক পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়া যায়।”

আরএমও জানান, ভোরের দিকে লিফটটি নিচে নামার সময় কর্মীরা দুর্গন্ধ টের পান। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল কোনো প্রাণী মারা গেছে। পরে সেখানে নিখোঁজ রোগীর স্বজনের মরদেহ পাওয়া যায়।

উখিয়ায় গৃহবধূ ‘ধর্ষণ ও হত্যা’: মেঝের মাটি খোঁড়া ছিলো, জমি বিরোধ চাচাতো-জেঠাতো ভাইদের সাথে

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় গৃহবধূ লায়লা বিবিকে হত্যার ঘটনায় ধর্ষণের অভিযোগ উঠলেও বিষয়টি নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষার কথা বলছে পুলিশ।

মঙ্গলবার ভোররাতে উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের পূর্ব মরিচ্যা মধুঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত লায়লা বিবি মালয়েশিয়া প্রবাসী আব্দুর শুক্কুরের স্ত্রী। তিনি তিন সন্তানের জননী ছিলেন এবং সন্তানদের নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করতেন।

উখিয়া থানার ওসি নুর আহমদ বলেন, “তাকে হত্যা করা হয়েছে, এটি নিশ্চিত। তবে ধর্ষণের বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না। ফরেনসিক প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।”

সুরতহাল প্রতিবেদনে তার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কপালে গুরুতর জখম, হাতে আঘাত এবং ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে।

ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার মধ্যরাতে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে জানিয়ে ওসি বলেন, মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ কাজ করছে।

এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশীদের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডটির সঙ্গে ওই বিরোধের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

নিহতের ভাসুর আব্দুল আলম বলেন, ভোরে সেহরি প্রস্তুতের সময় দুই থেকে তিনজন মুখোশধারী ব্যক্তি দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে লায়লা বিবিকে মারধর করে হত্যা করে।

“পরে তার সন্তানরা দেখতে পেয়ে আমাদের খবর দেয়। আমরা এসে পুলিশকে জানাই,” বলেন তিনি।

তিনি আরও দাবি করেন, উদ্ধারের সময় লায়লা বিবির শরীরে কোনো কাপড় ছিল না এবং হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো অবস্থায় ছিল।

নিহতের শ্বশুর জাফর আলম বলেন, “জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। এর আগেও বাড়িতে হামলা হয়েছিল। এবার আমার ছেলের বউকে মেরে ফেলেছে।”

শাশুড়ি মনোয়ারা বেগমের দাবি, খাটের নিচে মেঝে খুঁড়ে রাখা ছিল, যা দেখে তাদের ধারণা, লাশ গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

প্রবাসী স্বামী আব্দুর শুক্কুর হোয়াটসঅ্যাপে জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে স্ত্রীর সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। পরদিন সকালে আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি হত্যার খবর পান।

তিনি বলেন, “তিন বছর ধরে আমি মালয়েশিয়ায় আছি। জমি নিয়ে চাচাতো ও জেঠাতো ভাইদের সঙ্গে বিরোধ চলছে। তাদের সন্দেহ করছি, তবে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্তের দাবি জানাই।”

হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, “পুলিশ তদন্ত করছে। পরিষদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে।”

বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় ওসি নুর আহমদ জানান, মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মামলা হলেই জানা যাবে আসামির সংখ্যা ও পরিচয়।

পর্যবেক্ষণ শেষে অস্ত্রোপচার হতে পারে গুলিবিদ্ধ শিশুর

কক্সবাজার | ইনসাইট স্টোরি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলিতে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি শিশু হুজাইফা আফনানকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিটি স্ক্যান রিপোর্ট পাওয়ার পর তার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হবে।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

রোববার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছায় বলে জানান চমেক পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আলাউদ্দিন তালুকদার।
রাত ৯টার পর শিশুটির চাচা মৌলভী শওকত বে ইনসাইটকে বলেন, “চিকিৎসকরা শিশুটিকে আইসিইউতে নিয়েছেন। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট পাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জানিয়েছেন।”

মৃত্যুর গুজব, পরে সংশোধন

রোববার সকালে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোকন কান্তি রুদ্র প্রথমে জানান, মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী নিহত হয়েছে।

তবে দুপুরে এই তথ্য সঠিক নয় বলে বে ইনসাইটকে নিশ্চিত করেন হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল। তিনি বলেন, “শিশুটি মারা যায়নি।”

পরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস বে ইনসাইটকে বলেন, “শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্রথমে মৃত্যুর কথা শোনা গেলেও তা সঠিক নয়। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে।”

কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলো আফনান

১২ বছর বয়সী হুজাইফা আফনান টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জসিম উদ্দীনের মেয়ে। সে লম্বাবিল হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।

শিশুটির দাদা আবুল হাসেম বলেন,“সকালে আফনান নাশতা আনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। ফেরার সময় উঠানে হঠাৎ একটি গুলি এসে তাকে আঘাত করে। সে সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে।”

পরে তাকে প্রথমে উখিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বেলা ১২টার পর সেখান থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয় তার পরিবারের সদস্যরা।

সীমান্তের ওপারে কী চলছিল

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তোতার দ্বীপ এলাকা, যেটি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিপরীতে। স্থানীয়রা জানায়, যেখানে শনিবার রাত প্রায় ১১টা থেকে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলে।

এই সময় টানা গুলিবর্ষণ, মর্টারশেল বিস্ফোরণ ও ড্রোন হামলার শব্দ শোনা যায়। সংঘর্ষ চলাকালে সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে আফনানকে আঘাত করে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস জানান, “গুলিটি তার কানে লেগেছে।”

দ্বিমুখী আক্রমণে পড়ার দাবি সশস্ত্র গোষ্ঠীর

মিয়ানমারে থাকা একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একজন গ্রুপ কমান্ডার (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বে ইনসাইটকে রোববার দুপুরে ওয়াটসএপে বলেন, “আমরা দ্বিমুখী আক্রমণে পড়েছি। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। একদিকে জান্তা অন্যদিকে আরাকান আর্মি”।

তিনি জানান, “ভোর থেকে যারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, তারা নবী হোসেন গ্রুপ ও আরএসওর সদস্য হতে পারেন।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের চাপে অনেক সদস্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছেন।

‘টিকতে না পেরে পালিয়ে এসেছি’ – সশস্ত্র সদস্যের স্বীকারোক্তি

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাদেক নামের এক যুবক গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি নবী হোসেন গ্রুপের সদস্য।


তিনি বলেন,“আমরা আরাকান আর্মির সাথে টিকতে পারিনি। তাই পালিয়ে এসেছি।”


সাদেকের ভাষ্য, “আমাদের অনেক মানুষ ছিল। কে কোথায় গেছে ঠিক নাই। তোতার দ্বীপে আমাদের সাথে আরাকান আর্মির তুমুল যুদ্ধ হয়েছে।”

উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ও সড়ক অবরোধ

এদিকে রোববার সকালে বাংলাদেশী শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী উখিয়া–টেকনাফ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ ছিল।
পরে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সীমান্তবাসীর আতঙ্ক

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা বলেন, “গত দুই–তিন দিন ধরে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তবে শনিবার রাত ১১টার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গুলিবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।”

রোববার রাত সাড়ে ৯টায় স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাকিল বলেন, “দুপুর ১২টার পর থেকে আর গুলির শব্দ পাওয়া যায়নি। এখন সীমান্ত শান্ত রয়েছে। তবে প্রায় প্রতিদিন রাত বাড়লেই গোলাগুলি শুরু হয়।”

অনুপ্রবেশ ও আটক

সংঘর্ষের মধ্যে নাফ নদী ও স্থলসীমান্ত পেরিয়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান,“সীমান্ত অতিক্রম করে আসার পর মোট ৫৩ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে।”

রাতে টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, “আটকদের থানায় আনা হয়েছে। যাচাই-বাছাই চলছে। তাদের কাছে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি। আইনী প্রক্রিয়া চলছে”।

নিরাপত্তা জোরদার, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে

উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, “সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও স্থলসীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।”

সীমান্তে আপাতত গোলাগুলি বন্ধ থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি।

কক্সবাজারে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পায়নি সংশ্লিষ্টরা, বলছে “গুজব ও প্রতারণা”

কক্সবাজার | ইনসাইট স্টোরি

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চললেও, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ও পুলিশ।

তবে সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো তথ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে সংঘবদ্ধ অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টার তথ্য উঠে এসেছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

“না, আমরা কোনো প্রমাণ পাইনি। এগুলো মূলত গুজব। কয়েকটি সভায় আমরা স্পষ্টভাবে সবাইকে গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ করেছি,” বলেন তিনি।

আটক ও জব্দ: কী বলছে গোয়েন্দা তথ্য

সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর এলাকার একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের একজন সদস্য এবং একজন পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়।

পরবর্তীতে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং একটি পুলিশের ব্যাগ জব্দ করে তাদের কক্সবাজার সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।

আটক ব্যক্তিরা কারা

সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা হলেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্য পেকুয়ার ফজলুল হক ও পরীক্ষার্থী কুতুবদিয়ার জেসমিন আক্তার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা বে ইনসাইটকে বলেন, গোয়েন্দা তৎপরতার ভিত্তিতে ‘প্রশ্ন ফাঁসের’ অভিযোগেই তাদের আটক করা হয়। ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষার্থীকে উত্তর বলে দিচ্ছিলেন বাইরের একজন।

বে ইনসাইট জানতে চায় তা ‘ফাঁসকৃত’ প্রশ্ন কিনা? তিনি বলেন, প্রশ্ন হাতে নিয়েই উত্তর বলছিলেন বাইরে থাকা যুবক।

বড় পরীক্ষা, বড় গুঞ্জন

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবছর প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ১০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটি বড় অংশ ঝরে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ থেকে ১৫ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এই বিশাল অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়ানো নতুন কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন শাহীন মিয়া।

“১০ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কথা বলবেনই। কিন্তু এসব কথা পরীক্ষার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে এবং এমনকি পুরো পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে,” বলেন তিনি।

“সংবাদ প্রকাশ নিয়ে অভিযোগ”

কিছু সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “কিছু নিউজ চ্যানেল ‘শুনেছি’ বা ‘সম্ভাবনা আছে’ বা ‘সূত্র বলছে’ এমন শব্দ ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সব মানুষ বিষয়গুলো একভাবে ব্যাখ্যা করেন না। এতে অনেকেই মনে করেন, প্রকাশিত খবরটি হয়তো নিশ্চিত সত্য।”

তার দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত দলিল, ডিজিটাল প্রমাণ বা যাচাইযোগ্য তথ্য কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। “আমাদের কেউ এমন কিছু হাজির করতে পারেনি, একেবারেই না,” যোগ করেন তিনি।

“আটক, তবে প্রশ্ন ফাঁস নয়!”

তবে পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপরতার অংশ হিসেবে দুইজনকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন শাহীন মিয়া। তিনি বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কিছু ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।”

তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, “এগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়। পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা করেছিল তারা।”
আটক দুজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে দক্ষিণ খুরুশকূল কেন্দ্র ও সিটি কলেজ কেন্দ্রের সঙ্গে।

পুলিশের অবস্থান

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছমি উদ্দিনও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কোনো ঘটনার প্রমাণ পুলিশও পায়নি।

“পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে দুইজনকে আটক করে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে,” বলেন ওসি।

তিনি আরও জানান, নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য দিয়ে কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

‘প্রশ্নপত্র সাদৃশ’ প্রশ্ন, কিন্তু মিল নেই

এদিকে বে ইনসাইট একাধিক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তথাকথিত ‘প্রশ্নপত্র সাদৃশ’ কিছু প্রশ্ন সংগ্রহ করেছে। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলোর সঙ্গে পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের কোনো মিল নেই।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রতারণা হিসেবে দেখছে পুলিশ।ওসি ছমি উদ্দিন বলেন, “এগুলো সাধারণত ভুয়া প্রশ্ন দেখিয়ে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।”

প্রশ্ন থেকেই যায়

তবে বিশাল এই পরীক্ষাব্যবস্থায় গুজব ঠেকানো, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীলতা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।