ইফতিয়াজ নুর নিশান
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার জগতে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে- কে কাকে জবাবদিহি করবে? রাষ্ট্র কি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনবে, নাকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিজেরাই নিজেদের মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে? প্রশ্নটির উত্তর কখনোই একরৈখিক নয়। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম নিয়ে জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর (ওআইওএস) যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেটি এই বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয়- জবাবদিহি শুধু সমালোচনার ভাষা নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধন হওয়ারও ভাষা।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট এখন প্রায় এক দশকের বাস্তবতা। ২০১৭ সালের পর কক্সবাজারে যে বিশাল মানবিক সহায়তা কাঠামো গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে তার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমেছে, দাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে, বিশ্বের নানা প্রান্তে নতুন নতুন সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী প্রায় বারো লাখ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে ওআইওএস-এর অডিট রিপোর্টটি শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়; এটি একটি আয়না, যেখানে একই সঙ্গে সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কোনো প্রতিপক্ষের অভিযোগও নয়। এটি জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরকার স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার ফল। তাই এর পর্যবেক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হয়।
অডিটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কৌশলগত পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও স্যানিটেশন, জীবিকা কর্মসূচি, অংশীদার নির্বাচন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় একাধিক দুর্বলতা ছিল। কোথাও পরিকল্পনার ঘাটতি, কোথাও সমন্বয়ের অভাব, কোথাও সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, আবার কোথাও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতা।
এসব দুর্বলতা কেবল নীতিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; মাঠপর্যায়েও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
অডিটে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ এসেছে, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও রোগীর তুলনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা বেশি, কোথাও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল, আবার কোথাও ওষুধ ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার ঘাটতি ধরা পড়েছে। মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সম্পদের অভাব যেমন সমস্যা, বিদ্যমান সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারও তেমনি বড় প্রশ্ন।
একইভাবে, কিচেন সেট, রান্নার সামগ্রী, বালতি, স্লিপিং ম্যাটসহ বিভিন্ন নন-ফুড আইটেমের গুদাম ব্যবস্থাপনা ও বিতরণেও অসঙ্গতি উঠে এসেছে। অনেকের কাছে একটি প্লেট, একটি হাঁড়ি বা একটি চামচের হিসাব তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু শরণার্থী জীবনে এগুলো বিলাসিতা নয়, মৌলিক প্রয়োজন। ফলে এসব সামগ্রীর হিসাবের গরমিল কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি সহায়তা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন।
পানি ও স্যানিটেশন খাতেও একই চিত্র। কোথাও ন্যূনতম মান নিশ্চিত হয়নি, কোথাও অবকাঠামো নির্মাণ হলেও তার পূর্ণ ব্যবহার হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে এমন দুর্বলতা শুধু সেবার মানকেই প্রভাবিত করে না, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।
এসব পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।
তবে এই অডিটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত দুর্বলতার তালিকা নয়; বরং সেগুলোর প্রতি ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া।
অনেক প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার মুখে প্রথমে অস্বীকার করে, পরে ব্যাখ্যা দেয়, শেষে দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। ইউএনএইচসিআর অন্তত এই অডিটের ক্ষেত্রে সে পথ বেছে নেয়নি।
সংস্থাটি আটটি সুপারিশই গ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি সুপারিশ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কী কাজ চলমান এবং কোন সময়ের মধ্যে তা শেষ হবে—সেটিও বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক।
তবে এখানেই আলোচনা শেষ নয়।
সুপারিশ গ্রহণ করা আর বাস্তবে তা কার্যকর করা এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে অডিটের সুপারিশ কাগজে থেকে গেছে। ফলে ইউএনএইচসিআরের ঘোষিত সংস্কারগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সেগুলোর প্রভাব শরণার্থী শিবিরের হাসপাতাল, গুদাম, পানি সরবরাহ কিংবা দৈনন্দিন সেবায় দৃশ্যমান হবে। তবে সংস্থাটি ইতিমধ্যেই কিছু সুপারিশের বাস্তবায়ন শুরু করেছে এবং যার দৃশ্যমান তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে।
কিচেন সেট ও অন্যান্য নন-ফুড আইটেমের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অডিটে প্রশ্ন উঠলেও, জবাবে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে যে জনসংখ্যার চাহিদা মূল্যায়ন এবং বিতরণ পরিকল্পনার ভিত্তিতে ৬২ হাজার ১০০টি কিচেন সেট ইতোমধ্যে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন করে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্যও ২০২৫-২৬ সালের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। বিতরণের তথ্য ডিজিটাল GDT (Global Distribution Tool) সিস্টেমে সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
নোয়াখালীর ২০ শয্যার হাসপাতাল এবং উখিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালের সেবায় বিঘ্নের বিষয়টি অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইউএনএইচসিআর তাদের জবাবে বলেছে, হাসপাতাল দুটির কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার মূল কারণ ছিল সরকারকে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সরকারি সক্ষমতা ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা।
ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নোয়াখালীর ২০ শয্যার হাসপাতালটি পুনরায় চালু হয়েছে এবং আইওএম সরকারের পক্ষে এটি পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে উখিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালের জন্যও একটি অপারেশনাল পার্টনার নির্বাচন করা হয়েছে এবং সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর হাসপাতালের বিদ্যমান চিকিৎসা সরঞ্জাম পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে।
অর্থাৎ অডিটে যে দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে, তার জবাবে ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তনের একটি চেষ্টা দৃশ্যমান।
অডিটে কুতুপালং ট্রানজিট সেন্টারের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।ইউএনএইচসিআর বলেছে, ধাপে ধাপে এর বর্তমান কাঠামো গুটিয়ে আনা হবে।
স্বাস্থ্যখাতের সমালোচনার জবাবে নতুন স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ, ওষুধ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ও তথ্যব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছে। গুদাম ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ইনভেন্টরি ও নিয়মিত স্টক যাচাইয়ের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। একই সঙ্গে এটিও স্বীকার করতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে সব সীমাবদ্ধতার দায় এককভাবে ইউএনএইচসিআরের নয়।
বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত অবস্থান, ক্রমহ্রাসমান আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, দাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে সংস্থাটিকে অত্যন্ত জটিল বাস্তবতায় কাজ করতে হচ্ছে।
কিন্তু এই বাস্তবতা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ব্যাখ্যা হতে পারে, অজুহাত নয়। বরং সংকট যত দীর্ঘ হয়, জবাবদিহির প্রয়োজন তত বাড়ে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই অডিট আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান স্বাধীন মূল্যায়নকে এখনো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখেনি। অডিট রিপোর্ট অনেক সময় প্রকাশই হয় না। প্রকাশ পেলেও তার বাস্তবায়নের অগ্রগতি আর জনসমক্ষে আসে না।
সেই তুলনায় ইউএনএইচসিআরের অবস্থান একটি ইতিবাচক উদাহরণ। তবে সেই উদাহরণের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তব পরিবর্তনের ওপর, ঘোষণার ওপর নয়।
রোহিঙ্গা সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু জরুরি সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে, কিন্তু সংকটের মেয়াদ বাড়ছে। ফলে মানবিক সহায়তার প্রতিটি ডলার, প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি কিচেন সেট, প্রতিটি পানির লাইন এবং প্রতিটি প্রকল্পের কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করতেই হবে।
অডিট রিপোর্ট সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। যেটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই, সমালোচনা কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; সমালোচনা অস্বীকার করাই দুর্বলতা।
আত্মসমালোচনা একটি শক্তি, কিন্তু সেই শক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই, যখন তা দৃশ্যমান পরিবর্তনে রূপ নেয়।
সমালোচনা অনেকেই করতে পারেন। কিন্তু সমালোচনাকে আত্মসমালোচনায় রূপান্তর করার সংস্কৃতি বিরল। ইউএনএইচসিআর অন্তত সেই পথেই আছে দীর্ঘদিন ধরে।
এখন দেখার বিষয়, সেই আত্মসমালোচনা কতটা প্রশাসনিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে, আর কতটা হাসপাতালের সেবা, ওষুধের প্রাপ্যতা, কিচেন সেট বিতরণ, গুদাম ব্যবস্থাপনা কিংবা শরণার্থী পরিবারের প্রতিদিনের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনে দেয়।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি অডিট রিপোর্টের সাফল্য নির্ধারিত হয় না তার ভাষায়, বরং তার বাস্তবায়নে।
লেখক- সাংবাদিক, ঢাকা পোস্ট।