রোহিঙ্গা ত্রাণ প্রকল্পঃ তহবিল অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ ইউএনএইচসিআরের বিরুদ্ধে

বে ইনসাইট রিপোর্ট

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর একাধিক মানবিক সহায়তা প্রকল্পে পরিকল্পনার দুর্বলতা, তহবিলের অপচয়, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের অভিযোগ উঠেছে।

জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর -ওআইওএস পরিচালিত এক অডিটে এসব অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ওই অডিট প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এইজ’ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি বলছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটের জন্য অনুদান ধারাবাহিকভাবে কমে আসার সময়েও বিভিন্ন প্রকল্পে এমন ব্যয় হয়েছে, যার অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও একই ধরনের কাজ একাধিকবার করা হয়েছে, কোথাও নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহারই হয়নি, আবার কোথাও বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে। ফলে সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

লক্ষ্যচ্যুত প্রকল্প, অপচয় হয়েছে অর্থ

অডিটে বলা হয়েছে, ইউএনএইচসিআরের বেশ কয়েকটি প্রকল্প সংস্থাটির ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একই ধরনের কার্যক্রম বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনার অভাবে একই উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যয় হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পদের অপচয়ে পরিণত হয়েছে।

অডিটকারীরা মন্তব্য করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন নির্ধারণ, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি।

অডিটে ত্রাণসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার ঘাটতি ও অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত প্রয়োজন মূল্যায়ন না করেই এমন কিছু সামগ্রী কেনা হয়েছে, যেগুলোর ব্যবহার শিবিরে প্রায় নেই বললেই চলে। উদাহরণ হিসেবে খাওয়ার জন্য চামচ, কাটাচামচ ও ছুরি কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গারা ঐতিহ্যগতভাবে হাত দিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন। তা সত্ত্বেও এসব সামগ্রী কিনতে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মার্কিন ডলার।

অডিটে আরও বলা হয়, এসব সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বারবার আপত্তি ও অভিযোগ ওঠার পরও ক্রয় পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এর ফলে ৬২ হাজারের বেশি কুকিং সেট গুদামেই পড়ে থাকে, যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার

কোটি টাকার হাসপাতাল নির্মাণ, কিন্তু ব্যবহার হয়নি

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত।

অডিটে দেখা যায়, উখিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবহারই করা হয়নি। একইভাবে ভাসানচরে নির্মিত ২০ শয্যার একটি ইনডোর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত ছিল।

শুধু ভবনই নয়, হাসপাতালটিতে স্থাপন করা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ৭৪ হাজার ৩০১ ডলারের এক্স-রে মেশিনও কার্যত অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল।

অডিটে বলা হয়, অবকাঠামো নির্মাণের আগে বাস্তব প্রয়োজন এবং পরিচালনা পরিকল্পনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি

রোহিঙ্গা শিবিরে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির অভাবও অডিটে উঠে এসেছে।

অডিটকারীরা বলেন, ২০২৪ সালে শিবিরে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং হেপাটাইটিস-সি রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেও ইউএনএইচসিআরের কোনো সমন্বিত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ছিল না।

মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিও ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে তীব্র পানিবাহিত ডায়রিয়া, কলেরা, খোসপাঁচড়া এবং উকুনের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সময়মতো ও কার্যকর মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ার তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেই খাতেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

মেয়াদোত্তীর্ণ সূঁচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই আবার বড় চুক্তি

অডিটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি ছিল চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে।

একটি প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ মেডিকেল সূঁচের গায়ে নতুন মেয়াদ লিখে সরবরাহ করেছিল। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকেই পরবর্তীতে প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের নতুন চুক্তি দেওয়া হয়।

এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যের সরবরাহকারী নির্বাচন করায় প্রায় ৯৭ হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৬০ লাখ ডলারের ওষুধ কর্মসূচিতে ওষুধের ঘাটতি, আবার কোথাও অতিরিক্ত মজুদ, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের ঘটনাও পাওয়া গেছে।

এদিকে প্রায় ৩৬ লাখ ডলারের পুষ্টি কর্মসূচি এবং ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের রোগী রেফারেল কর্মসূচিতেও উপকারভোগী নির্বাচন, নির্দেশিকা এবং হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা ধরা পড়ে।

হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারেও কোটি কোটি টাকার অপচয়

অডিটে কক্সবাজারের শিবির এলাকায় বন্য হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত টাওয়ার প্রকল্পকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রায় ২২ লাখ ডলার ব্যয়ে ৯৯টি হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী মূল্যায়নে এগুলোকে কার্যকর নয় বলে উল্লেখ করা হয়।

এর মধ্যে ৮৩টি টাওয়ারের ছাদ ঘূর্ণিঝড়-উপযোগী না হওয়ায় খুলে ফেলতে হয়, যাতে প্রায় ৫৬ হাজার ডলারের নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হয়। পরে টাওয়ারগুলোকে আরও টেকসই করতে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৬৭ হাজার ডলার ব্যয় করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালের আরেকটি মূল্যায়নে টাওয়ারের সংখ্যা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও অডিট পর্যন্ত মাত্র ১২টি টাওয়ার অপসারণ করা হয়েছিল।

একই ঠিকাদারের ওপর অতিনির্ভরতা, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কাজ

ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচনেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নির্মাণকাজ মূলত একজন ঠিকাদারকেই দেওয়া হয়। তার দর বাজারদরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি ছিল। এতে সম্ভাব্য ৬৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

শুধু তাই নয়, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের দর ৩৩ থেকে ৪৩ শতাংশ কম হলেও তাদের পরিবর্তে একই ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করা হয়।

এছাড়া ৩ কোটি ডলারের এলপিজি রিফিল, চুলা, প্রেসার কুকার, ইগনাইটার ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কাজও এমন একজন সরবরাহকারীকে দেওয়া হয়, যিনি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন না। পরে ওই প্রতিষ্ঠান আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

চুক্তি অনুযায়ী এলপিজি ডিপোর ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বহন করার কথা থাকলেও ইউএনএইচসিআর নিজেই ১৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। ওয়ারেন্টির আওতায় স্পার্ক লাইটার পাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত ৬৫ হাজার ডলারের লাইটারও কিনেছে সংস্থাটি।

অডিটকারীরা উল্লেখ করেছেন, ওই ঠিকাদারের দর ছিল বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। একই ধরনের কাজ কম খরচে করতে সক্ষম অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

জ্বালানি ও পরিবেশ প্রকল্পেও অতিরিক্ত ব্যয়

অডিটে জ্বালানি ও পরিবেশ খাতের প্রকল্পগুলোকেও ব্যয়বহুল ও অদক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৩৯ লাখ ডলারের জ্বালানি ও পরিবেশ কর্মসূচিতে বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ করানো হয়েছে।

২০২১ সালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিকাদারের দর বাজারদর ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ বেশি ছিল।

এরপর ২০২৩ সালে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই একই কাজের দর ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যাতে অতিরিক্ত ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলার ব্যয় হয়।

পরে বাজার যাচাই ছাড়াই চুক্তির মূল্য আরও ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়, ফলে অতিরিক্ত ২২ লাখ ডলার ব্যয় হয়।

এছাড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোয় স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছে অডিট।

রোহিঙ্গা শিবিরে এলপিজি সরবরাহেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।

একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রায় ৩ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়, যদিও সেটি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল না।

অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৫৫ লাখ ডলার বেশি মূল্যের এলপিজি রিফিল কেনা হয়। প্রেসার কুকার ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক পরীক্ষামূলক প্রকল্প শেষ হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় সম্ভাব্য প্রায় ২০ লাখ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগও হারানো হয়েছে।

অপ্রয়োজনীয় যানবাহন কেনা, অফিস ও গুদাম

যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অদক্ষতার চিত্র পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়, ১৬টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন ৫২টি কর্মসূচির গাড়ি প্রয়োজন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ইউএনএইচসিআর দিতে পারেনি।

অডিটে আরও উঠে এসেছে, ইউএনএইচসিআরের ১০৪টি গাড়ির মধ্যে ১০টি দীর্ঘ সময় ব্যবহার হয়নি। তারপরও এসব গাড়ির জন্য ৮০ হাজার ডলারের বেশি ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআরের নতুন অফিস ভবন নির্মাণেও একাধিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে অডিট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয়ে অফিস ভবন নির্মাণ করা হলেও জমির মালিকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

নির্মাণকাজ চলাকালে নকশা পরিবর্তন করে ভবনে তৃতীয় তলা যুক্ত করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর জমির মালিক ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ভাড়াচুক্তি ছিল না।

এরপরও নতুন ভবনটি পাঁচ মাস খালি পড়ে ছিল। সেই সময় পুরোনো অফিসের জন্য প্রতি মাসে ১১ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

এছাড়া আট বছর ধরে একটি অব্যবহৃত মোটেলের জন্য বছরে ১ লাখ ২৬ হাজার ডলার ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে, যদিও অনেক কম খরচে বিকল্প জায়গা পাওয়া সম্ভব ছিল।

গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গুদাম ভাড়া নেওয়ায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাসানচরে একই কাজের জন্য একাধিক ব্যয়

অডিটে বলা হয়েছে, ভাসানচরে সরকার যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে ছিল, সেখানে ইউএনএইচসিআরও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে।

ফলে সরকার আগে থেকেই সৌরায়িত করে রাখা তিনটি স্থাপনায় আবারও একই ধরনের কাজ করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়াই ব্যয়বহুল ভোল্টেজ রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে।

একই এলাকায় একই ধরনের প্রকল্প

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নকারী অংশীদারদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে একই এলাকায় ১২৮টি পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ৫২টি পাম্পিং স্টেশন এবং ২০ হাজারেরও বেশি নলকূপ নির্মাণ করা হয়েছে।

অডিটকারীরা বলেছেন, সমন্বয় জোরদার করা গেলে এসব ব্যয়ের বড় অংশই এড়ানো সম্ভব ছিল।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে জরুরি সহায়তায় জোর

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর আট বছর পরও ইউএনএইচসিআরের ব্যয়ের অধিকাংশই তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল।

অডিট অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ জরুরি মানবিক সহায়তায় ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা এবং টেকসই সমাধানমুখী কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ।

অডিটকারীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে।

ইউএনএইচসিআরের প্রতিক্রিয়া

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ‘নিউ এইজ’কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের গণসংযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, সংস্থাটি সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তার ভাষায়, অভ্যন্তরীণ অডিট সংস্থার কার্যক্রম মূল্যায়ন ও উন্নয়নের একটি নিয়মিত অংশ। অডিটে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও ব্যয় দক্ষতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শারি নিজমান বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দিতে ইউএনএইচসিআর কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট

বর্তমানে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক হিসাবে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসে।

তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সেই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিজস্ব অডিটে উঠে আসা এই অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ শুধু একটি সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনাই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির জবাবদিহি, দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করেন স্থানীয় একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

তথ্যসূত্র: ‘নিউ এইজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি সেবা দপ্তর (ওআইওএস) -এর অডিট রিপোর্ট।

জয় এসেছে, কিন্তু আধিপত্য পুরোপুরি নয়!

ইনসাইট এক্সপ্লেইন

ব্রাজিলের ৩-০ জয় দেখে অনেক সমর্থকই স্বস্তি পেয়েছেন। মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর হাইতির বিপক্ষে অন্তত দলটি নিজের পরিচিত ছন্দে ফিরেছে। কিন্তু স্কোরলাইন যতটা স্বস্তিদায়ক, ম্যাচের ভেতরের গল্প ততটা একপেশে নয়। বরং এই ম্যাচ ব্রাজিলকে যেমন আশা দেখিয়েছে, তেমনি তাদের সীমাবদ্ধতাগুলোও উন্মুক্ত করেছে।

প্রথমার্ধে ব্রাজিল ছিল কার্যকর। ম্যাথেউস কুনিয়ার দুটি গোল এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটি গোল ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেয়। কিন্তু ম্যাচের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, হাইতি মোট শটে মাত্র একটি শটে পিছিয়ে ছিল (৯-৮), লক্ষ্যভেদী শটেও ব্যবধান ছিল সামান্য (৫-৪)।

এটি দেখায়, ব্রাজিল সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারেনি।

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা দলের ক্ষেত্রে শুধু জয় যথেষ্ট নয়; ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় আবিষ্কার: কুনিয়া

এই ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় অর্জন তিন পয়েন্ট নয়, ম্যাথেউস কুনিয়ার পুনর্জন্ম।

মরক্কোর বিপক্ষে ইগর থিয়াগোকে নিয়ে যে পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল, কুনিয়াকে ফিরিয়ে এনে আনচেলত্তি আক্রমণে ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছেন। তিনি শুধু গোল করেননি, ভিনিসিয়ুসের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন, মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগও গড়েছেন।

নেইমারের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা ব্রাজিল অনুভব করছিল, কুনিয়া-ভিনিসিয়ুস-পাকেতা ত্রয়ী অন্তত সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে, এই বিশ্বাস জন্মেছে।

বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে প্রায় সব চ্যাম্পিয়ন দলেরই একটি কার্যকর আক্রমণাত্মক ত্রিভুজ থাকে। ব্রাজিল হয়তো সেই কাঠামোর সন্ধান পেতে শুরু করেছে।

ভিনিসিয়ুস এখন সত্যিকারের নেতা

গত কয়েক বছরে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, নেইমারের পর আক্রমণের নেতৃত্ব কে নেবে?

এই বিশ্বকাপে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

মরক্কো ম্যাচে ভালো খেলার পর হাইতির বিপক্ষেও তিনি ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। গোল করেছেন, সুযোগ তৈরি করেছেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার তিনি একা নন। কুনিয়া ও পাকেতার সহায়তায় তিনি আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।

তবে ভিনিসিয়ুসের একটি পুরোনো দুর্বলতা এখনও আছে, অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বল পায়ে রাখা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে।

মাঝমাঠ: ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা

বিশ্বকাপ জয়ের পথে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন সম্ভবত মাঝমাঠ।

লুকাস পাকেতা কিছুটা ছন্দে ফিরেছেন। ব্রুনো গিমারায়েসও দুর্দান্ত খেলছেন। কিন্তু কাসেমিরোকে ঘিরে উদ্বেগ কমেনি।

৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরোকে কয়েকবার সহজে পরাস্ত হতে দেখা গেছে। হাইতির মতো দলের বিপক্ষে এটি বড় সমস্যা মনে না হলেও নকআউট পর্বে স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড কিংবা জার্মানির মতো দলের বিপক্ষে এটি মারাত্মক দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।

আধুনিক ফুটবলে মাঝমাঠের গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাসেমিরো সেই গতি ধরে রাখতে পারবেন কি না, সেটি এখনও অমীমাংসিত প্রশ্ন।

রাফিনিয়া সংকট

আরেকটি সমস্যা ডান প্রান্তে।

রাফিনিয়া টানা দুই ম্যাচে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। চোটের প্রভাব স্পষ্ট। তার বদলি রায়ানও এখনও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি।

অর্থাৎ ভিনিসিয়ুসের বিপরীত দিকে ব্রাজিল এখনও একটি নির্ভরযোগ্য আক্রমণভাগ খুঁজছে।

আনচেলত্তি হয়তো সামনে এন্দ্রিক কিংবা লুইস হেনরিকের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মাঝপথে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আদর্শ পরিস্থিতি নয়।

রক্ষণে এখনও অস্বস্তি

স্কোরলাইন বলছে হাইতি গোল করতে পারেনি। কিন্তু ম্যাচ বলছে অন্য গল্প।

হাইতি একাধিক ভালো সুযোগ তৈরি করেছে। আলিসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং কিছুটা ভাগ্য ব্রাজিলকে ক্লিনশিট এনে দিয়েছে।

বিশ্বকাপে বড় দলগুলো সাধারণত দুর্বল প্রতিপক্ষকে এমন সুযোগ দেয় না। ব্রাজিল সেই মানদণ্ডে এখনও পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।

তাহলে ব্রাজিলের পথ কতটা মসৃণ?

গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার সম্ভাবনা এখন বেশ উজ্জ্বল। চার পয়েন্ট নিয়ে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।

কিন্তু শিরোপা জয়ের সমীকরণ ভিন্ন।

এই মুহূর্তে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপের প্রধান দাবিদার বলা যাবে না, তবে শক্তিশালী প্রতিযোগী অবশ্যই বলা যায়।

কারণ,

যা আছে:

  • ভিনিসিয়ুসের নেতৃত্ব
  • কুনিয়ার ফর্ম
  • আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা
  • ব্রুনো গিমারায়েসের ধারাবাহিকতা
  • ম্যাচ জেতার মানসিকতা

যা এখনও নেই:

  • স্থিতিশীল মাঝমাঠ
  • নির্ভরযোগ্য ডান প্রান্ত
  • সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী রক্ষণ
  • ৯০ মিনিটের আধিপত্য
  • শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পরীক্ষিত কাঠামো

শেষ কথা

হাইতির বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলকে উত্তর দেয়নি, বরং কিছু নতুন প্রশ্নের পাশাপাশি কয়েকটি আশার আলো দেখিয়েছে।

আনচেলত্তি এখন অন্তত জানেন, ভিনিসিয়ুস-কুনিয়া-পাকেতাকে ঘিরে একটি কার্যকর আক্রমণভাগ গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝেছেন যে, কাসেমিরোর গতি, রাফিনিয়ার ফর্ম এবং রক্ষণের দুর্বলতা ঠিক না করলে বিশ্বকাপের শেষ ধাপগুলোতে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

সুতরাং, ব্রাজিল এখনো ট্রফির পথে দৌড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটি মহাসড়কের মসৃণ যাত্রা নয়। বরং সামনে এখনও রয়েছে বেশ কয়েকটি বাঁক, কয়েকটি গর্ত এবং কয়েকটি কঠিন পাহাড়ি পথ। হাইতির বিপক্ষে জয় তাদের পথ দেখিয়েছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।

বে ইনসাইট জনমত জরিপ: উন্নয়ন আছে, কিন্তু মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন নেই

বে ইনসাইট ডেস্ক

বে ইনসাইটের জরিপে উঠে এলো কক্সবাজারের সংকট, সম্ভাবনা ও নাগরিক প্রত্যাশার চিত্র।

কক্সবাজারে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে; সেই প্রশ্নে এখনো সন্তুষ্ট নন অধিকাংশ নাগরিক। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার মানুষ। তবে হতাশার মধ্যেও তাঁরা একটি নিরাপদ, পরিকল্পিত ও আন্তর্জাতিক মানের কক্সবাজারের স্বপ্ন দেখেন।

বে ইনসাইট পরিচালিত ‘জনমত জরিপ-এ উঠে এসেছে এসব তথ্য। কক্সবাজারের মানুষের নিজস্ব মতামত ও অভিজ্ঞতাকে সংখ্যায় রূপ দেওয়ার এ উদ্যোগে অংশগ্রহণকারীদের ৮৬.৫ শতাংশই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। উত্তরদাতাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ২৬ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে এবং বড় অংশই কর্মজীবী ও ব্যবসায়ী। ফলে জরিপের ফলাফলকে স্থানীয় বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

উন্নয়ন আছে, কিন্তু ‘অনুভূত উন্নয়ন’ নেই

রেল সংযোগ, মহাসড়ক এবং পর্যটন অবকাঠামোসহ সরকারি মেগা প্রকল্পগুলোর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ৭৮.৬ শতাংশ উত্তরদাতা কিছু না কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেন। এর মধ্যে ৪৯.২ শতাংশ বলেছেন ‘কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন’ এসেছে, আর ২৯.৪ শতাংশের মতে পরিবর্তন ‘স্পষ্টভাবে ইতিবাচক’।

তবে এই পরিসংখ্যানের ভেতরেও রয়েছে এক ধরনের অসন্তোষ। মাত্র তিনজনের একজন দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা বলেছেন, অন্যদিকে ৬.৩ শতাংশ মনে করেন এসব প্রকল্প বৈষম্য ও সামাজিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। জরিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও তার সুফল এখনো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

রোহিঙ্গা সংকট ও নিরাপত্তাহীনতাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা কী; এই প্রশ্নে নাগরিকদের উত্তর ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ৪২.৯ শতাংশ উত্তরদাতা রোহিঙ্গা সংকটকে এবং ২৯.৪ শতাংশ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও অপরাধকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

অর্থাৎ মোট ৭২.৩ শতাংশ নাগরিকের কাছে কক্সবাজারের প্রধান সংকট নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত চাপ। পরিবেশ ধ্বংস, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা মাদক ও মানবপাচারের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনমতের বিচারে এগুলো তুলনামূলকভাবে দ্বিতীয় সারির উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে।

বিদেশি পর্যটক না আসার পেছনে একক নয়, বহুমাত্রিক সংকট

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর হওয়া সত্ত্বেও কেন কাঙ্ক্ষিত বিদেশি পর্যটক আসছেন না; এ প্রশ্নে নাগরিকরা কোনো একক কারণকে দায়ী করেননি।

৪৩.৭ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মানের সেবা ও অবকাঠামোর ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং দুর্বল আন্তর্জাতিক প্রচারণা, সবগুলো কারণ মিলেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জরিপ বলছে, কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং এটি একটি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার ফল।

পর্যটন নিরাপত্তায় আস্থাহীনতা চরমে

পর্যটকের নিরাপত্তা, হয়রানি নিয়ন্ত্রণ, সৈকত ব্যবস্থাপনা ও রাতের পরিবেশের মূল্যায়নে অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে জরিপে।

১ থেকে ৫ স্কেলে ৮৭.৩ শতাংশ উত্তরদাতা পর্যটন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাকে মাত্র ১ বা ২ নম্বর দিয়েছেন। এর মধ্যে ৫১.৬ শতাংশই দিয়েছেন সর্বনিম্ন স্কোর ‘১’। বিপরীতে সন্তোষজনক মূল্যায়ন (স্কোর ৪ বা ৫) দিয়েছেন মাত্র ১.৬ শতাংশ।

এতে স্পষ্ট হয়েছে, পর্যটননির্ভর অর্থনীতির কেন্দ্র হলেও নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক ক্ষেত্রে নাগরিকদের আস্থা প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে।

সম্পদে সমৃদ্ধ, সেবায় বঞ্চিত

শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবার প্রাপ্তি নিয়ে করা প্রশ্নে উঠে এসেছে জরিপের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা।

৬৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন তাঁরা এসব সুযোগ-সুবিধা খুব সীমিতভাবে পান। অন্যদিকে ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পান’ বলে মত দিয়েছেন মাত্র ১.৬ শতাংশ উত্তরদাতা।

পর্যটন খাত থেকে বিপুল রাজস্ব অর্জন করলেও স্থানীয় মানুষের জীবনে সেই সুবিধার প্রতিফলন খুব কম; এমন ধারণাই জরিপে সবচেয়ে শক্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাদের মতে, সম্পদ ও নাগরিক সেবার এই বৈষম্যই কক্সবাজারের অন্যতম মৌলিক সংকট।

২০৩৫ সালের কক্সবাজার: নাগরিকের স্বপ্নের রূপরেখা

সংকটের পাশাপাশি নাগরিকদের স্বপ্নও তুলে ধরেছে এই জরিপ। উত্তরদাতারা আগামী এক দশকে একটি সিন্ডিকেটমুক্ত, দূষণহীন, নিরাপদ ও পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী দেখতে চান।

তাঁদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সবার জন্য সমান বিচার, ৫০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, পর্যটন ও সামুদ্রিক গবেষণাকেন্দ্র, কার্গো বিমানবন্দর, উন্নত রেল যোগাযোগ এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে বাকখালী নদীসহ হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের দাবিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে।

কক্সবাজারের আয়নায় কক্সবাজার

বে ইনসাইটের ‘জনমত জরিপ ২০২৬’ মূলত কক্সবাজারের মানুষের নিজের কাছে নিজের জবাবদিহির একটি আয়না। জরিপে উঠে এসেছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও তার সুফল মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছেনি; পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় আটকে আছে; আর রাজস্ব আয়ের কেন্দ্র হয়েও স্থানীয় জনগণ কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জরিপ হতাশার নয়, বরং পরিবর্তনের দাবি তুলে ধরা মানুষের কণ্ঠস্বর। নাগরিকেরা সংকট চিহ্নিত করেছেন, একই সঙ্গে সমাধানের পথও দেখিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়; বরং একটি কার্যকর, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক শহরের জন্য ন্যূনতম দাবি।

বে ইনসাইটের মতে, এই ফলাফল কেবল কিছু পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও পরিকল্পিত উন্নয়নের আহ্বান। আর সেই কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে তুলে ধরাই হবে তাদের গবেষণাভিত্তিক সাংবাদিকতার অন্যতম লক্ষ্য।

সংকুচিত বন, সঙ্কটে হাতি

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালংয়ে ভোরের অন্ধকার তখনও পুরো কাটেনি। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে স্থানীয়দের। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তিনটি বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে বসতঘরের দেয়াল ভাঙতে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বাসিন্দারা।

কিন্তু পালানোর সুযোগ পাননি ছেমন আরা ও তার তিন বছরের মেয়ে আসমা বিবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতির সামনে পড়ে ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়। এরপর আম-কাঁঠাল খেয়ে হাতির পালটি পাশের পাহাড়ি বনে ফিরে যায়।

এই ঘটনা নতুন নয়। বরং কক্সবাজারে মানুষ ও হাতির সংঘাত এখন এক গভীর পরিবেশগত সংকটের প্রতীক হয়ে উঠছে, যেখানে একদিকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মানুষ, অন্যদিকে সংকুচিত আবাসস্থলে আটকে পড়া মহাবিপন্ন এশীয় হাতি।

বন কমছে, বাড়ছে সংঘাত

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগ মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২০৩টি বন্য হাতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৫টি শাবক। ২০১৬ সালের জাতীয় জরিপে দেশে মোট বন্য হাতির সংখ্যা ধরা হয়েছিল ২৬৮টি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এদের “মহাবিপন্ন” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতির সংখ্যা যতটা না বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে তাদের বিচরণক্ষেত্র।

কক্সবাজারে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী অভয়ারণ্য, ঈদগাঁওয়ের ব্যাঙডেবা বনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই প্রায় ১৮ হাজার ৬০০ হেক্টর বনভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বনভূমির বড় অংশ এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, দখল ও বিচ্ছিন্ন বসতিতে আক্রান্ত।

তার ভাষায়, “বনের ভেতরেও মানুষ বসবাস করছে। ফলে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।”

রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমির ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

বন বিভাগ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ২০০ একর বনভূমি সম্পূর্ণ উজাড় হয়েছে। আরও কয়েক হাজার একর এলাকায় গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জ্বালানি সংগ্রহ, বসতি নির্মাণ ও অবকাঠামো তৈরির কারণে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র এক মূল্যায়নে বলা হয়, ক্যাম্পসংলগ্ন অন্তত ৭ হাজার ২২০ হেক্টর বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে পুনর্বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার একর এলাকায় নতুন গাছ লাগানো হয়েছে।

তবে বন গবেষকরা বলছেন, একটি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেলে কেবল গাছ লাগিয়ে সেই বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

হাতির করিডর ভেঙে দিচ্ছে উন্নয়ন

মানুষ-হাতি সংঘাতের আরেকটি বড় কারণ উন্নয়ন প্রকল্প।

কক্সবাজার-দোহাজারী রেললাইন চালুর পর হাতির অন্তত ১৬টি চলাচল পথ ও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পরিবেশবিদদের অভিযোগ। এছাড়া সড়ক, বসতি, কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্ত অবকাঠামো হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা তৈরি করছে।

ফলে হাতির পাল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নেকম’-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমানের মতে, হাতি সাধারণত মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক নয়। কিন্তু চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা খাদ্যসংকট তৈরি হলে তারা বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

এক দশকে অন্তত ৬০ হাতির মৃত্যু

মানুষের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছে হাতিও।

গত এক দশকে কক্সবাজার অঞ্চলে অন্তত ৬০টি হাতি মারা গেছে বলে বন বিভাগ ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে অন্তত ২৪টি হাতি। গুলিতে আহত বা নিহত হয়েছে আরও কয়েকটি।

২০২০ সালে ঈদগড়ে গুলিতে নিহত হয় পরিচিত একটি স্ত্রী হাতি “গণেশবতী”। ২০২১ সালে রামুতে বিদ্যুতায়িত ফাঁদে মারা যায় একটি শাবক।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষায় অনেক সময় স্থানীয়রা অবৈধ বিদ্যুৎ ফাঁদ ব্যবহার করেন। এতে সংঘাত আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নেকম-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমান বলেন, “মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবসময় ক্ষতিপূরণ পায় না। ফলে কেউ কেউ প্রতিশোধমূলকভাবে বিদ্যুৎ ফাঁদ বা গুলি ব্যবহার করে।”

সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্ন কার্যকারিতা নিয়ে

বন বিভাগ বলছে, সংঘাত কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ২০২২-২০২৮ মেয়াদের ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’
  • রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলপিজি সরবরাহ কর্মসূচি
  • হাতির করিডর পুনরুদ্ধার
  • পুনর্বনায়ন
  • বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণ
  • স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা কার্যক্রম

গত তিন বছরে অন্তত ৫২টি বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণের তথ্য দিয়েছে বন বিভাগ। এছাড়া কয়েক হাজার হেক্টর এলাকায় বনায়নও করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যার সমাধান ছাড়া সংঘাত কমানো কঠিন।

তাদের মতে, হাতির নিরাপদ চলাচলের করিডর পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

কারণ কক্সবাজারের বন এখন শুধু একটি পরিবেশগত সম্পদ নয়, এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের শেষ আশ্রয়গুলোর একটি।

কক্সবাজারের আকাশে রহস্যময় আলোর নেপথ্যে কি?

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

শুক্রবার (৮ মে) কক্সবাজার জেলাসহ বিভিন্ন এলাকার আকাশে এক অদ্ভুত ও উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আকাশের বুক চিরে একটি আলোর পিণ্ড অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ওপরের দিকে উঠে যেতে দেখা যায়, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী ছিল। এই রহস্যময় দৃশ্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী আলোচনা শুরু হলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন এর কিছু তথ্য বলছে, এটি ভারতের একটি শক্তিশালী ব্যালাস্টিক মিসাইল পরীক্ষার ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

সম্ভাব্য কারণ: ৩৫৬০ কিমি দীর্ঘ ‘ডেঞ্জার জোন’

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নেভিগেশন সতর্কবার্তা বা NOTAM (Notice to Airmen) অনুযায়ী, ভারত গত ৬ মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের একটি বিশাল এলাকায় বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল। ওড়িশার আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে ভারত মহাসাগরের গভীরে প্রায় ৩৫৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই সতর্কতা জারি করা হয়। সাধারণত এত দীর্ঘ পাল্লার সতর্কতা তখনই জারি করা হয় যখন কোনো আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইল (ICBM) বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়।

কক্সবাজার থেকে দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাব্য কারণ

ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, ভারতের ওড়িশার আব্দুল কালাম দ্বীপ (হুইলার আইল্যান্ড) থেকে যখন কোনো মিসাইল ভারত মহাসাগরের দিকে ছোড়া হয়, তার গতিপথ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের খুব কাছাকাছি থাকে। আজ আকাশ পরিষ্কার থাকায় এবং মিসাইলটি বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে (Ionosphere) পৌঁছানোর সময় এর ইঞ্জিনের ‘প্লুম’ বা ধোঁয়ার কণাগুলো আলোয় প্রতিফলিত হওয়ায় এটি কক্সবাজার থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে আপাতত।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) দাবি করছে, এটি ভারতের বহুল আলোচিত অগ্নি-৬ (Agni-VI) বা অগ্নি সিরিজের কোনো উন্নত সংস্করণের পরীক্ষা হতে পারে।

কেন এই আলো দেখা গেল?

ব্যালাস্টিক মিসাইল যখন বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তর ভেদ করে মহাকাশের দিকে এগিয়ে যায়, তখন এর রকেট ইঞ্জিনের এক্সজস্ট গ্যাস এবং বায়ুর ঘর্ষণে এক ধরনের উজ্জ্বল আভা তৈরি হয়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে কয়েকশ কিলোমিটার দূর থেকেও এই দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। এর আগে ২০২২ এবং ২০২৩ সালেও ভারতের একই ধরনের পরীক্ষার সময় বাংলাদেশ থেকে এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল।

অগ্নি-৬ এর সক্ষমতা:

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং এর পাল্লা হতে পারে ১০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি। এতে ‘MIRV’ প্রযুক্তি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মাধ্যমে একটি মিসাইল দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব।

নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে কবে?

ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা (DRDO) বা দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাধারণত এ ধরনের কৌশলগত পরীক্ষার সফল সমাপ্তির পর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করে। বুধবার রাতের শেষভাগে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা PIB (Press Information Bureau) বা DRDO-এর অফিশিয়াল পোর্টাল থেকে এই পরীক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত এবং নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজারে ছাত্রদল কমিটি নিয়ে বিতর্ক: সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে, এখন আসে ‘বিমানে চড়ে’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটি ঘোষণা ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর কেন্দ্র থেকে সরাসরি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও কাউন্সিল না হওয়া, পদবণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব এবং তৃণমূলের কর্মীদের বঞ্চনার অভিযোগে সংগঠনটির ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই বছর ধরে কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের কোনো কার্যকর কমিটি ছিল না। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হঠাৎ করেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছয় সদস্যের একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করে। তবে কমিটি ঘোষণার আগে কোনো কাউন্সিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় সংগঠনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।

পদবণ্টন নিয়ে ক্ষোভ, সড়কে বিক্ষোভ

ঘোষিত কমিটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের দাবি, তৃণমূলের মতামত নেওয়া হয়নি, দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় কর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি এবং গ্রুপভিত্তিক বিবেচনায় পদ দেওয়া হয়েছে।

কমিটি ঘোষণার পরপরই কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। শহরের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়, এতে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী জানান, কক্সবাজার ছাত্রদলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই গ্রুপিং বা অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে। নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেছে- ‘আমি নিরুপায়’

পদবঞ্চিত নেতা মিজানুল আলম বলেন, “ফাহিম সাবেক কমিটিতে আমার সহযোদ্ধা ছিলো। সে আসতে পারলে আমি কেনো আসতে পারবো না। সে তো আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তাঁর বয়স এখন ৪১/৪২। আমার বয়স ৩৬। যদি কক্সবাজারের জেলা ছাত্র দলের আওতাধীন আমাদের যে ২৭ টি ইউনিট আছে, সেখান থেকে সুপার ৪ বা সুপার ৫ করা হয়, সেখানে আমি সভাপতি হবো।

তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রীয় ছাত্র দলের সভাপতি আমার ফোন রিসিভ করে ক্ষমা চেয়েছে, সে আমাকে বলেছে- ‘আমি নিরুপায়, আমার কোনো উপায় ছিলো না, আমি নিরুপায়, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি পারি নাই, আমার হাত-পা বাঁধা’ সেরকম বলেছিলো। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ভাই কথা বলেছেন, সেক্রেটারি ফোন ধরে নি। ওনি বলেছেন, ‘আমরা অসহায়, আমরা নিরুপায়। আমাদেরকে উপর থেকে যেভাবে বলে দেওয়া হয়েছে ওভাবে দেওয়া হয়েছে।’”

কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কথা বলছেন নতুন সভাপতি

জেলা ছাত্রদলের নবনির্বাচিত কমিটি কতোতম জানতে চাইলে সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, “এখন সঠিক বলতে পারবোনা। আপনাকে পরে জানাচ্ছি।”

কাউন্সিল না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় কমিটি একযোগে এই কমিটি ঘোষনা করেছে, এগুলো কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত। তাই এই প্রশ্ন তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে।”

পদবঞ্চিতদের প্রতিবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পদ শুধু দুইটি, কিন্তু যোগ্য প্রার্থী তো অনেক। সেখান থেকে বাছাই করতে হয়। তাই সবাইকে তো দেয়া সম্ভব না। যারা জেলা কমিটির পদ পায়নি, তারা যোগ্য হলে অবশ্যই কলেজ কমিটি আছে, শহর কমিটি আছে, উপজেলা কমিটি আছে, সেখানে আসবে।”

পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যোগ্য ও নিয়মিত ছাত্রদের মাধ্যমে কমিটি পূর্ণা করা হবে।”

‘বিমানে চড়ে এসে শোভাযাত্রা’, সমালোচনা সাবেক নেতার

জেলা ছাত্রদলের সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমাদের সময় এমন রেওয়াজ ছিলোনা। বিমানে চড়ে এসে মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা করা ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্য নয়। কক্সবাজারে এই রেওয়াজ শুরু হয় ২০১২ সালের দিকে কাউন্সিল ছাড়া ছাত্রলীগের কমিটি হলে, তখন সভাপতি সেক্রেটারি ঢাকা থেকে বিমানে চড়ে এসে এখানে বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনা নেয়া শুরু হয়।”

সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে

ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটির সর্বশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব আসে ১৯৯৩ সালে। ওই কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন আকতার চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হন বদরুল হুদা সিদ্দিকী। এরপর দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জেলা ছাত্রদলের আর কোনো নির্বাচিত কমিটি হয়নি।

বর্তমানে কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওই সময়ের সভাপতি আকতার চৌধুরী। সাম্প্রতিক কমিটি গঠন ও কাউন্সিলবিহীন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রবণতা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছে বে ইনসাইট।

তিনি বলেন, “এটা তো আসলে সাংগঠনিক বিধিমালার ভিত্তিতে চলে। অ্যাট দ্যাট টাইম আমাদের সময়কালে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছি প্রত্যক্ষ ভোটে। এরপর থেকে সাংগঠনিক বিধিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে যেহেতু নির্বাচন কেন্দ্রিক যারা এমপি ক্যান্ডিডেট থাকেন তাদের কতগুলো কনস্টিটিউয়েন্সি থাকে, এটার উপরে নির্বাচন সহযোগিতার কারণে সাংগঠনিক ছাত্রদলকে ওভাবে সাজানো হয়েছে। পরবর্তীতে যতটুকু দেখলাম আর কি… এরপর থেকে দেখলাম যে টোটালি সেন্ট্রালের উপর চলে গেছে, স্থানীয় প্রতি নির্বাচনের পদ্ধতি কিছু রাখে নাই।”

বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটি নির্ধারণের বিষয়টি কেমন দেখেন—এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি সমালোচনা না করে বলেন, “আমিও তো একজন সংগঠনের কর্মী, মূল দলের এখন সাংগঠন যেগুলি আছে সাধারণত এটা আমাদের সহযোগী সংগঠন হিসেবে তাদেরকে ব্যক্তিবদ্ধভাবে সেন্ট্রালি এখন করে এটা।”

এই প্রবণতা সংগঠনের ভেতরে কোন্দল বাড়াচ্ছে কি না—এ বিষয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেন, “আমি আসলে এই বিষয়ে সরাসরি কিছু এভাবে বলতে চাচ্ছি না। যেহেতু দীর্ঘকালীন একটা ফ্যাসিজমের ভিতরে সাংগঠনিক যে মানে কাজগুলো করার কথা ছিল সেভাবে করতে পারে নাই বলে, আমার কাছে মনে হয়েছে যে তারা সাংগঠনিকভাবে যে বিধিতে সংগঠনকে বোঝানোর কথা সে সুযোগটা তারা পায় নাই। সেটা বিএনপির ক্ষেত্রে হতে পারে, যুবদলের ক্ষেত্রে হতে পারে। তারপরে ছাত্রদল তো সেম একটি অবস্থায় ছিল।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার হলে সংগঠনগুলো আবার নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরবে।

“তো এখন যেহেতু একটা গণতান্ত্রিক সরকার দেশে প্রতিষ্ঠিত। তো বিএনপিও গণতন্ত্রের চর্চাটা আগের যে বিধি সে অনুসারে করবে এবং অঙ্গ সংগঠনগুলো সেভাবে চলবে। সহযোগী সংগঠন সেভাবে চলবে। এটাই আশা করছি। যেহেতু এখন গণতন্ত্র চর্চার একটা সুযোগ হয়েছে। আগে সুযোগ ছিল না।”

নিজের নেতৃত্বকাল প্রসঙ্গে আকতার চৌধুরী বলেন, “আমি প্রথমে ৯০ সালে আহ্বায়ক হয়েছি। আবার নির্বাচনের মাধ্যমে আমি জেলা ছাত্রদল সভাপতি হয়েছি। একবার ৯১ সালে আরেকবার ৯৩ সালে।”

‘ইলেকশন নয়, সিলেকশন’

জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাশেদুল হক রাসেল বলেন, “সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিলো ৭ম কমিটির। সেটি সীগাল হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাও ইলেকশন নয় সিলেকশন হয়েছিলো। ওইসময় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলো সৈয়দ আহমদ উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলো হাবিব উল্লাহ।”

সংকটের নতুন রূপ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংগঠনগুলোর কমিটি গঠন নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়। কাউন্সিলবিহীন কমিটি, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক বলেন, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার কথা বলা হলেও, তাতে বিরোধ কমবে নাকি আরও বাড়বে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

ইউনূস সরকারকে ইউনিসেফ- “আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না”

বে ইনসাইট ডেস্ক

ঢাকার একটি শিশু হাসপাতালের মেঝেতে কনিকা আক্তারের কান্না থামছে না। পাশে দাঁড়িয়ে তার স্বামী মোহাম্মদ জাকির স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন তাদের ৬ মাস বয়সী মেয়ে রুহির দিক, যে এখন হাম ওয়ার্ডের একটি বিছানায় শুয়ে আছে।

রুহির যমজ বোন রিসা একই দিনেই হামে মারা গেছে। এখন রুহি সেই একই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন, যেখানে তার বোন শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল।

জাকিরের একটি প্রশ্ন হাসপাতালের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়- “যে আমার মেয়ের মতোই দেখতে, তাকে আমি কীভাবে কবর দেব?”

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ (Science.org) ঠিক এভাবেই শুরু করে বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করা হাম নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে উঠে এসেছে হাম নিয়ে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ভয়াবহ হাম (Measles) মহামারির মুখোমুখি, যেখানে মধ্য মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী এবং ২৫০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল শিশু রোগীতে উপচে পড়ছে। সেখানে শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগী, নিথর দেহ, আর মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়া শিশুর দৃশ্য এখন সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংকটের মূল কারণ: টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন

‘সায়েন্স’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭৫ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশ দীর্ঘদিন উচ্চ টিকাদান হার বজায় রাখলেও, এই প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের বিপ্লব-পরবর্তী টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয়।

বিপ্লবের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে।

ইউনিসেফ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সতর্ক করে দেয় যে এটি টিকাদান ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারি সৃষ্টি করতে পারে।

“আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না”

‘সায়েন্স’ কে বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন।
তার ভাষায়, “আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না।

তবে নতুন দরপত্র ব্যবস্থা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায় এবং টিকার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

২০২৫ সালে পরিকল্পিত অতিরিক্ত এমআর ক্যাম্পেইনও বাতিল হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী (পরে অপসারিত), ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯% উপযুক্ত শিশু হাম টিকা পেয়েছে।

শূন্যতা থেকে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ

প্রাদুর্ভাব শুরু হয় জানুয়ারিতে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে। এরপর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে।

এখন পর্যন্ত ২১,০০০-এর বেশি হাসপাতালে ভর্তি রোগী শনাক্ত হয়েছে।

২৩ এপ্রিল WHO সতর্ক করে জানায়, এই সংক্রমণ মিয়ানমার ও ভারতের দিকে ছড়িয়ে পড়ার “উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি” রয়েছে।

WHO একে বাংলাদেশের “হাম নির্মূলের পূর্ববর্তী অগ্রগতির বিপরীত যাত্রা” হিসেবে বর্ণনা করে

অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা: পরিস্থিতির বহুগুণ জটিলতা

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ২৮% শিশু খর্বাকৃত এবং ১০% শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।

ভিটামিন এ-এর ঘাটতি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে তিনটি জাতীয় ভিটামিন এ কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কম অর্থায়নপ্রাপ্ত হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো এই চাপ সামলাতে পারছে না।

আইইডিসিআর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন ‘সায়েন্স’কে বলেন, “এটি শুধু টিকাদানের ঘাটতি নয়, একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।”

সরকারের পদক্ষেপ ও নতুন সংকট ব্যবস্থাপনা

নতুন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয়।

এপ্রিল মাসে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু হয় এবং WHO ও Gavi-এর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

৫ এপ্রিল জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয় এবং ২০ এপ্রিল জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়। ভিটামিন এ বিতরণও পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান গতিতে এই ক্যাম্পেইন দ্রুত সংক্রমণ থামাতে পারবে না।

দোষারোপ, তদন্ত

সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেন।

রানা ফ্লাওয়ার্সও বলেন, এই টেন্ডার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তদন্ত হওয়া উচিত।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান ‘সায়েন্স’কে বলেন, সরকার ব্যবস্থাকে “স্বচ্ছতা ও পক্ষপাতমুক্ত কাঠামো”তে আনতে চেয়েছিল।

তিনি স্বীকার করেন, “হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ এ শিশুদের মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি।”

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ তার প্রতিবেদনে লিখেছে, ঢাকার হাসপাতাল থেকে গ্রামাঞ্চলের ক্লিনিক পর্যন্ত একই চিত্র, শিশুদের জীবন, যা একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কাছে হার মানছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয় রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা, টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন এবং কাঠামোগত দুর্বলতা মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন এক জনস্বাস্থ্য সংকটে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রভাব শুধু দেশ নয়—আঞ্চলিক পর্যায়েও বিস্তার লাভ করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কক্সবাজার উপকূলের নতুন স্বপ্ন ‘সামুদ্রিক শৈবাল’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া সৈকতে একসময় ঝিনুক কুড়িয়েই সংসারে সামান্য সহায়তা করতেন আনোয়ারা বেগম। মহেশখালী চ্যানেলের তীর থেকে সংগ্রহ করা সেই ঝিনুক বিক্রি করতে তিনি যেতেন শহরের বড়বাজারের বার্মিজ মার্কেটে, যেখানে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন প্রধান ক্রেতা।

সেই বাজারেই প্রথম তাঁর চোখে পড়ে কালো, চুলের মতো দেখতে এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল, যা দেখতে অনেকটা কালো সেমাইয়ের মতো। রাখাইন সম্প্রদায়ের রান্নায় ব্যবহৃত এই শৈবাল মূলত মিয়ানমার থেকে আসত।

আনোয়ারা ও তাঁর সঙ্গীরা দ্রুত বুঝতে পারেন, ভাটার সময় সৈকতে যে সামুদ্রিক আগাছার মতো উদ্ভিদ তারা দেখেন, সেটিই আসলে বাজারে বিক্রি হওয়া এই শৈবাল। চাহিদা দেখে তারা সৈকত থেকে সেই শৈবাল সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেন।

এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক বিজ্ঞানী তাঁদের কাছে শৈবাল চাষের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। শুরুতে অবাক হলেও পরে প্রশিক্ষণ ও চারা পেয়ে ধীরে ধীরে তাঁরা শৈবাল চাষে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে আনোয়ারা বেগম সপ্তাহে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন এই শৈবাল চাষ থেকে।

তিনি বলেন, “আগে সংসারের কাজ ছাড়া নিজের কোনো আয় ছিল না। এখন নভেম্বর থেকে টানা সাত মাস শৈবাল চাষ করা যায়। মাসে দুইবার ফসল তোলা যায়। কাজও খুব কম। বাঁশ, দড়ি আর চারা পানিতে বসিয়ে দিলেই ১৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়।

তিনি জানান, তিনি এখন দুই ধরনের শৈবাল চাষ করেন। একটি কালো, অন্যটি সবুজ। স্থানীয় রাখাইন বাজার ছাড়াও লামা, আলীকদমসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় এসব বিক্রি হয়।

ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে চাষ

বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক শৈবালের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক চাষ।

প্রথমদিকে অল্প কয়েকটি পরিবার প্রশিক্ষণ পেলেও এখন শুধু বারি-এর মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কৃষক নিয়মিত চারা পাচ্ছেন। এছাড়া জাইকা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় আরও প্রায় ৫০০ মানুষ কক্সবাজারে শৈবাল চাষ করছেন।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজারের তুলনায় উৎপাদন এখনও অনেক কম। বড় অর্ডার এলেও কৃষকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যায় না।

নুনিয়াছড়ার আরেক চাষি মরিয়ম বেগম বলেন, “চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে আমরা ঠিকমতো সরবরাহই দিতে পারছি না।”

গবেষণা থেকে বাণিজ্যে

কক্সবাজারে শৈবাল চাষ সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি বারি-এর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ।

তিনি ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শৈবাল চাষ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগ্রহ তৈরি করেন।

মোস্তাক বলেন, মূলত দুই ধরনের শৈবাল চাষ হচ্ছে, কালো, চুলের মতো ‘গ্রাসিলারিয়া’ এবং সবুজ, লেটুস পাতার মতো ‘উলভা’।

তিনি বলেন, “শৈবাল বিশ্বজুড়ে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনীসহ নানা শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ।”

তিনি জানান, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, ইনানী সৈকত ও কক্সবাজার উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেই শৈবাল জন্মায়।

শৈবালে বিটা ক্যারোটিন, বি ভিটামিন, ভিটামিন সি, ডি, ই ও কে রয়েছে। এটি সরাসরি খাওয়া যায়, আবার এর থেকে তৈরি আগার আইসক্রিম, মেয়োনিজ, ওষুধের ক্যাপসুল, মলম, ক্রিম, টুথপেস্ট, চকোলেট, লিপস্টিক, এমনকি রঙ তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।

মোস্তাক বলেন, গ্রাসিলারিয়ার চারা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা গেলেও উলভার চারা ‘বারি’ সরবরাহ করে। এই উলভা জাতটি জাপান থেকে আনা হয়েছে এবং এর বাজার চাহিদা বেশি।

চাষের জন্য কৃষকদের বাঁশ, ১০ মিটার দড়ি ও শৈবালের চারা দেওয়া হয়।

বাড়ছে উৎপাদন, বাড়ছে বাজার

বারি-এর গবেষণা সহকারী মাকসুদুল হক বলেন, গত বছর তারা এক হাজার দড়ি বিতরণ করেছিলেন, এ বছর তা বাড়িয়ে দুই হাজার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “প্রতি দড়ি থেকে মাসে প্রায় দুই কেজি উলভা উৎপাদন হয়। নুনিয়াছড়ায় আমরা খুঁটি-দড়ি পদ্ধতি এবং ভাসমান ভেলা, দুই পদ্ধতিতেই চাষ করছি।”

চাষি শফি আলম বলেন, তিনি ও তাঁর পরিবার লামা, আলীকদম এবং বান্দরবান শহরে শৈবাল বিক্রি করেন।

“শুকনো কালো শৈবাল কেজি ৩০০ টাকা, তাজা কালো শৈবাল ১০০ টাকা এবং শুকনো সবুজ শৈবাল ১,০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়,” বলেন তিনি।

ব্যবসায়ীদেরও আগ্রহ

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীও এখন কৃষকদের কাছ থেকে শৈবাল কিনে ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং কক্সবাজারের পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে সরবরাহ করছেন।

মেসার্স আলমগীর স্টোরের মালিক মো. নোমান বলেন, গত বছর তিনি দেড় লাখ টাকার শুকনো সবুজ শৈবাল কিনেছিলেন।

তিনি বলেন, “আমার মতো আরও চার-পাঁচজন ব্যবসায়ী এখন এই ব্যবসায় আছেন। কিন্তু কৃষকরা চাহিদামতো সরবরাহ দিতে পারছেন না। এজন্য আমরা নিজেরাও কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি, যাতে তারা উৎপাদন বাড়াতে পারেন।”

নোমান জানান, তিনি সবুজ শৈবাল অন্তত ১,৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তাঁর প্রধান ক্রেতা কক্সবাজারের কয়েকটি পাঁচ তারকা হোটেল। এছাড়া বিদেশ থেকেও অর্ডার আসে।

দুনিয়াজুড়ে জ্বালানি সংকট: জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ দিচ্ছে যে কেন্দ্র

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাব যখন বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে, তখন কক্সবাজারের একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প নীরবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে যাচ্ছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাতাস থাকলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে। বিশাল আকারের টারবাইনগুলো ইতোমধ্যে এলাকাটির নতুন ল্যান্ডমার্কে পরিণত হয়েছে, যা দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে।

২০২৪ সালের ৮ মার্চ প্রকল্পটির উদ্বোধন হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যায়। দুই বছর পর এখন প্রশ্ন- দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রকল্পটির অবদান কতটা?

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে, যার অর্থায়নে সহযোগিতা করেছে চীনের এসপিআইসি ওয়েইলিং পাওয়ার করপোরেশন। প্রকল্পের আওতায় ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২২টি টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে, যার মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানায়, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি তাদের কাছেই বিক্রি করা হয়।

বিপিডিবির ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার সেল-৩ এর উপপরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ফরিদি বলেন, “২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে।”

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে কেন্দ্রটি গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। স্থাপিত ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াটের তুলনায় এটি প্রায় ১৭ শতাংশ উৎপাদন হার নির্দেশ করে।

ফরিদি বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ উৎপাদন হারকে উৎসাহব্যঞ্জক বলা যায়। এমনকি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও সাধারণত ২০ শতাংশের মতো উৎপাদন করে।”

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ডলার। সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ সেন্ট দরে কিনছে। সেই হিসাবে গত দুই বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিদ্যুৎ কিনেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে পারে। তবে টারবাইনগুলো ২০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক কম।

প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী মুকিত আলম খান বলেন, “এ ধরনের আরও প্রকল্প হাতে নেওয়া গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

বর্তমানে আকিজ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের চিফ বিজনেস অফিসার হিসেবে কর্মরত মুকিত বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজার অঞ্চলে বাতাসের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। প্রকৃতিতে এমন পরিবর্তন কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি উন্নত হলে উৎপাদনও বাড়বে।”

প্রাথমিকভাবে স্থাপিত ক্ষমতার ২৩ শতাংশ উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

সাম্প্রতিক সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ টারবাইন সচল রয়েছে এবং ব্লেড ঘুরছে। শীতকালে বাতাসের গতি কম থাকায় উৎপাদন কমে যায়, তবে গ্রীষ্মে বাতাস বাড়ার সঙ্গে উৎপাদনও বাড়ে।

ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জির সহকারী ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু সূর্য ডোবার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বাতাস থাকলে বায়ু বিদ্যুৎ যেকোনো সময় উৎপাদন করতে পারে।”

তিনি জানান, বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার হলে উৎপাদন শুরু হয় এবং ৯ মিটার হলে পূর্ণ ৩ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব।

“বিকাল থেকে রাত যখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি, তখন বাতাসও তুলনামূলক ভালো থাকে,” বলেন তিনি।

ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় সুবিধা রয়েছে উল্লেখ করে বেলাল বলেন,

এক মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় তিন একর জমি লাগে, কিন্তু ৩ মেগাওয়াটের একটি বায়ু টারবাইনের জন্য লাগে মাত্র ২০ শতাংশ জমি।

তবে বজ্রপাত বড় ঝুঁকি উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রায় ৯০ মিটার উঁচু টাওয়ারগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাতাসের গতি সর্বোচ্চ থাকে এবং এই সময় উৎপাদনও সর্বাধিক হয়।

মুকিত আলম খান বলেন, “কক্সবাজার এলাকায় গড় বাতাসের গতি প্রায় ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রতি সেকেন্ড। উপকূলীয় অঞ্চলে আরও বেশি গতির বাতাস থাকায় সেখানে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।”

চৌফলদণ্ডীর বাসিন্দা শারমিন সুলতানা বলেন, “এটা এখন দর্শনীয় জায়গা হয়ে গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের পাশেই কেন্দ্র, তবুও আমরা অন্ধকারেই থাকি।”

তিনি জানান, শীতকালে লোডশেডিং কম থাকলেও গরম পড়তেই আবার বেড়েছে।

“গত গরমে অনেক রাত বিদ্যুৎ ছিল না,” বলেন তিনি।

ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহুরুল ইসলাম খান বলেন, “উৎপাদন নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু দুঃখজনক হলো, নতুন প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তুত থাকলেও অনুমোদন না পাওয়ায় এগোতে পারিনি।”

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুতের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানি খরচ না থাকায় এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী।”

তিনি বলেন, “এটি পরিবেশবান্ধব, কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং বৈশ্বিক কার্বন বাজারেও ভূমিকা রাখতে পারে।”

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে জানান তিনি।

স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয় ২০০৫ সালে ফেনীর সোনাগাজীতে। পরে কুতুবদিয়ায় ১ মেগাওয়াটের আরেকটি প্রকল্প স্থাপন করা হলেও তা স্থায়ীভাবে চালু রাখা যায়নি।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১,৩৭০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাতাসের গতিবেগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

ন্যাশনাল রিনিউএবল এনার্জি ল্যাবরেটরির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনার দাকোপ, চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও চাঁদপুরের মোহনা অঞ্চলে বাতাসের গতি ৬ মিটার প্রতি সেকেন্ডের বেশি, যা বায়ু বিদ্যুতের জন্য উপযোগী।

প্রতিবেদনটি বলছে, দেশে প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৫ দশমিক ৭৫ থেকে ৭ দশমিক ৭৫ মিটার গতির বাতাস পাওয়া যায়, যা তাত্ত্বিকভাবে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে ডেনমার্কভিত্তিক কোপেনহেগেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স বঙ্গোপসাগরে ৫০০ মেগাওয়াটের অফশোর বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়।

এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের উপকূলীয় জ্বালানি সম্ভাবনা উন্মোচনের পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

আপনি জানেন কী? লবণাক্ত সমুদ্র, মিষ্টি নদীএকই জলের দুই স্বাদ- রহস্যটা কোথায়?


আমরা প্রতিদিন যে নদীর পানি দেখি তা স্বচ্ছ, পানযোগ্য। অথচ সেই নদীরই শেষ গন্তব্য সমুদ্র, যার পানি তীব্র নোনতা। একই উৎসের জল, কিন্তু স্বাদে এত পার্থক্য কেন?
চলুন, সহজ করে জেনে নেওয়া যাক এই নোনা জলের গল্প।

১. লবণের জন্ম স্থলভাগে
বৃষ্টি, পাথর আর খনিজের গল্প


সমুদ্রের লবণের শুরুটা কিন্তু স্থলভাগেই। বৃষ্টি যখন পাহাড়, মাটি ও পাথরের ওপর পড়ে, তখন ধীরে ধীরে পাথর ক্ষয় হতে থাকে। এই ক্ষয়ের ফলে সোডিয়াম, ক্লোরাইডসহ নানা খনিজ পানির সঙ্গে মিশে যায়।
নদী সেই খনিজগুলোকে বয়ে নিয়ে যায় দূর থেকে দূরে, শেষমেশ সমুদ্রে। অর্থাৎ, সমুদ্রের লবণের মূল ‘সরবরাহকারী’ আমাদের এই ভূমিই।

২. নদী নোনতা নয় কেন?
প্রবাহই এখানে মূল চাবিকাঠি


নদী লবণ বয়ে আনে, কিন্তু নিজে নোনতা হয় না। কেন?
কারণ নদী সবসময় চলমান। খনিজগুলো নদীতে জমে থাকার সুযোগ পায় না, দ্রুত সাগরে গিয়ে মিশে যায়।
তার ওপর নিয়মিত বৃষ্টির পানি নদীকে ‘পাতলা’ করে রাখে। ফলে লবণের ঘনত্ব এতটাই কম থাকে যে আমরা তা টেরই পাই না।

৩. বঙ্গোপসাগর: একটু ভিন্ন স্বাদ
কম লবণাক্ততার পেছনে নদীর প্রভাব


বিশ্বের অধিকাংশ সমুদ্রে গড় লবণাক্ততা প্রায় ৩৫‰ (প্রতি হাজারে ৩৫ ভাগ)। কিন্তু আমাদের বঙ্গোপসাগরে এই মাত্রা তুলনামূলক কম। প্রায় ৩০–৩৪‰।
এর কারণ কী?
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো বিশাল নদীগুলো বিপুল পরিমাণ মিষ্টি পানি এনে মিশিয়ে দেয় সমুদ্রে। তার সঙ্গে যোগ হয় মৌসুমি বৃষ্টিপাত।
ফলে, লবণাক্ততার ভারসাম্য এখানে কিছুটা কমে আসে।

৪. সমুদ্র কেন লবণ জমিয়ে রাখে?
বাষ্পীভবন ও সময়ের দীর্ঘ হিসাব


নদী লবণ এনে দেয়, আর সমুদ্র তা ধরে রাখে হাজার হাজার বছর ধরে।
সূর্যের তাপে সমুদ্রের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে যায়, কিন্তু লবণ থেকে যায় নিচেই। এই বাষ্পীভবনের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লবণের পরিমাণ বাড়তেই থাকে।
এছাড়া সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরি ও খনিজ নির্গমনও এই লবণাক্ততা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

সংক্ষেপে সহজ কথা

নদী লবণ বহন করে, আর সমুদ্র তা জমা রাখে। এই সহজ প্রক্রিয়াই তৈরি করে—মিষ্টি নদী আর নোনতা সমুদ্রের বৈপরীত্য।
প্রকৃতিকে জানুন, উপকূলকে বুঝুন। বে ইনসাইটের সঙ্গে থাকুন।