সংকুচিত বন, সঙ্কটে হাতি

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালংয়ে ভোরের অন্ধকার তখনও পুরো কাটেনি। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে স্থানীয়দের। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তিনটি বন্য হাতির একটি পাল লোকালয়ে ঢুকে বসতঘরের দেয়াল ভাঙতে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বাসিন্দারা।

কিন্তু পালানোর সুযোগ পাননি ছেমন আরা ও তার তিন বছরের মেয়ে আসমা বিবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতির সামনে পড়ে ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়। এরপর আম-কাঁঠাল খেয়ে হাতির পালটি পাশের পাহাড়ি বনে ফিরে যায়।

এই ঘটনা নতুন নয়। বরং কক্সবাজারে মানুষ ও হাতির সংঘাত এখন এক গভীর পরিবেশগত সংকটের প্রতীক হয়ে উঠছে, যেখানে একদিকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মানুষ, অন্যদিকে সংকুচিত আবাসস্থলে আটকে পড়া মহাবিপন্ন এশীয় হাতি।

বন কমছে, বাড়ছে সংঘাত

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগ মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২০৩টি বন্য হাতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৫টি শাবক। ২০১৬ সালের জাতীয় জরিপে দেশে মোট বন্য হাতির সংখ্যা ধরা হয়েছিল ২৬৮টি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এদের “মহাবিপন্ন” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতির সংখ্যা যতটা না বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে তাদের বিচরণক্ষেত্র।

কক্সবাজারে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী অভয়ারণ্য, ঈদগাঁওয়ের ব্যাঙডেবা বনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই প্রায় ১৮ হাজার ৬০০ হেক্টর বনভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বনভূমির বড় অংশ এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, দখল ও বিচ্ছিন্ন বসতিতে আক্রান্ত।

তার ভাষায়, “বনের ভেতরেও মানুষ বসবাস করছে। ফলে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।”

রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমির ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

বন বিভাগ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ২০০ একর বনভূমি সম্পূর্ণ উজাড় হয়েছে। আরও কয়েক হাজার একর এলাকায় গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জ্বালানি সংগ্রহ, বসতি নির্মাণ ও অবকাঠামো তৈরির কারণে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র এক মূল্যায়নে বলা হয়, ক্যাম্পসংলগ্ন অন্তত ৭ হাজার ২২০ হেক্টর বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে পুনর্বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার একর এলাকায় নতুন গাছ লাগানো হয়েছে।

তবে বন গবেষকরা বলছেন, একটি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেলে কেবল গাছ লাগিয়ে সেই বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

হাতির করিডর ভেঙে দিচ্ছে উন্নয়ন

মানুষ-হাতি সংঘাতের আরেকটি বড় কারণ উন্নয়ন প্রকল্প।

কক্সবাজার-দোহাজারী রেললাইন চালুর পর হাতির অন্তত ১৬টি চলাচল পথ ও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পরিবেশবিদদের অভিযোগ। এছাড়া সড়ক, বসতি, কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্ত অবকাঠামো হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা তৈরি করছে।

ফলে হাতির পাল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নেকম’-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমানের মতে, হাতি সাধারণত মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক নয়। কিন্তু চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা খাদ্যসংকট তৈরি হলে তারা বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

এক দশকে অন্তত ৬০ হাতির মৃত্যু

মানুষের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছে হাতিও।

গত এক দশকে কক্সবাজার অঞ্চলে অন্তত ৬০টি হাতি মারা গেছে বলে বন বিভাগ ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে অন্তত ২৪টি হাতি। গুলিতে আহত বা নিহত হয়েছে আরও কয়েকটি।

২০২০ সালে ঈদগড়ে গুলিতে নিহত হয় পরিচিত একটি স্ত্রী হাতি “গণেশবতী”। ২০২১ সালে রামুতে বিদ্যুতায়িত ফাঁদে মারা যায় একটি শাবক।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষায় অনেক সময় স্থানীয়রা অবৈধ বিদ্যুৎ ফাঁদ ব্যবহার করেন। এতে সংঘাত আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নেকম-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা শফিক রহমান বলেন, “মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবসময় ক্ষতিপূরণ পায় না। ফলে কেউ কেউ প্রতিশোধমূলকভাবে বিদ্যুৎ ফাঁদ বা গুলি ব্যবহার করে।”

সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্ন কার্যকারিতা নিয়ে

বন বিভাগ বলছে, সংঘাত কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ২০২২-২০২৮ মেয়াদের ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’
  • রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলপিজি সরবরাহ কর্মসূচি
  • হাতির করিডর পুনরুদ্ধার
  • পুনর্বনায়ন
  • বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণ
  • স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা কার্যক্রম

গত তিন বছরে অন্তত ৫২টি বৈদ্যুতিক ফাঁদ অপসারণের তথ্য দিয়েছে বন বিভাগ। এছাড়া কয়েক হাজার হেক্টর এলাকায় বনায়নও করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যার সমাধান ছাড়া সংঘাত কমানো কঠিন।

তাদের মতে, হাতির নিরাপদ চলাচলের করিডর পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

কারণ কক্সবাজারের বন এখন শুধু একটি পরিবেশগত সম্পদ নয়, এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের শেষ আশ্রয়গুলোর একটি।

কক্সবাজারের আকাশে রহস্যময় আলোর নেপথ্যে কি?

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

শুক্রবার (৮ মে) কক্সবাজার জেলাসহ বিভিন্ন এলাকার আকাশে এক অদ্ভুত ও উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আকাশের বুক চিরে একটি আলোর পিণ্ড অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ওপরের দিকে উঠে যেতে দেখা যায়, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী ছিল। এই রহস্যময় দৃশ্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী আলোচনা শুরু হলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন এর কিছু তথ্য বলছে, এটি ভারতের একটি শক্তিশালী ব্যালাস্টিক মিসাইল পরীক্ষার ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

সম্ভাব্য কারণ: ৩৫৬০ কিমি দীর্ঘ ‘ডেঞ্জার জোন’

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নেভিগেশন সতর্কবার্তা বা NOTAM (Notice to Airmen) অনুযায়ী, ভারত গত ৬ মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের একটি বিশাল এলাকায় বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল। ওড়িশার আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে ভারত মহাসাগরের গভীরে প্রায় ৩৫৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই সতর্কতা জারি করা হয়। সাধারণত এত দীর্ঘ পাল্লার সতর্কতা তখনই জারি করা হয় যখন কোনো আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইল (ICBM) বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়।

কক্সবাজার থেকে দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাব্য কারণ

ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, ভারতের ওড়িশার আব্দুল কালাম দ্বীপ (হুইলার আইল্যান্ড) থেকে যখন কোনো মিসাইল ভারত মহাসাগরের দিকে ছোড়া হয়, তার গতিপথ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের খুব কাছাকাছি থাকে। আজ আকাশ পরিষ্কার থাকায় এবং মিসাইলটি বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে (Ionosphere) পৌঁছানোর সময় এর ইঞ্জিনের ‘প্লুম’ বা ধোঁয়ার কণাগুলো আলোয় প্রতিফলিত হওয়ায় এটি কক্সবাজার থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে আপাতত।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) দাবি করছে, এটি ভারতের বহুল আলোচিত অগ্নি-৬ (Agni-VI) বা অগ্নি সিরিজের কোনো উন্নত সংস্করণের পরীক্ষা হতে পারে।

কেন এই আলো দেখা গেল?

ব্যালাস্টিক মিসাইল যখন বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তর ভেদ করে মহাকাশের দিকে এগিয়ে যায়, তখন এর রকেট ইঞ্জিনের এক্সজস্ট গ্যাস এবং বায়ুর ঘর্ষণে এক ধরনের উজ্জ্বল আভা তৈরি হয়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে কয়েকশ কিলোমিটার দূর থেকেও এই দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। এর আগে ২০২২ এবং ২০২৩ সালেও ভারতের একই ধরনের পরীক্ষার সময় বাংলাদেশ থেকে এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল।

অগ্নি-৬ এর সক্ষমতা:

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং এর পাল্লা হতে পারে ১০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি। এতে ‘MIRV’ প্রযুক্তি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মাধ্যমে একটি মিসাইল দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব।

নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে কবে?

ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা (DRDO) বা দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাধারণত এ ধরনের কৌশলগত পরীক্ষার সফল সমাপ্তির পর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করে। বুধবার রাতের শেষভাগে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা PIB (Press Information Bureau) বা DRDO-এর অফিশিয়াল পোর্টাল থেকে এই পরীক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত এবং নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজারে ছাত্রদল কমিটি নিয়ে বিতর্ক: সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে, এখন আসে ‘বিমানে চড়ে’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটি ঘোষণা ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর কেন্দ্র থেকে সরাসরি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও কাউন্সিল না হওয়া, পদবণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব এবং তৃণমূলের কর্মীদের বঞ্চনার অভিযোগে সংগঠনটির ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই বছর ধরে কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের কোনো কার্যকর কমিটি ছিল না। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হঠাৎ করেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছয় সদস্যের একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করে। তবে কমিটি ঘোষণার আগে কোনো কাউন্সিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় সংগঠনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।

পদবণ্টন নিয়ে ক্ষোভ, সড়কে বিক্ষোভ

ঘোষিত কমিটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের দাবি, তৃণমূলের মতামত নেওয়া হয়নি, দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় কর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি এবং গ্রুপভিত্তিক বিবেচনায় পদ দেওয়া হয়েছে।

কমিটি ঘোষণার পরপরই কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। শহরের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়, এতে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী জানান, কক্সবাজার ছাত্রদলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই গ্রুপিং বা অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে। নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেছে- ‘আমি নিরুপায়’

পদবঞ্চিত নেতা মিজানুল আলম বলেন, “ফাহিম সাবেক কমিটিতে আমার সহযোদ্ধা ছিলো। সে আসতে পারলে আমি কেনো আসতে পারবো না। সে তো আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তাঁর বয়স এখন ৪১/৪২। আমার বয়স ৩৬। যদি কক্সবাজারের জেলা ছাত্র দলের আওতাধীন আমাদের যে ২৭ টি ইউনিট আছে, সেখান থেকে সুপার ৪ বা সুপার ৫ করা হয়, সেখানে আমি সভাপতি হবো।

তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রীয় ছাত্র দলের সভাপতি আমার ফোন রিসিভ করে ক্ষমা চেয়েছে, সে আমাকে বলেছে- ‘আমি নিরুপায়, আমার কোনো উপায় ছিলো না, আমি নিরুপায়, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি পারি নাই, আমার হাত-পা বাঁধা’ সেরকম বলেছিলো। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ভাই কথা বলেছেন, সেক্রেটারি ফোন ধরে নি। ওনি বলেছেন, ‘আমরা অসহায়, আমরা নিরুপায়। আমাদেরকে উপর থেকে যেভাবে বলে দেওয়া হয়েছে ওভাবে দেওয়া হয়েছে।’”

কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কথা বলছেন নতুন সভাপতি

জেলা ছাত্রদলের নবনির্বাচিত কমিটি কতোতম জানতে চাইলে সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, “এখন সঠিক বলতে পারবোনা। আপনাকে পরে জানাচ্ছি।”

কাউন্সিল না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় কমিটি একযোগে এই কমিটি ঘোষনা করেছে, এগুলো কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত। তাই এই প্রশ্ন তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে।”

পদবঞ্চিতদের প্রতিবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পদ শুধু দুইটি, কিন্তু যোগ্য প্রার্থী তো অনেক। সেখান থেকে বাছাই করতে হয়। তাই সবাইকে তো দেয়া সম্ভব না। যারা জেলা কমিটির পদ পায়নি, তারা যোগ্য হলে অবশ্যই কলেজ কমিটি আছে, শহর কমিটি আছে, উপজেলা কমিটি আছে, সেখানে আসবে।”

পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যোগ্য ও নিয়মিত ছাত্রদের মাধ্যমে কমিটি পূর্ণা করা হবে।”

‘বিমানে চড়ে এসে শোভাযাত্রা’, সমালোচনা সাবেক নেতার

জেলা ছাত্রদলের সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমাদের সময় এমন রেওয়াজ ছিলোনা। বিমানে চড়ে এসে মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা করা ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্য নয়। কক্সবাজারে এই রেওয়াজ শুরু হয় ২০১২ সালের দিকে কাউন্সিল ছাড়া ছাত্রলীগের কমিটি হলে, তখন সভাপতি সেক্রেটারি ঢাকা থেকে বিমানে চড়ে এসে এখানে বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনা নেয়া শুরু হয়।”

সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে

ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটির সর্বশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব আসে ১৯৯৩ সালে। ওই কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন আকতার চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হন বদরুল হুদা সিদ্দিকী। এরপর দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জেলা ছাত্রদলের আর কোনো নির্বাচিত কমিটি হয়নি।

বর্তমানে কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওই সময়ের সভাপতি আকতার চৌধুরী। সাম্প্রতিক কমিটি গঠন ও কাউন্সিলবিহীন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রবণতা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছে বে ইনসাইট।

তিনি বলেন, “এটা তো আসলে সাংগঠনিক বিধিমালার ভিত্তিতে চলে। অ্যাট দ্যাট টাইম আমাদের সময়কালে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছি প্রত্যক্ষ ভোটে। এরপর থেকে সাংগঠনিক বিধিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে যেহেতু নির্বাচন কেন্দ্রিক যারা এমপি ক্যান্ডিডেট থাকেন তাদের কতগুলো কনস্টিটিউয়েন্সি থাকে, এটার উপরে নির্বাচন সহযোগিতার কারণে সাংগঠনিক ছাত্রদলকে ওভাবে সাজানো হয়েছে। পরবর্তীতে যতটুকু দেখলাম আর কি… এরপর থেকে দেখলাম যে টোটালি সেন্ট্রালের উপর চলে গেছে, স্থানীয় প্রতি নির্বাচনের পদ্ধতি কিছু রাখে নাই।”

বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটি নির্ধারণের বিষয়টি কেমন দেখেন—এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি সমালোচনা না করে বলেন, “আমিও তো একজন সংগঠনের কর্মী, মূল দলের এখন সাংগঠন যেগুলি আছে সাধারণত এটা আমাদের সহযোগী সংগঠন হিসেবে তাদেরকে ব্যক্তিবদ্ধভাবে সেন্ট্রালি এখন করে এটা।”

এই প্রবণতা সংগঠনের ভেতরে কোন্দল বাড়াচ্ছে কি না—এ বিষয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেন, “আমি আসলে এই বিষয়ে সরাসরি কিছু এভাবে বলতে চাচ্ছি না। যেহেতু দীর্ঘকালীন একটা ফ্যাসিজমের ভিতরে সাংগঠনিক যে মানে কাজগুলো করার কথা ছিল সেভাবে করতে পারে নাই বলে, আমার কাছে মনে হয়েছে যে তারা সাংগঠনিকভাবে যে বিধিতে সংগঠনকে বোঝানোর কথা সে সুযোগটা তারা পায় নাই। সেটা বিএনপির ক্ষেত্রে হতে পারে, যুবদলের ক্ষেত্রে হতে পারে। তারপরে ছাত্রদল তো সেম একটি অবস্থায় ছিল।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার হলে সংগঠনগুলো আবার নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরবে।

“তো এখন যেহেতু একটা গণতান্ত্রিক সরকার দেশে প্রতিষ্ঠিত। তো বিএনপিও গণতন্ত্রের চর্চাটা আগের যে বিধি সে অনুসারে করবে এবং অঙ্গ সংগঠনগুলো সেভাবে চলবে। সহযোগী সংগঠন সেভাবে চলবে। এটাই আশা করছি। যেহেতু এখন গণতন্ত্র চর্চার একটা সুযোগ হয়েছে। আগে সুযোগ ছিল না।”

নিজের নেতৃত্বকাল প্রসঙ্গে আকতার চৌধুরী বলেন, “আমি প্রথমে ৯০ সালে আহ্বায়ক হয়েছি। আবার নির্বাচনের মাধ্যমে আমি জেলা ছাত্রদল সভাপতি হয়েছি। একবার ৯১ সালে আরেকবার ৯৩ সালে।”

‘ইলেকশন নয়, সিলেকশন’

জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাশেদুল হক রাসেল বলেন, “সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিলো ৭ম কমিটির। সেটি সীগাল হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাও ইলেকশন নয় সিলেকশন হয়েছিলো। ওইসময় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলো সৈয়দ আহমদ উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলো হাবিব উল্লাহ।”

সংকটের নতুন রূপ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংগঠনগুলোর কমিটি গঠন নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়। কাউন্সিলবিহীন কমিটি, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক বলেন, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার কথা বলা হলেও, তাতে বিরোধ কমবে নাকি আরও বাড়বে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

ইউনূস সরকারকে ইউনিসেফ- “আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না”

বে ইনসাইট ডেস্ক

ঢাকার একটি শিশু হাসপাতালের মেঝেতে কনিকা আক্তারের কান্না থামছে না। পাশে দাঁড়িয়ে তার স্বামী মোহাম্মদ জাকির স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন তাদের ৬ মাস বয়সী মেয়ে রুহির দিক, যে এখন হাম ওয়ার্ডের একটি বিছানায় শুয়ে আছে।

রুহির যমজ বোন রিসা একই দিনেই হামে মারা গেছে। এখন রুহি সেই একই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন, যেখানে তার বোন শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল।

জাকিরের একটি প্রশ্ন হাসপাতালের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়- “যে আমার মেয়ের মতোই দেখতে, তাকে আমি কীভাবে কবর দেব?”

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ (Science.org) ঠিক এভাবেই শুরু করে বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করা হাম নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে উঠে এসেছে হাম নিয়ে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ভয়াবহ হাম (Measles) মহামারির মুখোমুখি, যেখানে মধ্য মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী এবং ২৫০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল শিশু রোগীতে উপচে পড়ছে। সেখানে শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগী, নিথর দেহ, আর মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়া শিশুর দৃশ্য এখন সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংকটের মূল কারণ: টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন

‘সায়েন্স’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭৫ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশ দীর্ঘদিন উচ্চ টিকাদান হার বজায় রাখলেও, এই প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের বিপ্লব-পরবর্তী টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয়।

বিপ্লবের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে।

ইউনিসেফ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সতর্ক করে দেয় যে এটি টিকাদান ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারি সৃষ্টি করতে পারে।

“আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না”

‘সায়েন্স’ কে বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন।
তার ভাষায়, “আল্লাহর দোহাই, এটা করবেন না।

তবে নতুন দরপত্র ব্যবস্থা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায় এবং টিকার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

২০২৫ সালে পরিকল্পিত অতিরিক্ত এমআর ক্যাম্পেইনও বাতিল হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী (পরে অপসারিত), ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯% উপযুক্ত শিশু হাম টিকা পেয়েছে।

শূন্যতা থেকে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ

প্রাদুর্ভাব শুরু হয় জানুয়ারিতে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে। এরপর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে।

এখন পর্যন্ত ২১,০০০-এর বেশি হাসপাতালে ভর্তি রোগী শনাক্ত হয়েছে।

২৩ এপ্রিল WHO সতর্ক করে জানায়, এই সংক্রমণ মিয়ানমার ও ভারতের দিকে ছড়িয়ে পড়ার “উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি” রয়েছে।

WHO একে বাংলাদেশের “হাম নির্মূলের পূর্ববর্তী অগ্রগতির বিপরীত যাত্রা” হিসেবে বর্ণনা করে

অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা: পরিস্থিতির বহুগুণ জটিলতা

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ২৮% শিশু খর্বাকৃত এবং ১০% শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।

ভিটামিন এ-এর ঘাটতি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে তিনটি জাতীয় ভিটামিন এ কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কম অর্থায়নপ্রাপ্ত হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো এই চাপ সামলাতে পারছে না।

আইইডিসিআর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন ‘সায়েন্স’কে বলেন, “এটি শুধু টিকাদানের ঘাটতি নয়, একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।”

সরকারের পদক্ষেপ ও নতুন সংকট ব্যবস্থাপনা

নতুন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয়।

এপ্রিল মাসে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু হয় এবং WHO ও Gavi-এর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

৫ এপ্রিল জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয় এবং ২০ এপ্রিল জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়। ভিটামিন এ বিতরণও পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান গতিতে এই ক্যাম্পেইন দ্রুত সংক্রমণ থামাতে পারবে না।

দোষারোপ, তদন্ত

সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেন।

রানা ফ্লাওয়ার্সও বলেন, এই টেন্ডার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তদন্ত হওয়া উচিত।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান ‘সায়েন্স’কে বলেন, সরকার ব্যবস্থাকে “স্বচ্ছতা ও পক্ষপাতমুক্ত কাঠামো”তে আনতে চেয়েছিল।

তিনি স্বীকার করেন, “হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ এ শিশুদের মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি।”

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ তার প্রতিবেদনে লিখেছে, ঢাকার হাসপাতাল থেকে গ্রামাঞ্চলের ক্লিনিক পর্যন্ত একই চিত্র, শিশুদের জীবন, যা একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কাছে হার মানছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয় রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা, টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন এবং কাঠামোগত দুর্বলতা মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন এক জনস্বাস্থ্য সংকটে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রভাব শুধু দেশ নয়—আঞ্চলিক পর্যায়েও বিস্তার লাভ করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কক্সবাজার উপকূলের নতুন স্বপ্ন ‘সামুদ্রিক শৈবাল’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া সৈকতে একসময় ঝিনুক কুড়িয়েই সংসারে সামান্য সহায়তা করতেন আনোয়ারা বেগম। মহেশখালী চ্যানেলের তীর থেকে সংগ্রহ করা সেই ঝিনুক বিক্রি করতে তিনি যেতেন শহরের বড়বাজারের বার্মিজ মার্কেটে, যেখানে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন প্রধান ক্রেতা।

সেই বাজারেই প্রথম তাঁর চোখে পড়ে কালো, চুলের মতো দেখতে এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল, যা দেখতে অনেকটা কালো সেমাইয়ের মতো। রাখাইন সম্প্রদায়ের রান্নায় ব্যবহৃত এই শৈবাল মূলত মিয়ানমার থেকে আসত।

আনোয়ারা ও তাঁর সঙ্গীরা দ্রুত বুঝতে পারেন, ভাটার সময় সৈকতে যে সামুদ্রিক আগাছার মতো উদ্ভিদ তারা দেখেন, সেটিই আসলে বাজারে বিক্রি হওয়া এই শৈবাল। চাহিদা দেখে তারা সৈকত থেকে সেই শৈবাল সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেন।

এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক বিজ্ঞানী তাঁদের কাছে শৈবাল চাষের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। শুরুতে অবাক হলেও পরে প্রশিক্ষণ ও চারা পেয়ে ধীরে ধীরে তাঁরা শৈবাল চাষে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে আনোয়ারা বেগম সপ্তাহে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন এই শৈবাল চাষ থেকে।

তিনি বলেন, “আগে সংসারের কাজ ছাড়া নিজের কোনো আয় ছিল না। এখন নভেম্বর থেকে টানা সাত মাস শৈবাল চাষ করা যায়। মাসে দুইবার ফসল তোলা যায়। কাজও খুব কম। বাঁশ, দড়ি আর চারা পানিতে বসিয়ে দিলেই ১৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়।

তিনি জানান, তিনি এখন দুই ধরনের শৈবাল চাষ করেন। একটি কালো, অন্যটি সবুজ। স্থানীয় রাখাইন বাজার ছাড়াও লামা, আলীকদমসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় এসব বিক্রি হয়।

ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে চাষ

বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক শৈবালের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক চাষ।

প্রথমদিকে অল্প কয়েকটি পরিবার প্রশিক্ষণ পেলেও এখন শুধু বারি-এর মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কৃষক নিয়মিত চারা পাচ্ছেন। এছাড়া জাইকা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় আরও প্রায় ৫০০ মানুষ কক্সবাজারে শৈবাল চাষ করছেন।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজারের তুলনায় উৎপাদন এখনও অনেক কম। বড় অর্ডার এলেও কৃষকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যায় না।

নুনিয়াছড়ার আরেক চাষি মরিয়ম বেগম বলেন, “চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে আমরা ঠিকমতো সরবরাহই দিতে পারছি না।”

গবেষণা থেকে বাণিজ্যে

কক্সবাজারে শৈবাল চাষ সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি বারি-এর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ।

তিনি ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শৈবাল চাষ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগ্রহ তৈরি করেন।

মোস্তাক বলেন, মূলত দুই ধরনের শৈবাল চাষ হচ্ছে, কালো, চুলের মতো ‘গ্রাসিলারিয়া’ এবং সবুজ, লেটুস পাতার মতো ‘উলভা’।

তিনি বলেন, “শৈবাল বিশ্বজুড়ে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনীসহ নানা শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ।”

তিনি জানান, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, ইনানী সৈকত ও কক্সবাজার উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেই শৈবাল জন্মায়।

শৈবালে বিটা ক্যারোটিন, বি ভিটামিন, ভিটামিন সি, ডি, ই ও কে রয়েছে। এটি সরাসরি খাওয়া যায়, আবার এর থেকে তৈরি আগার আইসক্রিম, মেয়োনিজ, ওষুধের ক্যাপসুল, মলম, ক্রিম, টুথপেস্ট, চকোলেট, লিপস্টিক, এমনকি রঙ তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।

মোস্তাক বলেন, গ্রাসিলারিয়ার চারা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা গেলেও উলভার চারা ‘বারি’ সরবরাহ করে। এই উলভা জাতটি জাপান থেকে আনা হয়েছে এবং এর বাজার চাহিদা বেশি।

চাষের জন্য কৃষকদের বাঁশ, ১০ মিটার দড়ি ও শৈবালের চারা দেওয়া হয়।

বাড়ছে উৎপাদন, বাড়ছে বাজার

বারি-এর গবেষণা সহকারী মাকসুদুল হক বলেন, গত বছর তারা এক হাজার দড়ি বিতরণ করেছিলেন, এ বছর তা বাড়িয়ে দুই হাজার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “প্রতি দড়ি থেকে মাসে প্রায় দুই কেজি উলভা উৎপাদন হয়। নুনিয়াছড়ায় আমরা খুঁটি-দড়ি পদ্ধতি এবং ভাসমান ভেলা, দুই পদ্ধতিতেই চাষ করছি।”

চাষি শফি আলম বলেন, তিনি ও তাঁর পরিবার লামা, আলীকদম এবং বান্দরবান শহরে শৈবাল বিক্রি করেন।

“শুকনো কালো শৈবাল কেজি ৩০০ টাকা, তাজা কালো শৈবাল ১০০ টাকা এবং শুকনো সবুজ শৈবাল ১,০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়,” বলেন তিনি।

ব্যবসায়ীদেরও আগ্রহ

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীও এখন কৃষকদের কাছ থেকে শৈবাল কিনে ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং কক্সবাজারের পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে সরবরাহ করছেন।

মেসার্স আলমগীর স্টোরের মালিক মো. নোমান বলেন, গত বছর তিনি দেড় লাখ টাকার শুকনো সবুজ শৈবাল কিনেছিলেন।

তিনি বলেন, “আমার মতো আরও চার-পাঁচজন ব্যবসায়ী এখন এই ব্যবসায় আছেন। কিন্তু কৃষকরা চাহিদামতো সরবরাহ দিতে পারছেন না। এজন্য আমরা নিজেরাও কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি, যাতে তারা উৎপাদন বাড়াতে পারেন।”

নোমান জানান, তিনি সবুজ শৈবাল অন্তত ১,৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তাঁর প্রধান ক্রেতা কক্সবাজারের কয়েকটি পাঁচ তারকা হোটেল। এছাড়া বিদেশ থেকেও অর্ডার আসে।

দুনিয়াজুড়ে জ্বালানি সংকট: জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ দিচ্ছে যে কেন্দ্র

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাব যখন বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে, তখন কক্সবাজারের একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প নীরবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে যাচ্ছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাতাস থাকলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে। বিশাল আকারের টারবাইনগুলো ইতোমধ্যে এলাকাটির নতুন ল্যান্ডমার্কে পরিণত হয়েছে, যা দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে।

২০২৪ সালের ৮ মার্চ প্রকল্পটির উদ্বোধন হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যায়। দুই বছর পর এখন প্রশ্ন- দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রকল্পটির অবদান কতটা?

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে, যার অর্থায়নে সহযোগিতা করেছে চীনের এসপিআইসি ওয়েইলিং পাওয়ার করপোরেশন। প্রকল্পের আওতায় ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২২টি টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে, যার মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানায়, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি তাদের কাছেই বিক্রি করা হয়।

বিপিডিবির ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার সেল-৩ এর উপপরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ফরিদি বলেন, “২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে।”

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে কেন্দ্রটি গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। স্থাপিত ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াটের তুলনায় এটি প্রায় ১৭ শতাংশ উৎপাদন হার নির্দেশ করে।

ফরিদি বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ উৎপাদন হারকে উৎসাহব্যঞ্জক বলা যায়। এমনকি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও সাধারণত ২০ শতাংশের মতো উৎপাদন করে।”

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ডলার। সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ সেন্ট দরে কিনছে। সেই হিসাবে গত দুই বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিদ্যুৎ কিনেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে পারে। তবে টারবাইনগুলো ২০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক কম।

প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী মুকিত আলম খান বলেন, “এ ধরনের আরও প্রকল্প হাতে নেওয়া গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

বর্তমানে আকিজ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের চিফ বিজনেস অফিসার হিসেবে কর্মরত মুকিত বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজার অঞ্চলে বাতাসের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। প্রকৃতিতে এমন পরিবর্তন কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি উন্নত হলে উৎপাদনও বাড়বে।”

প্রাথমিকভাবে স্থাপিত ক্ষমতার ২৩ শতাংশ উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

সাম্প্রতিক সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ টারবাইন সচল রয়েছে এবং ব্লেড ঘুরছে। শীতকালে বাতাসের গতি কম থাকায় উৎপাদন কমে যায়, তবে গ্রীষ্মে বাতাস বাড়ার সঙ্গে উৎপাদনও বাড়ে।

ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জির সহকারী ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু সূর্য ডোবার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বাতাস থাকলে বায়ু বিদ্যুৎ যেকোনো সময় উৎপাদন করতে পারে।”

তিনি জানান, বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার হলে উৎপাদন শুরু হয় এবং ৯ মিটার হলে পূর্ণ ৩ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব।

“বিকাল থেকে রাত যখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি, তখন বাতাসও তুলনামূলক ভালো থাকে,” বলেন তিনি।

ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় সুবিধা রয়েছে উল্লেখ করে বেলাল বলেন,

এক মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় তিন একর জমি লাগে, কিন্তু ৩ মেগাওয়াটের একটি বায়ু টারবাইনের জন্য লাগে মাত্র ২০ শতাংশ জমি।

তবে বজ্রপাত বড় ঝুঁকি উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রায় ৯০ মিটার উঁচু টাওয়ারগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাতাসের গতি সর্বোচ্চ থাকে এবং এই সময় উৎপাদনও সর্বাধিক হয়।

মুকিত আলম খান বলেন, “কক্সবাজার এলাকায় গড় বাতাসের গতি প্রায় ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রতি সেকেন্ড। উপকূলীয় অঞ্চলে আরও বেশি গতির বাতাস থাকায় সেখানে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।”

চৌফলদণ্ডীর বাসিন্দা শারমিন সুলতানা বলেন, “এটা এখন দর্শনীয় জায়গা হয়ে গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের পাশেই কেন্দ্র, তবুও আমরা অন্ধকারেই থাকি।”

তিনি জানান, শীতকালে লোডশেডিং কম থাকলেও গরম পড়তেই আবার বেড়েছে।

“গত গরমে অনেক রাত বিদ্যুৎ ছিল না,” বলেন তিনি।

ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহুরুল ইসলাম খান বলেন, “উৎপাদন নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু দুঃখজনক হলো, নতুন প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তুত থাকলেও অনুমোদন না পাওয়ায় এগোতে পারিনি।”

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুতের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানি খরচ না থাকায় এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী।”

তিনি বলেন, “এটি পরিবেশবান্ধব, কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং বৈশ্বিক কার্বন বাজারেও ভূমিকা রাখতে পারে।”

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে জানান তিনি।

স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয় ২০০৫ সালে ফেনীর সোনাগাজীতে। পরে কুতুবদিয়ায় ১ মেগাওয়াটের আরেকটি প্রকল্প স্থাপন করা হলেও তা স্থায়ীভাবে চালু রাখা যায়নি।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১,৩৭০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাতাসের গতিবেগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

ন্যাশনাল রিনিউএবল এনার্জি ল্যাবরেটরির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনার দাকোপ, চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও চাঁদপুরের মোহনা অঞ্চলে বাতাসের গতি ৬ মিটার প্রতি সেকেন্ডের বেশি, যা বায়ু বিদ্যুতের জন্য উপযোগী।

প্রতিবেদনটি বলছে, দেশে প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৫ দশমিক ৭৫ থেকে ৭ দশমিক ৭৫ মিটার গতির বাতাস পাওয়া যায়, যা তাত্ত্বিকভাবে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে ডেনমার্কভিত্তিক কোপেনহেগেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স বঙ্গোপসাগরে ৫০০ মেগাওয়াটের অফশোর বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়।

এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের উপকূলীয় জ্বালানি সম্ভাবনা উন্মোচনের পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

আপনি জানেন কী? লবণাক্ত সমুদ্র, মিষ্টি নদীএকই জলের দুই স্বাদ- রহস্যটা কোথায়?


আমরা প্রতিদিন যে নদীর পানি দেখি তা স্বচ্ছ, পানযোগ্য। অথচ সেই নদীরই শেষ গন্তব্য সমুদ্র, যার পানি তীব্র নোনতা। একই উৎসের জল, কিন্তু স্বাদে এত পার্থক্য কেন?
চলুন, সহজ করে জেনে নেওয়া যাক এই নোনা জলের গল্প।

১. লবণের জন্ম স্থলভাগে
বৃষ্টি, পাথর আর খনিজের গল্প


সমুদ্রের লবণের শুরুটা কিন্তু স্থলভাগেই। বৃষ্টি যখন পাহাড়, মাটি ও পাথরের ওপর পড়ে, তখন ধীরে ধীরে পাথর ক্ষয় হতে থাকে। এই ক্ষয়ের ফলে সোডিয়াম, ক্লোরাইডসহ নানা খনিজ পানির সঙ্গে মিশে যায়।
নদী সেই খনিজগুলোকে বয়ে নিয়ে যায় দূর থেকে দূরে, শেষমেশ সমুদ্রে। অর্থাৎ, সমুদ্রের লবণের মূল ‘সরবরাহকারী’ আমাদের এই ভূমিই।

২. নদী নোনতা নয় কেন?
প্রবাহই এখানে মূল চাবিকাঠি


নদী লবণ বয়ে আনে, কিন্তু নিজে নোনতা হয় না। কেন?
কারণ নদী সবসময় চলমান। খনিজগুলো নদীতে জমে থাকার সুযোগ পায় না, দ্রুত সাগরে গিয়ে মিশে যায়।
তার ওপর নিয়মিত বৃষ্টির পানি নদীকে ‘পাতলা’ করে রাখে। ফলে লবণের ঘনত্ব এতটাই কম থাকে যে আমরা তা টেরই পাই না।

৩. বঙ্গোপসাগর: একটু ভিন্ন স্বাদ
কম লবণাক্ততার পেছনে নদীর প্রভাব


বিশ্বের অধিকাংশ সমুদ্রে গড় লবণাক্ততা প্রায় ৩৫‰ (প্রতি হাজারে ৩৫ ভাগ)। কিন্তু আমাদের বঙ্গোপসাগরে এই মাত্রা তুলনামূলক কম। প্রায় ৩০–৩৪‰।
এর কারণ কী?
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো বিশাল নদীগুলো বিপুল পরিমাণ মিষ্টি পানি এনে মিশিয়ে দেয় সমুদ্রে। তার সঙ্গে যোগ হয় মৌসুমি বৃষ্টিপাত।
ফলে, লবণাক্ততার ভারসাম্য এখানে কিছুটা কমে আসে।

৪. সমুদ্র কেন লবণ জমিয়ে রাখে?
বাষ্পীভবন ও সময়ের দীর্ঘ হিসাব


নদী লবণ এনে দেয়, আর সমুদ্র তা ধরে রাখে হাজার হাজার বছর ধরে।
সূর্যের তাপে সমুদ্রের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে যায়, কিন্তু লবণ থেকে যায় নিচেই। এই বাষ্পীভবনের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লবণের পরিমাণ বাড়তেই থাকে।
এছাড়া সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরি ও খনিজ নির্গমনও এই লবণাক্ততা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

সংক্ষেপে সহজ কথা

নদী লবণ বহন করে, আর সমুদ্র তা জমা রাখে। এই সহজ প্রক্রিয়াই তৈরি করে—মিষ্টি নদী আর নোনতা সমুদ্রের বৈপরীত্য।
প্রকৃতিকে জানুন, উপকূলকে বুঝুন। বে ইনসাইটের সঙ্গে থাকুন।

হাতে তেলের মজুদ, রাস্তায় দীর্ঘ লাইন: সংকটটা কোথায়?

বে ইনসাইট | ঢাকা

তপ্ত দুপুর। মাথার ওপর চৈত্রের রোদ, পিচঢালা সড়ক থেকে উঠছে গরম হাওয়া।
রাজধানীর আসাদগেটে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাফওয়ান। পড়াশোনার খরচ জোগাতে অবসরে রাইড শেয়ারিং করেন। কিন্তু আজ তার সময় যাচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে।

দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তার সামনে গাড়ির লাইন, পেছনেও একই চিত্র। এই লাইন আসাদগেট থেকে বিজয় সরণি, দুই কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব পেরিয়ে গেছে।

সাফওয়ান বে ইনসাইটকে বলেন, “পাম্পগুলো আগের বছরের পারফরম্যান্স অনুযায়ী তেল পাচ্ছে। অনেক পাম্পেই কম পড়ে যাচ্ছে। এজন্যই মনে হয় এমন লাইন।”

তথ্য বলছে, আমদানি করা ডিজেলের চাহিদা বাংলাদেশে বেশি থাকলেও, দীর্ঘ সারির অধিকাংশ বাইক বা গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে অকটেন বা পেট্রোলের জন্য। অথচ দেশেই এই চাহিদার একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয়।

একারণেই প্রশ্নটা থেকে যায়, সংকট কি সত্যিই তেলের?

উৎপাদন আছে, তবুও অস্থিরতা

পরিসংখ্যান বলছে, গল্পটা এত সরল নয়। বাংলাদেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন, অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন।

দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে এর একটি বড় অংশই উৎপাদন হচ্ছে দেশে।
পেট্রোলের প্রায় অর্ধেক, অকটেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

শুধু সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টেই গত অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার টনের বেশি পেট্রোল আর ৫৫ হাজার টনের বেশি অকটেন।

অর্থাৎ চাকা থামিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ঘাটতির গল্প এখানে নেই।

তবুও শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে শত শত যানবাহন। যেন জ্বালানি নয়, ‘অপেক্ষা’ই এখন প্রধান জ্বালানী।

সংকটের নতুন নাম: আতঙ্ক

বাস্তবতা বলছে, এটি জ্বালানির ঘাটতির চেয়ে বেশি মানসিক সংকট।

গুজব, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের ভয় এই তিনে মিলে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য চাপ।

পাম্প মালিকদের ভাষায়, মানুষ এখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছেন। অনেকে মজুত করছেন, “যদি পরে না পাওয়া যায়” এই আশঙ্কায়।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বে ইনসাইটকে বলেন,

“মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুজব ছড়াচ্ছে, মিডিয়াও কিছুটা ভূমিকা রাখছে।”

অর্থাৎ পাম্পে যতটা তেল কমছে, তার চেয়ে বেশি কমছে মানুষের আস্থা।

পাম্পগুলো তেল মজুত করছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “তেল ডিপো থেকে শুধু পাম্পেই আসে না, নানা দপ্তরে যায়, কলকারখানায় যায়, সরকারি অফিসে যায়। সেখান থেকে তেল মজুদ হতে পারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, আমাদের তেল বিক্রি না করে মজুত করার প্রশ্নই আসে না।”

মজুত আছে, তবুও পৌঁছাচ্ছে না

সরকারি হিসাব বলছে, দেশে জ্বালানির মজুত স্বাভাবিক।

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দেয়া তথ্যমতে বর্তমানে রয়েছে-

  • প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল
  • ১৬ হাজার টন পেট্রোল
  • ১০ হাজার ৫০০ টন অকটেন

এপ্রিল মাসে আরও আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে চলছে অভিযান। মার্চ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত ৩৪২টি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ লিটার জ্বালানি।

কিন্তু এই সংখ্যাগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে যেন পৌঁছায় না।

কারণ বাস্তবতার আরেকটি দিক আছে, সরবরাহের অসমতা। যেখানে তেল আছে, সেখান থেকে যেখানে প্রয়োজন সেই যাত্রাপথেই তৈরি হচ্ছে ফাঁক।

দাম, লোকসান আর নীতির দ্বিধা

বর্তমানে এক লিটার ডিজেলের সরবরাহ খরচ প্রায় ২০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। প্রতিদিন লোকসান প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা।

এই আর্থিক চাপ সরকারের ওপর যেমন আছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে বাজারের আচরণেও।

সংসদে জ্বালানির দাম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছিলেন, “গত মাসে সরকার কোনো মূল্যবৃদ্ধি করেনি। তবে আগামী মে মাসের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কাজ চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং মন্ত্রিপরিষদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে দাম সমন্বয় করা হবে।”

তবে বিষয়টি নিয়ে বে ইনসাইটের সাথে কথা হয় বিশ্লেষক ও এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার এর সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের। তিনি বলেন, “পদ্ধতি তৈরি করে সেভিংস করার জন্য এই মূল্য সমন্বয় দরকার ছিল। কিন্তু দাম সমন্বয় করলে চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে সেটি উল্টো প্রভাবও ফেলতে পারে।”

এর মধ্যেই বিশ্ববাজারে এসেছে নতুন মোড়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে তেলের দাম কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বিবিসি তার খবরে বলছে, বিশ্ববাজারে বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলার ৩০ সেন্টে নেমে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া তেলের দাম প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ কমে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ যেখানে দেশে দাম বাড়ানোর চিন্তা, সেখানে বিশ্ববাজারে দাম কমার ইঙ্গিত।

এই দ্বন্দ্বই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন।

সমাধান: নিয়ন্ত্রণ, না আস্থা?

বিশৃঙ্খলার এই চিত্রে বিশেষজ্ঞরা খুঁজছেন প্রযুক্তির সমাধান। শ্রীলঙ্কার মতো কিউআর কোডভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল নেওয়া যাবে না।

মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের মতে, “ট্রাফিক পুলিশের কাছে স্ক্যানার থাকে, তারা স্ক্যান করে আপনার গাড়িতে কোন প্রবলেম থাকলে ধরে ফেলে। প্রত্যেকটা গাড়িতো ডিজিটাইজড। পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা আছে, তাদের কাছে একটা স্ক্যানিং সিস্টেম চালু করিয়ে দেন।”

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “সংকট পুরোপুরি নেই, কিন্তু যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। একাধিকবার বেশি তেল নেওয়ার প্রবণতা থাকলে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”

অর্থাৎ সংকট সমাধানে শুধু জ্বালানি নয়, ব্যবস্থাপনাই মূল বিষয়।

বৈশ্বিক চাপের ছায়া

এই সংকট শুধু দেশের ভেতরের নয়। বিশ্ববাজারেও অস্থিরতা চলছে।

ইরান যুদ্ধ, সরবরাহ অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।

বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য ডিজেল, ক্রুড অয়েল ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করাই হয়ে উঠতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।

অপেক্ষার শহর

আমরা যখন এই হিসাব-নিকাশ করছি, আসাদগেটের সেই লাইন তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, কিন্তু অপেক্ষা শেষ হয়নি।

সাফওয়ান এখনও দাঁড়িয়ে, তার বাইকের ট্যাংক প্রায় খালি।

আপনি জানেন কী সৈকতের বালিয়াড়ি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আপনি জানেন কি? সমুদ্রসৈকত শুধু পর্যটকদের জন্যই আকর্ষণ নয়, এটি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বালিয়াড়ি, অর্থাৎ সৈকতের প্রাকৃতিক বালি স্তর ও ঢেউ-বাধা, উপকূলকে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রের ক্ষতিকর শক্তি থেকে রক্ষা করে। গবেষণা দেখায়, সমুদ্রের শক্তি প্রায় ৩০–৫০% পর্যন্ত বালিয়াড়ি শোষণ করে, ফলে inland এলাকায় ভূমি ক্ষয় ও বন্যার ঝুঁকি কমে।

বালিয়াড়ি কেবল প্রাকৃতিক বাধা নয়; এটি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। কক্সবাজারের বালিয়াড়িতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, কাঁকড়া, ছোট সামুদ্রিক প্রাণী, সাপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী আশ্রয় নেয়। এছাড়া, বালিয়াড়ি সৈকতের উপর দিয়ে সমুদ্রের বায়ু ও ঢেউ নিয়ন্ত্রণ করে, যা ভূমি ক্ষয় প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি হারালে প্রতি বছর স্থানীয় উপকূলীয় এলাকা ১–২ মিটার পর্যন্ত ক্ষয় হতে পারে।

কিন্তু আধুনিক সময়ে অবৈধ স্থাপনা, পর্যটন ও সমুদ্রতীরের অব্যবস্থাপনার কারণে বালিয়াড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বালি উত্তোলন, দোকানপাট স্থাপন এবং সমুদ্র সৈকতের অযাচিত ব্যবহারের ফলে এটি সরু ও ভেঙে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু উপকূল নয়, সমুদ্রপথ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকেও বিপন্ন করে।

স্থানীয় প্রশাসন, বিজ্ঞানী এবং কমিউনিটি উদ্যোগগুলো বালিয়াড়ি সংরক্ষণ ও পুনঃস্থাপনের জন্য কাজ করছে। এটি রক্ষা করতে আমরা সবাই অবদান রাখতে পারি, যেমন বালির অপচয় রোধ, অযথা স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখা।

সংক্ষেপে, বালিয়াড়ি কেবল কক্সবাজারের সৌন্দর্য নয়; এটি উপকূলের প্রথম প্রতিরক্ষা, যা মানুষের জীবন, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে রক্ষা করে। বালিয়াড়ি রক্ষার মাধ্যমে আমরা ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও পরিবেশগত বিপদ থেকে কক্সবাজারকে বাঁচাতে পারি।

তিন রাষ্ট্রপর্বে কক্সবাজারের তিন মন্ত্রী: উপকূল থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

পর্যটন নির্ভর জেলা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রিত্বের নজির খুব বেশি নয়। তবে ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ—তিন রাষ্ট্রপর্বেই এই জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব ছিল। জন্ম, পরিবার, ছাত্ররাজনীতি, দলীয় উত্থান, মন্ত্রীত্ব এবং বিতর্ক—সব মিলিয়ে তিনজনের রাজনৈতিক জীবন তিন ভিন্ন সময়ের প্রতিচ্ছবি।


ব্রিটিশ ভারত পর্ব

হারবাংয়ের সন্তান, প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রী

১৮৯০ সালে কক্সবাজারের হারবাংয়ে জন্ম নেন জালালউদ্দিন আহমদ। শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পান। বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা তাঁকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলে। সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “খান বাহাদুর” উপাধি দেয়।

১৯৩৭ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বঙ্গীয় আইনসভায় প্রবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী–এর মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৪৬–৪৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জনস্বাস্থ্য সংকট ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময়কালেই ছিল তাঁর মন্ত্রীত্ব।
ব্রিটিশ ভারতের শেষ অধ্যায়ে কক্সবাজার থেকে এটিই ছিল প্রথম প্রাদেশিক মন্ত্রীত্ব।


পাকিস্তান পর্ব

রামুর ফরিদ আহমদ: ছাত্রনেতা থেকে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী

৩ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে রামুর রশিদ নগরে জন্ম নেন ফরিদ আহমদ। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারে বেড়ে ওঠা ফরিদ আহমদ উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৫২ সালে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪–১৯৬৯ পর্যন্ত নেজামে ইসলাম পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৭ সালে প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল ইব্রাহিম চুন্দ্রিগারের মন্ত্রিসভায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৫ পর্যন্ত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৫ সালে বক্সার মুহাম্মদ আলিকে নিয়ে Muhammad Ali Clay শিরোনামে বই লেখেন। মাসিক ‘পৃথিবী’ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক এবং দৈনিক ‘নাজাত’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের আহ্বানে অনুষ্ঠিত রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। একই বছরে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন। ১৯৭১ সালে দামেস্কে আফ্রো-এশীয় পিপলস সলিডারিটি অর্গানাইজেশনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ ঢাকায় ইস্ট পাকিস্তান সেন্ট্রাল পিস কমিটি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ইস্ট পাকিস্তান পিস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি ও রাজাকার বাহিনীর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এই অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিতর্কিত করে তোলে।


স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব

সালাহউদ্দিন আহমদ: প্রতিমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৩০ জুন ১৯৬২ সালে চকরিয়ায় জন্ম নেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পিতা শায়দুল হক, মাতা আয়েশা হক। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে তৃতীয় খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হন।

দলীয় কাঠামোয় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দলীয় মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভীর গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়া তাঁকে দলের মুখপাত্র নিয়োগ দেন।

নিখোঁজ ও কারাবাস

২০১৫ সালের মার্চে ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন তিনি। বিএনপির দাবি ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে আটক করেছে; প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী র‌্যাবের সদস্যরা তাঁকে তুলে নেয়। দুই মাস পর ভারতের শিলংয়ে তাঁর অবস্থান জানা যায়। ভারতীয় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিদেশি আইন ভঙ্গের অভিযোগ আনে। ৩ জুন ২০১৫ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় নর্থ ইস্টার্ন ইন্দিরা গান্ধী রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল সায়েন্সেসে রাখা হয়।

তিন বছরের বেশি সময় পর, ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেঘালয়ের আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপি তাঁকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ শিলংয়ের আপিল আদালত তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়।

বর্তমান দায়িত্ব

রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন—যা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা রাজনীতিকদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বের পদ।


তিন সময়, তিন বাস্তবতা

রাষ্ট্রপর্বনামজন্মস্থানদলমন্ত্রীত্ব
ব্রিটিশ ভারতজালালউদ্দিন আহমদহারবাংকৃষক প্রজা পার্টিস্বাস্থ্য মন্ত্রী
পাকিস্তানফরিদ আহমদরামুনেজামে ইসলাম পার্টিকেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী
বাংলাদেশসালাহউদ্দ্দিন আহমদচকরিয়াবিএনপিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী; বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা এই তিন রাজনীতিক তিন ভিন্ন রাষ্ট্রপর্বে তিন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করেন—ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ অধ্যায়, পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের দলভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি।

সংখ্যায় কম হলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের উপস্থিতি তাই স্পষ্ট—সমুদ্রের তীর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে আমরা সহযোগিতা নিয়েছি-

  1.  ্কালাম আজাদ (২০১৪). মুক্তিসংগ্রামে কক্সবাজার : প্রসঙ্গ রাজনীতি : কক্সবাজার জেলা প্রশাসন পৃ. ১২৭–১২৮.
  2.  Government of Bengal. “Alphabetical list of members”. Bengal Legislative Assembly Proceedings (1939). Vol. 54. 
  3.  Indian Annual Register, Volume 1. Annual Register Office. 1944. p. 2.
  4. হাসান মুরাদ সিদ্দীকী: চকরিয়ার ইতিহাস