রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম নয়, বাড়ছে জলবসন্ত; তিন মাসে আক্রান্ত ৮ হাজারের বেশি

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হাম নয়, এখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভ্যারিসেলা জোস্টার ভাইরাসজনিত রোগ জলবসন্ত (চিকেনপক্স)।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই রোগের সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা ক্যাম্পের ঘনবসতি ও শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, “গত তিন মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জলবসন্তে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৭৬৯ জন। অথচ গত বছরের শেষ ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৫৫।”

তিনি বলেন, “তুলনামূলকভাবে হাম বা রুবেলার সংক্রমণ এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত শিশু পাওয়া গেছে ৪ জন এবং রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে ১ জন।”

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে হাম ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জলবসন্তের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

ডা. তোহা ভূঁইয়া জানান, ক্যাম্পে বসবাসরত শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকাদান কার্যক্রম চলছে।

ঘনবসতি ও বাস্তবতা: দ্রুত ছড়াচ্ছে সংক্রমণ

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সংকীর্ণ বসবাস, একসঙ্গে অনেক মানুষের থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে না পারা—এসব কারণে জলবসন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা নূরজাহান বলেন, “আমার ছেলের শরীরে হঠাৎ ফুসকুড়ি ওঠে, পরে জ্বর আসে। এখন আলাদা করে রাখতে হচ্ছে, কিন্তু এক ঘরে সবাই থাকায় সেটা খুব কঠিন।”

আরেক অভিভাবক মোহাম্মদ ইদ্রিসের ভাষ্য, “একজনের হলে দ্রুত অন্যদেরও হয়ে যায়। বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”

কী এই জলবসন্ত

চিকেন পক্স বা জলবসন্ত ভ্যারিসেলা-জোস্টার ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা সাধারণত শীতের শেষে ও বসন্তকালে বেশি দেখা যায়।

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

লক্ষণ ও সংক্রমণের সময়কাল

জলবসন্তের লক্ষণ সাধারণত ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায় এবং ১ থেকে ২ সপ্তাহ স্থায়ী হয়।

প্রধান লক্ষণগুলো হলো-
জ্বর
মাথাব্যথা
শরীর ম্যাজম্যাজ করা
চুলকানিযুক্ত তরলপূর্ণ ছোট ফোসকা
জলবসন্তের ধাপগুলো কীভাবে এগোয়

ইনকিউবেশন পিরিয়ড (সুপ্তাবস্থা):
ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর ১০-২১ দিন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

প্রাথমিক লক্ষণ :
ফুসকুড়ি ওঠার ১-২ দিন আগে জ্বর, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা ও মাথাব্যথা শুরু হয়।

ফুসকুড়ি বা ফোসকা পর্যায়:

প্রথমে লালচে দানা (র‍্যাশ)
পরে তরলপূর্ণ ফোসকা
শেষে শুকিয়ে খোসা (স্ক্যাব) হয়ে ঝরে পড়ে
আক্রান্ত হলে করণীয় কী

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ব্যক্তির যত্নে কিছু বিষয় জরুরি-

১। আক্রান্তকে আলাদা রাখা
২। নখ ছোট রাখা, যাতে চুলকানোর ক্ষত না হয়
৩। প্রচুর পানি ও তরল খাবার গ্রহণ
৪। চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বর ও চুলকানির ওষুধ গ্রহণ
৫। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
৬। প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবসন্ত প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভ্যারিসেলা টিকা গ্রহণ।

একই সঙ্গে সতর্কতা হিসেবে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা ফোসকা থেকে অতিরিক্ত পুঁজ বের হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন বাড়তি নজরদারি

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, ক্যাম্পে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেতনতা বাড়ানো, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং আলাদা রাখার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

নচেৎ, সীমিত জায়গায় বসবাসরত হাজারো মানুষের মধ্যে এই রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চার শিশুর মৃত্যু, কক্সবাজারে আতঙ্ক বাড়ছে

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে হামের প্রকোপ বাড়লেও আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। অনেক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও পরীক্ষায় সব ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত ৯২টি স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। এর মধ্যে ৩০টি পজিটিভ এসেছে, বাকিগুলো নেগেটিভ বা রিপোর্ট এখনো আসেনি। তাই সব মৃত্যুকে সরাসরি হামের কারণে হয়েছে, এভাবে বলা যাচ্ছে না।”

৯২ নমুনায় ৩০ পজিটিভ

স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, জেলায় হামের সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। নমুনা পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৩০টি পজিটিভ এলেও অনেক ক্ষেত্রে রিপোর্ট আসতে দেরি হচ্ছে, ফলে চিত্র পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

ডা. আলমগীর বলেন, “অনেক রোগী উপসর্গ নিয়ে আসছে, কিন্তু পরীক্ষায় সব পজিটিভ হচ্ছে না। তাই নিশ্চিত হতে আমাদের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।”

উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু, রিপোর্ট অনিশ্চিত

সম্প্রতি মারা যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ৭ মাস বয়সী হিরা মনি হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও তার নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল এসেছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে সর্বশেষ মারা যাওয়া ৯ মাস বয়সী শিশু জেসিনের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি। তাকে আপাতত “সন্দেহভাজন” হিসেবে ধরা হচ্ছে।

“উপসর্গ দেখে আমরা ধারণা করছি, কিন্তু ল্যাব কনফার্মেশন ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না,” বলেন সিভিল সার্জন।

জেসিনের মৃত্যু: নিউমোনিয়ার জটিলতা

মহেশখালীর ছোট মহেশখালী এলাকার বাসিন্দা নাসিরের কন্যা জেসিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

ডা. মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “এ ধরনের ক্ষেত্রে অনেক সময় নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।”

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হামের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া একটি সাধারণ কিন্তু মারাত্মক জটিলতা, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত জেলায় মোট ১৩৯ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন দিনেই পাওয়া গেছে ৮৬ জন, যা সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ডা. আলমগীর বলেন, “আমরা মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়েছি এবং দ্রুত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে।”

এখন পর্যন্ত ৪ শিশুর মৃত্যু

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব মৃত্যুর সবগুলো সরাসরি হামের কারণে হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ল্যাব রিপোর্টের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ডা. আলমগীর বলেন, “মৃত্যুর ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বসহকারে যাচাই করছি। উপসর্গ থাকলেও ল্যাব কনফার্মেশন ছাড়া চূড়ান্তভাবে কারণ বলা সম্ভব নয়।”

“জটিলতাই বড় ঝুঁকি”

ডা. আলমগীর বলেন, “অনেক সময় দেখা যায়, সরাসরি হামের কারণে নয়, বরং নিউমোনিয়ার মতো জটিলতার কারণেই শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।”

সতর্কতা জোরদার

পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সচেতনতামূলক কার্যক্রম, নমুনা পরীক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, টিকাদান নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই হামের বিস্তার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

কক্সবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রতিটি সন্দেহভাজন কেসই হতে পারে বড় সংক্রমণের ইঙ্গিত।

কক্সবাজারে ৭০% ট্রলার বন্ধ, তেল সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় বিপাকে জেলেরা

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

তেল সংকট, সাগরে মাছের স্বল্পতা ও ডাকাতের উপদ্রবের কারণে কক্সবাজারে অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে ও তাদের পরিবার।

কক্সবাজার ফিশিং বোটমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি হিসাবে জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ ট্রলার সাগরে যেতে পারছে, আর ৭০ শতাংশ ট্রলার বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, আগে যেসব ট্রলার তেল সংগ্রহ করতে পেরেছিল, সেগুলোর কিছু এখনও চলমান থাকলেও নতুন করে তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ ট্রলার অচল হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে পুরো জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০টি ট্রলার সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

তেল সংকটে থমকে যাচ্ছে মাছ ধরা

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্রলার পরিচালনায় সবচেয়ে বড় সংকট এখন জ্বালানি তেল।

“ম্যাক্সিমাম ট্রলারের কাছেই তেল নেই। যারা পাচ্ছেন, তারাও পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না; অনেক ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ বা ১০ দিনে অল্প পরিমাণ তেল মিলছে।”

তিনি জানান, সমুদ্রে ভাসমান তেল সরবরাহ ব্যবস্থাও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

তার ভাষায়, তেলের পাশাপাশি সাগরে মাছের অপ্রতুলতা এবং ডাকাতের উপদ্রবও ট্রলার চলাচল কমে যাওয়ার বড় কারণ।

ঝুঁকি ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মালিক ট্রলার সাগরে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

হাজার হাজার জেলে কর্মহীন

দেলোয়ার হোসেন বলেন, কক্সবাজারে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। তবে নিবন্ধনের বাইরে আরও অনেক জেলে রয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ থেকে ২০ হাজার জেলে সাগরে যেতে পারছেন না, ফলে তারা কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

সামনে আসছে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা

তিনি জানান, ১৪ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, যা মাছের প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়।

“যেসব ট্রলার এখন সাগরে আছে, সেগুলো ফিরে এলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে আবার যেতে পারবে না,” বলেন তিনি।

নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার দাবি

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা ছোট জেলেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

তার মতে, সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে দেশের মাছের সরবরাহ কমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে।
এ কারণে তিনি সরকারের কাছে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

জেলেদের হতাশা: “সমুদ্রে যেতে না পারলে ঘরে খাবার নাই”

কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক এলাকার জেলে মোহাম্মদ হানিফ বলেন, “আগে সপ্তাহে দুই-তিনবার সাগরে যাইতাম। এখন তেল নাই, ট্রলার বন্ধ। ঘরে বসে থাকি, কাম নাই, আয় নাই।”

কক্সবাজার ফিশারী ঘাটে অপেক্ষমান জেলে আবদুল কাদের বলেন, “সমুদ্রে গেলেও ভয় আছে। ডাকাতের উপদ্রব বাড়ছে। আর মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। খরচ উঠে না, তাই অনেকে যাইতেছে না।”

জেলে নুরুল আমিন বলেন, “আমরা দৈনিক খাই-দৈনিক চলি। ১০-১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। এখন অনেকেই ধার-দেনা করে চলতেছে।”

কুতুবদিয়ার জেলে সালামত উল্লাহ বলেন, “১৪ তারিখ থেকে আবার নিষেধাজ্ঞা আসতেছে। এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো বুঝতেছি না।”

আরেক জেলে রশিদ আহমদ বলেন, “সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে আমাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হইবো।”

কক্সবাজারে হামের থাবা: উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মৃত বেড়ে ৩, হাসপাতালে বাড়ছে চাপ

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে আবারও হামের (মিজেলস) ছোবল। সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনে। একইসঙ্গে হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্ত শিশুদের চাপ, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে জনস্বাস্থ্য খাতে।

ভোরে নিভে গেল জেসিনের জীবন

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ডেডিকেটেড হাম ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ৯ মাস বয়সী শিশু জেসিন। সে মহেশখালীর ছোট মহেশখালী এলাকার বাসিন্দা নাসিরের কন্যা।

এর আগের দিন একই উপজেলার ৭ মাস বয়সী হিরা মনি নামের আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। এছাড়া এর আগে আরও একটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামের পাশাপাশি অন্যান্য জটিলতা, বিশেষ করে নিউমোনিয়া এই মৃত্যুগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

“হাম একা আসে না, সঙ্গে আনে জটিলতা”

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মোহাম্মদ শহিদুল আলম বলেন, “এ পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের অনেকের মধ্যে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত ছিল। অনেক সময় হাম সরাসরি নয়, বরং এর জটিলতাই জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

তার মতে, অপুষ্টি, দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং সেকেন্ডারি সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

হাসপাতালে রোগীর ঢল

জেলায় হামের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও দ্রুত বাড়ছে।

বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ইউনিটে ভর্তি রয়েছে ৪২ শিশু। এছাড়া কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে আরও ৫ জন। সব মিলিয়ে দুই হাসপাতালে ভর্তি শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে, যার ফলে শয্যা সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

আলাদা ওয়ার্ড, তবু চাপে চিকিৎসকরা

রোগীর চাপ সামাল দিতে ইতোমধ্যে সদর হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড ও আলাদা নার্সিং ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মং টিংঞো বলেন, আমরা হাম রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ইউনিট চালু করেছি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আছে, কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

কেন বাড়ছে সংক্রমণ?

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, মৌসুমি পরিবর্তনের পাশাপাশি টিকাদানের ফাঁক, অপুষ্টি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের অবাধ মেলামেশা, সব মিলিয়ে হামের বিস্তার বাড়ছে।

বিশেষ করে মহেশখালীর মতো দ্বীপ ও প্রান্তিক এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নীরব ঝুঁকি: লক্ষণ প্রকাশের আগেই ছড়ায়

হামের বড় ঝুঁকি হলো, লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই আক্রান্ত শিশু অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে পরিবার বা আশপাশের অন্য শিশুরা দ্রুত সংক্রমিত হয়।

এখন কী জরুরি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ জরুরি—

  • ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন
  • আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা
  • প্রি-স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা
  • অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি

কক্সবাজারে হামের এই নতুন ঢেউ শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকটই নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। যেখানে প্রতিরোধই হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

নিউমোনিয়াসহ হামে আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজারে এখন পর্যন্ত দুই শিশুর মৃত্যু

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ জনে।

বুধবার ৭ মাস বয়সী মারা যাওয়া ইরা মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা। গত ৩০ মার্চ থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) তার মৃত্যু হয়।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মোহাম্মদ শহিদুল আলম জানান, মৃত দুই শিশুই হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল।

তিনি বলেন, “আজ যে শিশুটি মারা গেছে, তার মুখে ঘা ছিল। এ কারণে সে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারছিল না। তাকে নলের মাধ্যমে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু অভিভাবক নল ব্যবহার না করে মুখে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করলে তা নাক-মুখ দিয়ে উঠে গিয়ে শ্বাসকষ্ট তৈরি হয়, এরপরই তার মৃত্যু ঘটে।”

ডা. শহিদুল জানান, মৃত শিশুদের উভয়েরই হামের পাশাপাশি জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া ও মুখে ঘা ছিল, যা তাদের অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে।

এদিকে, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এখন হামে আক্রান্ত ২৮ জন শিশু ভর্তি রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের ঝুঁকি বেশি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, “সাধারণত শিশুকে ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। এর আগে মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে সুরক্ষা দেয় বলে ধারণা করা হয়। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাসের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।”

তিনি জানান, এ পরিস্থিতিতে মায়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। গর্ভধারণের আগে বা পরিকল্পিত সময়ে মাকে টিকা দেওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যৎ কৌশল হিসেবে বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

যেভাবে ছড়ায় ও উপসর্গ

হাম একটি বায়ুবাহিত রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা বা দূষিত বাতাসের মাধ্যমে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে।

এর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি-কাশি, গলার ভেতরে বিশেষ দাগ (কপলিক স্পট), চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রি-স্কুল বয়সী শিশু—যারা কিন্ডারগার্টেন, নূরানী বা কওমি মাদ্রাসায় যায়—তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকায় এই গ্রুপে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

টিকার কাভারেজ কম হলে ঝুঁকি বাড়ে

ডা. নাজির বলেন, “যদি কোনো এলাকায় ৮৫ শতাংশের নিচে টিকাদান কাভারেজ থাকে, তাহলে সেখানে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি।”

তিনি জানান, অনেক সময় কিছু শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় ‘পকেট’ তৈরি হয়, যেখান থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো এবং সংক্রমিত এলাকার আশপাশে শিশুদের টিকার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

হাম প্রতিরোধে কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যে রয়েছে—

  • হাঁচি-কাশির সময় মাস্ক ব্যবহার
  • কনুই বা টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে কাশি দেওয়া
  • নিয়মিত হাত ধোয়া
  • আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা

তিনি বলেন, “এই সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চললে সংক্রমণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”

জটিলতা হতে পারে মারাত্মক

হাম সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে সেরে গেলেও কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানে সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)।

ডা. নাজির বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে ব্রেনের কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার ফুসফুসে গুরুতর সংক্রমণ হলে আইসিইউ সাপোর্টও প্রয়োজন হতে পারে।”

তিনি আরও জানান, হামের একটি বড় ঝুঁকি হলো—রোগের লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাই সংক্রমণ দেখা দিলে দ্রুত আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই হামের বিস্তার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

৬৭ শতাংশ রোহিঙ্গার জন্মদিন এক জানুয়ারি!

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা বহু বছর ধরে নীরবে বহমান রয়েছে। এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্মদিন একই দিনে, ১ জানুয়ারি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি অনেক সময় হাস্যরসের জন্ম দিলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পরিচয় হারানোর গভীর বেদনা।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাতিসংঘের শরণার্থী নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সময় তাড়াহুড়া ও তথ্যের ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্মতারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে শিবিরে বসবাসরত প্রায় ৬৭ শতাংশ রোহিঙ্গার সরকারি নথিতে এই একই জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে।

নিবন্ধনের তাড়াহুড়ায় তৈরি ‘এক দিনের জন্ম’

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভিযান, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের মুখে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। হঠাৎ এই বিপুল জনস্রোত সামাল দিতে গিয়ে জাতিসংঘের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা।

অনেক শরণার্থী নিজেদের সঠিক জন্মতারিখ জানাতে পারেননি, আবার অনেক ক্ষেত্রে সময়ের চাপেই তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে একটি ‘ডিফল্ট’ তারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি ব্যবহার করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত একজন সাবেক নিবন্ধনকর্মীর ভাষায়, “তখন মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া, যেখানে সঠিক তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না।”

হাসির আড়ালে বিষণ্ণতা

শিবিরের বাসিন্দাদের জন্য ১ জানুয়ারি একদিকে যেমন ‘সম্মিলিত জন্মদিন’, অন্যদিকে এটি তাদের হারানো পরিচয়ের প্রতীক।

ক্যাম্প-৭–এর বাসিন্দা মোহাম্মদ ফারুক জানান, তার প্রকৃত জন্মদিন সেপ্টেম্বর মাসে হলেও সরকারি কাগজে ১ জানুয়ারি। প্রতি বছর এই দিনে একসঙ্গে শত শত মানুষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা কখনো হাস্যরসের জন্ম দনত। তিনি মন্তব্য করেন, “এক কিলোমিটার জুড়ে কেক লাগবে”।

কিন্তু বাস্তবে এটি তাদের জন্য কষ্টের। “এই তারিখটা দেখলে মনে হয় আমি কেউ নই”, বলেন তিনি।

পরিচয়পত্র: অস্তিত্বের শেষ প্রমাণ

রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের জন্য একটি কাগজের পরিচয়পত্রই এখন অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন। অনেকেই এই নথি প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখেন বা বালিশের নিচে সংরক্ষণ করেন।

তবে ভুল তথ্যের কারণে এই নথিই কখনো হয়ে উঠছে নতুন সমস্যার কারণ।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর কাছে ক্যাম্প-১২–এর বাসিন্দা মোহাম্মদ আনিস বলেন, চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে সব জায়গায় তাকে ভুল জন্মতারিখ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে আসার পর জাতিসংঘের কর্মীরা তার জন্মদিন জানতে চাননি। তিনি বলেন, “তারা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল তোমার বয়স কত? আমি বলেছিলাম ১৭।”

এরপর তাকে ১ জানুয়ারি জন্মতারিখ দিয়ে একটি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। নতুন আসা শরণার্থী হিসেবে তখন তিনি কোনো আপত্তি জানাতে সাহস পাননি।

তারপর থেকে এই ভুল জন্মতারিখ তাকে অনুসরণ করছে। সম্প্রতি চাকরির আবেদন করার সময়ও তাকে এই তারিখ ব্যবহার করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “তারিখটা ভুল, এটা আমাকে কষ্ট দেয়। একদিন হয়তো আমরা আমাদের আসল জন্মতারিখই ভুলে যাব।”

তথ্য সংশোধনের জটিলতা

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর কাছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, শরণার্থীরা চাইলে তথ্য সংশোধন করতে পারেন।

কিন্তু বাস্তবে তা সহজ নয়।

প্রতিবেদনে শিবিরের এক নারী জানান, কয়েক মাস চেষ্টা করেও তিনি তার জন্ম তারিখ সংশোধন করতে পারেননি। প্রশাসনিক জটিলতা, প্রমাণের অভাব এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া এই সংশোধনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।

শুধু শিবির নয়, প্রবাসেও সমস্যা

এই ভুল তথ্যের প্রভাব শুধু শিবিরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে পুনর্বাসিত রোহিঙ্গারাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

রোহিঙ্গা লেখক মাইয়্যু আলী দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, তার পরিবারের এক সদস্য কানাডায় গিয়েও জন্মতারিখ পরিবর্তন করতে পারেননি। ফলে নতুন জীবনেও বহন করতে হচ্ছে পুরোনো ভুল।

তিনি বলেন, “এই মুছে ফেলার নীতিগুলো আমাদের নতুন জীবনেও প্রভাব ফেলে।”

ফেরার অনিশ্চয়তা, পরিচয়ের সংকট

রোহিঙ্গাদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয়, এই ভুল তথ্য তাদের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

কারণ তাদের শরণার্থী কার্ডের তথ্য মিয়ানমারের পুরোনো নথির সঙ্গে মিলবে না।

তবে বাস্তবতা হলো, ফেরার সম্ভাবনাই এখন অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্রিয়।

জন্মদিন নয়, প্রয়োজন নিজের মাটি

অনেকের কাছে তাই জন্মদিন এখন আর আনন্দের বিষয় নয়।

রোহিঙ্গা ফটোগ্রাফার রহিম উল্লাহর ভাষায়, “যতদিন নিজের কোনো মাটি না থাকবে, ততদিন কোনো জন্মদিন উদযাপন করতে চাই না।”

১ জানুয়ারি, বিশ্বের অনেকের কাছে নতুন বছরের শুরু। কিন্তু কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে এটি হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের এক নীরব প্রতীক।

হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই গল্প মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রহীনতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং ব্যক্তিগত অস্তিত্ব ও পরিচয়ের গভীর ক্ষয়।

কক্সবাজারে হামের প্রকোপ, এক মাসে ১২০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে হামের (মিজেলস) সংক্রমণ বাড়তে থাকায় মার্চ মাসজুড়ে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে গত ১ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১০৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছলিম উল্লাহ জানান, রোববার (গতকাল) হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৩৩ জন শিশু, আর সোমবার নতুন করে ১২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিল মাত্র ৯ জন শিশু, যা মার্চে এসে হঠাৎ করেই কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

মৌসুমি কারণ, তবে নজরদারি জোরদার

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন আলমগীর জানান, বছরে সাধারণত দুটি মৌসুমে হামের প্রকোপ বাড়ে বসন্ত এবং বর্ষাকালে।

“বর্তমানে যে সংক্রমণ বাড়ছে, সেটি মৌসুমি দিক থেকে স্বাভাবিক হলেও এবার কিছুটা বেশি হওয়ায় আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৩টি সন্দেহভাজন কেস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার জন্য পাঠানো নমুনার ২৮টি পজিটিভ এসেছে। আক্রান্তদের মধ্যে রামুর মিঠাছড়ি এলাকা এবং সদর উপজেলার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলী এলাকায় সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি।

টিকাদান ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর এবং পুষ্টিহীনতা হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

ডা. আলমগীর বলেন, “টিকাদানের আওতা সাধারণত ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হলেও কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়। আবার ভাইরাসের ধরন পরিবর্তনের কারণেও সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।”

তিনি আরও জানান, ছিন্নমূল ও ঝরে পড়া শিশুদের মধ্যে টিকা না পাওয়া বা অপুষ্টির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এ পরিস্থিতিতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

অত্যন্ত সংক্রামক রোগ

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ।

“একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একটি এলাকায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, সাধারণত পাঁচ বছরের নিচের শিশু, বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, যা মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

উখিয়ায়ও আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশু

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার জানান, উখিয়ায় বর্তমানে ২ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

তিনি বলেন, “গত এক মাসের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে নেই, তবে এ সময়ের মধ্যে ৭ থেকে ৮ জন রোহিঙ্গা শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।”

উপসর্গ ও জটিলতা

হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। তবে জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানে সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি ওঠার আগেই রোগী অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।

প্রতিরোধে করণীয়

স্বাস্থ্য বিভাগ সংক্রমণ ঠেকাতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে-
– আক্রান্ত শিশুদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখা
– হাঁচি-কাশির সময় মাস্ক ব্যবহার
– নিয়মিত হাত ধোয়া
– টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা
– ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো

ডা. নাজির বলেন, “যেসব এলাকায় টিকার কাভারেজ ৮৫ শতাংশের নিচে থাকে, সেসব জায়গায় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।”

চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক জানান, গত এক মাসে সেখানে প্রায় ২০টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৪ জন শিশু।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠপর্যায়ে ‘উঠান বৈঠক’, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে কক্সবাজার: মেজর জিয়ার আগমন ও প্রতিরোধের বাস্তবতা

কালাম আজাদ

১৯৭১ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহ। বাংলার ইতিহাসে এক অস্থির, অনিশ্চিত এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সেই অস্থির দিনগুলোতে পূর্ববাংলার ভূগোল যেমন ভেঙে পড়ে, তেমনি ভেঙে পড়ে আস্থার প্রচলিত কাঠামোও। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে বাঙালি জাতির উপর যে গণহত্যা শুরু হয়, তার অভিঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পূর্ব বাংলায়। চট্টগ্রাম ছিল সেই প্রথম আঘাতপ্রাপ্ত নগরগুলোর একটি। কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কালুরঘাটের দিকে নজর দেয়।

এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থানরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এই প্রেক্ষাপটে মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট অতিক্রম করে দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন এবং ট্রান্সমিটার সরিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

পটিয়ায় কিছুক্ষণ অবস্থানের পর মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর মীর শওকত আলী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ২৮ মার্চ সড়কপথে কক্সবাজারের পথে রওয়ানা দেন। কিন্তু যে বাস্তবতার মুখোমুখি তারা হন, তা ছিল যুদ্ধের প্রথম দিককার এক নির্মম সত্য—পরিচয়ের অনিশ্চয়তা। চকরিয়া থেকে রামু পর্যন্ত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এমন কঠোর পাহারা বসিয়েছিলেন, যেখানে সন্দেহই ছিল প্রধান নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে মেজর জিয়ার দল সেই পাহারার জালে আটকা পড়ে।

রামুর উত্তর মিঠাছড়িস্থ চা বাগানেও পাহারা বসানো হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে। কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যাতে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর কোনো ব্যক্তি জান নিয়ে কক্সবাজারের দিকে যেতে না পারে। নির্দেশ পালন করতে গিয়ে চকরিয়ায় ৪ জনকে চর সন্দেহে মেরে ফেলা হয় সংগ্রাম কমিটির নির্দেশে। এমনই কড়া পাহারা বসানো হয়, সে জালে মেজর জিয়াউর রহমান ও তার দল আটকা পড়ে।

২৮ মার্চ রামুর চা বাগানে মুক্তিযোদ্ধারা মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ সকলকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। তাদের গায়ে সামরিক পোশাক ছিল, কিন্তু তারা ব্যাজ খুলে ফেলায় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পলায়নরত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সেনা ভেবে ঘেরাও করে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘আঁরঅ বাড়ি চন্দনাইশ। এই অইলো মেজর জিয়া, যার ঘোষণা অঁনরা রেডিওতে শুন্নন’।

তখন ‘মেজর জিয়া আওয়ামী লীগ নেতার সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করলে আফসার কামাল চৌধুরী, ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী এগিয়ে এসে তাকে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেন।’ [মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম: আন্দোলন সংগ্রামের দিনগুলো—বায়ান্ন থেকে একাত্তর, কামরুল হাসান সম্পাদিত বিজয় স্মারক ২০১১, (কক্সবাজার: জেলা প্রশাসন, ১৬ ডিসেম্বর ২০১১), পৃ. ৭২-৭৩/ কালাম আজাদ: মুক্তিযুদ্ধে কক্সবাজার: জানা-অজানা তথ্য, বিজয় স্মারক ২০১২, (কক্সবাজার: জেলা প্রশাসন, ১৬ ডিসেম্বর ২০১২), পৃ. ৫২।]

এ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ‘বন্ধু ও শত্রু’ চিহ্নিত করার জটিলতাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। আফসার কামাল চৌধুরী ও ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর সহায়তায় এরপর তারা আবার কক্সবাজার শহরের পথে অগ্রসর হয়। পথে আর কোনো ঝামেলায় যাতে পড়তে না হয়, সে জন্য জিপে রামু-উখিয়া-টেকনাফ আসনের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীকে বসিয়ে রাখা হয়। জিয়া নিজেই জিপটি চালাচ্ছিলেন। পাশের আসনে অলি আহমদ।’ (Col. Oli Ahmad, `Revolution Military Personnel and the War of Liberation in Bangladesh, 2009, Dhaka: Annesha Prokashon, P. 30-31.) পরে ডাকবাংলাতে স্থাপিত কক্সবাজারে সংগ্রাম কমিটির কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়।

কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর সংগ্রাম কমিটির নিয়ন্ত্রণকক্ষে তাদের নেওয়া হয়। ইপিআর ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদেরকে কক্সবাজার পৌর প্রিপ্যারেটরি হাই স্কুল এবং মেজর জিয়া, মীর শওকত আলী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় থাকার ব্যবস্থা করে কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটি। বিশ্রাম শেষে মেজর জিয়া কক্সবাজারে অবস্থানরত ইপিআর (বাঙালি ও অবাঙালি)-এর খবর নিলেন এবং ইপিআর সুবেদার জোনাব আলীকে ডেকে আনলেন। স্থানীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও ইপিআরের অবস্থান সম্পর্কিত হয়ে বাঙালি ও অবাঙালি ইপিআর সদস্যদের মধ্যে বিভাজন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

জোনাব আলীর কাছ থেকে অবাঙালি ইপিআরের অবস্থান এবং তাদের তৎপরতা সম্পর্কে জেনে তাদেরকে খতম করার জন্য নির্দেশ দিলেন। তার নির্দেশ মোতাবেক কারাবন্দি অবাঙালি ইপিআর সৈন্যকে প্রথমে কক্সবাজার সরকারি হাই স্কুলের বিপরীতে নিয়ে মেরে ফেলতে চাইলে নানা কারণে সম্ভব না হওয়ায় রামুর পানেরছড়া ঢালায় নিয়ে গিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয় সুবেদার শাহনেওয়াজ খানসহ ১২ জন অবাঙালি ইপিআর সদস্যকে।

ওই দিন মেজর জিয়া কক্সবাজারের স্বনামধন্য উকিল অগ্নিযুগের বিপ্লবী জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর সাথে দেখা করেন। রহস্যাবৃত মাহমুদ হোসেন মেজর জিয়াকে অ্যাডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর ছেলে নিখিলেশ্বর চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। সেই মোতাবেক জিয়া ও অলি জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর বাসায় যান এবং জানতে পারেন, ছেলে তিন দিন আগেই লন্ডন চলে গেছেন। ধারেকাছেও কোথাও সপ্তম নৌবহর নেই।’

লেখক মহিউদ্দীন আহমদ ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ বইয়ে ‘ওই উকিলের ছেলে’ আমেরিকায় চলে গেছেন বলে উল্লেখ করে লিখেন—‘মাহমুদ কক্সবাজারে একজন উকিলের ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। সেই মোতাবেক জিয়া ও অলি ওই উকিলের বাসায় যান এবং জানতে পারেন, ওই উকিলের ছেলে তিন দিন আগেই আমেরিকায় চলে গেছেন। ধারে কাছে কোথাও নৌবহর নেই। ৩০ মার্চ জিয়া কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যান এবং দ্বিতীয় ঘোষণাটি দেন।’ (মহিউদ্দিন আহমেদ: আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১, পৃ. ৮২-৮৩)। যে ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর সাথে মেজর জিয়া ও অলির সাক্ষাতের প্রত্যক্ষদর্শী জহরলাল পাল চৌধুরী ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২৮ মার্চ মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন অলি আহমদসহ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেশ কয়েকজন সৈন্য নিয়ে কক্সবাজারে আসেন। ওই সময় মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ অগ্নিযুগের বিপ্লবী অ্যাডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর সাথে দেখা করতে তার বাসায় যান। ওই সময় আমি, স. আ. ম. শামসুল হুদা চৌধুরীর ছেলে ইউসুফ মোহাম্মদ শামসুল হুদা, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা সুভাষ চন্দ্র পাল, দেবব্রুত চৌধুরী, লালুসহ আরও বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলাম।’ (জহরলাল পাল চৌধুরী, ‘যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি তারা আমাদের চেয়ে ভালো থাকতে দেখে অপমানবোধ করি (কালাম আজাদ গৃহীত সাক্ষাৎকার), ৮ ডিসেম্বর ২০১৪, দৈনিক কক্সবাজার বাণী)।

২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত কক্সবাজার আওয়ামী লীগ ও কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির বৈঠকে মেজর জিয়া উপলব্ধি করেন যে, গেরিলা যুদ্ধ চালাতে হলে বহিরাগত সহায়তা অপরিহার্য। তাই কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির বৈঠকে বার্মার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাঁর পরামর্শমতে, কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নুর আহমদ এবং কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. শামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরীকে সাথে নিয়ে মংডু শহরে গিয়ে বার্মা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু বার্মা কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এই ব্যর্থতা কক্সবাজার অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। এ ব্যাপারে ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরীর স্মৃতিচারণ স্মরণযোগ্য—
“জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ এক বৈঠক বসেন। ২৯ মার্চ [২৮ মার্চ] রাত ৮টার পর জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় অনুষ্ঠিত হয় ওই বৈঠক। বৈঠকে কক্সবাজারের গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ছাত্র-যুবকদের ট্রেনিং দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। ওই বৈঠকে তিনি বার্মার সহযোগিতা না পেলে কক্সবাজার থেকে গেরিলা যুদ্ধ সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন। অ্যাডভোকেট নুর আহমদ সাহেবকে বার্মার সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে সমর্থন আদায় করতে অনুরোধ করেন। নুর আহমদ সাহেব ডা. শামসুদ্দিন সাহেবকে নিয়ে এ লক্ষ্যে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মংডু শহরে পৌঁছান। সমর্থন পাওয়া তো দূরের কথা; উল্টো মিয়ানমার সরকার তাদের নজরবন্দি করে রাখে।” (নজরুল ইসলাম চৌধুরী: যে কথা বলা হয়নি, বিজয় স্মারক ২০১৪, (কক্সবাজার: জেলা প্রশাসন, ডিসেম্বর ২০১৪), পৃ. ৪৪)।

পরে মেজর জিয়াউর রহমান ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ মীর শওকত আলীকে আরও কয়েকদিন কক্সবাজারে থাকার নির্দেশ দিয়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাটের দিকে রওয়ানা হন। মেজর জিয়া কক্সবাজার ত্যাগ করার পর মীর শওকত আলী পৌর প্রিপ্যারেটরি হাই স্কুল ও পিটিআই স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের তদারকি করেন।

মেজর মীর শওকত আলী কমান্ডার সেলিমুর রহমানের নেতৃত্বে পৌর প্রিপ্যারেটরি হাই স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণরত আড়াইশত মুক্তিযোদ্ধার সাথে ব্রিফিং করে তাদের মধ্য থেকে ১৮ জনকে নিয়ে ‘আলফা ট্রুপ’ নামে একটি দলে বিভক্ত করেন। আলফা ট্রুপ গঠনপূর্বক মেজর মীর শওকত আলী এ ট্রুপ গঠনের ইতিহাস বলতে গিয়ে বলেন, ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের পাক-ভারত যুদ্ধে মীর শওকতকে প্রধান করে একটি গ্রুপের নাম ছিল আলফা ট্রুপ।

কমান্ডার সেলিমুর রহমানের নেতৃত্বে ওই গ্রুপের সদস্য ছিলেন এ. কে. এম. মনসুর উল হক, মনজুর আলম মজনু, জালাল আহমদ, মোহাম্মদ আলী, আবদুল কাদের, কামাল উদ্দিন, আহম্মদ হোসেন, আল মামুন, শামসুল হুদা মান্নু, নুরুল নন্দা, মাস্টার শাহ আলম প্রমুখ। ট্রেনিং শেষে ওই মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপকে কন্ট্রোল রুম থেকে দশটি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল হস্তান্তর করা হয়।

এই সামরিক পুনর্গঠন মুক্তিযুদ্ধের বিকেন্দ্রীভূত কিন্তু সমন্বিত চরিত্রকে তুলে ধরে। কক্সবাজারে মেজর জিয়ার আগমন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে নিয়ে আসে—বিভ্রান্তি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, স্থানীয় পর্যায়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ এবং দ্রুত সামরিক পুনর্গঠন। এই তিনটি উপাদানই পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে একটি সংগঠিত ও সর্বাত্মক জনযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করে।

কালাম আজাদ
লেখক ও গবেষক

কক্সবাজারে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হত্যা: গ্রেপ্তার ‘মূল ঘাতক’, মোটিভে এখনো ধোঁয়াশা

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

ছাত্রদল নেতা ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ খোরশেদ আলম হত্যাকাণ্ডে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে তাকে ‘মূল ঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

তবে হত্যার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সবগুলো দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান।

নির্জন সৈকতে হামলা, শুরুতে ছিনতাইয়ের ইঙ্গিত

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের সমুদ্র সৈকতের কবিতা চত্বর বালুকাবেলায় খোরশেদ আলম তার বন্ধু তারিন সুলতানাকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও তারিনের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে কয়েকজন যুবক তাদের ঘিরে ধরে মূল্যবান জিনিসপত্র দাবি করে। এতে ঘটনাটি ছিনতাইয়ের প্রচেষ্টা হিসেবে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

তারিনের দাবি, ‘আরিফ’ নামে এক ব্যক্তিকে হামলার অভিযোগ তুলে খোরশেদকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

প্রাথমিকভাবে তার পেট ও পায়ে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক।

রাতভর অভিযান, ভোরে গ্রেপ্তার

ঘটনার পরপরই পুলিশ ভিকটিমের সঙ্গী, প্রত্যক্ষদর্শী ও আশপাশের তথ্য নিয়ে অভিযান শুরু করে।
রাতভর অভিযানের এক পর্যায়ে চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের সাত নাম্বার ওয়ার্ড থেকে তারেক নামে এক যুবককে একটি আত্মীয়ের বাসা থেকে ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনাস্থলের পরিবেশ পুনর্নির্মাণ করে এবং ভিকটিমের সঙ্গীর মাধ্যমে শনাক্ত করে নিশ্চিত হওয়া গেছে তারেকই এই হত্যাকাণ্ডের মূল ঘাতক।

তিনি জানান, চেহারা, শারীরিক গঠন, কণ্ঠস্বর ও মোটরসাইকেলের সূত্র মিলিয়ে এই নিশ্চিতকরণ করা হয়েছে।

একাধিক জড়িত, নাম গোপন

তদন্তে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, কমপক্ষে দুইজন এই ঘটনায় জড়িত। তবে অন্যদের নাম তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

ঘটনার পর সামনে আসা অডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে ‘আরিফ’ নামটি উঠে এসেছে। এই নামটি এখন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে রাজি নয় পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শী তারিন, সম্পৃক্ততা মেলেনি

ঘটনার সময় খোরশেদের সঙ্গে থাকা তারিন সুলতানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত তার কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে তিনি এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী।

হত্যার কারণ নির্ধারণে তিনটি সম্ভাব্য মোটিভ সামনে রেখে তদন্ত চলছে। এগুলো হলো ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। তবে এখনো কোনো একটিকে চূড়ান্ত করা হয়নি।

নিরাপত্তাহীন স্পট হিসেবে কবিতা চত্বর
ঘটনাস্থল কবিতা চত্বর এলাকায় নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে উঠে আসে, ওই এলাকার কিছু অংশে পর্যাপ্ত আলো নেই এবং রাতে নিরাপত্তা দুর্বল। পুলিশ সুপারও স্বীকার করেন, পর্যটকের চাপ বাড়লেও কিছু পয়েন্টে নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে।

কিশোর গ্যাং ও সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ে প্রশ্ন

সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারে একাধিক হত্যাকাণ্ড ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, কিশোর গ্যাং দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রক্রিয়ার ফল এবং এটি হঠাৎ তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের ‘ট্রানজিশনাল’ সময়ে অপরাধ কিছুটা বাড়তে পারে। তার ভাষায়, পুলিশ ক্রমাগত ব্যর্থ, এটি সঠিক নয়।

তদন্তে এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন

খোরশেদ আলম হত্যাকাণ্ডে একজনকে ‘মূল ঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
অন্য জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ সুপার বলছে, এখনো অমীমাংসিত থেকে গেছে, এই হত্যাকাণ্ডটি তাৎক্ষণিক সহিংসতা, নাকি পূর্বপরিকল্পিত হামলা।

কক্সবাজারে নিভে গেছে রূপালী পর্দার আলো

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

এক সময়ের প্রাণচঞ্চল বিনোদন, এখন শূন্যতা

ঈদ কিংবা বিশেষ ছুটির দিনে বন্ধু-পরিবার নিয়ে দল বেঁধে সিনেমা হলে যাওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন কক্সবাজারে প্রায় বিলুপ্ত। দেশের একমাত্র পর্যটন নগরীতে বর্তমানে কোনো চালু সিনেমা হল নেই, যা একসময় স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও বিনোদনের বড় কেন্দ্র ছিল।

এক দশক আগেও শহরে টকি হাউস, দিগন্ত সিনেমা হল এবং বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) অডিটোরিয়াম, এই তিনটি প্রেক্ষাগৃহ সচল ছিল। এখন সবগুলোই বন্ধ।

তিন হলের উত্থান-পতনের গল্প

১৯৬৮ সালে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে প্রতিষ্ঠিত টকি হাউস ছিল কক্সবাজারের প্রথম সিনেমা হল। দীর্ঘদিন জমজমাট চলার পর ২০০০ সালের দিকে দর্শক কমে গেলে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি বাজারঘাটার নিউ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় চালু হয় দিগন্ত সিনেমা হল। একই সময়ে, ১৯৯৬ সালে নির্মিত হয় বিডিআর অডিটোরিয়াম, যা পরে বিজিবির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১০ সাল পর্যন্ত এই তিনটি হলেই ভালো ব্যবসা ছিল। প্রতি শুক্রবার নতুন সিনেমা মুক্তি পেত, মাইকিং হতো শহরজুড়ে, আর দর্শকদের ভিড় থাকত চোখে পড়ার মতো।

করোনার পর শেষ প্রহর

করোনা মহামারির পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বিজিবি অডিটোরিয়ামও, যেটি শেষ চালু থাকা প্রেক্ষাগৃহ ছিল। আলীর জাহাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে।

হলের পাশের এক দোকানদার বাবু বলেন, “একসময় এই হলে হাউজফুল দর্শক থাকত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত সিনেমা দেখতে। এখন সব বন্ধ হয়ে গেছে।”

হল হারানোর পেছনের কারণ কী

স্থানীয়দের মতে, সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে।

সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাব। ২০০০ সালের পর থেকে বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যবসার ধস নামে। গল্প, নির্মাণশৈলী এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক উপাদান দর্শককে বিমুখ করে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির প্রভাব। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় এখন ঘরে বসেই নতুন সিনেমা দেখা যায়। ফলে প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার আগ্রহ কমে গেছে।

পাশের অঞ্চলও একই পথে

শুধু কক্সবাজার শহর নয়, আশপাশের এলাকাতেও একই চিত্র। নাইক্ষ্যংছড়িতে ৯০-এর দশকে চালু হওয়া ‘পাহাড়ীকা’ সিনেমা হলও দর্শক সংকটে বন্ধ হয়ে যায়।

স্মৃতিতে রয়ে গেছে ‘হাউজফুল’ দিনগুলো

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল করিম বলেন, “একসময় এই হলে টিকিট পাওয়া কঠিন ছিল। এক শো শেষ হওয়ার আগেই পরের শোর টিকিট শেষ হয়ে যেত। এখন মনে হয় সবকিছুই স্বপ্ন।”

পর্যটন ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের মতে, “ভালো মানের, পরিবার নিয়ে দেখার মতো সিনেমা তৈরি হলে দর্শক আবার হলে ফিরবে। উন্নত নির্মাণ আর বড় বাজেটের কাজই দর্শক ধরে রাখতে পারে।”

ফিরে আসবে কি প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতি?

সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিকায়ন, উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ, এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলে কক্সবাজারে আবারও সিনেমা হল সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তবে সে জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, প্রযোজক ও হল মালিকদের একসঙ্গে এগিয়ে আসা। ততদিন পর্যন্ত কক্সবাজারের রূপালী পর্দা থাকবে স্মৃতির ভেতরেই।