বে ইনসাইট । কক্সবাজার
কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতি পাড়া। সাগরপাড়ের সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভিটেমাটি হারানো মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মানুষদের বসতি হিসেবে শুরু হলেও, এখন এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নিম্নআয়ের মানুষ অল্প ভাড়ায় বসবাস করছেন।
প্রভাবশালীদের মাধ্যমে অবৈধভাবে জায়গা নিয়ে কাঠ ও বাঁশের ঘর তুলে গড়ে উঠেছে পুরো পাড়া।
সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের খোঁজে বে ইনসাইট যায় সমিতি পাড়ার বাগানপাড়া এলাকায়। স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করতেই কয়েকজন শিশু পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় ঝাউবনের ভেতর সরু গলিপথ পেরিয়ে একটি ছোট ঘরের সামনে।
ঘরের দরজায় বসে ছিল ৮ থেকে ১০ বছরের এক শিশু। অন্যরা পরিচয় করিয়ে দেয়, তার নাম জুনায়েদ। তার বাবা মোহাম্মদ নূর, মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বাবার কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে ওঠে শিশুটির। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিল না।
জুনায়েদ জানায়, তার মা এখন অন্যত্র থাকেন। সে ও তার বড় ভাই সৎমায়ের সঙ্গে এখানে থাকত। কিন্তু বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর সৎমাও চলে গেছেন। এখন দুই ভাইই এই ঘরে থাকে। বড় ভাইকে পাওয়া যায়নি, সে সুগন্ধা পয়েন্টে ঘোড়া চালিয়ে সংসারের খরচ জোগাড় করে।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে জুনায়েদের চাচাতো ভাই, আট বছর বয়সী মোহাম্মদ হোসেন বাড়িতে আসে। তার বাবা মোহাম্মদ হারুনও একই ঘটনায় নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই শিশুই জানায়, তাদের বাবারা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন পরিবারের সচ্ছলতার জন্য। পরে তারা জানতে পারে, আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় তারা নিখোঁজ।
এ সময় প্রতিবেশী মোহাম্মদ আলম মাইজভান্ডারী বলেন, ২ এপ্রিল নূর ও হারুন যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন তিনি উপস্থিত ছিলেন। তারা জানিয়েছিলেন ভাগ্য বদলাতে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন, তবে কার মাধ্যমে যাচ্ছেন তা বলেননি।
একই পাড়ার আরেক বাসিন্দা শফিউল্লাহও ওই ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হয়েছেন বলে তার পরিবার জানিয়েছে। তার শাশুড়ি রহিমা বেগম বলেন, উত্তাল সাগরের আশঙ্কায় তিনি জামাইকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু শফিউল্লাহ বলেছিলেন, মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
কেন মামলা করা হয়নি জানতে চাইলে রহিমা বেগম বলেন, “কার বিরুদ্ধে মামলা করব বুঝতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেন, যারা তাদের নিয়ে গিয়েছিল তারা জানিয়েছে, হয়তো ভেসে কোনো দ্বীপে পৌঁছাতে পারে, এই আশাতেই তারা মামলা করেননি। তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, শফিউল্লাহ কার মাধ্যমে গেছেন তা তারা জানেন না।
সমিতি পাড়া থেকে ওই ট্রলারে ছিলেন অন্তত পাঁচজন। নূর, হারুন, শফিউল্লাহ ছাড়াও হামিদ মাঝি ও তার ভাই ইব্রাহিম খলিল। খলিলের স্ত্রী জুবাইদা বলেন, তার স্বামী অটোরিকশা চালাতেন, ভাগ্য ফেরাতে মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিলেন।
হামিদ মাঝি জীবিত উদ্ধার হওয়া নয়জনের একজন। কোস্টগার্ডের দায়ের করা মামলায় তিনি এক নম্বর আসামি। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশীই পাচারকারী চক্রের সদস্য।
স্থানীয়দের দাবি, হামিদ মাঝি এর আগেও একাধিকবার ট্রলার নিয়ে মালয়েশিয়া গেছেন। নিরাপদে ফিরে আসায় অনেকেই তার মাধ্যমে অবৈধভাবে যাওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তারা আরও দাবি করেন, হামিদের বড় ভাই ইলিয়াস ও তার স্ত্রী রোজিনা এই পাচার চক্রের মূল হোতা।
তবে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা জানেন না তাদের স্বজনরা কার মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বলেন, পাচারকারীরা ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারের সদস্যদের চুপ থাকতে বাধ্য করছে, ফলে কেউ আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে টেকনাফ থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ওই ট্রলারে ছিলেন। এছাড়া পেকুয়া থেকে ১২ জন, রামু থেকে চারজনসহ আরও অনেক এলাকার মানুষ যাত্রী ছিলেন বলে স্বজনরা দাবি করছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকায় নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এমদাদুল হক শরীফ বলেন, “পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।”
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, “বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য লিখিতভাবে সরকারকে জানানো হচ্ছে এবং যাচাই-বাছাই চলছে। নিশ্চিত না হয়ে সংখ্যা প্রকাশ করা ঠিক হবে না।”
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকেও কিছু মানুষ ওই ট্রলারে উঠেছিল।
তবে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বলেন, “এখনও কোনো রোহিঙ্গা পরিবার থেকে নিখোঁজের অভিযোগ পাইনি।”
তিনি যোগ করেন, সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় রোহিঙ্গারা অভিযোগ করে না, ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “এই ধরনের সংগঠিত অপরাধ বন্ধ করা কঠিন নয়, কিন্তু সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু রুটে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার চালিয়ে যাচ্ছে।”
কোস্টগার্ড জানায়, ৯ এপ্রিল বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমটি মেঘনাপ্রাইড আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় ছয় বাংলাদেশি ও তিন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে। পরে তাদের কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম জানান, ট্রলারটিতে প্রায় আড়াইশোর বেশি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা ছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা কয়েকজন কাঠের টুকরো ও পানির বোতল আঁকড়ে ভেসে থাকতে পেরেছিলাম, কিন্তু অনেকেই সাগরে হারিয়ে গেছে।”