কক্সবাজার উপকূলের নতুন স্বপ্ন ‘সামুদ্রিক শৈবাল’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া সৈকতে একসময় ঝিনুক কুড়িয়েই সংসারে সামান্য সহায়তা করতেন আনোয়ারা বেগম। মহেশখালী চ্যানেলের তীর থেকে সংগ্রহ করা সেই ঝিনুক বিক্রি করতে তিনি যেতেন শহরের বড়বাজারের বার্মিজ মার্কেটে, যেখানে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন প্রধান ক্রেতা।

সেই বাজারেই প্রথম তাঁর চোখে পড়ে কালো, চুলের মতো দেখতে এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল, যা দেখতে অনেকটা কালো সেমাইয়ের মতো। রাখাইন সম্প্রদায়ের রান্নায় ব্যবহৃত এই শৈবাল মূলত মিয়ানমার থেকে আসত।

আনোয়ারা ও তাঁর সঙ্গীরা দ্রুত বুঝতে পারেন, ভাটার সময় সৈকতে যে সামুদ্রিক আগাছার মতো উদ্ভিদ তারা দেখেন, সেটিই আসলে বাজারে বিক্রি হওয়া এই শৈবাল। চাহিদা দেখে তারা সৈকত থেকে সেই শৈবাল সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেন।

এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক বিজ্ঞানী তাঁদের কাছে শৈবাল চাষের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। শুরুতে অবাক হলেও পরে প্রশিক্ষণ ও চারা পেয়ে ধীরে ধীরে তাঁরা শৈবাল চাষে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে আনোয়ারা বেগম সপ্তাহে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন এই শৈবাল চাষ থেকে।

তিনি বলেন, “আগে সংসারের কাজ ছাড়া নিজের কোনো আয় ছিল না। এখন নভেম্বর থেকে টানা সাত মাস শৈবাল চাষ করা যায়। মাসে দুইবার ফসল তোলা যায়। কাজও খুব কম। বাঁশ, দড়ি আর চারা পানিতে বসিয়ে দিলেই ১৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়।

তিনি জানান, তিনি এখন দুই ধরনের শৈবাল চাষ করেন। একটি কালো, অন্যটি সবুজ। স্থানীয় রাখাইন বাজার ছাড়াও লামা, আলীকদমসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় এসব বিক্রি হয়।

ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে চাষ

বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক শৈবালের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক চাষ।

প্রথমদিকে অল্প কয়েকটি পরিবার প্রশিক্ষণ পেলেও এখন শুধু বারি-এর মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কৃষক নিয়মিত চারা পাচ্ছেন। এছাড়া জাইকা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় আরও প্রায় ৫০০ মানুষ কক্সবাজারে শৈবাল চাষ করছেন।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজারের তুলনায় উৎপাদন এখনও অনেক কম। বড় অর্ডার এলেও কৃষকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যায় না।

নুনিয়াছড়ার আরেক চাষি মরিয়ম বেগম বলেন, “চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে আমরা ঠিকমতো সরবরাহই দিতে পারছি না।”

গবেষণা থেকে বাণিজ্যে

কক্সবাজারে শৈবাল চাষ সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি বারি-এর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ।

তিনি ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শৈবাল চাষ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগ্রহ তৈরি করেন।

মোস্তাক বলেন, মূলত দুই ধরনের শৈবাল চাষ হচ্ছে, কালো, চুলের মতো ‘গ্রাসিলারিয়া’ এবং সবুজ, লেটুস পাতার মতো ‘উলভা’।

তিনি বলেন, “শৈবাল বিশ্বজুড়ে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনীসহ নানা শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ।”

তিনি জানান, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, ইনানী সৈকত ও কক্সবাজার উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেই শৈবাল জন্মায়।

শৈবালে বিটা ক্যারোটিন, বি ভিটামিন, ভিটামিন সি, ডি, ই ও কে রয়েছে। এটি সরাসরি খাওয়া যায়, আবার এর থেকে তৈরি আগার আইসক্রিম, মেয়োনিজ, ওষুধের ক্যাপসুল, মলম, ক্রিম, টুথপেস্ট, চকোলেট, লিপস্টিক, এমনকি রঙ তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।

মোস্তাক বলেন, গ্রাসিলারিয়ার চারা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা গেলেও উলভার চারা ‘বারি’ সরবরাহ করে। এই উলভা জাতটি জাপান থেকে আনা হয়েছে এবং এর বাজার চাহিদা বেশি।

চাষের জন্য কৃষকদের বাঁশ, ১০ মিটার দড়ি ও শৈবালের চারা দেওয়া হয়।

বাড়ছে উৎপাদন, বাড়ছে বাজার

বারি-এর গবেষণা সহকারী মাকসুদুল হক বলেন, গত বছর তারা এক হাজার দড়ি বিতরণ করেছিলেন, এ বছর তা বাড়িয়ে দুই হাজার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “প্রতি দড়ি থেকে মাসে প্রায় দুই কেজি উলভা উৎপাদন হয়। নুনিয়াছড়ায় আমরা খুঁটি-দড়ি পদ্ধতি এবং ভাসমান ভেলা, দুই পদ্ধতিতেই চাষ করছি।”

চাষি শফি আলম বলেন, তিনি ও তাঁর পরিবার লামা, আলীকদম এবং বান্দরবান শহরে শৈবাল বিক্রি করেন।

“শুকনো কালো শৈবাল কেজি ৩০০ টাকা, তাজা কালো শৈবাল ১০০ টাকা এবং শুকনো সবুজ শৈবাল ১,০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়,” বলেন তিনি।

ব্যবসায়ীদেরও আগ্রহ

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীও এখন কৃষকদের কাছ থেকে শৈবাল কিনে ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং কক্সবাজারের পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে সরবরাহ করছেন।

মেসার্স আলমগীর স্টোরের মালিক মো. নোমান বলেন, গত বছর তিনি দেড় লাখ টাকার শুকনো সবুজ শৈবাল কিনেছিলেন।

তিনি বলেন, “আমার মতো আরও চার-পাঁচজন ব্যবসায়ী এখন এই ব্যবসায় আছেন। কিন্তু কৃষকরা চাহিদামতো সরবরাহ দিতে পারছেন না। এজন্য আমরা নিজেরাও কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি, যাতে তারা উৎপাদন বাড়াতে পারেন।”

নোমান জানান, তিনি সবুজ শৈবাল অন্তত ১,৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তাঁর প্রধান ক্রেতা কক্সবাজারের কয়েকটি পাঁচ তারকা হোটেল। এছাড়া বিদেশ থেকেও অর্ডার আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *