টেকনাফের ঘরে ঘরে মায়ের আর্তনাদ ‘আমার ছেলে কই’?

আব্দুর রহমান, টেকনাফ | কক্সবাজার

কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রের ঢেউ কখনো শুধু পানি নয়, কখনো তা বয়ে আনে কান্না, হারিয়ে যাওয়ার গল্প, আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস। টেকনাফের উপকূলে আজ ঢেউ ভাঙে ঠিকই, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে মিশে থাকে অসংখ্য মায়ের আর্তনাদ “আমার ছেলে কই?”

শাহপরীর দ্বীপের সরু গলিতে, বিকেলের মাঠে, কিংবা নাফ নদীর পাড়ে, যেখানে একসময় শিশুদের হাসি, ফুটবলের দৌড় আর স্বপ্নের উড়ান ছিল, সেখানে এখন অনিশ্চয়তার ছায়া।

টেকনাফে এখন রাত নামলেই শুধু অন্ধকার নামে না, নামে আতঙ্ক। সমুদ্রপথে ভেসে যায় স্বপ্ন, আর তীরে বসে থাকে পরিবার। কেবল অপেক্ষায়, প্রতীক্ষায়, আর অবিরাম কান্নায়।

প্রলোভনের ফাঁদে নিখোঁজ আনাছ

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের কিশোর মোহাম্মদ আনাছ। বয়স মাত্র ১৪। স্থানীয় হাজি বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ফুটবল ছিল তার স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নই তাকে ঠেলে দেয় অন্ধকারে।

বিদেশে ফুটবল খেলার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় দালালচক্র তাকে ঘর থেকে বের করে আনে। পরে মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় আরেক দালাল চক্রের কাছে। সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাকে তুলে নেওয়া হয় একটি নৌকায়।

পরিবারের সঙ্গে শেষ যোগাযোগ হয় একটি ফোন কলে। ওপার থেকে দাবি করা হয় তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ। না দিলে হত্যার হুমকি।

ধারদেনা করে সেই টাকা জোগাড় করে পরিবার। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আনাছ আর ফেরেনি।

“টাকা দিলাম, ছেলেকে পেলাম না”

আনাছের মা ছমুদা বেগমের কণ্ঠে এখনও অপেক্ষা আর হতাশা:

ফুটবল খেলার কথা বলে আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। পরে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে তিন লাখ টাকা নিল। এখনো আমার ছেলেকে ফেরত দেয়নি। পুলিশের কাছেও গেছি, কোনো বিচার পাইনি।

পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত দালালরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আনাছের মা ছমুদা বেগম বলেন, “মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা ‘দালাল’ ইব্রাহীমের কথা মতো তার ভাতিজা স্থানীয় মো. ফারুকসহ স্বজনকে তিন লাখ টাকা দিই। তবে এখনও ছেলেকে ফিরে পাইনি। এ বিষয়ে স্থানীয় পুলিশসহ জনপ্রতিনিধির কাছে অভিযোগ দিয়েছি, তবে কোনো সুরাহা হয়নি।”

খেলতে গিয়ে আর ফেরা হয়নি

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উত্তরপাড়ার একটি সাধারণ পরিবার। সেখানেই থাকতেন আব্দুর রহমান। সবার মতোই স্বাভাবিক জীবন, ছিলো হাসি, গল্প আর স্বপ্নে ভরা দিনগুলো।

কিন্তু একদিন বিকেলে খেলতে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি।

প্রথমে পরিবার ভেবেছিল, হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও গেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, রাত পেরিয়ে দিন কিন্তু আব্দুর রহমানের কোনো খোঁজ মেলেনি। উদ্বেগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় আতঙ্কে।

কয়েকদিন পর হঠাৎ করেই আসে সেই ফোন কল, অচেনা নম্বর অপর প্রান্তে অচেনা কণ্ঠ। সেখান থেকেই জানা যায়, স্থানীয় দালালচক্রের মাধ্যমে তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে।

এরপর শুরু হয় দুঃস্বপ্নের আরেক অধ্যায়।

আব্দুর রহমানের ভাই আব্দুস সালাম বলেন,

ওকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর আমাদের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করে। না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমরা তো গরিব মানুষ, এত টাকা জোগাড় করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পরিবারের প্রতিটি দিন এখন অনিশ্চয়তায় কাটে। ফোনের অপেক্ষা, কোনো খবরের আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা, সবকিছু যেন এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।

আব্দুর রহমান বেঁচে আছে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরও আজ তাদের কাছে অজানা।

পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ চিত্র

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী:

  • ২০১৬–২০২৫ পর্যন্ত কক্সবাজারে ৩,১৩৪ জন মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করা হয়েছে
  • তাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা
  • ১১৫টি মামলা হয়েছে উখিয়া-টেকনাফ থানায়
  • আসামি করা হয়েছে প্রায় ১,১০০ জনকে
  • আটক হয়েছে প্রায় ৬০০ পাচারকারী

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে সাগর থেকে ২৬৩ জন নারী-শিশুসহ যাত্রীকে উদ্ধার করে নৌবাহিনী। আটক করা হয় পাচারচক্রের ১০ সদস্যকে।

নতুন রুট: ছোট ট্রলার থেকে গভীর সমুদ্র- যেভাবে সক্রিয় দালালচক্র

সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপের ঘোলার চর এলাকা ঘিরে পাচার তৎপরতা নতুন করে বেড়েছে বলে অভিযোগ।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি কয়েকটি ধাপে কাজ করে।

প্রথম ধাপে, স্থানীয় দালালরা গ্রামের কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করে। কেউ ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখায়, কেউ বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে খেলতে বের হওয়া বা ঘরের বাইরে থাকা অবস্থায় সরাসরি অপহরণ করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে, ভুক্তভোগীদের দ্রুত গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিবার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগেই তাদের উপকূলীয় নির্জন পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে ছোট ট্রলার।

তৃতীয় ধাপে, রাতের আঁধারে এসব ট্রলারে করে তাদের গভীর সমুদ্রে নেওয়া হয়। সেখানে অপেক্ষমান বড় জাহাজ বা ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়, যেগুলো মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

চতুর্থ ধাপে শুরু হয় মুক্তিপণের খেলা। ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, বিদেশে অবস্থানরত চক্রের সদস্যরা ফোন করে কয়েক লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে নির্যাতন, এমনকি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের কান্না বা নির্যাতনের শব্দও ফোনে শোনানো হয়, যাতে পরিবার দ্রুত টাকা জোগাড় করে।

পঞ্চম ধাপে, মুক্তিপণ আদায়ের পরও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের আর খোঁজ মেলে না। কেউ নিখোঁজ থাকে, কেউ মারা গেছে, এমন আশঙ্কা থেকে যায় পরিবারের মধ্যে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বে ইনসাইট জানতে পারে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্থানীয় দালালদের পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে। স্থানীয়ভাবে যারা লোক সংগ্রহ করে, তারা বিদেশে থাকা চক্রের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করে এবং পরে মুক্তিপণের অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়।

ভুক্তভোগী পরিবার গুলোর দাবি, এদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে কাজ করে আসছে এবং এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় সহজে আইনের আওতায় আসছে না।

এই প্রক্রিয়ায় অনেককে জোরপূর্বক নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাতের আঁধারে ১৫ পয়েন্টে পাচার

টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে নিয়মিত পাচার চলছে বলে খোঁজ পেয়েছে প্রতিবেদক। এসব কাজে জড়িত রয়েছে একটি সুসংগঠিত দালাল নেটওয়ার্ক।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে একাধিক স্থানীয় দালালের নাম, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

অভিযুক্ত দালালদের তালিকা

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে।

তারা হলেন- মোহাম্মদ তাহের, মোহাম্মদ ইসমাইল, শাহাব মিয়া, মো. আজগর, নুরুল নবী, হেলাল উদ্দিন, মো. ফেরুজ, পোয়া মাঝি, শওকত আলম, নজির আহমেদ, আবু তাহের, মাম্মা, নজরুল পুতু, লাল মিয়া, শাহজান মিয়া, সৈয়দ উল্লাহ, মো. শামীম কাসু, মো. ফয়সাল, আব্দুল আমিন, মো: হোসন, প্রকাশ মাহসন, মো. হাসান (প্রকাশ আতুড়ি), রেজাউল করিম (মোরাদ), মাহামুদুল হক, মোহাম্মদ আমিন (প্রকাশ বদ্দা মাঝি), আজিজুল হক, মোহাম্মদ দেলোয়ার, জামাল হোছন এবং মোহাম্মদ রফিক (প্রকাশ বার্মায়া রফিক)।

তবে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

পুলিশের অবস্থান: “অভিযান চলছে”

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন:

মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। এটি প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ তৎপর। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়াগামী ট্রলার সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

অপেক্ষার প্রহর

টেকনাফের উপকূলজুড়ে এখন এক অদৃশ্য আতঙ্ক। সাগরের ঢেউ যেমন ফিরে আসে, তেমনি কি ফিরবে হারিয়ে যাওয়া সন্তানেরা?

আনাছের মা এখনও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রতিটি শব্দে চমকে ওঠেন, হয়তো এবার ফিরবে তার ছেলে। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, সেই আশা ততই ফিকে হয়ে আসছে।

একটা প্রলোভন, একটা ডাকে সাড়া। “বিদেশে খেলতে যাবে?” এরপরই নিখোঁজ হয়ে যায় আনাছের মতো শত শত কিশোর।

ঘর থেকে বের হওয়া সেই ছোট্ট পা, ফিরে আসে না আর। ফোন আসে, দাবি আসে, ভয় আসে। ফিরে আসে না শুধু মানুষটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *