বে ইনসাইট | কক্সবাজার
রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর থেকেই কক্সবাজারে হঠাৎ করে পাহাড় কাটার প্রবণতা বেড়েছে।
কক্সবাজারে পাহাড় কাটার ওপর হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা কার্যত অমান্য করে চলছে বিস্তৃত ‘মাটি বাণিজ্য’। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির ফাঁক গলে রাতের অন্ধকারে রামু, পেকুয়া, উখিয়া ও সদর উপজেলায় একের পর এক পাহাড় সমতল করা হচ্ছে, যার মাটি যাচ্ছে ইটভাটা ও নির্মাণ প্রকল্পে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত এক্সকাভেটর চালিয়ে পাহাড় কাটা হয়, যাতে দিনের বেলায় প্রশাসনের নজরে না পড়ে। এতে শত বছরের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি দ্রুত বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
দীর্ঘদিন পাহাড় রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত পরিবেশকর্মীদের দাবি, প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের অবহেলা এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতায় এই অবৈধ কর্মকাণ্ড নতুন মাত্রা পেয়েছে।
পাহাড় কাটা বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, “নির্বাচনের পর হঠাৎ করেই পাহাড় কাটার ঘটনা বেড়ে গেছে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, অনেক ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ায় এর মূল কারণ। এমনকি এতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।”
ঈদের ছুটিতে ২০০ ফুট পাহাড় ‘গায়েব’
রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পূর্ব লামাপাড়ার ঘোনারপাড়া এলাকায় ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রায় ২০০ ফুট উচ্চতার একটি পাহাড়, যার আয়তন প্রায় ১০ একর, সম্পূর্ণ সমতল করে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন রাত ৭টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটি কেটে ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব মাটি গেছে আশপাশের ইটভাটা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে।
একই ইউনিয়ন ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি এলাকায় অন্তত আটটি পাহাড় ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, “ঈদের ছুটিতে কাউয়ারখোপ ও দক্ষিণ মিঠাছড়িতে পাহাড় কাটার মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।”

অভিযানে মিলেছে ৯০ হাজার ঘনফুট মাটি উত্তোলনের প্রমাণ
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) পরিদর্শক মুসাইব ইবনে রহমান জানান, গত ৩০ মার্চ রামুর লামাপাড়া, ঘোনারপাড়া ও স্কুলপাড়া এলাকায় যৌথ অভিযানে পাহাড় কাটার ৮-৯টি স্থান শনাক্ত করা হয়।
“কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৯০ হাজার ঘনফুট মাটি উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
এ সময় একটি এক্সকাভেটর ও একটি ডাম্প ট্রাক জব্দ করা হয় এবং ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
‘হাতেনাতে না ধরলে শাস্তি দেওয়া যায় না’
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, অভিযান অব্যাহত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।
ফজলে রাব্বি চৌধুরীর মতে, “মোবাইল কোর্ট আইনে হাতেনাতে না ধরলে শাস্তি দেওয়া যায় না, এ সুযোগটাই নিচ্ছে অপরাধীরা।”

আইনি নোটিশ, কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না নির্দেশনা
গত ১০ মার্চ বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলা) ১২ জন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠায়। এতে ২০১২ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় পাহাড় কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
আইন অনুযায়ী, ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। যার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
‘ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি’ দেখিয়ে দায় এড়ানোর অভিযোগ
পেকুয়ার টইটং ইউনিয়নের “আসমানের খুঁটি” নামে পরিচিত পাহাড়টির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিন-রাত এক্সকাভেটর চালিয়ে ২.৫ একর আয়তনের পাহাড়টি সমতল করা হয়েছে।
বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, “এটি সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই বন বিভাগের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে উখিয়ার থোয়াইংকাটা, সদরকাটা এবং রাজাপালং এলাকাতেও, যেখানে পাহাড় কিনে বা দখল নিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ কেমিস্ট আব্দুস সালাম বলেন, কোনো পাহাড় সরকারি বা ব্যক্তিগত হোক, তা কাটা যাবে না। তিনি জানান, টইটং ও শিলখালীতে পাহাড় কাটার ঘটনায় পৃথক মামলা দায়েরের জন্য চট্টগ্রামের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অবৈধ ভাবে পাহাড় কাটলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

‘প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় বাড়ছে ধ্বংস’
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, পাহাড় কাটার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে মাটি বাণিজ্য। আর প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও নিষ্ক্রিয়তাই এ ধ্বংসযজ্ঞকে উৎসাহ দিচ্ছে।
পরিবেশকর্মী দীপক শর্মা দীপু বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে কক্সবাজারের পাহাড় একসময় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি এবং কৃষিজমির ক্ষতি হবে।”
তিনি পাহাড় ও বন রক্ষায় বন বিভাগের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
বর্ষা সামনে, ঝুঁকি বাড়ছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়বে। প্রতিবছর চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় ধসে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এ অবস্থায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
