বে ইনসাইট | কক্সবাজার
কক্সবাজারের কুতুপালং বাজার থেকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে রফিকুল ইসলামকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় টেকনাফের কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের রাজাছড়া এলাকায়। ২ এপ্রিল সেখানে একটি ঘরে তাকে ২০ থেকে ২৫ জনের সঙ্গে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়। বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেই চলত নির্যাতন। রফিকুলের ভাষায়, “পশুর মতো বন্দী করে রাখা হয়েছিল, আশপাশের অনেক ঘরেই একইভাবে মানুষ আটকে ছিল।”
ধাপে ধাপে সমুদ্রে পাচার
৪ এপ্রিল রাতে রাজাছড়া সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ এলাকা থেকে ছোট মাছ ধরার নৌকায় করে তাদের সমুদ্রে নেওয়া হয়। পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে ছোট ট্রলার বদলে বড় ফিশিং ট্রলারে তোলা হয় তাদের, যা সেন্ট মার্টিনের অদূরে মিয়ানমারের জলসীমার দিকে অগ্রসর হয়।
এক ট্রলারে প্রায় ২৮০ জন
রফিকুল জানান, ট্রলারটিতে প্রায় ২৮০ জন মানুষ ছিল। এর মধ্যে ১৩ জন ছিল পাচারকারী ও নৌকার স্টাফ, ২১ জন রোহিঙ্গা নারী এবং চারজন শিশু। প্রায় দেড়শ জন রোহিঙ্গা এবং বাকিরা বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। সবাই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হয়েছিলেন।
মৃত্যুকূপে পরিণত কুঠুরি
রফিকুল বলেন, ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে। এ সময় পাচারকারীরা যাত্রীদের জোর করে ট্রলারের মাছ ও জাল রাখার চারটি সংকীর্ণ কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত মানুষের চাপে ও অক্সিজেনের অভাবে সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলে জানান রফিকুল।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন পাচারকারীরা যাত্রীদের হুমকি দেয়- ট্রলারের ডেকে থাকা কেউ কুঠুরিতে না নামলে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হবে। এর মধ্যেই বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক আর আর্তনাদ।
একটি পানির বোতলেই বাঁচার লড়াই
ডুবন্ত ট্রলার থেকে কোনোভাবে একটি দুই লিটারের পানির বোতল আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকেন রফিকুল। তার ভাষায়, “চারদিকে শুধু মানুষ ডুবছিল… আমি শুধু একটা বোতল ধরে ছিলাম… আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন।”
৯ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ তাকে সহ মোট ৯ জনকে উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ রয়েছেন।
আরেক বেঁচে ফেরা কণ্ঠ
উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গা যুবক মো. ইমরান জানান, ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে তিনি এই যাত্রায় বের হয়েছিলেন। ট্রলার ডুবে গেলে তিনি একটি পানির ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভেসে ছিলেন, পরে উদ্ধার পান।
আইনি ব্যবস্থা ও তদন্ত
এ ঘটনায় কোস্ট গার্ড বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেছে বলে জানান টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।
ওসি বলেন, উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জন দালালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ৩ জন ভিকটিমকে আদালতের মাধ্যমে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ: এটি শুধু দুর্ঘটনা নয়
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলছে, এই ঘটনা একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি, ক্যাম্পের কঠিন জীবন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং কমে যাওয়া মানবিক সহায়তা মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সংস্থা দুটি এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছে, আন্দামান সাগরে একটি নৌকা ডুবির ঘটনায় কমপক্ষে ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকরা আছেন।
সমাধান ছাড়া থামবে না মৃত্যুযাত্রা
শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও নৃবিজ্ঞানী রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ না হওয়া এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত না হলে এমন বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। পাচারকারীরা এই অসহায় পরিস্থিতিকে পুঁজি করে আরও মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সমুদ্র শুধু ঢেউ নয়
বাংলাদেশ যখন নতুন বছরকে বরণ করছে, তখন আন্দামান সাগরের এই মর্মান্তিক ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সমুদ্র শুধু নীল জলরাশি নয়, কখনো তা হয়ে ওঠে শত মানুষের নিঃশব্দ কবর।