বে ইনসাইট | ঢাকা
তপ্ত দুপুর। মাথার ওপর চৈত্রের রোদ, পিচঢালা সড়ক থেকে উঠছে গরম হাওয়া।
রাজধানীর আসাদগেটে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাফওয়ান। পড়াশোনার খরচ জোগাতে অবসরে রাইড শেয়ারিং করেন। কিন্তু আজ তার সময় যাচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে।
দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তার সামনে গাড়ির লাইন, পেছনেও একই চিত্র। এই লাইন আসাদগেট থেকে বিজয় সরণি, দুই কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব পেরিয়ে গেছে।
সাফওয়ান বে ইনসাইটকে বলেন, “পাম্পগুলো আগের বছরের পারফরম্যান্স অনুযায়ী তেল পাচ্ছে। অনেক পাম্পেই কম পড়ে যাচ্ছে। এজন্যই মনে হয় এমন লাইন।”
তথ্য বলছে, আমদানি করা ডিজেলের চাহিদা বাংলাদেশে বেশি থাকলেও, দীর্ঘ সারির অধিকাংশ বাইক বা গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে অকটেন বা পেট্রোলের জন্য। অথচ দেশেই এই চাহিদার একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয়।
একারণেই প্রশ্নটা থেকে যায়, সংকট কি সত্যিই তেলের?

উৎপাদন আছে, তবুও অস্থিরতা
পরিসংখ্যান বলছে, গল্পটা এত সরল নয়। বাংলাদেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন, অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন।
দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে এর একটি বড় অংশই উৎপাদন হচ্ছে দেশে।
পেট্রোলের প্রায় অর্ধেক, অকটেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
শুধু সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টেই গত অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার টনের বেশি পেট্রোল আর ৫৫ হাজার টনের বেশি অকটেন।
অর্থাৎ চাকা থামিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ঘাটতির গল্প এখানে নেই।
তবুও শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে শত শত যানবাহন। যেন জ্বালানি নয়, ‘অপেক্ষা’ই এখন প্রধান জ্বালানী।
সংকটের নতুন নাম: আতঙ্ক
বাস্তবতা বলছে, এটি জ্বালানির ঘাটতির চেয়ে বেশি মানসিক সংকট।
গুজব, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের ভয় এই তিনে মিলে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য চাপ।
পাম্প মালিকদের ভাষায়, মানুষ এখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছেন। অনেকে মজুত করছেন, “যদি পরে না পাওয়া যায়” এই আশঙ্কায়।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বে ইনসাইটকে বলেন,
“মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুজব ছড়াচ্ছে, মিডিয়াও কিছুটা ভূমিকা রাখছে।”
অর্থাৎ পাম্পে যতটা তেল কমছে, তার চেয়ে বেশি কমছে মানুষের আস্থা।
পাম্পগুলো তেল মজুত করছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “তেল ডিপো থেকে শুধু পাম্পেই আসে না, নানা দপ্তরে যায়, কলকারখানায় যায়, সরকারি অফিসে যায়। সেখান থেকে তেল মজুদ হতে পারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, আমাদের তেল বিক্রি না করে মজুত করার প্রশ্নই আসে না।”

মজুত আছে, তবুও পৌঁছাচ্ছে না
সরকারি হিসাব বলছে, দেশে জ্বালানির মজুত স্বাভাবিক।
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দেয়া তথ্যমতে বর্তমানে রয়েছে-
- প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল
- ১৬ হাজার টন পেট্রোল
- ১০ হাজার ৫০০ টন অকটেন
এপ্রিল মাসে আরও আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে চলছে অভিযান। মার্চ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত ৩৪২টি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ লিটার জ্বালানি।
কিন্তু এই সংখ্যাগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে যেন পৌঁছায় না।
কারণ বাস্তবতার আরেকটি দিক আছে, সরবরাহের অসমতা। যেখানে তেল আছে, সেখান থেকে যেখানে প্রয়োজন সেই যাত্রাপথেই তৈরি হচ্ছে ফাঁক।

দাম, লোকসান আর নীতির দ্বিধা
বর্তমানে এক লিটার ডিজেলের সরবরাহ খরচ প্রায় ২০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। প্রতিদিন লোকসান প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা।
এই আর্থিক চাপ সরকারের ওপর যেমন আছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে বাজারের আচরণেও।
সংসদে জ্বালানির দাম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছিলেন, “গত মাসে সরকার কোনো মূল্যবৃদ্ধি করেনি। তবে আগামী মে মাসের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কাজ চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং মন্ত্রিপরিষদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে দাম সমন্বয় করা হবে।”
তবে বিষয়টি নিয়ে বে ইনসাইটের সাথে কথা হয় বিশ্লেষক ও এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার এর সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের। তিনি বলেন, “পদ্ধতি তৈরি করে সেভিংস করার জন্য এই মূল্য সমন্বয় দরকার ছিল। কিন্তু দাম সমন্বয় করলে চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে সেটি উল্টো প্রভাবও ফেলতে পারে।”
এর মধ্যেই বিশ্ববাজারে এসেছে নতুন মোড়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে তেলের দাম কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বিবিসি তার খবরে বলছে, বিশ্ববাজারে বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলার ৩০ সেন্টে নেমে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া তেলের দাম প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ কমে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ যেখানে দেশে দাম বাড়ানোর চিন্তা, সেখানে বিশ্ববাজারে দাম কমার ইঙ্গিত।
এই দ্বন্দ্বই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন।

সমাধান: নিয়ন্ত্রণ, না আস্থা?
বিশৃঙ্খলার এই চিত্রে বিশেষজ্ঞরা খুঁজছেন প্রযুক্তির সমাধান। শ্রীলঙ্কার মতো কিউআর কোডভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল নেওয়া যাবে না।
মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের মতে, “ট্রাফিক পুলিশের কাছে স্ক্যানার থাকে, তারা স্ক্যান করে আপনার গাড়িতে কোন প্রবলেম থাকলে ধরে ফেলে। প্রত্যেকটা গাড়িতো ডিজিটাইজড। পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা আছে, তাদের কাছে একটা স্ক্যানিং সিস্টেম চালু করিয়ে দেন।”
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “সংকট পুরোপুরি নেই, কিন্তু যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। একাধিকবার বেশি তেল নেওয়ার প্রবণতা থাকলে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”
অর্থাৎ সংকট সমাধানে শুধু জ্বালানি নয়, ব্যবস্থাপনাই মূল বিষয়।
বৈশ্বিক চাপের ছায়া
এই সংকট শুধু দেশের ভেতরের নয়। বিশ্ববাজারেও অস্থিরতা চলছে।
ইরান যুদ্ধ, সরবরাহ অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।
বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য ডিজেল, ক্রুড অয়েল ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করাই হয়ে উঠতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।

অপেক্ষার শহর
আমরা যখন এই হিসাব-নিকাশ করছি, আসাদগেটের সেই লাইন তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, কিন্তু অপেক্ষা শেষ হয়নি।
সাফওয়ান এখনও দাঁড়িয়ে, তার বাইকের ট্যাংক প্রায় খালি।
