কক্সবাজার শহরে কাজে বেরোনো একজন নারীর হঠাৎ শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তিনি কী করবেন?

ইনসাইট রিপোর্ট । কক্সবাজার

কক্সবাজার শহরে কাজে বেরোনো একজন নারীর হঠাৎ শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তিনি কী করবেন?

দ্রুত বাসায় ফিরবেন? কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে অনুমতি চাইবেন? নাকি প্রয়োজন চেপে রেখে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন?

প্রশ্নটা অস্বস্তিকর। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহরের বাস্তবতা অনেকটাই এমন।

এটি শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত অস্বস্তির গল্প নয়।এটি একটি শহরের জনস্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা এবং নাগরিক সেবার বাস্তব চিত্র।

প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এবং কয়েক লাখ স্থানীয় মানুষের চলাচলের এই শহরে পর্যাপ্ত, পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর গণশৌচাগার থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মৌলিক নাগরিক সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ – পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা এখনো অনেকটাই অপরিকল্পিত, অসম্পূর্ণ এবং ইজারানির্ভর।

বে ইনসাইটের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সৈকত এলাকার কিছু টয়লেট ও চেঞ্জিং রুম ব্যবহারযোগ্য থাকলেও অনেক স্থানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কোথাও দরজায় ঝুলছে তালা, আবার কোথাও অবকাঠামো তৈরি হলেও তা এখনো মানুষের কাজে লাগছে না।

সুগন্ধা পয়েন্টের নতুন চেঞ্জিং রুম ও টয়লেট তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকলেও লাবণীসহ অন্যান্য স্থানে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শহরের বড়বাজার এলাকার একটি পাবলিক টয়লেট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। অন্যদিকে আইবিপি মাঠ এলাকায় নতুন টয়লেট নির্মাণ হলেও সেটি এখনো মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।

জান্নাতুল আয়েশা কাজ করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। তিনি বলেন, “কাজে বের হলে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু মাঝপথে শৌচাগারের প্রয়োজন হলে কোথায় যাব, সেটা নিয়েই চিন্তায় থাকতে হয়। সব জায়গায় তো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে ঢুকে শৌচাগার ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় প্রয়োজন থাকলেও চেপে রাখতে হয়।”

পর্যটকদের অভিযোগও একই ধরনের।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন আসাদুল্লাহ রহমান। বার্মিজ মার্কেট এলাকায় এসে তাঁর মেয়ের হঠাত শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানান।

আসাদুল্লাহ রহমান বলেন, দ্রুত হোটেলে ফিরতে যাচ্ছিলাম, তখন পরে গেলাম রাস্তার জ্যামে।

এই পর্যটকের ভাষায়, “বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে আসেন। পাবলিক টয়লেট সবার জন্য প্রয়োজনীয় একটি সেবা। এটা সবসময় চালু ও পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত।”

কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষক ঈপসীতা চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু টয়লেট বানালেই হবে না। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। অনেক জায়গায় ব্যবহারই করা যায় না।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু নাগরিক দুর্ভোগের বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “পর্যটন এলাকায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর পাবলিক টয়লেট না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করে। এতে শুধু পরিবেশ দূষণই বাড়ে না, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ, কলেরা ও বিভিন্ন ধরনের অন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ সময় শৌচাগার ব্যবহার চেপে রাখার কারণে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে মূত্রনালির সংক্রমণ, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।”

পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের অধীনে থাকা টয়লেটগুলোর একটি অংশ সচল রয়েছে এবং বাকি স্থাপনাগুলো ধাপে ধাপে চালু করার চেষ্টা চলছে।

কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ বলেন, “কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের টয়লেট ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নাপিতাপুকুরের টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত করে চালু রাখা হয়েছে। বড়বাজারের টয়লেটটি ইজারায় কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটি বন্ধ রয়েছে।

তবে সেটি বন্ধের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাশেই বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য টয়লেট থাকায় অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত এই টয়লেটের ব্যবহারকারী কম। তাই কেউ ইজারাও নিতে চায় না। আর আইবিপি মাঠের টয়লেটের নির্মাণকাজ শেষ হলে দ্রুত চালু করা হবে।”

অন্যদিকে জেলা পরিষদ জানিয়েছে, সৈকত এলাকার লাবণী, সুগন্ধা ও ইনানি পয়েন্টের টয়লেটগুলো ইজারা অথবা খাস আদায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রহমত উল্লাহর ভাষ্য, “পর্যটকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান টয়লেটগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় চলছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই।

একটি মৌলিক নাগরিক সেবা কি ইজারার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে?

আইনজীবী সেজান এহসান প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো ব্যবসায়ী দায়িত্ব নিতে আগ্রহী না হন, তাহলে কি একটি শহরের মানুষ এবং পর্যটকরা সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন?

“কারণ, পাবলিক টয়লেট কোনো ব্যবসা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অবকাঠামো।”

আইনজীবী সেজান এহসান এর মতে, বাস্তবতা হলো, কক্সবাজারে হঠাৎ একজন নারীর শৌচাগারের প্রয়োজন হলে তার সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে দ্রুত বাসা, হোটেল কিংবা পরিচিত কোনো স্থানে ছুটতে হয়।

“এটি শুধু সেবার সংকট নয়। এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অগ্রাধিকারেরও একটি সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।”

তিনি বলেন, কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহর, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি গন্তব্য। অথচ এখানকার পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো টেকসই জনসেবার বদলে নির্ভর করছে ইজারা ব্যবস্থার ওপর। ফলে কোথাও সেবা আছে, কোথাও নেই; কোথাও স্থাপনা আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই।

“একটি শহরের মৌলিক সেবা যদি ইজারাদার পাওয়া-না পাওয়ার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি আর শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়। সেটি নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।”

আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রতিভা দাশ বলেন, কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বমানের শহরের পরিচয় শুরু হয় সবচেয়ে মৌলিক জায়গা থেকে।

প্রতিভা দাশ বলেন, একজন নারী যেন শহরের যেকোনো প্রান্তে দ্বিধাহীনভাবে, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে একটি পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি শহর সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব হয়ে ওঠে।

“কারণ, যে শহর প্রতিদিন লাখো মানুষের আতিথেয়তা করে, সেই শহরে একটি কার্যকর পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়,এটি রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব।”

জয় এসেছে, কিন্তু আধিপত্য পুরোপুরি নয়!

ইনসাইট এক্সপ্লেইন

ব্রাজিলের ৩-০ জয় দেখে অনেক সমর্থকই স্বস্তি পেয়েছেন। মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর হাইতির বিপক্ষে অন্তত দলটি নিজের পরিচিত ছন্দে ফিরেছে। কিন্তু স্কোরলাইন যতটা স্বস্তিদায়ক, ম্যাচের ভেতরের গল্প ততটা একপেশে নয়। বরং এই ম্যাচ ব্রাজিলকে যেমন আশা দেখিয়েছে, তেমনি তাদের সীমাবদ্ধতাগুলোও উন্মুক্ত করেছে।

প্রথমার্ধে ব্রাজিল ছিল কার্যকর। ম্যাথেউস কুনিয়ার দুটি গোল এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটি গোল ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেয়। কিন্তু ম্যাচের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, হাইতি মোট শটে মাত্র একটি শটে পিছিয়ে ছিল (৯-৮), লক্ষ্যভেদী শটেও ব্যবধান ছিল সামান্য (৫-৪)।

এটি দেখায়, ব্রাজিল সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারেনি।

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা দলের ক্ষেত্রে শুধু জয় যথেষ্ট নয়; ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় আবিষ্কার: কুনিয়া

এই ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় অর্জন তিন পয়েন্ট নয়, ম্যাথেউস কুনিয়ার পুনর্জন্ম।

মরক্কোর বিপক্ষে ইগর থিয়াগোকে নিয়ে যে পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল, কুনিয়াকে ফিরিয়ে এনে আনচেলত্তি আক্রমণে ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছেন। তিনি শুধু গোল করেননি, ভিনিসিয়ুসের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন, মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগও গড়েছেন।

নেইমারের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা ব্রাজিল অনুভব করছিল, কুনিয়া-ভিনিসিয়ুস-পাকেতা ত্রয়ী অন্তত সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে, এই বিশ্বাস জন্মেছে।

বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে প্রায় সব চ্যাম্পিয়ন দলেরই একটি কার্যকর আক্রমণাত্মক ত্রিভুজ থাকে। ব্রাজিল হয়তো সেই কাঠামোর সন্ধান পেতে শুরু করেছে।

ভিনিসিয়ুস এখন সত্যিকারের নেতা

গত কয়েক বছরে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, নেইমারের পর আক্রমণের নেতৃত্ব কে নেবে?

এই বিশ্বকাপে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

মরক্কো ম্যাচে ভালো খেলার পর হাইতির বিপক্ষেও তিনি ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। গোল করেছেন, সুযোগ তৈরি করেছেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার তিনি একা নন। কুনিয়া ও পাকেতার সহায়তায় তিনি আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।

তবে ভিনিসিয়ুসের একটি পুরোনো দুর্বলতা এখনও আছে, অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বল পায়ে রাখা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে।

মাঝমাঠ: ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা

বিশ্বকাপ জয়ের পথে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন সম্ভবত মাঝমাঠ।

লুকাস পাকেতা কিছুটা ছন্দে ফিরেছেন। ব্রুনো গিমারায়েসও দুর্দান্ত খেলছেন। কিন্তু কাসেমিরোকে ঘিরে উদ্বেগ কমেনি।

৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরোকে কয়েকবার সহজে পরাস্ত হতে দেখা গেছে। হাইতির মতো দলের বিপক্ষে এটি বড় সমস্যা মনে না হলেও নকআউট পর্বে স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড কিংবা জার্মানির মতো দলের বিপক্ষে এটি মারাত্মক দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।

আধুনিক ফুটবলে মাঝমাঠের গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাসেমিরো সেই গতি ধরে রাখতে পারবেন কি না, সেটি এখনও অমীমাংসিত প্রশ্ন।

রাফিনিয়া সংকট

আরেকটি সমস্যা ডান প্রান্তে।

রাফিনিয়া টানা দুই ম্যাচে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। চোটের প্রভাব স্পষ্ট। তার বদলি রায়ানও এখনও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি।

অর্থাৎ ভিনিসিয়ুসের বিপরীত দিকে ব্রাজিল এখনও একটি নির্ভরযোগ্য আক্রমণভাগ খুঁজছে।

আনচেলত্তি হয়তো সামনে এন্দ্রিক কিংবা লুইস হেনরিকের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মাঝপথে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আদর্শ পরিস্থিতি নয়।

রক্ষণে এখনও অস্বস্তি

স্কোরলাইন বলছে হাইতি গোল করতে পারেনি। কিন্তু ম্যাচ বলছে অন্য গল্প।

হাইতি একাধিক ভালো সুযোগ তৈরি করেছে। আলিসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং কিছুটা ভাগ্য ব্রাজিলকে ক্লিনশিট এনে দিয়েছে।

বিশ্বকাপে বড় দলগুলো সাধারণত দুর্বল প্রতিপক্ষকে এমন সুযোগ দেয় না। ব্রাজিল সেই মানদণ্ডে এখনও পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।

তাহলে ব্রাজিলের পথ কতটা মসৃণ?

গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার সম্ভাবনা এখন বেশ উজ্জ্বল। চার পয়েন্ট নিয়ে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।

কিন্তু শিরোপা জয়ের সমীকরণ ভিন্ন।

এই মুহূর্তে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপের প্রধান দাবিদার বলা যাবে না, তবে শক্তিশালী প্রতিযোগী অবশ্যই বলা যায়।

কারণ,

যা আছে:

  • ভিনিসিয়ুসের নেতৃত্ব
  • কুনিয়ার ফর্ম
  • আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা
  • ব্রুনো গিমারায়েসের ধারাবাহিকতা
  • ম্যাচ জেতার মানসিকতা

যা এখনও নেই:

  • স্থিতিশীল মাঝমাঠ
  • নির্ভরযোগ্য ডান প্রান্ত
  • সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী রক্ষণ
  • ৯০ মিনিটের আধিপত্য
  • শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পরীক্ষিত কাঠামো

শেষ কথা

হাইতির বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলকে উত্তর দেয়নি, বরং কিছু নতুন প্রশ্নের পাশাপাশি কয়েকটি আশার আলো দেখিয়েছে।

আনচেলত্তি এখন অন্তত জানেন, ভিনিসিয়ুস-কুনিয়া-পাকেতাকে ঘিরে একটি কার্যকর আক্রমণভাগ গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝেছেন যে, কাসেমিরোর গতি, রাফিনিয়ার ফর্ম এবং রক্ষণের দুর্বলতা ঠিক না করলে বিশ্বকাপের শেষ ধাপগুলোতে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

সুতরাং, ব্রাজিল এখনো ট্রফির পথে দৌড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটি মহাসড়কের মসৃণ যাত্রা নয়। বরং সামনে এখনও রয়েছে বেশ কয়েকটি বাঁক, কয়েকটি গর্ত এবং কয়েকটি কঠিন পাহাড়ি পথ। হাইতির বিপক্ষে জয় তাদের পথ দেখিয়েছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।

“আমাদেরও দেশ আছে, আমরা দেশছাড়া মানুষ নই”

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের মতো বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারাও স্মরণ করছেন তাদের হারিয়ে যাওয়া দেশ, ভিটেমাটি, স্বজন ও অতীতের জীবনকে। তবে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নতুন করে জানাচ্ছেন নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবি, শরণার্থী নয়, মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চান তারা।

বে ইনসাইটের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে এ কথা বলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মো. জুবায়ের।

তার ভাষায়, বিশ্ব শরণার্থী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি পৃথিবীর সব শরণার্থীর বেদনা, হারিয়ে যাওয়া পরিচয় এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

“এই দিনটি আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় কেন আমরা শরণার্থী হয়েছি। আমরা আমাদের দেশ, সম্পত্তি, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি সবাইকে স্মরণ করি। আমরা কাঁদি। বিশ্বকে বলতে চাই, আমাদেরও দেশ আছে, আমরা দেশছাড়া মানুষ নই,” বলেন তিনি।

মো. জুবায়েরের অভিযোগ, মিয়ানমারে ধারাবাহিক নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণেই রোহিঙ্গারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি বলেন, “২০১৭ সালে এবং পরে ২০২৪ সালেও গণহত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে আমাদের বিতাড়িত করা হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা কখনোই শরণার্থী হতে চাইনি, এখনও চাই না।”

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, এটি স্থায়ী সমাধান নয়।”

রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে মো. জুবায়ের বলেন, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের অভাবের কারণেই প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না।

“বিশ্ব বাংলাদেশকে এমন কোনো সুযোগ বা পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারেনি, যাতে আমরা নিরাপদে আরাকানে ফিরতে পারি। ফলে আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও মর্যাদার সঙ্গে নিজের ভূমিতে ফিরতে পারেনি,” বলেন তিনি।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ক্যাম্প আসলে এক ধরনের কারাগার। অনেক ক্ষেত্রে কারাগারের চেয়েও এখানে অশান্তি বেশি। এখানে শান্তি নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই।”

তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পরিচয়ের প্রশ্ন।

“আমরা বলছি আমরা রোহিঙ্গা। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন জনগোষ্ঠী ও কর্তৃপক্ষ আমাদের ‘বাঙালি’ বলে। এই বিরোধের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। তাই আজও আমরা এই দুরবস্থার মধ্যে আছি,” বলেন তিনি।

আরাকানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মো. জুবায়ের। তার দাবি, সেখানে চলমান সংঘাত ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

“এখনও বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের স্বার্থে খেলা খেলছে। আরাকানের বিভিন্ন এলাকা দখল করা হচ্ছে। আমাদের ফিরে যাওয়ার মতো জায়গাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।

তবে সমাধানের বিষয়ে তিনি একটি বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তার মতে, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরাকানে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল বা সুরক্ষিত আশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটি শরণার্থী শিবির হলেও তারা সেখানে যেতে প্রস্তুত।

“পুরো বিশ্ব যদি আমাদের জন্য আরাকানে একটি নিরাপদ আস্তানা তৈরি করে দেয়, সেটা শরণার্থী শিবির হলেও আমাদের আপত্তি নেই। অন্তত সেটা আমাদের নিজ ভূমির কাছাকাছি হবে। আমরা সেখানে থাকতে রাজি,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন এই রোহিঙ্গা নেতা।

“আমরা বাঙালি জনগণকে আর কষ্ট দিতে চাই না। বাংলাদেশের কোনো প্রান্তিক এলাকায় বছরের পর বছর আটকে থাকতে চাই না। আমরা চাই সম্মানের সঙ্গে নিজের ভূমিতে ফিরে যেতে,” বলেন তিনি।

বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মো. জুবায়ের বলেন, শুধু রোহিঙ্গা সংকট নয়, ভবিষ্যতে যেন পৃথিবীর আর কোনো জনগোষ্ঠী শরণার্থী হতে বাধ্য না হয়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তার ভাষায়, “আমাদের অনুরোধ, বিশ্ব এমন প্রতিজ্ঞা করুক যাতে আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো মানুষ শরণার্থী না হয়। কারণ কেউই শরণার্থী হয়ে জন্মায় না, কেউ শরণার্থী হতে চায় না।”

প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান: শরণার্থী কমিশনার মিজানুর রহমান

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাংলাদেশ এখন তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধান একমাত্র নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।

মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর সবচেয়ে বড় ঢলে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি।

তার ভাষায়, “গত দুই-আড়াই বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। অন্যদিকে প্রতিবছর ক্যাম্পগুলোতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে না। ফলে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।”

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জনগণ ও সরকারকে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। তবে তিনি উল্লেখ করেন, নয় বছর পূর্ণ হতে চললেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে আরআরআরসি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম সেবা দিয়ে এখানে রাখা এবং পরে তাদের নিজ দেশে সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও আমরা প্রত্যাবাসন করতে পারিনি।”

তিনি এর জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও অনিরাপদ পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের পথে প্রধান বাধা বলে উল্লেখ করেন।

মিজানুর রহমান বলেন, “মিয়ানমারের নাগরিকরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তাদের নিজ দেশে এখনো এমন পরিবেশ তৈরি হয়নি যেখানে তারা নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে। রাখাইনের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের অনুকূল নয়।”

তিনি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ সরকারও প্রত্যাবাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আরআরআরসি বলেন, এই মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে জানানোর মতো বড় কোনো অগ্রগতি নেই। তবে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যাবাসন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করছে। আমরা আশা করি মিয়ানমার সরকার এবং রাখাইনে সক্রিয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে যাবে এবং প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।”

আড়াই লাখ রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাই

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিজানুর রহমান জানান, বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ সালেই প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গার পারিবারিক তথ্য (ফ্যামিলি ট্রি) মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল।

তিনি বলেন, “মিয়ানমার প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই করেছে। তবে সেটিও অনেক আগের বিষয়। এর মধ্যে পরিবারে নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে, কেউ মারা গেছে, অনেক পরিবার ভেঙে গেছে। ফলে যাচাই একটি চলমান প্রক্রিয়া।”

তার মতে, প্রত্যাবাসন শুরু হলে এসব তথ্য আবার হালনাগাদ করতে হবে। বর্তমানে জাতিসংঘের সহযোগিতায় পরিচালিত নিবন্ধন কার্যক্রম অনুযায়ী প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নিবন্ধিত রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’

ক্যাম্পগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে আরআরআরসি বলেন, এত বড় জনসংখ্যাকে সীমিত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিনি বলেন, “অনেক রোহিঙ্গা নিজ দেশে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে এখানে এসেছে। তাদের মধ্যে বিশেষ করে তরুণদের এক ধরনের মানসিক ট্রমা রয়েছে। তারপরও আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি।”

তিনি জানান, ক্যাম্প এলাকায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), পুলিশ, র‍্যাব, আনসার এবং সীমান্তে বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীরও সহযোগিতা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

স্থায়ী অবকাঠামো নয়, দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অভিযোগ সম্পর্কে মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি একটি ভুল ধারণা।

তার ভাষায়, “রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী আবাসন তৈরির কোনো সুযোগ নেই। কিছু জায়গায় ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন করা হচ্ছে। সেখানে বাঁশের পরিবর্তে স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এগুলো স্থায়ী নয়। নাট-বল্টু খুলে অল্প সময়ের মধ্যেই খুলে ফেলা যায়।”

তিনি জানান, পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ক্যাম্পগুলোতে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকে। ২০২৩ সালে ভূমিধস ও দুর্যোগে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছিল।

এর পর থেকে প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ক্যাম্প-ইন-চার্জদের (সিআইসি) নেতৃত্বে নিয়মিত প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়।

তিনি বলেন, “যেসব এলাকা ভূমিধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কাজটি কঠিন হলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমরা সফলভাবে এটি করতে পেরেছি। এবারও সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।”

দীর্ঘায়িত সংকটের ভার

আরআরআরসি মিজানুর রহমান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, বাংলাদেশ এখনও মানবিক দায়িত্ব পালন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কমে আসা আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কোনোভাবেই ক্যাম্পে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নয়; বরং মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।

“গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় এজেন্ডায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি” : রাহমান নাসির উদ্দিন

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

আগামী ২৫ আগস্ট পূর্ণ হবে রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ বড় ঢলের নয় বছর। প্রায় এক দশক পার হলেও প্রত্যাবাসনের কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন অনুপ্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস উপলক্ষে বে ইনসাইটের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন।

তিনি বলেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের মধ্যে হলেও প্রকৃত সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি হতে পারে।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “২০১৭ সালে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ছিল। এরপর গত নয় বছরে জন্মহার বিবেচনায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার করে জনসংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে অনুপ্রবেশও হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে আমি মনে করি।”

প্রত্যাবাসন ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ অবস্থায়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি “স্ট্যান্ডস্টিল” শব্দটি ব্যবহার করেন।

তার ভাষায়, “এটা এমন এক অবস্থা, যেখানে কোনো অগ্রগতিও নেই, আবার আনুষ্ঠানিকভাবে পিছিয়েও যায়নি। সামনে এগোচ্ছে না, পেছাচ্ছেও না।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের বড় ঢল নামার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি করে। এরপর টাস্কফোর্স গঠন, শারীরিক ব্যবস্থাপনা চুক্তিসহ দ্রুত নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালের নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের আগস্টে প্রত্যাবাসনের দুটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

“এর প্রধান কারণ ছিল মিয়ানমারের অনীহা এবং আন্তরিকতার অভাব। রোহিঙ্গারা জানতে চেয়েছিল তারা কোথায় থাকবে, নিরাপত্তা কে দেবে, তাদের ফেলে আসা সম্পদ ফেরত পাবে কি না। এসব প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর মিয়ানমার দিতে পারেনি,” বলেন তিনি।

কোভিড, অভ্যুত্থান ও যুদ্ধের ধাক্কা

রাহমান নাসির উদ্দিনের মতে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার পেছনে পরবর্তী ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ মহামারির পর পুরো বিষয়টি ধীর হয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তার বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ফলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যায়।”

তার মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নতুন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

“গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় এজেন্ডায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি,” বলেন তিনি।

হতাশ তরুণ প্রজন্ম

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই গবেষক বলেন, সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছে ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম।

“যে শিশুর বয়স ২০১৭ সালে ১০ বছর ছিল, তার বয়স এখন ১৯। যে কিশোরের বয়স ছিল ১৫, সে এখন ২৪ বছরের যুবক। তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কেটে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্যে,” বলেন তিনি।

তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা অনেককে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা কিংবা নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

“তারা খুবই হতাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে,” যোগ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ কমছে

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার তালিকায় আগের মতো নেই।

“ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাসহ নানা বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেছে। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যু ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে,” বলেন তিনি।

তবে শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকেই দায়ী করতে চান না তিনি।

তার মতে, “বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথেষ্ট কার্যকরভাবে বোঝাতে পারেনি যে এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।”

নতুন বাস্তবতায় নতুন নীতি প্রয়োজন

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান বলে মনে করেন রাহমান নাসির উদ্দিন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তা দ্রুত সম্ভব নয় বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, “ধরুন কাল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সিদ্ধান্ত নিল রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে। তবুও বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নেই।”

তার মতে, শুধু প্রত্যাবাসনের কথা বললে হবে না; পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের প্রস্তাব

সমাধানের অংশ হিসেবে তিনি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন।

“যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করে আরও বেশি রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের সুযোগ খুঁজতে হবে,” বলেন তিনি।

একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করারও পরামর্শ দেন।

তার ভাষায়, “১৫ লাখ মানুষকে শুধু সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে হবে না। তাদের এমন কাজে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হয়।”

ভাসানচরে পশুপালন, হস্তশিল্প ও অন্যান্য জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে রোহিঙ্গাদের দক্ষতা ও শ্রমকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

‘প্যাকেজ ডিল’ ভাবনার প্রস্তাব

রাহমান নাসির উদ্দিন আরও বলেন, যেহেতু সংকট দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা নেই, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা বা “প্যাকেজ ডিল” নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

“বাংলাদেশ যদি আরও কয়েক বছর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও অন্যভাবে এর দায় ভাগ করে নিতে হবে। সেটা হতে পারে বাণিজ্য সুবিধা, শিক্ষা বৃত্তি, শ্রমবাজারে সুযোগ বৃদ্ধি বা অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে,” বলেন তিনি।

তার মতে, প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই সংকট মোকাবিলায় পুরোনো অবস্থানের পাশাপাশি নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণের সময় এসেছে।

রোহিঙ্গাদের বাড়ি আর কত দূর?

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

“আমার ছেলে যখন বাংলাদেশে আসে, তখন তার বয়স পাঁচ বছর। এখন সে প্রায় চৌদ্দ। সে তার গ্রামের নাম জানে, কিন্তু কখনও নিজের গ্রাম দেখেনি।”

উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে বসে কথাগুলো বলছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থী আবদুস সালাম। কথার মাঝেই তিনি থেমে যান। চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়ের দিকে।
তার মতো লাখো রোহিঙ্গার জীবন এখন দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকা এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।

একদিকে মিয়ানমার যেখানে তাদের জন্ম, শিকড়, জমি-ঘর, স্মৃতি। অন্যদিকে বাংলাদেশ, যে দেশ তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী ঠিকানা দিতে পারেনি।

বিশ্ব যখন ২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস পালন করছে, তখন কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কাছে দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া বাড়ি, হারিয়ে যাওয়া পরিচয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের স্মরণ দিবস।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগেও কয়েক দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে আজ প্রায় নয় বছর পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়েছে।

সংখ্যা বাড়ছে, সংকটও বড় হচ্ছে

বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে সংকটটি দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।

“২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় ইনফ্লাক্সের সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ এসেছিল। এখন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের উপরে। গত দুই-আড়াই বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।”

তিনি বলেন, “প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা স্থির নেই, ক্রমাগত বাড়ছে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন অবশ্য মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

“২০১৭ সালে আমরা ১১ লাখাধিক রোহিঙ্গার কথা বলেছিলাম। এরপর গত নয় বছরে প্রতিবছর গড়ে ৩০ হাজার করে জনসংখ্যা বেড়েছে। জন্মহার থেকে মৃত্যুহার বাদ দিলেও দুই থেকে আড়াই লাখ নতুন মানুষ যুক্ত হয়েছে। তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে দেড় থেকে দুই লাখ নতুন অনুপ্রবেশকারী যোগ করলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি।”

তার মতে, “বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আবাসভূমি।”

‘আমাদেরও দেশ ছিল’

রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকমের সাথে কথা বলেছেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর সদস্য ডা. জুবায়ের।

তার কণ্ঠে ছিল বেদনা, ক্ষোভ ও প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

“২০ জুন পৃথিবীর সব শরণার্থীর জন্য একটি বিশেষ দিন। এই দিনে তারা স্মরণ করে কেন তারা শরণার্থী হয়েছে, কীভাবে তাদের দেশ হারিয়েছে, কারা তাদের দেশছাড়া করেছে।”

তিনি বলেন, “আমরাও এই দিনে আমাদের ফেলে আসা বাড়ি, জমি, কবরস্থান, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানদের স্মরণ করি। অনেকের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। অনেকেই আর বেঁচে নেই।”

ডা. জুবায়েরের মতে, বিশ্ব শরণার্থী দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত নতুন করে যেন আর কোনো জনগোষ্ঠী শরণার্থী না হয়।

“আমরা বিশ্বকে বলতে চাই, আমরা কখনো শরণার্থী হতে চাইনি। পৃথিবীর কোনো মানুষই শরণার্থী হতে চায় না।”

পরিচয়ের সংকট

রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিচয়ের প্রশ্ন, এ কথা বারবার তুলে ধরেন ডা. জুবায়ের।

“আমরা বলি আমরা রোহিঙ্গা। কিন্তু রাখাইনের মগরা বলে আমরা বাঙালি। মিয়ানমার রাষ্ট্র আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। আমাদের পরিচয় অস্বীকার করে।”

তার ভাষায়, “যে জনগোষ্ঠীর পরিচয় স্বীকৃত নয়, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন কীভাবে সম্ভব?”

তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাখাইনে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা আরাকান আর্মির সময়ও রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা পায়নি।

“আজও মগ আর মিলিটারি নিজেদের মতো খেলা খেলছে। আমরা মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছি।”

‘ক্যাম্প একটা কারাগার’

নয় বছরের শরণার্থী জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডা. জুবায়ের বলেন, “ক্যাম্প একটা কারাগার।”

তিনি বলেন, “কারাগারের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে খারাপ। এখানে মানুষের স্বাধীনতা সীমিত। কাজের সুযোগ সীমিত। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।”

তার ভাষায়, “আমরা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্ব যদি রাখাইনে আমাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করে, সেটা শরণার্থী শিবির হলেও আমরা যেতে প্রস্তুত। অন্তত সেটা আমাদের ভূমি হবে।”

নয় বছরে একজনও ফেরেনি

রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ছিল। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। ২০১৮ সালের শুরুতে হয় বাস্তবায়ন চুক্তি।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। নভেম্বরে চুক্তি, ডিসেম্বরে টাস্কফোর্স, জানুয়ারিতে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট এগ্রিমেন্ট। তখন মনে হয়েছিল দুই বছরের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে।”

কিন্তু তা হয়নি। ২০১৮ সালে প্রথম এবং ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

“কারণ মিয়ানমার নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-সম্পত্তি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দিতে পারেনি,” বলেন তিনি।

“বাংলাদেশও জোর করে কাউকে ফেরত পাঠাতে পারেনি। রোহিঙ্গারা যেতে রাজি না হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির কারণে তাদের জোর করে পাঠাতে পারে না।”

‘প্রত্যাবাসন এখন স্ট্যান্ডস্টিল’

রাহমান নাসির উদ্দিন প্রত্যাবাসন পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেন ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ হিসেবে।

“এটা সামনে যাচ্ছে না, পিছিয়েও যাচ্ছে না। এক ধরনের স্থবিরতা।”

তিনি বলেন, “কোভিড মহামারির পর পুরো প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে যায়। এরপর মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, গৃহযুদ্ধ, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন—সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যত থেমে গেছে।”

তার মতে, “বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের বাস্তব রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়।”

‘আমাদের লক্ষ্য প্রত্যাবাসন’

আরআরআরসি মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য কখনোই রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রাখা নয়। আমরা চাই তাদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করতে এবং সসম্মানে নিজ দেশে ফিরিয়ে দিতে।”

তিনি বলেন, “নয় বছর প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।”

এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
“প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ এখনও নেই।”

তিনি জানান, বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ সালেই প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল।

“তারা প্রায় আড়াই লাখ মানুষের তথ্য যাচাইও করেছে। কিন্তু যাচাই করা আর প্রত্যাবাসন শুরু করা এক বিষয় নয়।”

নতুন বাস্তবতা: আরাকান আর্মি

রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন আগের চেয়ে অনেক জটিল।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “২০১৭ সালে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে ছিল। এখন বাস্তবতা বদলে গেছে।”

তার মতে, “আজ যদি মিয়ানমার সরকারও প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়, প্রশ্ন হচ্ছে—সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা কি তাদের আছে?”

কারণ রাখাইনের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

“বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখে। কিন্তু আরাকান আর্মি কোনো রাষ্ট্র নয়। ফলে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যেতে পারে না।”

সহায়তা কমছে

মিজানুর রহমানের ভাষায়, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন অর্থসংকট।”
তিনি বলেন, “প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অর্থায়ন কমছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয়—সবখানে চাপ বাড়ছে।”

তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ সহায়তাকারী দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

“তাদের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতো না।”

হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজন্ম

ক্যাম্পে এখন এমন একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যারা কখনও মিয়ানমার দেখেনি।
২০১৭ সালে যে শিশুর বয়স ছিল ১০, সে এখন তরুণ। যার বয়স ছিল ১৫, সে এখন কর্মক্ষম যুবক। কিন্তু তাদের সামনে নেই কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশ তাদের নাগরিকত্ব দেবে না। মিয়ানমারও গ্রহণ করছে না। তারা এক ধরনের রাষ্ট্রহীন ভবিষ্যতের মধ্যে বড় হচ্ছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি হতাশা সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ, মানবপাচার ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমছে

একসময় রোহিঙ্গা সংকট ছিল বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে।

কিন্তু এখন ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনাসহ নানা সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।

রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার তালিকা থেকে নিচে নেমে যাচ্ছে।”

তার মতে, বাংলাদেশেরও কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

“আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথেষ্টভাবে বোঝাতে পারিনি যে এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়।”

বিকল্প পরিকল্পনা কি প্রয়োজন?

প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান—এ বিষয়ে সবাই একমত। কিন্তু প্রত্যাবাসন না হলে কী হবে? এই প্রশ্ন তুলছেন রাহমান নাসির উদ্দিন।

“বাংলাদেশের একমাত্র নীতি হচ্ছে প্রত্যাবাসন। কিন্তু যদি আগামী পাঁচ বা দশ বছরেও তা সম্ভব না হয়, তাহলে বিকল্প পরিকল্পনা কী?”

তিনি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন, সীমিত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নতুন ধরনের চুক্তির কথা বলেন।

“অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কিছু দেশ মানবিক পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের মানুষদের কিছু উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার বিষয়ও ভাবতে হবে।”

তার মতে, “১৫ লাখ মানুষকে বছরের পর বছর শুধু ত্রাণনির্ভর করে রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।”

বাড়ি আর কত দূর?

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসের আগের দিন সকালে কুতুপালং ক্যাম্পের সরু গলিতে কয়েকজন শিশু ঘুড়ি উড়াচ্ছিল।

তাদের একজনের হাতে ছিল কাগজের তৈরি একটি ছোট ঘুড়ি। ঘুড়িটি আকাশে উঠছিল, কিন্তু সুতো ছিল শক্ত করে বাঁধা।

রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার জীবনও যেন সেই ঘুড়ির মতো। স্বপ্ন আছে, স্মৃতি আছে, ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সুতো আটকে আছে যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি, পরিচয়ের সংকট এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার জটিল গিঁটে।

নয় বছর আগে যারা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের অনেক শিশুই আজ তরুণ। কেউ কখনও রাখাইন দেখেনি, কেউ শুধু বাবা-মায়ের মুখে নিজের গ্রামের গল্প শুনেছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসে তাই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পগুলো থেকে আবারও ভেসে আসে একই প্রশ্ন- রোহিঙ্গাদের বাড়ি আর কত দূর?

বরাদ্দ বাতিল হলেও সোনাদিয়া পুরোপুরি বুঝিয়ে দেয়নি বেজা, দখল-ধ্বংসে বিপন্ন দ্বীপ

বে ইনসাইট রিপোর্ট

এক সময় সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে সেখানে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতার সুযোগে এখন দখল, বন উজাড় ও অবৈধ পর্যটন বাণিজ্যের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়েছে দ্বীপটির অনন্য বাস্তুতন্ত্র।

পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের মুখে বেজার জন্য দেওয়া জমির বরাদ্দ বাতিল করা হলেও প্রায় দুই বছর পরও দ্বীপের পুরো নিয়ন্ত্রণ পায়নি বন বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রশাসনিক অচলাবস্থাই সোনাদিয়ার বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।

সরকার ২০১৯ সালে মাত্র ১ হাজার ১ টাকা সালামিতে সোনাদিয়া দ্বীপের ৯ হাজার ৪৬৭ একর জমি দীর্ঘমেয়াদে বেজাকে বরাদ্দ দেয়। পরিকল্পনা ছিল দ্বীপের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় ইকোট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার। ভারতীয় মাহিন্দ্রা গ্রুপকে যুক্ত করে প্রায় ৫০০ একর এলাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

তবে সরকারের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) তখনই সতর্ক করেছিল, ব্যাপক পর্যটন কার্যক্রম শুরু হলে অতিথি পাখির আবাস, সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়া এবং দ্বীপের নাজুক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হোটেল-মোটেল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ বর্জ্য বৃদ্ধি করে অপূরণীয় পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তীতে পরিবেশবাদীদের আপত্তি ও আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয় বেজার বন্দোবস্ত বাতিল করে জমি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বরাদ্দ বাতিল হলেও সাতটি মৌজার মধ্যে মাত্র তিনটির নিয়ন্ত্রণ আমরা ফিরে পেয়েছি। বাকি অংশ এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো দ্বীপে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।”

তার ভাষায়, “মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বেজার বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত মামলা এখনো চলমান থাকায় প্রক্রিয়াটি শেষ হয়নি। যে এলাকাগুলো আমাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, সেখানেই সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা, বন পোড়ানো ও দখলের ঘটনা ঘটছে।”

তিনি জানান, দক্ষিণ কুতুবজুম ও পানদ্বীপ মৌজায় বন ধ্বংসের ঘটনা সবচেয়ে বেশি।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল প্যারাবন কেটে রিসোর্ট নির্মাণ, চিংড়ি ঘের তৈরি এবং অবৈধ পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।

গত ২ এপ্রিল বন বিভাগ বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের ৩০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে। তাদের দাবি, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এসব মামলা করা হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে।

তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বন বিভাগের মামলায় নাম আসা শেখ কামাল বলেন, “সোনাদিয়া দ্বীপে আমার কোনো রিসোর্ট নেই। আমি প্যারাবনও দখল করিনি।”

অন্যদিকে বিএনপি নেতা জাহেদুল হক নাহিদ বলেন, “জীবনে কোনো দিন সোনাদিয়া দ্বীপে যাইনি। সেখানে আমার রিসোর্ট থাকবে কীভাবে?”

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ জন দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে জমা দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “গত মাসে অভিযান চালিয়ে পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫টি অবৈধ রিসোর্ট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় পুলিশ ও নৌবাহিনীসহ শতাধিক সদস্য এতে অংশ নেন।”

‘বাংলাদেশের অন্যতম অক্ষত দ্বীপ’

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দারের মতে, সোনাদিয়া দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি।

তিনি বলেন, “সোনাদিয়া সত্যিকার অর্থে একটি ক্রিটিক্যাল ইকোলজিক্যাল এলাকা। এখানে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী প্রজনন করে, বসবাস করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অন্য অনেক উপকূলীয় এলাকার তুলনায় এখানকার জীববৈচিত্র্য এখনো অনেকটাই অক্ষত।”

তার মতে, দ্বীপটিতে একদিকে বিস্তীর্ণ বালুকাময় সৈকত, অন্যদিকে কর্দমাক্ত উপকূল ও প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের বিরল সমন্বয় রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না।

“এখানে বালিয়াড়ি আছে, কেয়াবন আছে, সাগরলতা আছে। উপকূলের যেসব উদ্ভিদ অনেক জায়গা থেকে হারিয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকটাই এখনো সোনাদিয়ায় টিকে আছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, অপরিকল্পিত পর্যটন চালু করা হলে দ্বীপের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও নাজুক বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাবে।

“পর্যটন হতে পারে, তবে সেটি অবশ্যই সীমিত পরিসরে এবং পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে। এখন যেভাবে ম্যানগ্রোভ বন কেটে বা পুড়িয়ে চিংড়ি প্রকল্প করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তার মতে, সোনাদিয়া নিয়ে যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার আগে দ্বীপটির পরিবেশগত ধারণক্ষমতা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে সেই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা। বরাদ্দ বাতিলের পরও বেজার কাছ থেকে পুরো জমি বুঝে না পাওয়ায় বন বিভাগ কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আর সেই সুযোগেই প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে সোনাদিয়ার বন, বালিয়াড়ি ও জীববৈচিত্র্য।

মাতারবাড়ী এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু উত্তোলন: ‘শত কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ’, হাইকোর্টে রিট

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক (পোর্ট এক্সেস রোড) নির্মাণ প্রকল্পে বালু উত্তোলন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হয়েছে।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন এ রিট আবেদন করেন। আবেদনে মহেশখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং বালুর মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

রিট আবেদন গ্রহণ করে হাইকোর্ট আগামী ২১ জুন শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।

রিটের নথিতে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর ভিত্তিমূল্য বা রয়্যালটি ৬ টাকা ৯৪ পয়সা। তবে ড্রেজিং ব্যয় বাবদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা সমন্বয়ের পর কার্যত প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৩৭ পয়সা।

রিটকারীর দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে প্রকল্পের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তোকিউ-এমআইএল-জেভি’ বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

রিটে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ মোট আটজনকে বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব সুবিধা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রিট আবেদনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেন। তবে অনুমোদনের আগে কোনো বিকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়নি এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সম্পন্ন হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া মহেশখালী উপকূল থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র এবং এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও ন্যায্য রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সংবিধান ও আইনের দাবি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।”

তিনি বলেন, রিটে বালু উত্তোলনের অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

সোহানা শারমিনের ভাষ্য, “ড্রেজিং ব্যয় সমন্বয়ের নামে রাষ্ট্রকে প্রতি ঘনফুটে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা রয়্যালটি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকল্পে ব্যবহৃত বালুর জন্য সরকারের কাছ থেকেই তুলনামূলক অনেক বেশি মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এসব কারণেই আদালতের কাছে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।”

তবে রিটে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব সমুদ্র দিবস: জীবন ও জীবিকার উৎস আজ সংকটে

বে ইনসাইট রিপোর্ট

প্রতিদিন ভোরে নাজিরারটেকের জেলেরা তাদের নৌকা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমান। তাদের বাবারা যেমন গিয়েছেন, দাদারাও তেমনি গিয়েছেন। কিন্তু সমুদ্রটা যেন আর আগের মতো নেই। মাছের পরিমাণ কমে গেছে, পানির রং বদলেছে, আর প্রবীণ জেলেদের ভাষায়—সমুদ্রের গন্ধও আর আগের মতো নেই।

বিশ্ব মহাসাগর দিবসে তাই কক্সবাজার উদ্‌যাপন করছে না; বরং নিজের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

যে পরিসংখ্যান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই

২০২৪ সালে ব্র্যাক পরিচালিত একটি বেসলাইন জরিপে উঠে আসে উদ্বেগজনক তথ্য। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন গড়ে ৩৪ দশমিক ৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ এবং বিভিন্ন ধরনের পলিথিনে ভরে যাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের বালুচর।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সৈকতসংলগ্ন প্রায় ৫০০টি হোটেল ও গেস্টহাউসের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে কার্যকর পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) রয়েছে। বাকি অধিকাংশ স্থাপনার বর্জ্য পানি শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে সেই সমুদ্রে, যা দেখতে লাখো পর্যটক কক্সবাজারে আসেন এবং যার ওপর নির্ভর করে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা।

ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সৈকত

দূষণের পাশাপাশি আরেকটি নীরব সংকট হচ্ছে উপকূল ভাঙন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণাগুলো বলছে, কক্সবাজার উপকূলে ভৌগোলিক পরিবর্তনের গতি বেড়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে অনেক প্রাকৃতিক পাহাড়ি ছড়া ও জলপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্ষার পানি সরাসরি সৈকত অতিক্রম করে সাগরে গিয়ে পড়ছে এবং বালুচর দ্রুত ক্ষয় করছে।

গবেষকদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ পুনরুদ্ধার এবং উপকূলজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ বন্ধ করা না গেলে এই ক্ষয়রোধ করা কঠিন হবে।

ঝুঁকিতে একটি জেলার জীবন-জীবিকা

এটি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি কক্সবাজারের অর্থনীতি ও মানুষের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। মাছ ধরা, পর্যটন, লবণ চাষ, চিংড়ি ও মৎস্যখাত—সবকিছুই নির্ভর করছে একটি সুস্থ সমুদ্রের ওপর।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা ইতোমধ্যে সতর্ক করছেন, দূষিত পানি ও নোংরা সৈকত পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করবে, যার প্রভাব পড়বে হাজারো ব্যবসা ও লাখো মানুষের কর্মসংস্থানে। অন্যদিকে জেলেদের জন্য সংকট আরও তাৎক্ষণিক—সমুদ্রের অবক্ষয় মানেই জালে কম মাছ।

তবে আশার আলোও আছে। রামুতে একটি পুনর্ব্যবহার কারখানা কঠিন প্লাস্টিক বর্জ্যকে কাঠ ও নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তর করছে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা সৈকত পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছেন। সুযোগ পেলে সমুদ্র নিজেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

কক্সবাজারের পরিচয় কেবল একটি সৈকতের সঙ্গে নয়; এটি গড়ে উঠেছে একটি মহাসাগরকে ঘিরে। বিশ্ব মহাসাগর দিবসে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরাই কি সেই প্রজন্ম, যারা এই সমুদ্রকে রক্ষা করবে, নাকি সেই প্রজন্ম, যারা নিজেদের বর্জ্যের নিচে তাকে ধীরে ধীরে ডুবে যেতে দেখবে।

উখিয়াঃ অভাব-অনটনের জেরে স্বামীর ‘ছুরিকাঘাতে’ স্ত্রী ‘খুন’

বে ইনসাইট ডেস্ক

অভাব-অনটন আর দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তিন সন্তানের জননীর প্রাণ। কক্সবাজারের উখিয়ায় স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটির পর রক্তাক্ত মরদেহ কাঁধে করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে অভিযুক্ত স্বামীকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পাগলিরবিল এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনার তথ্য জানিয়েছেন উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান।

নিহত পারভীন আক্তার (২৮) হলদিয়াপালং ইউনিয়নের পাতাবাড়ি এলাকার আবদুল গফুরের মেয়ে। অভিযুক্ত স্বামী আবদুল আলম (৩২) পাগলিরবিল এলাকার শামসুল আলমের ছেলে। তিনি পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন।

নিহতের ছোট বোন ইয়াসমিন আক্তার দাবী করেন, গভীর রাতে বাড়ি ফিরে আবদুল আলম ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে ঘুম থেকে উঠে খাবার খাওয়ার সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি পারভীনকে মারধর করেন। পরে পারভীন রাগ করে বাবার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলে পেছন থেকে তার ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করা হয়।

গুরুতর আহত অবস্থায় পারভীনকে কাঁধে করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ অভিযুক্তকে থানায় নিয়ে যায়।

উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান জানান, উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। অভিযুক্ত স্বামী এবং তার মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

নিহতের ভাই সৌদি প্রবাসী কামাল উদ্দিন জানান, দম্পতির সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরিবারে অভাব-অনটন ও পারিবারিক অশান্তি বিরাজ করছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বোরহান উদ্দিন বলেন, পারিবারিক আর্থিক সংকটকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে।

এদিকে উখিয়া থানার ওসি জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের অভাব, অশান্তি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত রূপ নিল ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডিতে। আর সেই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে রইল দম্পতির তিন সন্তান, যারা এক মুহূর্তেই হারাল তাদের মাকে।