বে ইনসাইট রিপোর্ট
এক সময় সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে সেখানে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতার সুযোগে এখন দখল, বন উজাড় ও অবৈধ পর্যটন বাণিজ্যের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়েছে দ্বীপটির অনন্য বাস্তুতন্ত্র।
পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের মুখে বেজার জন্য দেওয়া জমির বরাদ্দ বাতিল করা হলেও প্রায় দুই বছর পরও দ্বীপের পুরো নিয়ন্ত্রণ পায়নি বন বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রশাসনিক অচলাবস্থাই সোনাদিয়ার বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।
সরকার ২০১৯ সালে মাত্র ১ হাজার ১ টাকা সালামিতে সোনাদিয়া দ্বীপের ৯ হাজার ৪৬৭ একর জমি দীর্ঘমেয়াদে বেজাকে বরাদ্দ দেয়। পরিকল্পনা ছিল দ্বীপের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় ইকোট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার। ভারতীয় মাহিন্দ্রা গ্রুপকে যুক্ত করে প্রায় ৫০০ একর এলাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

তবে সরকারের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) তখনই সতর্ক করেছিল, ব্যাপক পর্যটন কার্যক্রম শুরু হলে অতিথি পাখির আবাস, সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়া এবং দ্বীপের নাজুক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হোটেল-মোটেল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ বর্জ্য বৃদ্ধি করে অপূরণীয় পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে পরিবেশবাদীদের আপত্তি ও আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয় বেজার বন্দোবস্ত বাতিল করে জমি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বরাদ্দ বাতিল হলেও সাতটি মৌজার মধ্যে মাত্র তিনটির নিয়ন্ত্রণ আমরা ফিরে পেয়েছি। বাকি অংশ এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো দ্বীপে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।”
তার ভাষায়, “মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বেজার বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত মামলা এখনো চলমান থাকায় প্রক্রিয়াটি শেষ হয়নি। যে এলাকাগুলো আমাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, সেখানেই সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা, বন পোড়ানো ও দখলের ঘটনা ঘটছে।”
তিনি জানান, দক্ষিণ কুতুবজুম ও পানদ্বীপ মৌজায় বন ধ্বংসের ঘটনা সবচেয়ে বেশি।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল প্যারাবন কেটে রিসোর্ট নির্মাণ, চিংড়ি ঘের তৈরি এবং অবৈধ পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।
গত ২ এপ্রিল বন বিভাগ বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের ৩০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে। তাদের দাবি, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এসব মামলা করা হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে।
তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বন বিভাগের মামলায় নাম আসা শেখ কামাল বলেন, “সোনাদিয়া দ্বীপে আমার কোনো রিসোর্ট নেই। আমি প্যারাবনও দখল করিনি।”
অন্যদিকে বিএনপি নেতা জাহেদুল হক নাহিদ বলেন, “জীবনে কোনো দিন সোনাদিয়া দ্বীপে যাইনি। সেখানে আমার রিসোর্ট থাকবে কীভাবে?”
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ জন দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে জমা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “গত মাসে অভিযান চালিয়ে পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫টি অবৈধ রিসোর্ট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় পুলিশ ও নৌবাহিনীসহ শতাধিক সদস্য এতে অংশ নেন।”

‘বাংলাদেশের অন্যতম অক্ষত দ্বীপ’
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দারের মতে, সোনাদিয়া দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি।
তিনি বলেন, “সোনাদিয়া সত্যিকার অর্থে একটি ক্রিটিক্যাল ইকোলজিক্যাল এলাকা। এখানে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী প্রজনন করে, বসবাস করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অন্য অনেক উপকূলীয় এলাকার তুলনায় এখানকার জীববৈচিত্র্য এখনো অনেকটাই অক্ষত।”
তার মতে, দ্বীপটিতে একদিকে বিস্তীর্ণ বালুকাময় সৈকত, অন্যদিকে কর্দমাক্ত উপকূল ও প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের বিরল সমন্বয় রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না।
“এখানে বালিয়াড়ি আছে, কেয়াবন আছে, সাগরলতা আছে। উপকূলের যেসব উদ্ভিদ অনেক জায়গা থেকে হারিয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকটাই এখনো সোনাদিয়ায় টিকে আছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, অপরিকল্পিত পর্যটন চালু করা হলে দ্বীপের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও নাজুক বাস্তুতন্ত্র দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাবে।
“পর্যটন হতে পারে, তবে সেটি অবশ্যই সীমিত পরিসরে এবং পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে। এখন যেভাবে ম্যানগ্রোভ বন কেটে বা পুড়িয়ে চিংড়ি প্রকল্প করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তার মতে, সোনাদিয়া নিয়ে যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার আগে দ্বীপটির পরিবেশগত ধারণক্ষমতা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে সেই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা। বরাদ্দ বাতিলের পরও বেজার কাছ থেকে পুরো জমি বুঝে না পাওয়ায় বন বিভাগ কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আর সেই সুযোগেই প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে সোনাদিয়ার বন, বালিয়াড়ি ও জীববৈচিত্র্য।
