“আমাদেরও দেশ আছে, আমরা দেশছাড়া মানুষ নই”

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের মতো বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারাও স্মরণ করছেন তাদের হারিয়ে যাওয়া দেশ, ভিটেমাটি, স্বজন ও অতীতের জীবনকে। তবে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নতুন করে জানাচ্ছেন নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবি, শরণার্থী নয়, মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চান তারা।

বে ইনসাইটের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে এ কথা বলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মো. জুবায়ের।

তার ভাষায়, বিশ্ব শরণার্থী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি পৃথিবীর সব শরণার্থীর বেদনা, হারিয়ে যাওয়া পরিচয় এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

“এই দিনটি আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় কেন আমরা শরণার্থী হয়েছি। আমরা আমাদের দেশ, সম্পত্তি, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি সবাইকে স্মরণ করি। আমরা কাঁদি। বিশ্বকে বলতে চাই, আমাদেরও দেশ আছে, আমরা দেশছাড়া মানুষ নই,” বলেন তিনি।

মো. জুবায়েরের অভিযোগ, মিয়ানমারে ধারাবাহিক নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণেই রোহিঙ্গারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি বলেন, “২০১৭ সালে এবং পরে ২০২৪ সালেও গণহত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে আমাদের বিতাড়িত করা হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা কখনোই শরণার্থী হতে চাইনি, এখনও চাই না।”

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, এটি স্থায়ী সমাধান নয়।”

রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে মো. জুবায়ের বলেন, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের অভাবের কারণেই প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না।

“বিশ্ব বাংলাদেশকে এমন কোনো সুযোগ বা পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারেনি, যাতে আমরা নিরাপদে আরাকানে ফিরতে পারি। ফলে আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও মর্যাদার সঙ্গে নিজের ভূমিতে ফিরতে পারেনি,” বলেন তিনি।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ক্যাম্প আসলে এক ধরনের কারাগার। অনেক ক্ষেত্রে কারাগারের চেয়েও এখানে অশান্তি বেশি। এখানে শান্তি নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই।”

তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পরিচয়ের প্রশ্ন।

“আমরা বলছি আমরা রোহিঙ্গা। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন জনগোষ্ঠী ও কর্তৃপক্ষ আমাদের ‘বাঙালি’ বলে। এই বিরোধের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। তাই আজও আমরা এই দুরবস্থার মধ্যে আছি,” বলেন তিনি।

আরাকানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মো. জুবায়ের। তার দাবি, সেখানে চলমান সংঘাত ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

“এখনও বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের স্বার্থে খেলা খেলছে। আরাকানের বিভিন্ন এলাকা দখল করা হচ্ছে। আমাদের ফিরে যাওয়ার মতো জায়গাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।

তবে সমাধানের বিষয়ে তিনি একটি বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তার মতে, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরাকানে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল বা সুরক্ষিত আশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটি শরণার্থী শিবির হলেও তারা সেখানে যেতে প্রস্তুত।

“পুরো বিশ্ব যদি আমাদের জন্য আরাকানে একটি নিরাপদ আস্তানা তৈরি করে দেয়, সেটা শরণার্থী শিবির হলেও আমাদের আপত্তি নেই। অন্তত সেটা আমাদের নিজ ভূমির কাছাকাছি হবে। আমরা সেখানে থাকতে রাজি,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন এই রোহিঙ্গা নেতা।

“আমরা বাঙালি জনগণকে আর কষ্ট দিতে চাই না। বাংলাদেশের কোনো প্রান্তিক এলাকায় বছরের পর বছর আটকে থাকতে চাই না। আমরা চাই সম্মানের সঙ্গে নিজের ভূমিতে ফিরে যেতে,” বলেন তিনি।

বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মো. জুবায়ের বলেন, শুধু রোহিঙ্গা সংকট নয়, ভবিষ্যতে যেন পৃথিবীর আর কোনো জনগোষ্ঠী শরণার্থী হতে বাধ্য না হয়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তার ভাষায়, “আমাদের অনুরোধ, বিশ্ব এমন প্রতিজ্ঞা করুক যাতে আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো মানুষ শরণার্থী না হয়। কারণ কেউই শরণার্থী হয়ে জন্মায় না, কেউ শরণার্থী হতে চায় না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *