মাতারবাড়ী এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু উত্তোলন: ‘শত কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ’, হাইকোর্টে রিট

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক (পোর্ট এক্সেস রোড) নির্মাণ প্রকল্পে বালু উত্তোলন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হয়েছে।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন এ রিট আবেদন করেন। আবেদনে মহেশখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং বালুর মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

রিট আবেদন গ্রহণ করে হাইকোর্ট আগামী ২১ জুন শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।

রিটের নথিতে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর ভিত্তিমূল্য বা রয়্যালটি ৬ টাকা ৯৪ পয়সা। তবে ড্রেজিং ব্যয় বাবদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা সমন্বয়ের পর কার্যত প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৩৭ পয়সা।

রিটকারীর দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে প্রকল্পের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তোকিউ-এমআইএল-জেভি’ বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

রিটে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ মোট আটজনকে বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড প্রকল্পে বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব সুবিধা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রিট আবেদনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেন। তবে অনুমোদনের আগে কোনো বিকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়নি এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সম্পন্ন হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া মহেশখালী উপকূল থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র এবং এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও ন্যায্য রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সংবিধান ও আইনের দাবি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।”

তিনি বলেন, রিটে বালু উত্তোলনের অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

সোহানা শারমিনের ভাষ্য, “ড্রেজিং ব্যয় সমন্বয়ের নামে রাষ্ট্রকে প্রতি ঘনফুটে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা রয়্যালটি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকল্পে ব্যবহৃত বালুর জন্য সরকারের কাছ থেকেই তুলনামূলক অনেক বেশি মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এসব কারণেই আদালতের কাছে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।”

তবে রিটে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *