ইনসাইট এক্সপ্লেইন
ব্রাজিলের ৩-০ জয় দেখে অনেক সমর্থকই স্বস্তি পেয়েছেন। মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর হাইতির বিপক্ষে অন্তত দলটি নিজের পরিচিত ছন্দে ফিরেছে। কিন্তু স্কোরলাইন যতটা স্বস্তিদায়ক, ম্যাচের ভেতরের গল্প ততটা একপেশে নয়। বরং এই ম্যাচ ব্রাজিলকে যেমন আশা দেখিয়েছে, তেমনি তাদের সীমাবদ্ধতাগুলোও উন্মুক্ত করেছে।
প্রথমার্ধে ব্রাজিল ছিল কার্যকর। ম্যাথেউস কুনিয়ার দুটি গোল এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটি গোল ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেয়। কিন্তু ম্যাচের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, হাইতি মোট শটে মাত্র একটি শটে পিছিয়ে ছিল (৯-৮), লক্ষ্যভেদী শটেও ব্যবধান ছিল সামান্য (৫-৪)।
এটি দেখায়, ব্রাজিল সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারেনি।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা দলের ক্ষেত্রে শুধু জয় যথেষ্ট নয়; ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় আবিষ্কার: কুনিয়া
এই ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় অর্জন তিন পয়েন্ট নয়, ম্যাথেউস কুনিয়ার পুনর্জন্ম।
মরক্কোর বিপক্ষে ইগর থিয়াগোকে নিয়ে যে পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল, কুনিয়াকে ফিরিয়ে এনে আনচেলত্তি আক্রমণে ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছেন। তিনি শুধু গোল করেননি, ভিনিসিয়ুসের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন, মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগও গড়েছেন।
নেইমারের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা ব্রাজিল অনুভব করছিল, কুনিয়া-ভিনিসিয়ুস-পাকেতা ত্রয়ী অন্তত সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে, এই বিশ্বাস জন্মেছে।
বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে প্রায় সব চ্যাম্পিয়ন দলেরই একটি কার্যকর আক্রমণাত্মক ত্রিভুজ থাকে। ব্রাজিল হয়তো সেই কাঠামোর সন্ধান পেতে শুরু করেছে।
ভিনিসিয়ুস এখন সত্যিকারের নেতা
গত কয়েক বছরে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, নেইমারের পর আক্রমণের নেতৃত্ব কে নেবে?
এই বিশ্বকাপে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
মরক্কো ম্যাচে ভালো খেলার পর হাইতির বিপক্ষেও তিনি ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। গোল করেছেন, সুযোগ তৈরি করেছেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার তিনি একা নন। কুনিয়া ও পাকেতার সহায়তায় তিনি আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
তবে ভিনিসিয়ুসের একটি পুরোনো দুর্বলতা এখনও আছে, অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বল পায়ে রাখা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে।
মাঝমাঠ: ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা
বিশ্বকাপ জয়ের পথে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন সম্ভবত মাঝমাঠ।
লুকাস পাকেতা কিছুটা ছন্দে ফিরেছেন। ব্রুনো গিমারায়েসও দুর্দান্ত খেলছেন। কিন্তু কাসেমিরোকে ঘিরে উদ্বেগ কমেনি।
৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরোকে কয়েকবার সহজে পরাস্ত হতে দেখা গেছে। হাইতির মতো দলের বিপক্ষে এটি বড় সমস্যা মনে না হলেও নকআউট পর্বে স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড কিংবা জার্মানির মতো দলের বিপক্ষে এটি মারাত্মক দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
আধুনিক ফুটবলে মাঝমাঠের গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাসেমিরো সেই গতি ধরে রাখতে পারবেন কি না, সেটি এখনও অমীমাংসিত প্রশ্ন।
রাফিনিয়া সংকট
আরেকটি সমস্যা ডান প্রান্তে।
রাফিনিয়া টানা দুই ম্যাচে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। চোটের প্রভাব স্পষ্ট। তার বদলি রায়ানও এখনও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি।
অর্থাৎ ভিনিসিয়ুসের বিপরীত দিকে ব্রাজিল এখনও একটি নির্ভরযোগ্য আক্রমণভাগ খুঁজছে।
আনচেলত্তি হয়তো সামনে এন্দ্রিক কিংবা লুইস হেনরিকের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মাঝপথে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আদর্শ পরিস্থিতি নয়।
রক্ষণে এখনও অস্বস্তি
স্কোরলাইন বলছে হাইতি গোল করতে পারেনি। কিন্তু ম্যাচ বলছে অন্য গল্প।
হাইতি একাধিক ভালো সুযোগ তৈরি করেছে। আলিসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং কিছুটা ভাগ্য ব্রাজিলকে ক্লিনশিট এনে দিয়েছে।
বিশ্বকাপে বড় দলগুলো সাধারণত দুর্বল প্রতিপক্ষকে এমন সুযোগ দেয় না। ব্রাজিল সেই মানদণ্ডে এখনও পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।
তাহলে ব্রাজিলের পথ কতটা মসৃণ?
গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার সম্ভাবনা এখন বেশ উজ্জ্বল। চার পয়েন্ট নিয়ে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
কিন্তু শিরোপা জয়ের সমীকরণ ভিন্ন।
এই মুহূর্তে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপের প্রধান দাবিদার বলা যাবে না, তবে শক্তিশালী প্রতিযোগী অবশ্যই বলা যায়।
কারণ,
যা আছে:
- ভিনিসিয়ুসের নেতৃত্ব
- কুনিয়ার ফর্ম
- আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা
- ব্রুনো গিমারায়েসের ধারাবাহিকতা
- ম্যাচ জেতার মানসিকতা
যা এখনও নেই:
- স্থিতিশীল মাঝমাঠ
- নির্ভরযোগ্য ডান প্রান্ত
- সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী রক্ষণ
- ৯০ মিনিটের আধিপত্য
- শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পরীক্ষিত কাঠামো
শেষ কথা
হাইতির বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলকে উত্তর দেয়নি, বরং কিছু নতুন প্রশ্নের পাশাপাশি কয়েকটি আশার আলো দেখিয়েছে।
আনচেলত্তি এখন অন্তত জানেন, ভিনিসিয়ুস-কুনিয়া-পাকেতাকে ঘিরে একটি কার্যকর আক্রমণভাগ গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝেছেন যে, কাসেমিরোর গতি, রাফিনিয়ার ফর্ম এবং রক্ষণের দুর্বলতা ঠিক না করলে বিশ্বকাপের শেষ ধাপগুলোতে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
সুতরাং, ব্রাজিল এখনো ট্রফির পথে দৌড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটি মহাসড়কের মসৃণ যাত্রা নয়। বরং সামনে এখনও রয়েছে বেশ কয়েকটি বাঁক, কয়েকটি গর্ত এবং কয়েকটি কঠিন পাহাড়ি পথ। হাইতির বিপক্ষে জয় তাদের পথ দেখিয়েছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।