ইনসাইট রিপোর্ট । কক্সবাজার
কক্সবাজার শহরে কাজে বেরোনো একজন নারীর হঠাৎ শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তিনি কী করবেন?
দ্রুত বাসায় ফিরবেন? কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে অনুমতি চাইবেন? নাকি প্রয়োজন চেপে রেখে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন?
প্রশ্নটা অস্বস্তিকর। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহরের বাস্তবতা অনেকটাই এমন।
এটি শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত অস্বস্তির গল্প নয়।এটি একটি শহরের জনস্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা এবং নাগরিক সেবার বাস্তব চিত্র।
প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এবং কয়েক লাখ স্থানীয় মানুষের চলাচলের এই শহরে পর্যাপ্ত, পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর গণশৌচাগার থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মৌলিক নাগরিক সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ – পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা এখনো অনেকটাই অপরিকল্পিত, অসম্পূর্ণ এবং ইজারানির্ভর।
বে ইনসাইটের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সৈকত এলাকার কিছু টয়লেট ও চেঞ্জিং রুম ব্যবহারযোগ্য থাকলেও অনেক স্থানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কোথাও দরজায় ঝুলছে তালা, আবার কোথাও অবকাঠামো তৈরি হলেও তা এখনো মানুষের কাজে লাগছে না।
সুগন্ধা পয়েন্টের নতুন চেঞ্জিং রুম ও টয়লেট তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকলেও লাবণীসহ অন্যান্য স্থানে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শহরের বড়বাজার এলাকার একটি পাবলিক টয়লেট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। অন্যদিকে আইবিপি মাঠ এলাকায় নতুন টয়লেট নির্মাণ হলেও সেটি এখনো মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।
এই সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।
জান্নাতুল আয়েশা কাজ করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। তিনি বলেন, “কাজে বের হলে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু মাঝপথে শৌচাগারের প্রয়োজন হলে কোথায় যাব, সেটা নিয়েই চিন্তায় থাকতে হয়। সব জায়গায় তো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে ঢুকে শৌচাগার ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় প্রয়োজন থাকলেও চেপে রাখতে হয়।”
পর্যটকদের অভিযোগও একই ধরনের।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন আসাদুল্লাহ রহমান। বার্মিজ মার্কেট এলাকায় এসে তাঁর মেয়ের হঠাত শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানান।
আসাদুল্লাহ রহমান বলেন, দ্রুত হোটেলে ফিরতে যাচ্ছিলাম, তখন পরে গেলাম রাস্তার জ্যামে।
এই পর্যটকের ভাষায়, “বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে আসেন। পাবলিক টয়লেট সবার জন্য প্রয়োজনীয় একটি সেবা। এটা সবসময় চালু ও পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত।”
কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষক ঈপসীতা চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু টয়লেট বানালেই হবে না। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। অনেক জায়গায় ব্যবহারই করা যায় না।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু নাগরিক দুর্ভোগের বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, “পর্যটন এলাকায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর পাবলিক টয়লেট না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করে। এতে শুধু পরিবেশ দূষণই বাড়ে না, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ, কলেরা ও বিভিন্ন ধরনের অন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ সময় শৌচাগার ব্যবহার চেপে রাখার কারণে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে মূত্রনালির সংক্রমণ, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।”
পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের অধীনে থাকা টয়লেটগুলোর একটি অংশ সচল রয়েছে এবং বাকি স্থাপনাগুলো ধাপে ধাপে চালু করার চেষ্টা চলছে।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ বলেন, “কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের টয়লেট ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নাপিতাপুকুরের টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত করে চালু রাখা হয়েছে। বড়বাজারের টয়লেটটি ইজারায় কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটি বন্ধ রয়েছে।
তবে সেটি বন্ধের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাশেই বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য টয়লেট থাকায় অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত এই টয়লেটের ব্যবহারকারী কম। তাই কেউ ইজারাও নিতে চায় না। আর আইবিপি মাঠের টয়লেটের নির্মাণকাজ শেষ হলে দ্রুত চালু করা হবে।”
অন্যদিকে জেলা পরিষদ জানিয়েছে, সৈকত এলাকার লাবণী, সুগন্ধা ও ইনানি পয়েন্টের টয়লেটগুলো ইজারা অথবা খাস আদায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রহমত উল্লাহর ভাষ্য, “পর্যটকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান টয়লেটগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় চলছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই।
একটি মৌলিক নাগরিক সেবা কি ইজারার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে?
আইনজীবী সেজান এহসান প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো ব্যবসায়ী দায়িত্ব নিতে আগ্রহী না হন, তাহলে কি একটি শহরের মানুষ এবং পর্যটকরা সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন?
“কারণ, পাবলিক টয়লেট কোনো ব্যবসা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অবকাঠামো।”
আইনজীবী সেজান এহসান এর মতে, বাস্তবতা হলো, কক্সবাজারে হঠাৎ একজন নারীর শৌচাগারের প্রয়োজন হলে তার সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে দ্রুত বাসা, হোটেল কিংবা পরিচিত কোনো স্থানে ছুটতে হয়।
“এটি শুধু সেবার সংকট নয়। এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অগ্রাধিকারেরও একটি সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।”
তিনি বলেন, কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহর, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি গন্তব্য। অথচ এখানকার পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো টেকসই জনসেবার বদলে নির্ভর করছে ইজারা ব্যবস্থার ওপর। ফলে কোথাও সেবা আছে, কোথাও নেই; কোথাও স্থাপনা আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই।
“একটি শহরের মৌলিক সেবা যদি ইজারাদার পাওয়া-না পাওয়ার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি আর শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়। সেটি নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।”
আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রতিভা দাশ বলেন, কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বমানের শহরের পরিচয় শুরু হয় সবচেয়ে মৌলিক জায়গা থেকে।
প্রতিভা দাশ বলেন, একজন নারী যেন শহরের যেকোনো প্রান্তে দ্বিধাহীনভাবে, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে একটি পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি শহর সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব হয়ে ওঠে।
“কারণ, যে শহর প্রতিদিন লাখো মানুষের আতিথেয়তা করে, সেই শহরে একটি কার্যকর পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়,এটি রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব।”