বে ইনসাইট । ডেস্ক
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা মেটাতে নতুন করে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ ও তার অংশীদার সংস্থাগুলো।
পাশাপাশি সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
বুধবার ঢাকায় জাতিসংঘ ভবনে ২০২৬ সালের হালনাগাদ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) উপস্থাপনকালে এ আহ্বান জানানো হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা, সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে। এতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ জরুরি সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে।
জেআরপি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত তহবিলের মধ্যে খাদ্য সহায়তার জন্য ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, আশ্রয় খাতে ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার, শিক্ষার জন্য ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার, স্বাস্থ্য খাতে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলার এবং জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নে ৩ কোটি ৫১ লাখ ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটে প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি টি. ক্লেমেন্টস, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রানিয়া দাগাশ-কামারা এবং ইউএন উইমেন-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা।
কেলি টি. ক্লেমেন্টস বলেন, “সম্পদ সীমিত হয়ে আসার এই সময়ে শরণার্থীদের দক্ষতা ও সহনশীলতা বাড়ানো আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা স্বনির্ভর হতে পারে এবং ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে পারে।”
রানিয়া দাগাশ-কামারা বলেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছে। দাতাদের অব্যাহত সহায়তা শরণার্থীদের জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে।”
অন্যদিকে নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা বলেন, “তহবিল সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে ক্যাম্পের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করেছে। নারী ও মেয়েরা বাস্তুচ্যুতির ফলে অতিরিক্ত ঝুঁকি ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।”
জাতিসংঘ জানিয়েছে, বর্তমানে ক্যাম্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার পুরোপুরি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ৪২ শতাংশ পরিবারের আয় অস্থায়ী ও অনিশ্চিত উৎসনির্ভর এবং মাত্র ২৩ শতাংশ পরিবার মানবিক কার্যক্রমের আওতায় নগদ অর্থভিত্তিক কাজে যুক্ত হতে পারছে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এ ধরনের নৌযাত্রা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। গত মাসে ২৭০ জনের বেশি যাত্রী বহনকারী একটি নৌকা ডুবে গেলে মাত্র ৯ জন জীবিত উদ্ধার হন।
জেআরপি উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তঃসরকারি সংস্থা বিষয়ক সচিব ও ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মান্যবর এম. ফরহাদুল ইসলাম এবং জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর উপস্থিত ছিলেন। ৫২টি বাংলাদেশি সংস্থাসহ মোট ৯৮টি মানবিক অংশীদার এই পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছে।
জাতিসংঘ পুনর্ব্যক্ত করেছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।