কক্সবাজার । বে ইনসাইট
টেকনাফের ২৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করেন ইয়াসিনতারা। এবারের ঈদে কোরবানি দেওয়ার কথা তাঁর কাছে এখন কল্পনার মতো।
তিনি বলেন, “আগে যখন মাথাপিছু ১২ ডলার করে খাদ্য সহায়তা পেতাম, তখন চাল-ডাল থেকে একটু বাঁচিয়ে মাছ বা মাংস কিনতে পারতাম। এখন ১০ ডলার দিয়ে কিছুই বাঁচে না। গরুর মাংস কেনা সম্ভব না। ঈদের দিন হয়তো একটা ব্রয়লার মুরগি কিনেই উৎসব বলতে হবে।”
ইয়াসিনতারার মতো একই বাস্তবতায় আছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের অধিকাংশ মানুষ। এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমের কাছে এবারের ঈদ সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে কঠিন সময় হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার কোরবানি তো দূরের কথা, পরবর্তী খাবার নিয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
গত এপ্রিল থেকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। আগে সব পরিবার সমানভাবে মাথাপিছু ১২ ডলার পেত। এখন ঝুঁকি ও অসহায়ত্বের মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা ভাগ করা হয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো পাচ্ছে মাথাপিছু ১২ ডলার, মাঝারি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো ১০ ডলার এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো পাচ্ছে মাত্র ৭ ডলার।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “ক্যাম্পের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ আগের ১২ ডলারের কম সহায়তা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবার ১০ ডলার এবং ১৭ শতাংশ পরিবার ৭ ডলার পাচ্ছে। আগের তুলনায় বড় একটি অংশ এখন কম বাজেটে চলতে বাধ্য হচ্ছে।”
মা-বাবা ও চার বোনকে নিয়ে বসবাস করা রেজওয়ান জানান, তাঁদের পরিবার এখন মাথাপিছু ৭ ডলার সহায়তা পায়।
তিনি বলেন, “ঈদ উদযাপন এখন স্বপ্নের মতো। ঈদের আগে কিছু টাকা জোগাড় করতে পারলে হয়তো একটু গরুর মাংস কিনতে পারব, কিন্তু কোরবানি দেওয়া সম্ভব না।”
আগের সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “১২ ডলার পেলে কোনোভাবে সংসার চলত। এখন যা পাই, তাতে ঠিকমতো খাবারই জোটে না। কিছুদিন না খেয়েও থাকতে হয়। এই অসহায় অবস্থা থেকে কবে মুক্তি পাব জানি না।”
ক্যাম্প-২৭ এর মাঝি মো. কালাম বলেন, যাদের বিদেশে আত্মীয়স্বজন আছেন তারা ভাগে কোরবানিতে অংশ নিতে পারছেন। অল্প কিছু সচ্ছল ব্যক্তি আলাদাভাবে গরু কোরবানি দিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ মানুষের জন্য সেটিও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “কখনও কখনও প্রায় ১০০ জন মিলে এক লাখ টাকার একটি গরু কিনে ভাগ করে নেয়। খাদ্য সহায়তা কমার পর এটাই প্রথম ঈদ, তাই মানুষের কষ্ট অনেক বেড়ে গেছে।”
আরআরআরসি কার্যালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন এনজিও সংস্থাও এবার কোরবানির গরু ও মাংস বিতরণের পরিমাণ কমিয়েছে।
তবে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, অন্তত ন্যূনতম পর্যায়ে মাংস বিতরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “প্রায় এক মাস আগে অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় পরিমাণ কম হলেও আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি পরিবারকে অন্তত এক কেজি মাংস পৌঁছে দিতে।”
তিনি জানান, মূলত বিভিন্ন ইসলামিক সংস্থা কোরবানির পশুর ব্যবস্থা করছে।
তবে টেকনাফ এলাকার ক্যাম্পগুলোতে সহায়তা পৌঁছানো কঠিন বলে উল্লেখ করেন আরআরআরসি।
তিনি বলেন, “ওই এলাকায় যাতায়াত খরচ বেশি। ফলে অনেক সংস্থা সেখানে যেতে আগ্রহ দেখায় না।”
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংকট তৈরি হওয়ায় দাতাদের মনোযোগও বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে।
“মানুষের আবেগ বা মনোযোগ সবসময় এক জায়গায় থাকে না। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থাও এখন অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।”
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেন, “ঈদের দিনে সন্তানদের প্লেটে কোরবানির মাংস তুলে দিতে না পেরে অনেক বাবা-মা হতাশায় ভুগছেন।”
তবে জুবায়েরের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত আনন্দের ঈদ হবে তখনই, যেদিন তারা নিজ ভূমি রাখাইনে নিরাপদে ফিরতে পারবে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ অঞ্চল গঠন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এদিকে মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র যখন ঈদ উৎসবের প্রস্তুতি চলছে, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতার গল্প—দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতি, কমে আসা সহায়তা আর টিকে থাকার সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষের নীরব ঈদের গল্প।