আলতাফ পারভেজ
বাংলাদেশে অনেক পত্র-পত্রিকা। জনসংখ্যার তুলনায় বেশি নয়, কিন্তু সক্রিয় পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের তুলনায় কম নয়। বিজ্ঞাপনের বাজারের তুলনায়ও অনেক।
তাছাড়া যেকোন নতুন মিডিয়া হাউস মানেই নতুন এক দল কর্মীর প্রয়োজনীয়তা। নতুন নতুন আইডিয়া। সেরকম কারিগরী জনসম্পদ ও ভাবসম্পদ খুব বেশি নেই এদেশে। অনেক চাকুরিপ্রার্থীর ভিড় আছে বটে, কিন্তু মিডিয়ার কাজ স্রেফ চাকুরি করা তো নয়। ফলে নতুন গণমাধ্যমের আয়োজন মানেই গতানুগতিক কিছু দেখার শঙ্কা। তবে অনেকে এর মাঝেও ব্যতিক্রমী কিছুও করছেন। সেই সূত্রে সামনে, এই জগতে সৃজনশীলতা ও দক্ষতার একটা প্রতিযোগিতাও হবে। সেই দৌড়ে সবাই হয়তো টিকবে না। কেউ কেউ এগিয়ে যাবে, মনযোগ আকর্ষন করবে। পাঠক-শ্রোতা-দর্শকও গুণে এবং পরিমানে পাল্টাবে। আপাতত অবশ্য ভাইরালপণার জোয়ার বইছে, সত্য-মিথ্যার ফারাক করাও বেশ দুরূহ হয়ে যাচ্ছে এবং স্থুলতার জয়-জয়কার চলছে। কবে এই জোয়ারের উপাদান ও ধরন বদলাবে বলা মুশকিল। একসময় নিশ্চয়ই ভোক্তার ক্ষুধা পাল্টাবে। কখন ও কীভাবে সেটা ঘটবে আমরা জানি না।
এরকম প্রত্যাশার মাঝেই জানলাম, কক্সবাজার থেকে একদল সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মী মিলে নতুন গণমাধ্যম গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে ‘কেন্দ্রে’র বেশ দাপট। প্রান্ত এখানে ‘মফস্বল’। কক্সবাজার নিশ্চিতভাবে সেরকম মফস্বল নয়। বহুকারণে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের এই জনপদ আঞ্চলিক এক রাজধানীর মতো। কক্সবাজারের ফরমাল ও ইন-ফরমাল ইকোনমি আয়তনে বিশাল। আমরা হয়তো প্রথাগত হিসাবপত্তরে তার তলদেশ খুঁজেও পাবো না। এর উপত্যকা আন্তর্জাতিক ঠান্ডাযুদ্ধের একটা ছোটখাটো ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে। কক্সবাজারের পাশে আরাকান, চিন, মিজোরামসহ নর্থ-ইস্ট, পার্বত্য চট্টগ্রাম বৈশ্বিক মনযোগে রয়েছে সর্বক্ষণ। এখানকার আলো-হাওয়ায় বহু জাতি আর অনেক ধর্মের মানুষের চাওয়া-পাওয়া-হতাশা-প্রত্যাশার আদান-প্রদান চলছে। সামনের দিনগুলোতে যে প্রক্রিয়া আরও বাড়বে। আসন্ন সে-ই দিনগুলোর চেহারা কীরকম হবে আমরা এখনি তা অনুমান করতে পারবে না, কিন্তু নানান ধরনের রাজনৈতিক ও জাতিগত ঘটনাপ্রবাহ দেখবো আমরা কক্সবাজার ও সন্নিহিত জনপদে।
এরকম একটা জায়গায় গণমাধ্যম বা প্রচার মাধ্যমে দুর্দান্ত কাজ করার সুযোগ আছে। এটা হতে পারে বাংলাদেশের গতানুগতিক মিডিয়া জগতের ব্যতিক্রমী কিছু। যাকে আমরা বলতে পারি প্রকৃত ‘নিউ মিডিয়া’। পরিবেশ থেকে ভূ-রাজনীতি বহু বিষয়ে কক্সবাজারের মিডিয়াকর্মীদের কাজের পরিসর অনেক ব্যাপক এবং গভীর।
এই জেলার যেকোন ‘নিউ মিডিয়া’র দিকে চোখ থাকবে আকিয়াব থেকে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত সবার। একে নজরে রাখবে ভূ-রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলো। পর্যটন ও ব্লু ইকোনমির সূত্রে কক্সাবাজার আঞ্চলিক অর্থনীতিরও এক আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠবে ক্রমাগত। পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ এবং আরাকানিজদের সংগ্রামের বিষয় তো থাকছেই।
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটা নব পর্যায়ের শিশুকাল চলছে এখন। এই সুযোগে দেশে অনেক নতুন মিডিয়া হাউসের জন্ম হচ্ছে। এটা লক্ষণ হিসেবে শুভ। দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্যও মিডিয়ার সহায়ক ভূমিকা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের গুণগতভাবে অগ্রসর কিছু করার দিকে মনযোগ দেয়া দরকার। কক্সবাজার উপকূলে মিডিয়ার জন্য যে বিষয়-বৈচিত্র্য রয়েছে তার সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মেলবন্ধন ঘটলে নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক মানের অনেক কিছু হতে পারে। নতুন সময় ভাবনা ও কাজের নতুনত্বও চাইছে।
বে-ইনসাইটের জন্য শুভ কামনা।