।। রহমান মুফিজ ।।
একটা খোলা জিপে দাঁড়িয়ে হাইলাইট করা লালচে কালো ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছুটে চলেছেন জাফর ইকবাল। চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল। পরনে হাতাকাটা পাতলা কাপড়ের কালো শার্ট। বুকের বোতাম খোলা। কালো সানগ্লাসে চোখ ঢাকা। হাস্যোজ¦ল অপূর্ব জ্যোতির্ময় মুখ। প্রথম পলকে চিনতে পারিনি। পরের পলকে চিনতে পারতেই সেই জিপের পেছনে পেছনে দিলাম ছুট। বেশ কিছুক্ষণ ছুটেছিলাম জিপের পেছনে। আমার মতো আরো কয়েকজন হৈ হৈ করে ছুটতে ছুটতে সম্ভাষণ জানাচ্ছে তাকে। তিনিও পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাত নেড়ে বাতাসে হাসি ছড়িয়ে দিলেন। আর আমাদের সে কী আনন্দ, সে কী উত্তেজনা, সে কী উন্মাদ হৃদয়ের তোলপাড়! আমাদের প্রিয় নায়ক, আমাদের শহরে এভাবে চুল উড়িয়ে ছুটে চলেছেন! যেন বা ছুটে চলেছেন এক জাদুকর! তার সুঘ্রাণ, তার হাসি, তার চুলের রঙ, তার খোলা জিপের চাকার শব্দ, তার পেছনে আনন্দে লুটোপুটি খাওয়া ধূলোÑ পুরো শহরকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে চলে যাচ্ছেন অনন্ত জাদুর দেশে…
নব্বই সালের ডিসেম্বরে, সম্ভবত এরশাদ শাহীর পতন হলো মাত্র। তখনো সবখানে বিজয়ের আনন্দ। গাছের ডালে, ইলেকট্রিকের থামে, উঁচু বাড়ির বেলকনিতে সম্ভবত আসন্ন বিজয় দিবসকে ঘিরে কেউ কেউ পতাকাও উড়াচ্ছিল। যতদূর মনে পড়ে, সেরকম একটা আনন্দ ও উৎসবঘন আবহের মধ্যে একদিন বিকেলে একটা খয়েরি জিপের উপরে চিত্রনায়ক জাফর ইকবালকে দেখে আমি যে অপার্থিব আনন্দের মুহূর্ত আবিষ্কার করেছিলাম, সেটি আমার চোখ থেকে, মগজ থেকে, বুকের কবোষ্ণ কক্ষ থেকে কোনোভাবেই বিস্মৃত হয় না।
সেই যে প্রথম কোনো ফিল্মস্টারকে এমন সামনাসামনি দেখা, সেটা আমার শৈশব-কৈশরের সবচেয়ে উত্তেজনাময় স্মৃতির একটি। আমি যখন সিনেমা সংক্রান্ত কোনো আলাপে প্রবৃত্ত হই, তখনই এই স্মৃতিটাই এমন তড়িৎ গতি নিয়ে হাজির হয় যে, জাফর ইকবালকে দেখার সেই বিরল দৃশ্যটিই আমার সিনেমাভাবনার সদরদরজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমার অবচেতনে মগজের মধ্যে অপার আনন্দময় সেই দৃশ্যটি গেঁথে ছিল বলে কি না জানি না, আমি বড় হয়ে হুট করে একদিন ঘর ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছিলাম, কেবল সিনেমা বানাবো বলে! হতে পারে, জীবনের খুব ছোট কোনো মুহূর্তও হঠাৎ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিতে প্ররোচিত করে। আমি সেই ঝুঁকি নিয়েছিলাম। কিন্তু সিনেমা আমার বানানো হয়নি এখনো। সিনেমা বানাতে এসে ঢাকাতেই কেটে গেছে আঠারো-উনিশ বছর। দুনিয়ার সব কাজ করা হয়েছে, সিনেমা আর বানানো হয়নি। কবে যে সিনেমায় হাত দেবো, সে এরাদাও প্রায় ধূসর হতে চলেছে।
কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু স্বপ্ন ধূসর হয় না। সেই নব্বইয়ের দশকের আমার শহর, আমার প্রিয় জলজোছনাময় জন্মভূমি, আমার স্বপ্নতন্তুতে বোনা কক্সবাজার ধূসর হয় না কখনো। ওটা একটা সিনেমার মতো শহর। ওটা আসলে একটা সিনেমার শহর। ওই একটা শহরেই আমি হেমিংওয়ের বুড়ো সান্তিয়াগোকে পেয়ে যাই, আবার পেয়ে যাই মার্কেজের অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বা একশ বছরের নিঃসঙ্গতার বিচিত্র সব চরিত্রকে।
নব্বইয়ের প্রথমার্ধে আমরা যারা নবকিশোরÑ স্বৈরশাসন বা গণতন্ত্রের কিছুই বুঝি না, তবুও মিছিলে ছুটতাম; আমরা যারা নবকিশোরÑ যৌনানন্দের অনুভূতি কেবল অবয়ব পাচ্ছিল, টিভিতে নায়ক নায়িকাকে জড়িয়ে ধরতে দেখলে লজ্জায় লাল হয়ে উঠতাম, শরীর কাঁপতো; আমরা যারা নবকিশোরÑ সারা দিনমান ক্যানভাচারের মজমার ভিড়ে কামরুক কামাখ্যার গল্প শুনে শিউরে উঠতাম, আর বাদশা মিয়া কবিরাজের কাছ থেকে অচেনা বয়জ্যেষ্ঠদের যৌনশক্তি বর্ধক বড়ি কিনতে দেখে বুকের ভেতর দীর্ঘশ^াস চেপে বিড়বিড় করে বলে উঠতাম, একদিন আমিও বড় হবো!
যদিও আমরা নিজে নিজে বড় হতে পারিনি। আমরা যারা নবকিশোর, অন্য অনেকের মতো আমাদের বালেগ করে তোলার দায়িত্ব স্কন্ধে তুলে নিয়েছিল বাদশা মিয়া কবিরাজের সহকারী, সার্কাসে তাঁবু থেকে পালিয়ে এসে মজমায় খেলা দেখিয়ে বেড়ানো সেই যুবক, নাম যার লাটের পুত কালাইয়াÑ আমাদের কৈশরের আরেক বিস্ময় জাগানিয়া এক্রোবেট। শরীরের খাঁজ থেকে বাজিকরী খেলা আর মুখের ভাঁজ থেকে হাস্যরসের ঝুলি খুলতে খুলতে যে হরণ করে নিতো স্কুল, নাওয়া-খাওয়া, বাড়ি ফেরার জরুরত।
লাটের পুত কালাইয়া ছাড়াও আমাদের বালেগ করে তোলার অনেক অনুসঙ্গ-উপসঙ্গের সঙ্গে একটা রাস্তা আমাদের কৈশরে একদম অনিবার্য নিয়তির মতো আটকে ছিল। তার নাম সিনেমাহল রোড। বড় হতে হতে তার নাম রূপান্তরিত হলো বঙ্গবন্ধু সড়কে। এ এক বিস্ময়কর সড়ক। একমাত্র এই সড়কেই পাওয়া যেতো সেই সময়কার চমক জাগানিয়া আর উত্তেজনাপূর্ণ সব ভিউকার্ড ও পোস্টার। কার ছবি মিলত না সেখানে? দুনিয়ার তাবড় তাবড় তারকারা সেখানে ঝুলে থাকতো, টেবিলে পড়ে থাকতো, তাকের মধ্যে ওঁৎ পেতে থাকতো আমরা পকেটের পয়সা খসিয়ে তাদের কিনে নেব বলে। এই সড়কেই মিলতো রসময়গুপ্ত, গুপ্তবাবুর পরের জেনারেশনের বিপুল সাহিত্য। এই সড়কেই গুরু আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, তপন চৌধুরীর নতুন গানের ক্যাসেট, এই সড়কেই পকেটমারের কবলে পড়া, এই সড়কেই ষোড়ষীর হৃদি-প্রেমোদ্যাম নবগণিকার লাস্যভঙ্গির কাছে হার মানা।
এই সড়ক কী ঐশ^র্যময়, তা জানে কেবল আশির হৃদয়, নব্বইয়ের বুক।
সড়কটির প্রবেশমুখেই লালদীঘি, পাবলিক লাইব্রেরি, কোর্টবিল্ডিং এলাকা। সড়কটির শেষ প্রান্তে টকি হাউজ সিনেমাহল, সড়কটির শেষপ্রান্তে বাঁকখালী নদী। আমাদের এই শহরে, আমাদের বালেগ হওয়ার সময়ে, আমাদের আনন্দ-আনজাম ছিল মূলত এইসব রাস্তাÑ সিনেমাহল রোড, লাল দীঘির পাড়, পাবলিক লাইব্রেরি, কোর্টবিল্ডিং এলাকা, বাঁকখালী নদী, কস্তুরাঘাট, মাঝির ঘাট, লাবনীর চর, ঝিনুক মার্কেট সিবিচের মতো জায়গাগুলো। এখানেই জীবনের প্রথমার্ধের বিপুল বিস্ময় এমনভাবে তড়পাতো যে, এখন ভাবতে গেলেই মনে হয়, ওই দশকে ওই শহরের অলিতে-গলিতে জাদুকরের মতো হাঁটাহাঁটি করতো বিচিত্র সব চরিত্র।
তো, সে জাদুর শহরে সবচেয়ে বড় জাদুর ঘর ছিল টকি হাউজ সিনেমা হল। এই সিনেমা হল মূলত একটা সভ্যতার স্বাক্ষর। একটা শহরের গড়ে ওঠা ও ধ্বংস হওয়ার স্মৃতিবাহী এক নামখ-Ñ যেটি আজ নিশ্চিহ্ন বলা চলে। আমরা টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে এখানে সিনেমা দেখতে যেতাম। রাঙ্গা ভাবী, সত্যমিথ্যা, বেদের মেয়ে জোছনা, সুজনসখি, ভেজা চোখ, ডিসকো ডান্সার, টপ রঙবাজ, মরণের পরে, যতদূর মনে পড়ে এই হলে দেখেছিলাম। টকি হাউজ সিনেমা হলে একদম টাটকা ছবি খুব কমই আসতো। মাস দুয়েক বা তারও বেশি পুরনো হয়ে যাওয়া ছবিই বেশি আসতো। প্রায় প্রতি পক্ষেই পর্দায় নতুন ছবি লাগতো। নতুন ছবি আসলেই শহরজুড়ে মাইক নামিয়ে ঘোষণা হতোÑ হ্যাঁ ভাই… টকি হাউজ সিনেমাহলের রূপালি পর্দায়… চলিতেছে… । ভরাট ও নাটুকে গলায়, এমন ঢলে ঢলে, কায়দা করে, রসিয়ে রসিয়ে সিনেমা ও কলাকুশলীদের নাম বলা হতো যে, সে সিনেমা না দেখলে মানবজীবনই বৃথা। আমরা মাইকের পেছনে ছুটে ছুটে সিনেমার লিফলেট কুঁড়াতাম আর দুষ্টু ছেলেরা দলবেঁধে ঘোষকের কণ্ঠ নকল করে হেসে কুটি কুটি হতামÑ হ্যাঁ ভাই… চলিতেছে…টকি হাউজ সিনেমা হলের রূপালি পর্দায়…।
টকি হাউজ মূলত আমাদের শহরের একটা উৎসবের নাম। আমার মনে আছে, টকি হাউজের কারণে আমাদের শহরে কখনো রাত নামতো না। আমাদের শহর মানে তো ওই লাল দীঘির পাড়, সিনেমাহল রোড, কস্তুরাঘাট এলাকাটাই। টকি হাউজের কারণেই মূলত এ শহর জেগে থাকতো সবসময়। সারা শহর নিরব ও অন্ধকার, কিন্তু সিনেমাহল রোড থাকতো জমজমাট। নব্বই দশকের শেষ দিকে, ধীরে ধীরে মøান হতে শুরু করে টকি হাউজের জৌলুস। নিয়মিত রাত নামতে নামতে অন্ধকার ও নিরব হয়ে আসতে শুরু করে রাস্তাটি। কোত্থেকে কী যেন হয়ে গেল, বাংলাদেশের সিনেমার বাজার এমনভাবে পড়তে শুরু করে যে, সেটাকে আর কেউ টেনে তুলতে পারলো না। আশি-নব্বইয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হতো বছরে গড়ে একশটির মতো। আর তা বর্তমানে এসে ঠেকেছে গড় চল্লিশে। ওই সময় সারাদেশে সিনেমা হল ছিল অন্তত দেড় হাজারের মতো। আর এখন সারাদেশে সিনেমা হল সচল থাকে মাত্র ৬০ থেকে ৬০টি।
সেই ষাটের দশকে নির্মিত হওয়া টকি হাউজ সিনেমা হল, যার জৌলুসে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল কক্সবাজার শহর, সেটি এখন আর নেই। বন্ধ হয়ে আছে প্রায় ২৫ বছর। নব্বই দশকে শহরতলীর ঝিলংজায় নির্মিত হয়েছিল বিডিআর হল (অধুনা বিজিবি হল) এবং বাজারঘাটার দিগন্ত সিনেমা হল। সেই দুটি হলও নাকি বন্ধ হয়ে গেছে, শুনলাম।
আমাদের জাদুর শহরে, সিনেমার মতো এ প্রাচীণ জনপদে আমরা তো দেশখ্যাত সব ফিল্ম স্টারদের শ্যুটিং দেখে দেখে বড় হয়েছি। চলচ্চিত্রের এমন কোনো তারকা ছিল না, হর হপ্তায় যাদের পা পড়তো না এই শহরে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবাগান, কাটা পাহাড়, কলাতলি, বড়ছড়া ও হিমছড়ির নানা স্পটে জনারণ্যে ভিড় ঠেলে শ্যুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তো আমাদের হাজার সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
নায়করাজ রাজ্জাক, ববিতা, আলমগীর, শাবানা, রোজিনা, চম্পা, সুচরিতা, রুবেল, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, দিতি, মৌসুমী, সালমান শাহ, শাবনুর, শাবনাজ, শাহনাজ, তামান্না, পপি, অমিত হাসান, আমিন খান, জাহাঙ্গীর, আলেকজান্ডার বো, হুমায়ুন ফরিদি, এটিএম শামসুজ্জামান, রাজীব, জাম্বু, দিলদার, টেলিসামাদ প্রমুখ সিনেমা তারকাদের শ্যুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তো আমার একার ঝুলিতেই প্রচুর। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে তাদের ছবিই দেখতে যেতাম টকি হাউজ সিনেমা হলের পর্দায়।
কিন্তু সেই সিনেমার শহরের আজ কী দশা? একটিও সিনেমা হল নেই! অথচ শহরের কী শনৈ শনৈ উন্নতি ঘটেছে। কত কত মেগা প্রজেক্টে ভারি হয়ে উঠেছে তার ভূমি। উন্নয়নের তোপে রীতিমতো গঠন করতে হয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু “পর্যটন শহর” বলে তার যে গালভরা পরিচয়, সে পরিচয়ের প্রতিও কোনো সুবিচার হলো না।
অথচ সমুদ্র-নদী-পাহাড়ের এ শহর পৃথিবীতে ঘোষণা করতে পারতো তার ঐশ^র্যের কথা। সারা পৃথিবীকে আহ্বান করতে পারতো তার কীর্তি দিয়ে, তার চলমানতা দিয়ে। কিন্তু এ শহরকে স্থবির করে রাখা হয়েছে। যে শহরে ‘টকি হাউজ সিনেমা হল’ বন্ধ হয়ে যায় সে শহর স্থবির নয় তো কী? যে শহরে কিশোর-কিশোরীদের বালেগ করে তোলার মতো রাস্তা থাকে না, দোকান থাকে না, প্রতিষ্ঠান থাকে না, পার্ক থাকে না, সে শহরের মানুষেরা বড় হতে পারে, সে আমি বিশ^াসই করি না। সে শহরের মানুষ স্রেফ শিশুতোষ চৈতন্যের মধ্যে খাবি খায় আর শিশুতোষ জ্ঞানের ক্ষুদ্রতা দিয়েই পৃথিবীকে মাপে। এ তো মধ্যযুগের চেয়েও ভয়ংকর!
কিন্তু কাউকে এই প্রশ্ন করতে দেখলাম নাÑ এ শহরকে স্থবির করে রেখে কার লাভ?
এ শহরকে একটা বিশ^জনীন ও বিশ^মননের সাংস্কৃতিক নগরীতে পরিণত করার লড়াই আমরা করে গেছি বহুদিন। এখনো সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। সমুদ্র তীরবর্তী এ জনপদের ইতিহাসের দিকে তাকালে আপনি এর ঐশ^র্যের কাছে জানু পেতে বসবেন। আপনি এর প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকবেন। আপনি যদি একবার এর গৌরবকে অনুভব করতে পারেন তাহলে আপনিই অস্থির হয়ে উঠবেন সে গৌরবকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে।
একসময় নিয়মিত এ শহরে সার্কাসের দল আসতো। এক সময় কস্তুরাঘাটে ভিড়তো বড় বড় বৈদেশি জাহাজ। পৃথিবীর নামকরা পরিব্রাজকদের পা পড়তো এখানে। সারা পৃথিবীকে উদার বুক নিয়ে আমরা সম্ভাষণ জানাতাম। কিন্তু আমরা এমন কৃপণ হয়ে উঠলাম যে, নিজের শহরেরই সব অলঙ্কার একে একে কেড়ে নিয়েছি।
অথচ এই শহরে গড়ে ওঠার কথা ছিল, বিশ্বমানের ফিল্ম সিটি। এই শহরে থাকার কথা ছিল অন্তত ১০টা থিয়েটার, যেখানে দেশি-বিদেশি সিনেমা প্রদর্শিত হতো। থাকার কথা ছিল বিশ্বমানের আর্ট ইনস্টিটিউট, আর্ট ক্লাবÑ যেখানে দেশিবিদেশি শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নিতো, তাদের ছবি ও আর্টওয়ার্ক প্রদর্শিত হতো। সমৃদ্ধ সমুদ্র জাদুঘর, একাধিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নাট্যদল, স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। লাইব্রেরি থাকার কথা ছিল কয়েকটা। নাইট ক্লাব, সার্কাসের দল থাকার কথা ছিল। নগরকীর্তনের মতো ভ্রাম্যমান অর্কেস্ট্রাদলের ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর কথা ছিল শহরের সর্বত্র। এ শহরে প্রবেশ করলেই মনে হতো, আপনি একটা অনন্ত উৎসবের দেশে চলে এসেছেন। উৎসবের কায়কেওস থেকে কারও দূরে যেতে ইচ্ছে হলেই তিনি আবার ডুব দিতে পারতেন হিমছড়ির পাহাড় বা অজ্ঞমেধা ক্যাংয়ের গাঢ় নিরবতার মধ্যেও।
এ কেবল সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের আকাক্সক্ষা নয়, একইসঙ্গে বিপুল অর্থনৈতিক বন্দোবস্তেরও আকাঙ্ক্ষা। বিশ্বের বুকে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার মতো, বিশ^কে আহ্বান করার মতো একটা শহর গড়ে তোলার কালেক্টিভ স্বপ্নও বলা চলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, আমরা কেবল সেই স্বপ্নটা দেখে চলেছি। আমাদের আগের প্রজন্ম দেখেছে, এখন আমরা দেখছি, এরপর আমাদের পরের প্রজন্মও একই আকাক্সক্ষা বুকে নিয়ে বড় হবে। কিন্তু কক্সবাজার শহরের উন্নয়নের গুরুদায় যারা স্কন্ধে তুলে নিয়েছেন, তাদের চিন্তায় কী এর সামান্যও নড়াচড়া করে?
করলে তো ভাল, লড়াইটা একসঙ্গে করা যাবে। আর না করলে, একটা টকি হাউজ সিনেমা হলের মর্তবা বোঝাতে হয়তো দ্রুতই আয়োজন করতে হবে একটা গুরুতর পঞ্চায়েত বৈঠক বা একটা জমকালো সেমিনার। (লেখাটি সংক্ষেপিত) #