কক্সবাজারে ছাত্রদল কমিটি নিয়ে বিতর্ক: সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে, এখন আসে ‘বিমানে চড়ে’

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটি ঘোষণা ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর কেন্দ্র থেকে সরাসরি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও কাউন্সিল না হওয়া, পদবণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব এবং তৃণমূলের কর্মীদের বঞ্চনার অভিযোগে সংগঠনটির ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই বছর ধরে কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের কোনো কার্যকর কমিটি ছিল না। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হঠাৎ করেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছয় সদস্যের একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করে। তবে কমিটি ঘোষণার আগে কোনো কাউন্সিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় সংগঠনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।

পদবণ্টন নিয়ে ক্ষোভ, সড়কে বিক্ষোভ

ঘোষিত কমিটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের দাবি, তৃণমূলের মতামত নেওয়া হয়নি, দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় কর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি এবং গ্রুপভিত্তিক বিবেচনায় পদ দেওয়া হয়েছে।

কমিটি ঘোষণার পরপরই কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। শহরের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়, এতে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী জানান, কক্সবাজার ছাত্রদলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই গ্রুপিং বা অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে। নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেছে- ‘আমি নিরুপায়’

পদবঞ্চিত নেতা মিজানুল আলম বলেন, “ফাহিম সাবেক কমিটিতে আমার সহযোদ্ধা ছিলো। সে আসতে পারলে আমি কেনো আসতে পারবো না। সে তো আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তাঁর বয়স এখন ৪১/৪২। আমার বয়স ৩৬। যদি কক্সবাজারের জেলা ছাত্র দলের আওতাধীন আমাদের যে ২৭ টি ইউনিট আছে, সেখান থেকে সুপার ৪ বা সুপার ৫ করা হয়, সেখানে আমি সভাপতি হবো।

তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রীয় ছাত্র দলের সভাপতি আমার ফোন রিসিভ করে ক্ষমা চেয়েছে, সে আমাকে বলেছে- ‘আমি নিরুপায়, আমার কোনো উপায় ছিলো না, আমি নিরুপায়, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি পারি নাই, আমার হাত-পা বাঁধা’ সেরকম বলেছিলো। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ভাই কথা বলেছেন, সেক্রেটারি ফোন ধরে নি। ওনি বলেছেন, ‘আমরা অসহায়, আমরা নিরুপায়। আমাদেরকে উপর থেকে যেভাবে বলে দেওয়া হয়েছে ওভাবে দেওয়া হয়েছে।’”

কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কথা বলছেন নতুন সভাপতি

জেলা ছাত্রদলের নবনির্বাচিত কমিটি কতোতম জানতে চাইলে সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, “এখন সঠিক বলতে পারবোনা। আপনাকে পরে জানাচ্ছি।”

কাউন্সিল না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় কমিটি একযোগে এই কমিটি ঘোষনা করেছে, এগুলো কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত। তাই এই প্রশ্ন তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে।”

পদবঞ্চিতদের প্রতিবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পদ শুধু দুইটি, কিন্তু যোগ্য প্রার্থী তো অনেক। সেখান থেকে বাছাই করতে হয়। তাই সবাইকে তো দেয়া সম্ভব না। যারা জেলা কমিটির পদ পায়নি, তারা যোগ্য হলে অবশ্যই কলেজ কমিটি আছে, শহর কমিটি আছে, উপজেলা কমিটি আছে, সেখানে আসবে।”

পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যোগ্য ও নিয়মিত ছাত্রদের মাধ্যমে কমিটি পূর্ণা করা হবে।”

‘বিমানে চড়ে এসে শোভাযাত্রা’, সমালোচনা সাবেক নেতার

জেলা ছাত্রদলের সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমাদের সময় এমন রেওয়াজ ছিলোনা। বিমানে চড়ে এসে মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা করা ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্য নয়। কক্সবাজারে এই রেওয়াজ শুরু হয় ২০১২ সালের দিকে কাউন্সিল ছাড়া ছাত্রলীগের কমিটি হলে, তখন সভাপতি সেক্রেটারি ঢাকা থেকে বিমানে চড়ে এসে এখানে বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনা নেয়া শুরু হয়।”

সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ’৯৩ সালে

ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা কমিটির সর্বশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব আসে ১৯৯৩ সালে। ওই কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন আকতার চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হন বদরুল হুদা সিদ্দিকী। এরপর দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জেলা ছাত্রদলের আর কোনো নির্বাচিত কমিটি হয়নি।

বর্তমানে কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওই সময়ের সভাপতি আকতার চৌধুরী। সাম্প্রতিক কমিটি গঠন ও কাউন্সিলবিহীন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রবণতা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছে বে ইনসাইট।

তিনি বলেন, “এটা তো আসলে সাংগঠনিক বিধিমালার ভিত্তিতে চলে। অ্যাট দ্যাট টাইম আমাদের সময়কালে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছি প্রত্যক্ষ ভোটে। এরপর থেকে সাংগঠনিক বিধিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে যেহেতু নির্বাচন কেন্দ্রিক যারা এমপি ক্যান্ডিডেট থাকেন তাদের কতগুলো কনস্টিটিউয়েন্সি থাকে, এটার উপরে নির্বাচন সহযোগিতার কারণে সাংগঠনিক ছাত্রদলকে ওভাবে সাজানো হয়েছে। পরবর্তীতে যতটুকু দেখলাম আর কি… এরপর থেকে দেখলাম যে টোটালি সেন্ট্রালের উপর চলে গেছে, স্থানীয় প্রতি নির্বাচনের পদ্ধতি কিছু রাখে নাই।”

বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটি নির্ধারণের বিষয়টি কেমন দেখেন—এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি সমালোচনা না করে বলেন, “আমিও তো একজন সংগঠনের কর্মী, মূল দলের এখন সাংগঠন যেগুলি আছে সাধারণত এটা আমাদের সহযোগী সংগঠন হিসেবে তাদেরকে ব্যক্তিবদ্ধভাবে সেন্ট্রালি এখন করে এটা।”

এই প্রবণতা সংগঠনের ভেতরে কোন্দল বাড়াচ্ছে কি না—এ বিষয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেন, “আমি আসলে এই বিষয়ে সরাসরি কিছু এভাবে বলতে চাচ্ছি না। যেহেতু দীর্ঘকালীন একটা ফ্যাসিজমের ভিতরে সাংগঠনিক যে মানে কাজগুলো করার কথা ছিল সেভাবে করতে পারে নাই বলে, আমার কাছে মনে হয়েছে যে তারা সাংগঠনিকভাবে যে বিধিতে সংগঠনকে বোঝানোর কথা সে সুযোগটা তারা পায় নাই। সেটা বিএনপির ক্ষেত্রে হতে পারে, যুবদলের ক্ষেত্রে হতে পারে। তারপরে ছাত্রদল তো সেম একটি অবস্থায় ছিল।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার হলে সংগঠনগুলো আবার নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরবে।

“তো এখন যেহেতু একটা গণতান্ত্রিক সরকার দেশে প্রতিষ্ঠিত। তো বিএনপিও গণতন্ত্রের চর্চাটা আগের যে বিধি সে অনুসারে করবে এবং অঙ্গ সংগঠনগুলো সেভাবে চলবে। সহযোগী সংগঠন সেভাবে চলবে। এটাই আশা করছি। যেহেতু এখন গণতন্ত্র চর্চার একটা সুযোগ হয়েছে। আগে সুযোগ ছিল না।”

নিজের নেতৃত্বকাল প্রসঙ্গে আকতার চৌধুরী বলেন, “আমি প্রথমে ৯০ সালে আহ্বায়ক হয়েছি। আবার নির্বাচনের মাধ্যমে আমি জেলা ছাত্রদল সভাপতি হয়েছি। একবার ৯১ সালে আরেকবার ৯৩ সালে।”

‘ইলেকশন নয়, সিলেকশন’

জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাশেদুল হক রাসেল বলেন, “সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিলো ৭ম কমিটির। সেটি সীগাল হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাও ইলেকশন নয় সিলেকশন হয়েছিলো। ওইসময় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলো সৈয়দ আহমদ উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলো হাবিব উল্লাহ।”

সংকটের নতুন রূপ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংগঠনগুলোর কমিটি গঠন নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়। কাউন্সিলবিহীন কমিটি, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক বলেন, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার কথা বলা হলেও, তাতে বিরোধ কমবে নাকি আরও বাড়বে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *