সৌরভ দেব | বে ইনসাইট
কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল থেকে অবৈধভাবে নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় উদ্ধার হয় ৯ জন। এরমধ্যে ৬ বাংলাদেশিকে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা করে কোস্টগার্ড। বাকি তিনজন রোহিঙ্গাকে ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের ভাষ্যে, অভিযুক্তদের মধ্যে অন্তত চারজনকে তারা ট্রলারের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখেছেন, অন্য দুই বাংলাদেশিকে তারা নিজেদের মতোই ভুক্তভোগী যাত্রী বলে দাবি করেছেন।
এদিকে এই ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা। যাদের কোনো তালিকাই এখনো প্রশাসনের হাতে নেই। মামলা হয়নি কোনো ভুক্তভোগী পরিবার থেকেও।
ভুক্তভোগীদের বয়ান: ‘মাঝি, ড্রাইভার, দালালসহ উদ্ধার চারজনকে দেখেছি’
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ছয় বাংলাদেশিই পাচারচক্রের সদস্য। ওই ছয়জন হলেন, কক্সবাজার সদর উপজেলার মো হামিদ ও মো আকবর, টেকনাফের বাহারছড়ার মো তোফায়েল, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সৈয়দ আলম, টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের মো সোহান উদ্দিন, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মহিউদ্দিন হৃদয়।
বে ইনসাইটের সঙ্গে কথা বলা দুই রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী তারমধ্যে চারজনকে সরাসরি যুক্ত থাকার চিত্র তুলে ধরেন।
উদ্ধার হওয়া কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “মো. হামিদ আর মো. ছৈয়দ আলম ছিল ট্রলারটির মাঝি, মহিউদ্দিন হৃদয় ইঞ্জিন চালাত আর আকবর ছিল দালাল। বাকি দুইজনকে আমরা যাত্রী হিসেবেই দেখেছি।”
তিনি অভিযোগ করেন, দালাল আকবর যাত্রীদের ওপর নির্যাতন চালাতেন।
“আমি এক গ্লাস পানি চাইলে সে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। সবচেয়ে বেশি মারধর করেছে সে-ই।”
একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন ১ নম্বর ক্যাম্পের এনাম উল্লাহ ইমরানও। তিনিও এই যাত্রায় ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিলেন।
পুলিশের অবস্থান: ‘কোস্টগার্ডের তদন্তে ছয়জনই জড়িত’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, টেকনাফ থানার উপ-পরিদর্শক সনজীব কান্তি নাথ বলেন,
“কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। তাদের তদন্তে ছয়জনেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আমরা রিমান্ড চাইব, এরপর বিস্তারিত বলা যাবে।”
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন, উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে কারাগারে আছেন।
পাচারের নেটওয়ার্ক: ক্যাম্প থেকে গ্রাম বিস্তৃত চক্রের ইঙ্গিত
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালদের মাধ্যমে যাত্রী সংগ্রহ করে ওই ট্রলারে তোলা হয়েছিল।
রফিকুল ইসলামের দাবি, ৬ নম্বর ক্যাম্পের সি ব্লকের মাহ নূর নামের এক দালাল তাকে “টেকনাফ বন্দরে কাজ” দেওয়ার কথা বলে ট্রলারে তোলে। পরে পরিবারের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নেয়। ট্রলারডুবির খবর ছড়াতেই ওই দালাল পালিয়ে যায়।
রামুর কচ্ছপিয়া দক্ষিণ পাড়া ওই ট্রলারে গিয়ে নিখোঁজ আছে ৪ যুবক। তাদেরই একজন মিজবাউল হকের পরিবার জানায়, স্থানীয় আবদুল হামিদ ১ এপ্রিল সকাল ১১টায় তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান।
তার বাবা মোজাম্মেল হক বলেন, “পরে ভয়েস মেসেজে জানায়, সে মালয়েশিয়া যাচ্ছে। হামিদ বলেছিল সে টেকনাফ পর্যন্ত পাঠিয়েছে। ফিরিয়ে আনতে চাইলে ৭০ হাজার টাকা চায়, আর মালয়েশিয়া পৌঁছালে আরও ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।”
মোজাম্মেল হক জানান, ওই ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা একই এলাকার ফারুকের স্ত্রী মুমেনা আক্তারকে দিলেই হয়ে যাবে। মুমেনা আক্তারের ভাই মো আলম দালাল হিসেবে পরিচিত।
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর অভিযুক্ত আবদুল হামিদ ১২ এপ্রিল দেশ ছেড়ে দুবাই চলে গেছেন।
শহরের ‘মাঝি’ও সন্দেহের তালিকায়
কক্সবাজার শহরের ফদনার ডেইল এলাকা থেকে যাওয়া ৬ জনের একজন মো. হামিদ। যিনি উদ্ধার হলেও পাচারের অভিযোগে আটক এবং মামলার এক নম্বর আসামী।
তার ভাই মো. জুবায়ের বলেন, “হামিদ মাছ ধরার ট্রলারে কাজ করে। কাউকে না জানিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। এই যাত্রায় একসাথে যাওয়া তাদের আরেক ছোটো ভাই ইব্রাহিম এখনো নিখোঁজ।”
তবে বে ইনসাইট কথা বলেছে ফদনার ডেইলের অনেক স্থানীয়দের সাথে। কেউ কেউ বলছেন, হামিদের মাধ্যমেই অন্যদের যাওয়া হতে পারে এবং তিনি আগে থেকেই এমন ট্রলারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক মুদি দোকানদার বলেন, এটা ছিলো হামিদের ৬ষ্ঠ মালয়েশিয়া যাত্রা। তার আপন ভাইও যাচ্ছে বলে আরো ৪জনকে সাথে নিয়েছিলো হামিদ। এর আগে আরো ৫ বার যাওয়ায় বাকিরা তাকে বিশ্বাস করেছিলো।
আটক মো. আকবরের স্ত্রী দাবি করেন, “সে গত ২-৩ বছর ধরে টমটম চালায়। বন্ধুদের প্রলোভনে পড়ে চলে গেছে। না যাওয়া নিয়ে অনেক ঝগড়া হয়েছে। সে এর আগে মাছের ট্রলারে কাজ করতো।”
নারী ভুক্তভোগীর করুণ গল্প
ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ১৫ নম্বর ক্যাম্পের রাহেলা বেগমের সাথে যোগাযোগ করা না গেলেও তার বোন সেনোয়ারা বেগম জানান, “রাহেলার বিয়ে হয়েছে ৫ বছর। সন্তান না হওয়ায় স্বামীর বাড়িতে নির্যাতন চলছিল। বেশ কয়েকবার বাপের বাড়িও চলে আসছিলো। একদিন শুনি সে সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে।”
“ভালো কাজের প্রলোভনে দালালরা তাকে মালয়েশিয়া নিতে যাচ্ছিল।”
প্রশাসনের কাছে নিখোঁজের তালিকা নেই
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আন্দামান সাগরে নিখোঁজদের ঘটনায় প্রশাসন প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে।
মুঠোফোনে তিনি বলেন, “আমরা যতটুকু তথ্য পেয়েছি, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।”
প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ থাকার বিষয়ে কোনো তালিকা প্রশাসনের কাছে আছে কি না—এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, “এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা এখনো আমরা পাইনি।”
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বা উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পক্ষ থেকেও এখনো পরিষ্কারভাবে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বা তথ্য প্রদান করা হয়নি।
“যাদের উদ্ধারের কথা বলা হচ্ছে, তারাও বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে না। আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি,” বলেন তিনি।
পুলিশ: ‘পাচারকারীদের নির্দিষ্ট তালিকা নেই’
কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে কোনো মামলা হয়নি।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পরামর্শে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো সাইফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “পাচারের ২৫০ জন নিখোঁজের বিষয়ে কোনো মামলা হয়নি।”
ওসি জানান, একটি জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে লোকজন স্থানান্তরের ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড থানায় মামলা করে।
“কোস্টগার্ড ছয়জনের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে মামলা দিয়েছেন,” বলেন তিনি।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে জানিয়ে ওসি বলেন, “নয়জনকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছয়জনকে আসামি করে মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে আটক করা হয়েছে, তারা জেলে আছে।”
টেকনাফ এলাকায় মানবপাচারকারীদের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা পুলিশের কাছে আছে কিনা এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, “মানব পাচারকারীদের নির্দিষ্ট কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই। তবে যারা এসবের সাথে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচার সংক্রান্ত মামলার পরিসংখ্যান জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলো আপনাকে ওভাবে দেওয়া যাবে না, তবে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।”
অনিশ্চয়তা ও হতাশা ‘স্বেচ্ছা পাচারের’ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
রোহিঙ্গাদের পাচারের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বাস্তুচ্যুত ও রাষ্ট্রহীন অবস্থার কারণে তাদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
“ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, নিজ দেশে যুদ্ধ ও বৈরী পরিস্থিতি রয়েছে, আবার ক্যাম্পের জীবনও খুব অনুকূল নয়, সব মিলিয়ে তারা হতাশায় ভুগছে,” বলেন তিনি।
তার মতে, এই ‘হোপলেসনেস’ ও ‘ড্রিমলেসনেস’ অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় প্রলুব্ধ করছে।
“তারা মনে করে সাগরের ওপারে হয়তো ভালো জীবন অপেক্ষা করছে। ফলে কাঠের নৌকায় করেও তারা বিপজ্জনক যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা স্বজনদের সহায়তা নেয়, আবার স্থানীয়ভাবে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে,” যোগ করেন তিনি।
তিনি এটিকে এক ধরনের “স্বেচ্ছায় ট্রাফিকিং” বলেও উল্লেখ করেন।
নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব
রোহিঙ্গাদের মধ্যে ঠিক কতজন মানবপাচারের শিকার হয়েছেন, এমন নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন বলেও জানান শরণার্থী কমিশনার মিজানুর রহমান।
“যারা ট্রাফিক হয়ে সফলভাবে চলে যায়, তাদের তথ্য পাওয়া যায় না। সাধারণত কোনো নৌকাডুবি, উদ্ধার অভিযান বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মাধ্যমে কিছু তথ্য জানা যায়,” বলেন তিনি।
তার মতে, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী বা বিজিবি কাউকে উদ্ধার করলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তখনই জানা সম্ভব হয় যে তারা পাচারের শিকার ছিল বা পাচারের পথে ছিল।
এক ট্রলারে প্রায় ২৮০ জন
বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা মো. রফিকুল ইসলামের ভাষ্যে, ডুবে যাওয়া ট্রলারটিতে প্রায় ২৮০ জন মানুষ ছিলেন। এর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন পাচারকারী ও নৌকার স্টাফ, ২১ জন রোহিঙ্গা নারী এবং চারজন শিশু। প্রায় দেড়শ জন রোহিঙ্গা এবং বাকিরা বাংলাদেশি নাগরিক। সবাই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হয়েছিলেন।
‘মৃত্যুকূপে’ পরিণত কুঠুরি
রফিকুল জানান, ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে। এ সময় পাচারকারীরা যাত্রীদের জোর করে ট্রলারের মাছ ও জাল রাখার চারটি সংকীর্ণ কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দেয়।
“মানুষে মানুষে ঠাসাঠাসি হয়ে যায়। শ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল না,” বলেন তিনি।
অতিরিক্ত ভিড় ও অক্সিজেনের অভাবে ওই কুঠুরিগুলোতেই ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলে দাবি করেন রফিকুল।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন পাচারকারীরা হুমকি দেয়—ডেকে থাকা কেউ নিচে না নামলে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হবে। আতঙ্কের মধ্যেই বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়।
একটি পানির বোতলেই বাঁচার লড়াই
ডুবন্ত ট্রলার থেকে কোনোভাবে একটি দুই লিটারের পানির বোতল আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকেন রফিকুল।
“চারদিকে শুধু মানুষ ডুবছিল… আমি শুধু একটা বোতল ধরে ছিলাম… আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন,” বলেন তিনি।
পরদিন ৯ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ তাকে সহ মোট ৯ জনকে উদ্ধার করে।
এই ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু—যাদের অধিকাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকাও নেই প্রশাসনের কাছে।