বে ইনসাইট ডেস্ক
কক্সবাজারকে আমরা সাধারণত সমুদ্রের শহর হিসেবেই চিনি। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, পর্যটকের ভিড়, হোটেল-রিসোর্ট কিংবা রঙিন সূর্যাস্ত; এসবই যেন কক্সবাজারের পরিচয়ের প্রধান উপাদান। অথচ এই শহরের আরেকটি মুখ আছে, অনেক বেশি নীরব, অনেক বেশি অন্তরঙ্গ। সেই মুখটি দেখা যায় বাঁকখালী নদীর পাড়ে, ঘাসের ফাঁকে, ঝোপঝাড়ের ভেতর কিংবা বৃষ্টিভেজা চরাঞ্চলে ফুটে থাকা নাম না জানা ফুলগুলোর মধ্যে।
শিল্পী ইয়াসির আরাফাত সেই নীরব সৌন্দর্যকেই তুলে এনেছেন তাঁর তুলিতে আঁকা চিত্র প্রদর্শনী ‘বাক্কালির ফুল ও অন্যান্য’-এ।
কক্সবাজার শহরের অলিগলি, নদীতীর আর জনজীবনের ভেতর দিয়েই কেটেছে ইয়াসিরের শৈশব-কৈশোর। করোনাকালে যখন মানুষের চলাফেরা সীমিত হয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি হাঁটতে শুরু করেন বাঁকখালীর পাড় ধরে। সেই হাঁটায় তিনি আবিষ্কার করেন এক বিস্মৃত জগৎ। নদীর তীরে, পতিত জমিতে, কাদামাটির পাশে কিংবা ঘাসের ভেতর ফুটে থাকা অসংখ্য বুনো ফুল তাঁর চোখের ল্যান্সে ধরা পড়তে থাকে। করোলা ফুল, কলমি ফুল, ঘাসফুল, ত্রিধারা, কানাইবাসী; কত নাম জানা, কত নাম অজানা ফুল।
ইয়াসিরের কাছে এই প্রদর্শনী শুধু ফুলের ছবি প্রদর্শন নয়; এটি এক ধরনের আর্কাইভ নির্মাণের প্রচেষ্টা। এমন সব ফুল, যাদের জন্য কোনো ফুলদানি সাজানো হয় না, কোনো প্রেমিক তার প্রেমিকাকে উপহার দেয় না, যাদের সৌন্দর্য নীরবে জন্ম নেয় এবং নীরবেই ঝরে যায়; তাদের অস্তিত্ব সংরক্ষণের প্রয়াস।
এই ভাবনা থেকেই তিনি লিখেছিলেন একটি পঙ্ক্তি-
“যে ফুল পায়নি খোপা কিংবা কোনো দানি,
সেও পেয়েছিল সূর্য, আকাশ ও পানি।”

প্রদর্শনীর একটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ইয়াসির বলছিলেন মহিষের কথা। শহীদ মিনারে ছবি নিয়ে প্রবেশ করার সময় এক পথচারী ছবির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, “ভাই, দাম হতো?”
প্রশ্নটি ছিল সরল, কিন্তু ইয়াসিরের কাছে ছবিটি ছিল একটি গল্প। কক্সবাজারের স্থানীয় ভাষায় একটি শব্দ আছে- ‘ঢেরা পইজ্জা’। গ্রামের উঠানে কিংবা পাড়ার আড্ডায় যখন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চিন্তে বসে থাকে, কোনো তাড়া নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই, সেই অলস নিশ্চিন্ত অবস্থাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় শব্দটি। মহিষের সেই ছবিটি তাঁর কাছে ছিল ঠিক তেমনই এক ‘ঢেরা পইজ্জা’-এর প্রতীক। যেন জীবনানন্দ দাশের ‘অবসরের গান’-এর দৃশ্যমান রূপ; যেখানে সময় ধীরে বয়ে যায়, আর প্রকৃতি নিজের ছন্দে বেঁচে থাকে।
ইয়াসিরের কাজের একটি বিশেষ দিক হলো স্থানীয় ভাষা, প্রকৃতি ও স্মৃতিকে একই সুতোয় গেঁথে ফেলা। তাঁর ছবিতে শুধু ফুল বা নদী নেই; আছে কক্সবাজারের মানুষের জীবনবোধ, লোকজ শব্দ, গ্রামীণ অনুভূতি এবং হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক উপাদান।
এর আগে ‘কক্সবাজার ডায়েরিজ’ প্রদর্শনীতে তিনি শহরের স্থাপত্য ও জনজীবনের ছবি তুলে ধরেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী অধ্যায় যেন ‘বাক্কালির ফুল ও অন্যান্য’। শহরের দৃশ্যমান পরিচয় থেকে এবার তিনি চলে এসেছেন শহরের অন্তর্গত প্রকৃতির কাছে।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, প্রদর্শনীটি এমন এক উন্মুক্ত পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রবেশ করতে পারছেন। যারা সচরাচর গ্যালারিতে যান না, তারাও থেমে ছবি দেখছেন, প্রশ্ন করছেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন। শিল্পী হিসেবে এটাই ইয়াসিরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কক্সবাজারের গল্প শুধু সমুদ্রের নয়। এই শহরের গল্প বাঁকখালীরও, ঘাসফুলেরও, বুনো কলমিরও। সেই গল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক ছিল, অদেখা ছিল। ইয়াসির আরাফাতের ক্যামেরা সেই অদেখা জগতের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।
সমুদ্রের শহরের ভেতরে যে আরেকটি ফুলের শহর লুকিয়ে আছে, ‘বাক্কালির ফুল ও অন্যান্য’ যেন সেই শহরেরই এক নীরব মানচিত্র।
