বে ইনসাইট | কক্সবাজার
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টসহ বিভিন্ন পয়েন্টের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা পাঁচ শতাধিক দোকান ও স্থাপনা সরিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের আল্টিমেটামের মুখে রোববার ও সোমবার ব্যবসায়ীরাই নিজেদের দোকান ভেঙে মালামাল সরিয়ে নেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় দুই দশক পর সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ‘দখলমুক্ত’ করা সম্ভব হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অভিযানের মধ্যে তারাই হয়ে পড়েছেন ‘বলির পাঠা’।
কারণ, যেসব স্থাপনাকে এখন প্রশাসন ‘অবৈধ দখল’ বলছে, সেসব জায়গায় ব্যবসা করার জন্যই বছরের পর বছর ধরে জেলা প্রশাসন তাদের কাছ থেকে রাজস্ব নিয়ে ব্যবসার কার্ড দিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
রাজস্বের বিনিময়ে কার্ড
বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এমন শতাধিক কার্ডের কপি সংগ্রহ করেছে বে ইনসাইট, যেখানে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টাকা রাজস্বের বিনিময়ে ব্যবসা করার অনুমতির উল্লেখ রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এই কার্ডের ভিত্তিতেই তারা সুগন্ধা পয়েন্টসহ সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় ঝিনুক, শোপিস ও পর্যটক সামগ্রী বিক্রি করে আসছিলেন।
সুগন্ধা পয়েন্ট ঝিনুক ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল বলেন, “যদি অবৈধ হয়, তাহলে জেলা প্রশাসন আমাদের কার্ড দিল কেন? তারা রাজস্ব নিয়ে কার্ড দিয়েছে বলেই এখানে দোকান বসেছে।”
প্রশাসনের বক্তব্য: ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা, স্থাপনা নয়
তবে জেলা প্রশাসনের দাবি, এসব কার্ড স্থায়ী দোকানের জন্য দেওয়া হয়নি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, “বালিয়াড়িতে কোনো স্থায়ী দোকানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কার্ড দেওয়া হয়েছে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার জন্য। তাই বালিয়াড়িতে স্থাপনা সরাতে অভিযান চলবে।”
তবে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, যদি ভ্রাম্যমাণ ব্যবসাই হয়, তাহলে শত শত কার্ড ইস্যু করা হলো কেন এবং বছরের পর বছর ধরে সেসব ব্যবসা চলতে দেওয়া হলো কেন।
জয়নালের ভাষায়, “যদি ভ্রাম্যমাণ হয়, তাহলে এত কার্ড দিল কেন? ব্যবসায়ীরা তো এখানে শৃঙ্খলার মধ্যেই ব্যবসা করছিল।”
দুই দিনের আল্টিমেটাম
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সুগন্ধাসহ বিভিন্ন পয়েন্টের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো সরাতে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।
নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর রোববার ও সোমবার দুপুরের দিকে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান এবং মাইকিং করে দোকান সরানোর নির্দেশ দেন।
এরপর ব্যবসায়ীরা নিজেরাই দোকান ভেঙে মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেন। বিকেল ৩টা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলে।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (ট্যুরিজম সেল) মঞ্জু বিন আফনান বলেন,
“ব্যবসায়ীরা নিজেরাই দোকান সরিয়ে নিয়েছেন। তাদের অনুরোধে নির্ধারিত সময়ের পরও কিছুটা সময় দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি বলেন, সৈকত এলাকা ধাপে ধাপে পুরোপুরি দখলমুক্ত করে সেখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা চাইলে তাদের দাবি বা অভিযোগ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে পারেন, তা বিবেচনা করা হবে।
ঈদের আগে সংকটে ব্যবসায়ীরা
উচ্ছেদের সময় নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। অনেকেই বলছেন, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে ঋণ নিয়ে দোকানে বিনিয়োগ করেছিলেন তারা।
ঝিনুক বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, “ঈদের ব্যবসার আশায় অনেকে ঋণ নিয়ে দোকানে বিনিয়োগ করেছিলেন। হঠাৎ উচ্ছেদের কারণে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে।”
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “রমজান মাস, সামনে ঈদ। কিন্তু এখন দোকান সরাতে হচ্ছে। গত এক মাস দোকান প্রায় বন্ধ ছিল। বাচ্চাদের ঈদের কাপড় পর্যন্ত কিনতে পারিনি।”
দুই দশকের ব্যবসা, বারবার উচ্ছেদ
ঝিনুক ব্যবসায়ী আবুল হোসেন প্রায় ২২ বছর ধরে সৈকতে ব্যবসা করছেন।
তার ভাষায়, “প্রতিবছরই উচ্ছেদ করে, আবার বসতে দেয়। ভ্যান উপরে তুলি, আবার নামাই। এতে বোঝানো হয় এটা ভ্রাম্যমাণ। কিন্তু এবার একেবারে রুটিরুজি বন্ধ করে দেওয়া হলো।”
তিনি বলেন, “চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদের কার্ড দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তাহলে আমরা অবৈধ হলাম কীভাবে?”
ঋণের বোঝা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ব্যবসায়ী মো. ফরিদুল আলম বলেন, “লোন করে দোকান দিয়েছি। এখন ঋণ শোধ করবো কীভাবে? জেলা প্রশাসন যে ৬০ হাজার টাকা রাজস্ব নিয়েছিল, সেটার কী হবে?”
আরেক ব্যবসায়ী মো. রাশেদ বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে দুই-তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা সাজিয়েছি। উচ্ছেদ করতে হলে আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।”
কার্ড বেচাকেনার অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কার্ডের প্রকৃত মালিক অন্য জেলার হলেও স্থানীয়রা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সেই কার্ড নিয়ে ব্যবসা করছেন।
ব্যবসায়ী আব্বাস বলেন, “আমি যার কার্ডে ব্যবসা করি, সে নেত্রকোনার। রোজার আগে তিন লাখ টাকা দিয়ে কার্ডটা নিয়েছি।”
তার দাবি, এভাবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কার্ড কেনাবেচা সৈকতে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি করেছে।
তিন দিনে ৬৩০ স্থাপনা অপসারণ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় গত তিন দিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রায় ৬৩০টি স্থাপনা অপসারণ করেছে জেলা প্রশাসন।
তবে সৈকতকে ‘দখলমুক্ত’ করার এই অভিযানের মধ্যেই সামনে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, রাজস্ব নিয়ে বছরের পর বছর ব্যবসা করতে দেওয়ার পর হঠাৎ সেই ব্যবসাকেই অবৈধ ঘোষণা করার দায় নেবে কে?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই সৈকতের ধুলোর মধ্যে পড়ে আছে শত শত ভাঙা দোকান আর অনিশ্চয়তায় ডুবে গেছে সেসব দোকানের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন।










