কক্সবাজারে হামের প্রকোপ, এক মাসে ১২০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে হামের (মিজেলস) সংক্রমণ বাড়তে থাকায় মার্চ মাসজুড়ে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে গত ১ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১০৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছলিম উল্লাহ জানান, রোববার (গতকাল) হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৩৩ জন শিশু, আর সোমবার নতুন করে ১২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিল মাত্র ৯ জন শিশু, যা মার্চে এসে হঠাৎ করেই কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

মৌসুমি কারণ, তবে নজরদারি জোরদার

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন আলমগীর জানান, বছরে সাধারণত দুটি মৌসুমে হামের প্রকোপ বাড়ে বসন্ত এবং বর্ষাকালে।

“বর্তমানে যে সংক্রমণ বাড়ছে, সেটি মৌসুমি দিক থেকে স্বাভাবিক হলেও এবার কিছুটা বেশি হওয়ায় আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৩টি সন্দেহভাজন কেস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার জন্য পাঠানো নমুনার ২৮টি পজিটিভ এসেছে। আক্রান্তদের মধ্যে রামুর মিঠাছড়ি এলাকা এবং সদর উপজেলার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলী এলাকায় সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি।

টিকাদান ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর এবং পুষ্টিহীনতা হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

ডা. আলমগীর বলেন, “টিকাদানের আওতা সাধারণত ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হলেও কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়। আবার ভাইরাসের ধরন পরিবর্তনের কারণেও সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।”

তিনি আরও জানান, ছিন্নমূল ও ঝরে পড়া শিশুদের মধ্যে টিকা না পাওয়া বা অপুষ্টির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এ পরিস্থিতিতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

অত্যন্ত সংক্রামক রোগ

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ।

“একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একটি এলাকায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, সাধারণত পাঁচ বছরের নিচের শিশু, বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, যা মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

উখিয়ায়ও আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশু

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার জানান, উখিয়ায় বর্তমানে ২ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

তিনি বলেন, “গত এক মাসের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে নেই, তবে এ সময়ের মধ্যে ৭ থেকে ৮ জন রোহিঙ্গা শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।”

উপসর্গ ও জটিলতা

হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। তবে জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানে সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি ওঠার আগেই রোগী অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।

প্রতিরোধে করণীয়

স্বাস্থ্য বিভাগ সংক্রমণ ঠেকাতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে-
– আক্রান্ত শিশুদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখা
– হাঁচি-কাশির সময় মাস্ক ব্যবহার
– নিয়মিত হাত ধোয়া
– টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা
– ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো

ডা. নাজির বলেন, “যেসব এলাকায় টিকার কাভারেজ ৮৫ শতাংশের নিচে থাকে, সেসব জায়গায় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।”

চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক জানান, গত এক মাসে সেখানে প্রায় ২০টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৪ জন শিশু।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠপর্যায়ে ‘উঠান বৈঠক’, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *