বে ইনসাইট | কক্সবাজার
কক্সবাজারে আবারও হামের (মিজেলস) ছোবল। সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনে। একইসঙ্গে হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্ত শিশুদের চাপ, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে জনস্বাস্থ্য খাতে।
ভোরে নিভে গেল জেসিনের জীবন
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ডেডিকেটেড হাম ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ৯ মাস বয়সী শিশু জেসিন। সে মহেশখালীর ছোট মহেশখালী এলাকার বাসিন্দা নাসিরের কন্যা।
এর আগের দিন একই উপজেলার ৭ মাস বয়সী হিরা মনি নামের আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। এছাড়া এর আগে আরও একটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামের পাশাপাশি অন্যান্য জটিলতা, বিশেষ করে নিউমোনিয়া এই মৃত্যুগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
“হাম একা আসে না, সঙ্গে আনে জটিলতা”
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মোহাম্মদ শহিদুল আলম বলেন, “এ পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের অনেকের মধ্যে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত ছিল। অনেক সময় হাম সরাসরি নয়, বরং এর জটিলতাই জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
তার মতে, অপুষ্টি, দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং সেকেন্ডারি সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

হাসপাতালে রোগীর ঢল
জেলায় হামের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও দ্রুত বাড়ছে।
বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ইউনিটে ভর্তি রয়েছে ৪২ শিশু। এছাড়া কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে আরও ৫ জন। সব মিলিয়ে দুই হাসপাতালে ভর্তি শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে, যার ফলে শয্যা সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
আলাদা ওয়ার্ড, তবু চাপে চিকিৎসকরা
রোগীর চাপ সামাল দিতে ইতোমধ্যে সদর হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড ও আলাদা নার্সিং ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মং টিংঞো বলেন, আমরা হাম রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ইউনিট চালু করেছি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আছে, কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
কেন বাড়ছে সংক্রমণ?
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, মৌসুমি পরিবর্তনের পাশাপাশি টিকাদানের ফাঁক, অপুষ্টি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের অবাধ মেলামেশা, সব মিলিয়ে হামের বিস্তার বাড়ছে।
বিশেষ করে মহেশখালীর মতো দ্বীপ ও প্রান্তিক এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নীরব ঝুঁকি: লক্ষণ প্রকাশের আগেই ছড়ায়
হামের বড় ঝুঁকি হলো, লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই আক্রান্ত শিশু অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে পরিবার বা আশপাশের অন্য শিশুরা দ্রুত সংক্রমিত হয়।
এখন কী জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ জরুরি—
- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন
- আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা
- প্রি-স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা
- অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি

কক্সবাজারে হামের এই নতুন ঢেউ শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকটই নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। যেখানে প্রতিরোধই হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
