বে ইনসাইট | কক্সবাজার
তেল সংকট, সাগরে মাছের স্বল্পতা ও ডাকাতের উপদ্রবের কারণে কক্সবাজারে অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে ও তাদের পরিবার।
কক্সবাজার ফিশিং বোটমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি হিসাবে জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ ট্রলার সাগরে যেতে পারছে, আর ৭০ শতাংশ ট্রলার বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, আগে যেসব ট্রলার তেল সংগ্রহ করতে পেরেছিল, সেগুলোর কিছু এখনও চলমান থাকলেও নতুন করে তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ ট্রলার অচল হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে পুরো জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০টি ট্রলার সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।
তেল সংকটে থমকে যাচ্ছে মাছ ধরা
দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্রলার পরিচালনায় সবচেয়ে বড় সংকট এখন জ্বালানি তেল।
“ম্যাক্সিমাম ট্রলারের কাছেই তেল নেই। যারা পাচ্ছেন, তারাও পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না; অনেক ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ বা ১০ দিনে অল্প পরিমাণ তেল মিলছে।”
তিনি জানান, সমুদ্রে ভাসমান তেল সরবরাহ ব্যবস্থাও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
তার ভাষায়, তেলের পাশাপাশি সাগরে মাছের অপ্রতুলতা এবং ডাকাতের উপদ্রবও ট্রলার চলাচল কমে যাওয়ার বড় কারণ।
ঝুঁকি ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মালিক ট্রলার সাগরে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

হাজার হাজার জেলে কর্মহীন
দেলোয়ার হোসেন বলেন, কক্সবাজারে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। তবে নিবন্ধনের বাইরে আরও অনেক জেলে রয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ থেকে ২০ হাজার জেলে সাগরে যেতে পারছেন না, ফলে তারা কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
সামনে আসছে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা
তিনি জানান, ১৪ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, যা মাছের প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়।
“যেসব ট্রলার এখন সাগরে আছে, সেগুলো ফিরে এলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে আবার যেতে পারবে না,” বলেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার দাবি
দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা ছোট জেলেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
তার মতে, সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে দেশের মাছের সরবরাহ কমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে।
এ কারণে তিনি সরকারের কাছে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
জেলেদের হতাশা: “সমুদ্রে যেতে না পারলে ঘরে খাবার নাই”
কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক এলাকার জেলে মোহাম্মদ হানিফ বলেন, “আগে সপ্তাহে দুই-তিনবার সাগরে যাইতাম। এখন তেল নাই, ট্রলার বন্ধ। ঘরে বসে থাকি, কাম নাই, আয় নাই।”
কক্সবাজার ফিশারী ঘাটে অপেক্ষমান জেলে আবদুল কাদের বলেন, “সমুদ্রে গেলেও ভয় আছে। ডাকাতের উপদ্রব বাড়ছে। আর মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। খরচ উঠে না, তাই অনেকে যাইতেছে না।”
জেলে নুরুল আমিন বলেন, “আমরা দৈনিক খাই-দৈনিক চলি। ১০-১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। এখন অনেকেই ধার-দেনা করে চলতেছে।”
কুতুবদিয়ার জেলে সালামত উল্লাহ বলেন, “১৪ তারিখ থেকে আবার নিষেধাজ্ঞা আসতেছে। এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো বুঝতেছি না।”
আরেক জেলে রশিদ আহমদ বলেন, “সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে আমাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হইবো।”
