বে ইনসাইট | কক্সবাজার
কক্সবাজারে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ জনে।
বুধবার ৭ মাস বয়সী মারা যাওয়া ইরা মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা। গত ৩০ মার্চ থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) তার মৃত্যু হয়।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মোহাম্মদ শহিদুল আলম জানান, মৃত দুই শিশুই হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল।
তিনি বলেন, “আজ যে শিশুটি মারা গেছে, তার মুখে ঘা ছিল। এ কারণে সে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারছিল না। তাকে নলের মাধ্যমে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু অভিভাবক নল ব্যবহার না করে মুখে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করলে তা নাক-মুখ দিয়ে উঠে গিয়ে শ্বাসকষ্ট তৈরি হয়, এরপরই তার মৃত্যু ঘটে।”
ডা. শহিদুল জানান, মৃত শিশুদের উভয়েরই হামের পাশাপাশি জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া ও মুখে ঘা ছিল, যা তাদের অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে।
এদিকে, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এখন হামে আক্রান্ত ২৮ জন শিশু ভর্তি রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের ঝুঁকি বেশি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, “সাধারণত শিশুকে ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। এর আগে মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে সুরক্ষা দেয় বলে ধারণা করা হয়। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাসের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।”
তিনি জানান, এ পরিস্থিতিতে মায়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। গর্ভধারণের আগে বা পরিকল্পিত সময়ে মাকে টিকা দেওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যৎ কৌশল হিসেবে বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
যেভাবে ছড়ায় ও উপসর্গ
হাম একটি বায়ুবাহিত রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা বা দূষিত বাতাসের মাধ্যমে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে।
এর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি-কাশি, গলার ভেতরে বিশেষ দাগ (কপলিক স্পট), চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রি-স্কুল বয়সী শিশু—যারা কিন্ডারগার্টেন, নূরানী বা কওমি মাদ্রাসায় যায়—তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকায় এই গ্রুপে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
টিকার কাভারেজ কম হলে ঝুঁকি বাড়ে
ডা. নাজির বলেন, “যদি কোনো এলাকায় ৮৫ শতাংশের নিচে টিকাদান কাভারেজ থাকে, তাহলে সেখানে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি।”
তিনি জানান, অনেক সময় কিছু শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় ‘পকেট’ তৈরি হয়, যেখান থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো এবং সংক্রমিত এলাকার আশপাশে শিশুদের টিকার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি
হাম প্রতিরোধে কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যে রয়েছে—
- হাঁচি-কাশির সময় মাস্ক ব্যবহার
- কনুই বা টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে কাশি দেওয়া
- নিয়মিত হাত ধোয়া
- আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা
তিনি বলেন, “এই সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চললে সংক্রমণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”
জটিলতা হতে পারে মারাত্মক
হাম সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে সেরে গেলেও কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানে সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)।
ডা. নাজির বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে ব্রেনের কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার ফুসফুসে গুরুতর সংক্রমণ হলে আইসিইউ সাপোর্টও প্রয়োজন হতে পারে।”
তিনি আরও জানান, হামের একটি বড় ঝুঁকি হলো—রোগের লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাই সংক্রমণ দেখা দিলে দ্রুত আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই হামের বিস্তার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
