আন্দামান ট্র্যাজেডি: সমিতি পাড়ার যে শিশুদের খবর নেয়নি কেউ

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতি পাড়া। সাগরপাড়ের সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভিটেমাটি হারানো মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মানুষদের বসতি হিসেবে শুরু হলেও, এখন এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নিম্নআয়ের মানুষ অল্প ভাড়ায় বসবাস করছেন।

প্রভাবশালীদের মাধ্যমে অবৈধভাবে জায়গা নিয়ে কাঠ ও বাঁশের ঘর তুলে গড়ে উঠেছে পুরো পাড়া।

সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের খোঁজে বে ইনসাইট যায় সমিতি পাড়ার বাগানপাড়া এলাকায়। স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করতেই কয়েকজন শিশু পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় ঝাউবনের ভেতর সরু গলিপথ পেরিয়ে একটি ছোট ঘরের সামনে।

ঘরের দরজায় বসে ছিল ৮ থেকে ১০ বছরের এক শিশু। অন্যরা পরিচয় করিয়ে দেয়, তার নাম জুনায়েদ। তার বাবা মোহাম্মদ নূর, মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বাবার কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে ওঠে শিশুটির। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিল না।

জুনায়েদ জানায়, তার মা এখন অন্যত্র থাকেন। সে ও তার বড় ভাই সৎমায়ের সঙ্গে এখানে থাকত। কিন্তু বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর সৎমাও চলে গেছেন। এখন দুই ভাইই এই ঘরে থাকে। বড় ভাইকে পাওয়া যায়নি, সে সুগন্ধা পয়েন্টে ঘোড়া চালিয়ে সংসারের খরচ জোগাড় করে।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে জুনায়েদের চাচাতো ভাই, আট বছর বয়সী মোহাম্মদ হোসেন বাড়িতে আসে। তার বাবা মোহাম্মদ হারুনও একই ঘটনায় নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুই শিশুই জানায়, তাদের বাবারা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন পরিবারের সচ্ছলতার জন্য। পরে তারা জানতে পারে, আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় তারা নিখোঁজ।

এ সময় প্রতিবেশী মোহাম্মদ আলম মাইজভান্ডারী বলেন, ২ এপ্রিল নূর ও হারুন যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন তিনি উপস্থিত ছিলেন। তারা জানিয়েছিলেন ভাগ্য বদলাতে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন, তবে কার মাধ্যমে যাচ্ছেন তা বলেননি।

একই পাড়ার আরেক বাসিন্দা শফিউল্লাহও ওই ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হয়েছেন বলে তার পরিবার জানিয়েছে। তার শাশুড়ি রহিমা বেগম বলেন, উত্তাল সাগরের আশঙ্কায় তিনি জামাইকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু শফিউল্লাহ বলেছিলেন, মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

কেন মামলা করা হয়নি জানতে চাইলে রহিমা বেগম বলেন, “কার বিরুদ্ধে মামলা করব বুঝতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন, যারা তাদের নিয়ে গিয়েছিল তারা জানিয়েছে, হয়তো ভেসে কোনো দ্বীপে পৌঁছাতে পারে, এই আশাতেই তারা মামলা করেননি। তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, শফিউল্লাহ কার মাধ্যমে গেছেন তা তারা জানেন না।

সমিতি পাড়া থেকে ওই ট্রলারে ছিলেন অন্তত পাঁচজন। নূর, হারুন, শফিউল্লাহ ছাড়াও হামিদ মাঝি ও তার ভাই ইব্রাহিম খলিল। খলিলের স্ত্রী জুবাইদা বলেন, তার স্বামী অটোরিকশা চালাতেন, ভাগ্য ফেরাতে মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিলেন।

হামিদ মাঝি জীবিত উদ্ধার হওয়া নয়জনের একজন। কোস্টগার্ডের দায়ের করা মামলায় তিনি এক নম্বর আসামি। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশীই পাচারকারী চক্রের সদস্য।

স্থানীয়দের দাবি, হামিদ মাঝি এর আগেও একাধিকবার ট্রলার নিয়ে মালয়েশিয়া গেছেন। নিরাপদে ফিরে আসায় অনেকেই তার মাধ্যমে অবৈধভাবে যাওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তারা আরও দাবি করেন, হামিদের বড় ভাই ইলিয়াস ও তার স্ত্রী রোজিনা এই পাচার চক্রের মূল হোতা।

তবে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা জানেন না তাদের স্বজনরা কার মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বলেন, পাচারকারীরা ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারের সদস্যদের চুপ থাকতে বাধ্য করছে, ফলে কেউ আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে টেকনাফ থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ওই ট্রলারে ছিলেন। এছাড়া পেকুয়া থেকে ১২ জন, রামু থেকে চারজনসহ আরও অনেক এলাকার মানুষ যাত্রী ছিলেন বলে স্বজনরা দাবি করছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকায় নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এমদাদুল হক শরীফ বলেন, “পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।”

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, “বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য লিখিতভাবে সরকারকে জানানো হচ্ছে এবং যাচাই-বাছাই চলছে। নিশ্চিত না হয়ে সংখ্যা প্রকাশ করা ঠিক হবে না।”

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকেও কিছু মানুষ ওই ট্রলারে উঠেছিল।

তবে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বলেন, “এখনও কোনো রোহিঙ্গা পরিবার থেকে নিখোঁজের অভিযোগ পাইনি।”

তিনি যোগ করেন, সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় রোহিঙ্গারা অভিযোগ করে না, ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “এই ধরনের সংগঠিত অপরাধ বন্ধ করা কঠিন নয়, কিন্তু সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু রুটে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার চালিয়ে যাচ্ছে।”

কোস্টগার্ড জানায়, ৯ এপ্রিল বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমটি মেঘনাপ্রাইড আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় ছয় বাংলাদেশি ও তিন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে। পরে তাদের কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম জানান, ট্রলারটিতে প্রায় আড়াইশোর বেশি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা ছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা কয়েকজন কাঠের টুকরো ও পানির বোতল আঁকড়ে ভেসে থাকতে পেরেছিলাম, কিন্তু অনেকেই সাগরে হারিয়ে গেছে।”

দুনিয়াজুড়ে জ্বালানি সংকট: জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ দিচ্ছে যে কেন্দ্র

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাব যখন বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে, তখন কক্সবাজারের একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প নীরবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে যাচ্ছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাতাস থাকলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে। বিশাল আকারের টারবাইনগুলো ইতোমধ্যে এলাকাটির নতুন ল্যান্ডমার্কে পরিণত হয়েছে, যা দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে।

২০২৪ সালের ৮ মার্চ প্রকল্পটির উদ্বোধন হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যায়। দুই বছর পর এখন প্রশ্ন- দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রকল্পটির অবদান কতটা?

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে, যার অর্থায়নে সহযোগিতা করেছে চীনের এসপিআইসি ওয়েইলিং পাওয়ার করপোরেশন। প্রকল্পের আওতায় ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২২টি টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে, যার মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানায়, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি তাদের কাছেই বিক্রি করা হয়।

বিপিডিবির ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার সেল-৩ এর উপপরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ফরিদি বলেন, “২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে।”

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে কেন্দ্রটি গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। স্থাপিত ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াটের তুলনায় এটি প্রায় ১৭ শতাংশ উৎপাদন হার নির্দেশ করে।

ফরিদি বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ উৎপাদন হারকে উৎসাহব্যঞ্জক বলা যায়। এমনকি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও সাধারণত ২০ শতাংশের মতো উৎপাদন করে।”

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ডলার। সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ সেন্ট দরে কিনছে। সেই হিসাবে গত দুই বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিদ্যুৎ কিনেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে পারে। তবে টারবাইনগুলো ২০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক কম।

প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী মুকিত আলম খান বলেন, “এ ধরনের আরও প্রকল্প হাতে নেওয়া গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

বর্তমানে আকিজ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের চিফ বিজনেস অফিসার হিসেবে কর্মরত মুকিত বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজার অঞ্চলে বাতাসের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। প্রকৃতিতে এমন পরিবর্তন কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি উন্নত হলে উৎপাদনও বাড়বে।”

প্রাথমিকভাবে স্থাপিত ক্ষমতার ২৩ শতাংশ উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

সাম্প্রতিক সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ টারবাইন সচল রয়েছে এবং ব্লেড ঘুরছে। শীতকালে বাতাসের গতি কম থাকায় উৎপাদন কমে যায়, তবে গ্রীষ্মে বাতাস বাড়ার সঙ্গে উৎপাদনও বাড়ে।

ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জির সহকারী ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু সূর্য ডোবার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বাতাস থাকলে বায়ু বিদ্যুৎ যেকোনো সময় উৎপাদন করতে পারে।”

তিনি জানান, বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার হলে উৎপাদন শুরু হয় এবং ৯ মিটার হলে পূর্ণ ৩ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব।

“বিকাল থেকে রাত যখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি, তখন বাতাসও তুলনামূলক ভালো থাকে,” বলেন তিনি।

ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় সুবিধা রয়েছে উল্লেখ করে বেলাল বলেন,

এক মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় তিন একর জমি লাগে, কিন্তু ৩ মেগাওয়াটের একটি বায়ু টারবাইনের জন্য লাগে মাত্র ২০ শতাংশ জমি।

তবে বজ্রপাত বড় ঝুঁকি উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রায় ৯০ মিটার উঁচু টাওয়ারগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাতাসের গতি সর্বোচ্চ থাকে এবং এই সময় উৎপাদনও সর্বাধিক হয়।

মুকিত আলম খান বলেন, “কক্সবাজার এলাকায় গড় বাতাসের গতি প্রায় ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রতি সেকেন্ড। উপকূলীয় অঞ্চলে আরও বেশি গতির বাতাস থাকায় সেখানে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।”

চৌফলদণ্ডীর বাসিন্দা শারমিন সুলতানা বলেন, “এটা এখন দর্শনীয় জায়গা হয়ে গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের পাশেই কেন্দ্র, তবুও আমরা অন্ধকারেই থাকি।”

তিনি জানান, শীতকালে লোডশেডিং কম থাকলেও গরম পড়তেই আবার বেড়েছে।

“গত গরমে অনেক রাত বিদ্যুৎ ছিল না,” বলেন তিনি।

ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহুরুল ইসলাম খান বলেন, “উৎপাদন নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু দুঃখজনক হলো, নতুন প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তুত থাকলেও অনুমোদন না পাওয়ায় এগোতে পারিনি।”

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুতের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানি খরচ না থাকায় এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী।”

তিনি বলেন, “এটি পরিবেশবান্ধব, কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং বৈশ্বিক কার্বন বাজারেও ভূমিকা রাখতে পারে।”

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে জানান তিনি।

স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয় ২০০৫ সালে ফেনীর সোনাগাজীতে। পরে কুতুবদিয়ায় ১ মেগাওয়াটের আরেকটি প্রকল্প স্থাপন করা হলেও তা স্থায়ীভাবে চালু রাখা যায়নি।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১,৩৭০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাতাসের গতিবেগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

ন্যাশনাল রিনিউএবল এনার্জি ল্যাবরেটরির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনার দাকোপ, চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও চাঁদপুরের মোহনা অঞ্চলে বাতাসের গতি ৬ মিটার প্রতি সেকেন্ডের বেশি, যা বায়ু বিদ্যুতের জন্য উপযোগী।

প্রতিবেদনটি বলছে, দেশে প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৫ দশমিক ৭৫ থেকে ৭ দশমিক ৭৫ মিটার গতির বাতাস পাওয়া যায়, যা তাত্ত্বিকভাবে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে ডেনমার্কভিত্তিক কোপেনহেগেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স বঙ্গোপসাগরে ৫০০ মেগাওয়াটের অফশোর বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়।

এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের উপকূলীয় জ্বালানি সম্ভাবনা উন্মোচনের পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি: ‘ভাসমান উদ্ধার ৯ জনের ৬ জনই পাচারচক্রের সদস্য’

সৌরভ দেব | বে ইনসাইট

কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল থেকে অবৈধভাবে নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় উদ্ধার হয় ৯ জন। এরমধ্যে ৬ বাংলাদেশিকে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা করে কোস্টগার্ড। বাকি তিনজন রোহিঙ্গাকে ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের ভাষ্যে, অভিযুক্তদের মধ্যে অন্তত চারজনকে তারা ট্রলারের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখেছেন, অন্য দুই বাংলাদেশিকে তারা নিজেদের মতোই ভুক্তভোগী যাত্রী বলে দাবি করেছেন।

এদিকে এই ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা। যাদের কোনো তালিকাই এখনো প্রশাসনের হাতে নেই। মামলা হয়নি কোনো ভুক্তভোগী পরিবার থেকেও।

ভুক্তভোগীদের বয়ান: ‘মাঝি, ড্রাইভার, দালালসহ উদ্ধার চারজনকে দেখেছি’

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ছয় বাংলাদেশিই পাচারচক্রের সদস্য। ওই ছয়জন হলেন, কক্সবাজার সদর উপজেলার মো হামিদ ও মো আকবর, টেকনাফের বাহারছড়ার মো তোফায়েল, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সৈয়দ আলম, টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের মো সোহান উদ্দিন, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মহিউদ্দিন হৃদয়।

বে ইনসাইটের সঙ্গে কথা বলা দুই রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী তারমধ্যে চারজনকে সরাসরি যুক্ত থাকার চিত্র তুলে ধরেন।

উদ্ধার হওয়া কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “মো. হামিদ আর মো. ছৈয়দ আলম ছিল ট্রলারটির মাঝি, মহিউদ্দিন হৃদয় ইঞ্জিন চালাত আর আকবর ছিল দালাল। বাকি দুইজনকে আমরা যাত্রী হিসেবেই দেখেছি।”

তিনি অভিযোগ করেন, দালাল আকবর যাত্রীদের ওপর নির্যাতন চালাতেন।

“আমি এক গ্লাস পানি চাইলে সে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। সবচেয়ে বেশি মারধর করেছে সে-ই।”

একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন ১ নম্বর ক্যাম্পের এনাম উল্লাহ ইমরানও। তিনিও এই যাত্রায় ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিলেন।

পুলিশের অবস্থান: ‘কোস্টগার্ডের তদন্তে ছয়জনই জড়িত’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, টেকনাফ থানার উপ-পরিদর্শক সনজীব কান্তি নাথ বলেন,
“কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। তাদের তদন্তে ছয়জনেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আমরা রিমান্ড চাইব, এরপর বিস্তারিত বলা যাবে।”

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন, উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে কারাগারে আছেন।

পাচারের নেটওয়ার্ক: ক্যাম্প থেকে গ্রাম বিস্তৃত চক্রের ইঙ্গিত

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালদের মাধ্যমে যাত্রী সংগ্রহ করে ওই ট্রলারে তোলা হয়েছিল।

রফিকুল ইসলামের দাবি, ৬ নম্বর ক্যাম্পের সি ব্লকের মাহ নূর নামের এক দালাল তাকে “টেকনাফ বন্দরে কাজ” দেওয়ার কথা বলে ট্রলারে তোলে। পরে পরিবারের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নেয়। ট্রলারডুবির খবর ছড়াতেই ওই দালাল পালিয়ে যায়।

রামুর কচ্ছপিয়া দক্ষিণ পাড়া ওই ট্রলারে গিয়ে নিখোঁজ আছে ৪ যুবক। তাদেরই একজন মিজবাউল হকের পরিবার জানায়, স্থানীয় আবদুল হামিদ ১ এপ্রিল সকাল ১১টায় তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান।

তার বাবা মোজাম্মেল হক বলেন, “পরে ভয়েস মেসেজে জানায়, সে মালয়েশিয়া যাচ্ছে। হামিদ বলেছিল সে টেকনাফ পর্যন্ত পাঠিয়েছে। ফিরিয়ে আনতে চাইলে ৭০ হাজার টাকা চায়, আর মালয়েশিয়া পৌঁছালে আরও ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।”

মোজাম্মেল হক জানান, ওই ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা একই এলাকার ফারুকের স্ত্রী মুমেনা আক্তারকে দিলেই হয়ে যাবে। মুমেনা আক্তারের ভাই মো আলম দালাল হিসেবে পরিচিত।

তিনি আরও জানান, ঘটনার পর অভিযুক্ত আবদুল হামিদ ১২ এপ্রিল দেশ ছেড়ে দুবাই চলে গেছেন।

শহরের ‘মাঝি’ও সন্দেহের তালিকায়

কক্সবাজার শহরের ফদনার ডেইল এলাকা থেকে যাওয়া ৬ জনের একজন মো. হামিদ। যিনি উদ্ধার হলেও পাচারের অভিযোগে আটক এবং মামলার এক নম্বর আসামী।

তার ভাই মো. জুবায়ের বলেন, “হামিদ মাছ ধরার ট্রলারে কাজ করে। কাউকে না জানিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। এই যাত্রায় একসাথে যাওয়া তাদের আরেক ছোটো ভাই ইব্রাহিম এখনো নিখোঁজ।”

তবে বে ইনসাইট কথা বলেছে ফদনার ডেইলের অনেক স্থানীয়দের সাথে। কেউ কেউ বলছেন, হামিদের মাধ্যমেই অন্যদের যাওয়া হতে পারে এবং তিনি আগে থেকেই এমন ট্রলারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক মুদি দোকানদার বলেন, এটা ছিলো হামিদের ৬ষ্ঠ মালয়েশিয়া যাত্রা। তার আপন ভাইও যাচ্ছে বলে আরো ৪জনকে সাথে নিয়েছিলো হামিদ। এর আগে আরো ৫ বার যাওয়ায় বাকিরা তাকে বিশ্বাস করেছিলো।

আটক মো. আকবরের স্ত্রী দাবি করেন, “সে গত ২-৩ বছর ধরে টমটম চালায়। বন্ধুদের প্রলোভনে পড়ে চলে গেছে। না যাওয়া নিয়ে অনেক ঝগড়া হয়েছে। সে এর আগে মাছের ট্রলারে কাজ করতো।”

নারী ভুক্তভোগীর করুণ গল্প

ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ১৫ নম্বর ক্যাম্পের রাহেলা বেগমের সাথে যোগাযোগ করা না গেলেও তার বোন সেনোয়ারা বেগম জানান, “রাহেলার বিয়ে হয়েছে ৫ বছর। সন্তান না হওয়ায় স্বামীর বাড়িতে নির্যাতন চলছিল। বেশ কয়েকবার বাপের বাড়িও চলে আসছিলো। একদিন শুনি সে সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে।”

“ভালো কাজের প্রলোভনে দালালরা তাকে মালয়েশিয়া নিতে যাচ্ছিল।”

প্রশাসনের কাছে নিখোঁজের তালিকা নেই

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আন্দামান সাগরে নিখোঁজদের ঘটনায় প্রশাসন প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে।

মুঠোফোনে তিনি বলেন, “আমরা যতটুকু তথ্য পেয়েছি, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।”

প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ থাকার বিষয়ে কোনো তালিকা প্রশাসনের কাছে আছে কি না—এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, “এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা এখনো আমরা পাইনি।”

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বা উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পক্ষ থেকেও এখনো পরিষ্কারভাবে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বা তথ্য প্রদান করা হয়নি।

“যাদের উদ্ধারের কথা বলা হচ্ছে, তারাও বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে না। আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি,” বলেন তিনি।

পুলিশ: ‘পাচারকারীদের নির্দিষ্ট তালিকা নেই’

কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে কোনো মামলা হয়নি।

পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পরামর্শে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো সাইফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “পাচারের ২৫০ জন নিখোঁজের বিষয়ে কোনো মামলা হয়নি।”

ওসি জানান, একটি জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে লোকজন স্থানান্তরের ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড থানায় মামলা করে।

“কোস্টগার্ড ছয়জনের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে মামলা দিয়েছেন,” বলেন তিনি।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে জানিয়ে ওসি বলেন, “নয়জনকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছয়জনকে আসামি করে মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে আটক করা হয়েছে, তারা জেলে আছে।”

টেকনাফ এলাকায় মানবপাচারকারীদের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা পুলিশের কাছে আছে কিনা এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, “মানব পাচারকারীদের নির্দিষ্ট কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই। তবে যারা এসবের সাথে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচার সংক্রান্ত মামলার পরিসংখ্যান জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলো আপনাকে ওভাবে দেওয়া যাবে না, তবে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।”

অনিশ্চয়তা ও হতাশা ‘স্বেচ্ছা পাচারের’ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

রোহিঙ্গাদের পাচারের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বাস্তুচ্যুত ও রাষ্ট্রহীন অবস্থার কারণে তাদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা কাজ করছে।

“ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, নিজ দেশে যুদ্ধ ও বৈরী পরিস্থিতি রয়েছে, আবার ক্যাম্পের জীবনও খুব অনুকূল নয়, সব মিলিয়ে তারা হতাশায় ভুগছে,” বলেন তিনি।

তার মতে, এই ‘হোপলেসনেস’ ও ‘ড্রিমলেসনেস’ অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় প্রলুব্ধ করছে।

“তারা মনে করে সাগরের ওপারে হয়তো ভালো জীবন অপেক্ষা করছে। ফলে কাঠের নৌকায় করেও তারা বিপজ্জনক যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা স্বজনদের সহায়তা নেয়, আবার স্থানীয়ভাবে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে,” যোগ করেন তিনি।

তিনি এটিকে এক ধরনের “স্বেচ্ছায় ট্রাফিকিং” বলেও উল্লেখ করেন।

নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব

রোহিঙ্গাদের মধ্যে ঠিক কতজন মানবপাচারের শিকার হয়েছেন, এমন নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন বলেও জানান শরণার্থী কমিশনার মিজানুর রহমান।

“যারা ট্রাফিক হয়ে সফলভাবে চলে যায়, তাদের তথ্য পাওয়া যায় না। সাধারণত কোনো নৌকাডুবি, উদ্ধার অভিযান বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মাধ্যমে কিছু তথ্য জানা যায়,” বলেন তিনি।

তার মতে, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী বা বিজিবি কাউকে উদ্ধার করলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তখনই জানা সম্ভব হয় যে তারা পাচারের শিকার ছিল বা পাচারের পথে ছিল।

এক ট্রলারে প্রায় ২৮০ জন

বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা মো. রফিকুল ইসলামের ভাষ্যে, ডুবে যাওয়া ট্রলারটিতে প্রায় ২৮০ জন মানুষ ছিলেন। এর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন পাচারকারী ও নৌকার স্টাফ, ২১ জন রোহিঙ্গা নারী এবং চারজন শিশু। প্রায় দেড়শ জন রোহিঙ্গা এবং বাকিরা বাংলাদেশি নাগরিক। সবাই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হয়েছিলেন।

‘মৃত্যুকূপে’ পরিণত কুঠুরি

রফিকুল জানান, ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে। এ সময় পাচারকারীরা যাত্রীদের জোর করে ট্রলারের মাছ ও জাল রাখার চারটি সংকীর্ণ কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দেয়।

“মানুষে মানুষে ঠাসাঠাসি হয়ে যায়। শ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল না,” বলেন তিনি।

অতিরিক্ত ভিড় ও অক্সিজেনের অভাবে ওই কুঠুরিগুলোতেই ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলে দাবি করেন রফিকুল।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন পাচারকারীরা হুমকি দেয়—ডেকে থাকা কেউ নিচে না নামলে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হবে। আতঙ্কের মধ্যেই বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়।

একটি পানির বোতলেই বাঁচার লড়াই

ডুবন্ত ট্রলার থেকে কোনোভাবে একটি দুই লিটারের পানির বোতল আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকেন রফিকুল।

“চারদিকে শুধু মানুষ ডুবছিল… আমি শুধু একটা বোতল ধরে ছিলাম… আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন,” বলেন তিনি।

পরদিন ৯ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ তাকে সহ মোট ৯ জনকে উদ্ধার করে।

এই ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু—যাদের অধিকাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকাও নেই প্রশাসনের কাছে।

দুর্ঘটনাপ্রবণ চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়ন: ২৬.২১ কিলোমিটার অংশের কাজ শেষ হবে ২০২৯ সালে

চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “হাইওয়ে ইম্প্রুভমেন্ট ফেজ-ওয়ান”-এর আওতায় মহাসড়কের ২৬ দশমিক ২১ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পের পিপিপি (PPP) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, এই অংশের কাজ ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লেনের একটি ফ্লাইওভারও নির্মাণ করা হবে।

বাকি অংশে সমীক্ষা, অর্থায়নে জাইকার সঙ্গে আলোচনা

তিনি বলেন, মহাসড়কের প্রায় ৪৮ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করতে বর্তমানে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) চলছে।

এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা (JICA)-র সঙ্গে আলোচনা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এ অংশের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।

১৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের পুরোটা চার লেনে উন্নীত করতে একাধিকবার সমীক্ষা চালানো হয়েছে।

আগের সমীক্ষায় ১০ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলন

এর আগে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সুইডিশ কনসালট্যান্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা যাচাই করে।

সেই সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়ক

চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে দুর্ঘটনাপ্রবণ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করেছে।

“চিহ্নিত স্থানগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা কমবে,” বলেন তিনি।

গভীর সমুদ্রে মৃত্যু ফাঁদ:‘পশুর মতো আটকে রেখে’ ট্রলার যাচ্ছিলো মালয়েশিয়া

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের কুতুপালং বাজার থেকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে রফিকুল ইসলামকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় টেকনাফের কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের রাজাছড়া এলাকায়। ২ এপ্রিল সেখানে একটি ঘরে তাকে ২০ থেকে ২৫ জনের সঙ্গে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়। বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেই চলত নির্যাতন। রফিকুলের ভাষায়, “পশুর মতো বন্দী করে রাখা হয়েছিল, আশপাশের অনেক ঘরেই একইভাবে মানুষ আটকে ছিল।”

ধাপে ধাপে সমুদ্রে পাচার

৪ এপ্রিল রাতে রাজাছড়া সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ এলাকা থেকে ছোট মাছ ধরার নৌকায় করে তাদের সমুদ্রে নেওয়া হয়। পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে ছোট ট্রলার বদলে বড় ফিশিং ট্রলারে তোলা হয় তাদের, যা সেন্ট মার্টিনের অদূরে মিয়ানমারের জলসীমার দিকে অগ্রসর হয়।

এক ট্রলারে প্রায় ২৮০ জন

রফিকুল জানান, ট্রলারটিতে প্রায় ২৮০ জন মানুষ ছিল। এর মধ্যে ১৩ জন ছিল পাচারকারী ও নৌকার স্টাফ, ২১ জন রোহিঙ্গা নারী এবং চারজন শিশু। প্রায় দেড়শ জন রোহিঙ্গা এবং বাকিরা বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। সবাই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হয়েছিলেন।

মৃত্যুকূপে পরিণত কুঠুরি

রফিকুল বলেন, ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে। এ সময় পাচারকারীরা যাত্রীদের জোর করে ট্রলারের মাছ ও জাল রাখার চারটি সংকীর্ণ কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দেয়।

অতিরিক্ত মানুষের চাপে ও অক্সিজেনের অভাবে সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলে জানান রফিকুল।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন পাচারকারীরা যাত্রীদের হুমকি দেয়- ট্রলারের ডেকে থাকা কেউ কুঠুরিতে না নামলে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হবে। এর মধ্যেই বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক আর আর্তনাদ।

একটি পানির বোতলেই বাঁচার লড়াই

ডুবন্ত ট্রলার থেকে কোনোভাবে একটি দুই লিটারের পানির বোতল আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকেন রফিকুল। তার ভাষায়, “চারদিকে শুধু মানুষ ডুবছিল… আমি শুধু একটা বোতল ধরে ছিলাম… আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন।”

৯ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ তাকে সহ মোট ৯ জনকে উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ রয়েছেন।

আরেক বেঁচে ফেরা কণ্ঠ

উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গা যুবক মো. ইমরান জানান, ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে তিনি এই যাত্রায় বের হয়েছিলেন। ট্রলার ডুবে গেলে তিনি একটি পানির ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভেসে ছিলেন, পরে উদ্ধার পান।

আইনি ব্যবস্থা ও তদন্ত

এ ঘটনায় কোস্ট গার্ড বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেছে বলে জানান টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।

ওসি বলেন, উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জন দালালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ৩ জন ভিকটিমকে আদালতের মাধ্যমে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।

জাতিসংঘের উদ্বেগ: এটি শুধু দুর্ঘটনা নয়

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলছে, এই ঘটনা একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি, ক্যাম্পের কঠিন জীবন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং কমে যাওয়া মানবিক সহায়তা মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।

সংস্থা দুটি এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছে, আন্দামান সাগরে একটি নৌকা ডুবির ঘটনায় কমপক্ষে ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকরা আছেন।

সমাধান ছাড়া থামবে না মৃত্যুযাত্রা

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও নৃবিজ্ঞানী রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ না হওয়া এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত না হলে এমন বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। পাচারকারীরা এই অসহায় পরিস্থিতিকে পুঁজি করে আরও মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সমুদ্র শুধু ঢেউ নয়

বাংলাদেশ যখন নতুন বছরকে বরণ করছে, তখন আন্দামান সাগরের এই মর্মান্তিক ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সমুদ্র শুধু নীল জলরাশি নয়, কখনো তা হয়ে ওঠে শত মানুষের নিঃশব্দ কবর।

টেকনাফের ঘরে ঘরে মায়ের আর্তনাদ ‘আমার ছেলে কই’?

আব্দুর রহমান, টেকনাফ | কক্সবাজার

কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রের ঢেউ কখনো শুধু পানি নয়, কখনো তা বয়ে আনে কান্না, হারিয়ে যাওয়ার গল্প, আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস। টেকনাফের উপকূলে আজ ঢেউ ভাঙে ঠিকই, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে মিশে থাকে অসংখ্য মায়ের আর্তনাদ “আমার ছেলে কই?”

শাহপরীর দ্বীপের সরু গলিতে, বিকেলের মাঠে, কিংবা নাফ নদীর পাড়ে, যেখানে একসময় শিশুদের হাসি, ফুটবলের দৌড় আর স্বপ্নের উড়ান ছিল, সেখানে এখন অনিশ্চয়তার ছায়া।

টেকনাফে এখন রাত নামলেই শুধু অন্ধকার নামে না, নামে আতঙ্ক। সমুদ্রপথে ভেসে যায় স্বপ্ন, আর তীরে বসে থাকে পরিবার। কেবল অপেক্ষায়, প্রতীক্ষায়, আর অবিরাম কান্নায়।

প্রলোভনের ফাঁদে নিখোঁজ আনাছ

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের কিশোর মোহাম্মদ আনাছ। বয়স মাত্র ১৪। স্থানীয় হাজি বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ফুটবল ছিল তার স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নই তাকে ঠেলে দেয় অন্ধকারে।

বিদেশে ফুটবল খেলার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় দালালচক্র তাকে ঘর থেকে বের করে আনে। পরে মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় আরেক দালাল চক্রের কাছে। সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাকে তুলে নেওয়া হয় একটি নৌকায়।

পরিবারের সঙ্গে শেষ যোগাযোগ হয় একটি ফোন কলে। ওপার থেকে দাবি করা হয় তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ। না দিলে হত্যার হুমকি।

ধারদেনা করে সেই টাকা জোগাড় করে পরিবার। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আনাছ আর ফেরেনি।

“টাকা দিলাম, ছেলেকে পেলাম না”

আনাছের মা ছমুদা বেগমের কণ্ঠে এখনও অপেক্ষা আর হতাশা:

ফুটবল খেলার কথা বলে আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। পরে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে তিন লাখ টাকা নিল। এখনো আমার ছেলেকে ফেরত দেয়নি। পুলিশের কাছেও গেছি, কোনো বিচার পাইনি।

পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত দালালরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আনাছের মা ছমুদা বেগম বলেন, “মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা ‘দালাল’ ইব্রাহীমের কথা মতো তার ভাতিজা স্থানীয় মো. ফারুকসহ স্বজনকে তিন লাখ টাকা দিই। তবে এখনও ছেলেকে ফিরে পাইনি। এ বিষয়ে স্থানীয় পুলিশসহ জনপ্রতিনিধির কাছে অভিযোগ দিয়েছি, তবে কোনো সুরাহা হয়নি।”

খেলতে গিয়ে আর ফেরা হয়নি

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উত্তরপাড়ার একটি সাধারণ পরিবার। সেখানেই থাকতেন আব্দুর রহমান। সবার মতোই স্বাভাবিক জীবন, ছিলো হাসি, গল্প আর স্বপ্নে ভরা দিনগুলো।

কিন্তু একদিন বিকেলে খেলতে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি।

প্রথমে পরিবার ভেবেছিল, হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও গেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, রাত পেরিয়ে দিন কিন্তু আব্দুর রহমানের কোনো খোঁজ মেলেনি। উদ্বেগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় আতঙ্কে।

কয়েকদিন পর হঠাৎ করেই আসে সেই ফোন কল, অচেনা নম্বর অপর প্রান্তে অচেনা কণ্ঠ। সেখান থেকেই জানা যায়, স্থানীয় দালালচক্রের মাধ্যমে তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে।

এরপর শুরু হয় দুঃস্বপ্নের আরেক অধ্যায়।

আব্দুর রহমানের ভাই আব্দুস সালাম বলেন,

ওকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর আমাদের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করে। না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমরা তো গরিব মানুষ, এত টাকা জোগাড় করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পরিবারের প্রতিটি দিন এখন অনিশ্চয়তায় কাটে। ফোনের অপেক্ষা, কোনো খবরের আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা, সবকিছু যেন এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।

আব্দুর রহমান বেঁচে আছে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরও আজ তাদের কাছে অজানা।

পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ চিত্র

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী:

  • ২০১৬–২০২৫ পর্যন্ত কক্সবাজারে ৩,১৩৪ জন মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করা হয়েছে
  • তাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা
  • ১১৫টি মামলা হয়েছে উখিয়া-টেকনাফ থানায়
  • আসামি করা হয়েছে প্রায় ১,১০০ জনকে
  • আটক হয়েছে প্রায় ৬০০ পাচারকারী

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে সাগর থেকে ২৬৩ জন নারী-শিশুসহ যাত্রীকে উদ্ধার করে নৌবাহিনী। আটক করা হয় পাচারচক্রের ১০ সদস্যকে।

নতুন রুট: ছোট ট্রলার থেকে গভীর সমুদ্র- যেভাবে সক্রিয় দালালচক্র

সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপের ঘোলার চর এলাকা ঘিরে পাচার তৎপরতা নতুন করে বেড়েছে বলে অভিযোগ।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি কয়েকটি ধাপে কাজ করে।

প্রথম ধাপে, স্থানীয় দালালরা গ্রামের কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করে। কেউ ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখায়, কেউ বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে খেলতে বের হওয়া বা ঘরের বাইরে থাকা অবস্থায় সরাসরি অপহরণ করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে, ভুক্তভোগীদের দ্রুত গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিবার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগেই তাদের উপকূলীয় নির্জন পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে ছোট ট্রলার।

তৃতীয় ধাপে, রাতের আঁধারে এসব ট্রলারে করে তাদের গভীর সমুদ্রে নেওয়া হয়। সেখানে অপেক্ষমান বড় জাহাজ বা ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়, যেগুলো মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

চতুর্থ ধাপে শুরু হয় মুক্তিপণের খেলা। ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, বিদেশে অবস্থানরত চক্রের সদস্যরা ফোন করে কয়েক লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে নির্যাতন, এমনকি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের কান্না বা নির্যাতনের শব্দও ফোনে শোনানো হয়, যাতে পরিবার দ্রুত টাকা জোগাড় করে।

পঞ্চম ধাপে, মুক্তিপণ আদায়ের পরও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের আর খোঁজ মেলে না। কেউ নিখোঁজ থাকে, কেউ মারা গেছে, এমন আশঙ্কা থেকে যায় পরিবারের মধ্যে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বে ইনসাইট জানতে পারে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্থানীয় দালালদের পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে। স্থানীয়ভাবে যারা লোক সংগ্রহ করে, তারা বিদেশে থাকা চক্রের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করে এবং পরে মুক্তিপণের অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়।

ভুক্তভোগী পরিবার গুলোর দাবি, এদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে কাজ করে আসছে এবং এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় সহজে আইনের আওতায় আসছে না।

এই প্রক্রিয়ায় অনেককে জোরপূর্বক নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাতের আঁধারে ১৫ পয়েন্টে পাচার

টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে নিয়মিত পাচার চলছে বলে খোঁজ পেয়েছে প্রতিবেদক। এসব কাজে জড়িত রয়েছে একটি সুসংগঠিত দালাল নেটওয়ার্ক।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে একাধিক স্থানীয় দালালের নাম, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

অভিযুক্ত দালালদের তালিকা

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে।

তারা হলেন- মোহাম্মদ তাহের, মোহাম্মদ ইসমাইল, শাহাব মিয়া, মো. আজগর, নুরুল নবী, হেলাল উদ্দিন, মো. ফেরুজ, পোয়া মাঝি, শওকত আলম, নজির আহমেদ, আবু তাহের, মাম্মা, নজরুল পুতু, লাল মিয়া, শাহজান মিয়া, সৈয়দ উল্লাহ, মো. শামীম কাসু, মো. ফয়সাল, আব্দুল আমিন, মো: হোসন, প্রকাশ মাহসন, মো. হাসান (প্রকাশ আতুড়ি), রেজাউল করিম (মোরাদ), মাহামুদুল হক, মোহাম্মদ আমিন (প্রকাশ বদ্দা মাঝি), আজিজুল হক, মোহাম্মদ দেলোয়ার, জামাল হোছন এবং মোহাম্মদ রফিক (প্রকাশ বার্মায়া রফিক)।

তবে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

পুলিশের অবস্থান: “অভিযান চলছে”

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন:

মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। এটি প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ তৎপর। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়াগামী ট্রলার সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

অপেক্ষার প্রহর

টেকনাফের উপকূলজুড়ে এখন এক অদৃশ্য আতঙ্ক। সাগরের ঢেউ যেমন ফিরে আসে, তেমনি কি ফিরবে হারিয়ে যাওয়া সন্তানেরা?

আনাছের মা এখনও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রতিটি শব্দে চমকে ওঠেন, হয়তো এবার ফিরবে তার ছেলে। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, সেই আশা ততই ফিকে হয়ে আসছে।

একটা প্রলোভন, একটা ডাকে সাড়া। “বিদেশে খেলতে যাবে?” এরপরই নিখোঁজ হয়ে যায় আনাছের মতো শত শত কিশোর।

ঘর থেকে বের হওয়া সেই ছোট্ট পা, ফিরে আসে না আর। ফোন আসে, দাবি আসে, ভয় আসে। ফিরে আসে না শুধু মানুষটা।

হাতে তেলের মজুদ, রাস্তায় দীর্ঘ লাইন: সংকটটা কোথায়?

বে ইনসাইট | ঢাকা

তপ্ত দুপুর। মাথার ওপর চৈত্রের রোদ, পিচঢালা সড়ক থেকে উঠছে গরম হাওয়া।
রাজধানীর আসাদগেটে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাফওয়ান। পড়াশোনার খরচ জোগাতে অবসরে রাইড শেয়ারিং করেন। কিন্তু আজ তার সময় যাচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে।

দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তার সামনে গাড়ির লাইন, পেছনেও একই চিত্র। এই লাইন আসাদগেট থেকে বিজয় সরণি, দুই কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব পেরিয়ে গেছে।

সাফওয়ান বে ইনসাইটকে বলেন, “পাম্পগুলো আগের বছরের পারফরম্যান্স অনুযায়ী তেল পাচ্ছে। অনেক পাম্পেই কম পড়ে যাচ্ছে। এজন্যই মনে হয় এমন লাইন।”

তথ্য বলছে, আমদানি করা ডিজেলের চাহিদা বাংলাদেশে বেশি থাকলেও, দীর্ঘ সারির অধিকাংশ বাইক বা গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে অকটেন বা পেট্রোলের জন্য। অথচ দেশেই এই চাহিদার একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয়।

একারণেই প্রশ্নটা থেকে যায়, সংকট কি সত্যিই তেলের?

উৎপাদন আছে, তবুও অস্থিরতা

পরিসংখ্যান বলছে, গল্পটা এত সরল নয়। বাংলাদেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন, অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন।

দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে এর একটি বড় অংশই উৎপাদন হচ্ছে দেশে।
পেট্রোলের প্রায় অর্ধেক, অকটেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

শুধু সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টেই গত অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার টনের বেশি পেট্রোল আর ৫৫ হাজার টনের বেশি অকটেন।

অর্থাৎ চাকা থামিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ঘাটতির গল্প এখানে নেই।

তবুও শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে শত শত যানবাহন। যেন জ্বালানি নয়, ‘অপেক্ষা’ই এখন প্রধান জ্বালানী।

সংকটের নতুন নাম: আতঙ্ক

বাস্তবতা বলছে, এটি জ্বালানির ঘাটতির চেয়ে বেশি মানসিক সংকট।

গুজব, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের ভয় এই তিনে মিলে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য চাপ।

পাম্প মালিকদের ভাষায়, মানুষ এখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছেন। অনেকে মজুত করছেন, “যদি পরে না পাওয়া যায়” এই আশঙ্কায়।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বে ইনসাইটকে বলেন,

“মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুজব ছড়াচ্ছে, মিডিয়াও কিছুটা ভূমিকা রাখছে।”

অর্থাৎ পাম্পে যতটা তেল কমছে, তার চেয়ে বেশি কমছে মানুষের আস্থা।

পাম্পগুলো তেল মজুত করছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “তেল ডিপো থেকে শুধু পাম্পেই আসে না, নানা দপ্তরে যায়, কলকারখানায় যায়, সরকারি অফিসে যায়। সেখান থেকে তেল মজুদ হতে পারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, আমাদের তেল বিক্রি না করে মজুত করার প্রশ্নই আসে না।”

মজুত আছে, তবুও পৌঁছাচ্ছে না

সরকারি হিসাব বলছে, দেশে জ্বালানির মজুত স্বাভাবিক।

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দেয়া তথ্যমতে বর্তমানে রয়েছে-

  • প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল
  • ১৬ হাজার টন পেট্রোল
  • ১০ হাজার ৫০০ টন অকটেন

এপ্রিল মাসে আরও আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে চলছে অভিযান। মার্চ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত ৩৪২টি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ লিটার জ্বালানি।

কিন্তু এই সংখ্যাগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে যেন পৌঁছায় না।

কারণ বাস্তবতার আরেকটি দিক আছে, সরবরাহের অসমতা। যেখানে তেল আছে, সেখান থেকে যেখানে প্রয়োজন সেই যাত্রাপথেই তৈরি হচ্ছে ফাঁক।

দাম, লোকসান আর নীতির দ্বিধা

বর্তমানে এক লিটার ডিজেলের সরবরাহ খরচ প্রায় ২০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। প্রতিদিন লোকসান প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা।

এই আর্থিক চাপ সরকারের ওপর যেমন আছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে বাজারের আচরণেও।

সংসদে জ্বালানির দাম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছিলেন, “গত মাসে সরকার কোনো মূল্যবৃদ্ধি করেনি। তবে আগামী মে মাসের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কাজ চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং মন্ত্রিপরিষদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে দাম সমন্বয় করা হবে।”

তবে বিষয়টি নিয়ে বে ইনসাইটের সাথে কথা হয় বিশ্লেষক ও এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার এর সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের। তিনি বলেন, “পদ্ধতি তৈরি করে সেভিংস করার জন্য এই মূল্য সমন্বয় দরকার ছিল। কিন্তু দাম সমন্বয় করলে চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে সেটি উল্টো প্রভাবও ফেলতে পারে।”

এর মধ্যেই বিশ্ববাজারে এসেছে নতুন মোড়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে তেলের দাম কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বিবিসি তার খবরে বলছে, বিশ্ববাজারে বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলার ৩০ সেন্টে নেমে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া তেলের দাম প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ কমে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ যেখানে দেশে দাম বাড়ানোর চিন্তা, সেখানে বিশ্ববাজারে দাম কমার ইঙ্গিত।

এই দ্বন্দ্বই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন।

সমাধান: নিয়ন্ত্রণ, না আস্থা?

বিশৃঙ্খলার এই চিত্রে বিশেষজ্ঞরা খুঁজছেন প্রযুক্তির সমাধান। শ্রীলঙ্কার মতো কিউআর কোডভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল নেওয়া যাবে না।

মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের মতে, “ট্রাফিক পুলিশের কাছে স্ক্যানার থাকে, তারা স্ক্যান করে আপনার গাড়িতে কোন প্রবলেম থাকলে ধরে ফেলে। প্রত্যেকটা গাড়িতো ডিজিটাইজড। পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা আছে, তাদের কাছে একটা স্ক্যানিং সিস্টেম চালু করিয়ে দেন।”

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “সংকট পুরোপুরি নেই, কিন্তু যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। একাধিকবার বেশি তেল নেওয়ার প্রবণতা থাকলে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”

অর্থাৎ সংকট সমাধানে শুধু জ্বালানি নয়, ব্যবস্থাপনাই মূল বিষয়।

বৈশ্বিক চাপের ছায়া

এই সংকট শুধু দেশের ভেতরের নয়। বিশ্ববাজারেও অস্থিরতা চলছে।

ইরান যুদ্ধ, সরবরাহ অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।

বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য ডিজেল, ক্রুড অয়েল ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করাই হয়ে উঠতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।

অপেক্ষার শহর

আমরা যখন এই হিসাব-নিকাশ করছি, আসাদগেটের সেই লাইন তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, কিন্তু অপেক্ষা শেষ হয়নি।

সাফওয়ান এখনও দাঁড়িয়ে, তার বাইকের ট্যাংক প্রায় খালি।

রাজনৈতিক পালাবদলের পর কক্সবাজারে ‘বেপরোয়া’ পাহাড় কাটা!

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর থেকেই কক্সবাজারে হঠাৎ করে পাহাড় কাটার প্রবণতা বেড়েছে।

কক্সবাজারে পাহাড় কাটার ওপর হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা কার্যত অমান্য করে চলছে বিস্তৃত ‘মাটি বাণিজ্য’। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির ফাঁক গলে রাতের অন্ধকারে রামু, পেকুয়া, উখিয়া ও সদর উপজেলায় একের পর এক পাহাড় সমতল করা হচ্ছে, যার মাটি যাচ্ছে ইটভাটা ও নির্মাণ প্রকল্পে।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত এক্সকাভেটর চালিয়ে পাহাড় কাটা হয়, যাতে দিনের বেলায় প্রশাসনের নজরে না পড়ে। এতে শত বছরের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি দ্রুত বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

দীর্ঘদিন পাহাড় রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত পরিবেশকর্মীদের দাবি, প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের অবহেলা এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতায় এই অবৈধ কর্মকাণ্ড নতুন মাত্রা পেয়েছে।

পাহাড় কাটা বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, “নির্বাচনের পর হঠাৎ করেই পাহাড় কাটার ঘটনা বেড়ে গেছে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, অনেক ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ায় এর মূল কারণ। এমনকি এতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।”

ঈদের ছুটিতে ২০০ ফুট পাহাড় ‘গায়েব’

রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পূর্ব লামাপাড়ার ঘোনারপাড়া এলাকায় ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রায় ২০০ ফুট উচ্চতার একটি পাহাড়, যার আয়তন প্রায় ১০ একর, সম্পূর্ণ সমতল করে ফেলা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন রাত ৭টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটি কেটে ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব মাটি গেছে আশপাশের ইটভাটা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে।

একই ইউনিয়ন ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি এলাকায় অন্তত আটটি পাহাড় ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, “ঈদের ছুটিতে কাউয়ারখোপ ও দক্ষিণ মিঠাছড়িতে পাহাড় কাটার মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।”

অভিযানে মিলেছে ৯০ হাজার ঘনফুট মাটি উত্তোলনের প্রমাণ

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) পরিদর্শক মুসাইব ইবনে রহমান জানান, গত ৩০ মার্চ রামুর লামাপাড়া, ঘোনারপাড়া ও স্কুলপাড়া এলাকায় যৌথ অভিযানে পাহাড় কাটার ৮-৯টি স্থান শনাক্ত করা হয়।

“কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৯০ হাজার ঘনফুট মাটি উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

এ সময় একটি এক্সকাভেটর ও একটি ডাম্প ট্রাক জব্দ করা হয় এবং ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

‘হাতেনাতে না ধরলে শাস্তি দেওয়া যায় না’

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, অভিযান অব্যাহত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

ফজলে রাব্বি চৌধুরীর মতে, “মোবাইল কোর্ট আইনে হাতেনাতে না ধরলে শাস্তি দেওয়া যায় না, এ সুযোগটাই নিচ্ছে অপরাধীরা।”

আইনি নোটিশ, কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না নির্দেশনা

গত ১০ মার্চ বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলা) ১২ জন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠায়। এতে ২০১২ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় পাহাড় কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

আইন অনুযায়ী, ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। যার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

‘ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি’ দেখিয়ে দায় এড়ানোর অভিযোগ

পেকুয়ার টইটং ইউনিয়নের “আসমানের খুঁটি” নামে পরিচিত পাহাড়টির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিন-রাত এক্সকাভেটর চালিয়ে ২.৫ একর আয়তনের পাহাড়টি সমতল করা হয়েছে।

বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, “এটি সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই বন বিভাগের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে উখিয়ার থোয়াইংকাটা, সদরকাটা এবং রাজাপালং এলাকাতেও, যেখানে পাহাড় কিনে বা দখল নিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ কেমিস্ট আব্দুস সালাম বলেন, কোনো পাহাড় সরকারি বা ব্যক্তিগত হোক, তা কাটা যাবে না। তিনি জানান, টইটং ও শিলখালীতে পাহাড় কাটার ঘটনায় পৃথক মামলা দায়েরের জন্য চট্টগ্রামের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অবৈধ ভাবে পাহাড় কাটলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

‘প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় বাড়ছে ধ্বংস’

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, পাহাড় কাটার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে মাটি বাণিজ্য। আর প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও নিষ্ক্রিয়তাই এ ধ্বংসযজ্ঞকে উৎসাহ দিচ্ছে।

পরিবেশকর্মী দীপক শর্মা দীপু বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে কক্সবাজারের পাহাড় একসময় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি এবং কৃষিজমির ক্ষতি হবে।”

তিনি পাহাড় ও বন রক্ষায় বন বিভাগের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।

বর্ষা সামনে, ঝুঁকি বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়বে। প্রতিবছর চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় ধসে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এ অবস্থায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

টেকনাফ স্থলবন্দর চালুঃ বাস্তবতা ও নিরাপত্তা কতোটুকু?

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর টেকনাফ স্থলবন্দর পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। তবে সরকারি এই সিদ্ধান্তের পরও নিরাপত্তা, নৌপথ ও বাস্তব বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়ে গেছে নানা সংশয় ও ভিন্নমত।

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে টেকনাফ স্থলবন্দর পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আজ থেকে বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় সচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কার্যক্রম চালানো হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপের কথাও জানান তিনি।

নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন চিত্র

তবে মন্ত্রীর এই ঘোষণার পরও বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সরল নয়।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক আবেদ আহসান সাগর বে ইনসাইটকে বলেন, “আমাদের মনে হয়েছে বন্দরের কার্যক্রম চালু না হওয়ার পেছনে মূল ফ্যাক্টর ছিল নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আপত্তি, বিশেষ করে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অবস্থান ছিল নেগেটিভ।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে, বন্দর ব্যবহার করে চোরাচালান বৃদ্ধি, বিশেষ কিছু পণ্যের (যেমন সিমেন্ট ও রড) সম্ভাব্য অপব্যবহার, এবং সীমান্ত পরিস্থিতির ঝুঁকি।

এছাড়া বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে ব্যবসায়ীরা এর বিরোধিতা করেছেন, কারণ বন্দরের নিজস্ব আইনগত কাঠামো রয়েছে।

স্ক্যানার বসানোর প্রস্তাব

বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আসে পণ্য তদারকির জন্য স্ক্যানার স্থাপন নিয়ে।

সাগর বলেন, “মন্ত্রী বলেছেন বন্দরে স্ক্যানার বসানো হবে। এতে পণ্য ওঠানামার সময় স্ক্যানের মাধ্যমে যাচাই করা যাবে। বিজিবি চাইলে গেট বা চেকপোস্টে তল্লাশি করতে পারবে।”

‘চালু’ ঘোষণা, কিন্তু পণ্য আসেনি

টেকনাফ স্থলবন্দরের মহাব্যবস্থাপক জসীম উদ্দিন জানান, বাস্তবে এখনও বাণিজ্য শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, “বন্দর তো খোলা ছিলই। এখনো আমরা প্রস্তুত আছি। মালপত্র আসলে কার্যক্রম শুরু হবে, তারপরই বোঝা যাবে পরিস্থিতি।”

আরাকান আর্মি ও নৌপথের জটিলতা

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে আরাকান আর্মি নাফ নদীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে পণ্যবাহী ট্রলার আটকে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু বন্দর চালুর ঘোষণা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

আবেদ আহসান সাগর বলেন, “বর্তমান নৌপথে চলাচল করতে গিয়ে অনেক সময় মিয়ানমারের জলসীমা ব্যবহার করতে হয়। এই কারণে বিভিন্ন গ্রুপকে টাকা দিতে হচ্ছে। নাফ নদের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় ড্রেজিং করা গেলে বিকল্প পথ তৈরি হবে, তখন এই ঝুঁকি কমবে।”

তার মতে, ড্রেজিং না হলে কিছুদিন পর আবারও বন্দর অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আটকে

ব্যবসায়ীদের দাবি, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিপুল অর্থ আটকে আছে।

সাগর বলেন, “প্রায় ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ড্রাফট আকারে আটকে আছে। পণ্য আসতে পারলেই এই অর্থ সমন্বয় করা সম্ভব হবে।”

ব্যবসায়ীদের আশাবাদ, তবে শর্তসাপেক্ষ

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বন্দর চালুর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, “এটা ব্যবসায়ীদের জন্য অবশ্যই ভালো। পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ নিত্যপণ্য কম খরচে আসতে পারবে। রাজস্বও বাড়বে।”

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, “আমরা আরাকান আর্মিকে বুঝি না, আমরা বুঝি ওপারের ব্যবসায়ীদের। তারা কীভাবে মাল পাঠাবে, সেটা তাদের দায়িত্ব।”

নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান

এদিকে টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মুহাম্মদ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “মন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা সেটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছি। নিরাপত্তা বিষয়টি আলোচনা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা কাঠামো জোরদারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর ২৭ একর জমির ওপর টেকনাফ স্থলবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।

তবে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল একটি কাঠবোঝাই ট্রলার আসার পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় আমদানি কার্যক্রম।

সরকারি ঘোষণায় বন্দর চালুর পথ খুললেও, বাস্তবে বাণিজ্য কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হবে—তা নির্ভর করছে সীমান্ত নিরাপত্তা, নৌপথের সক্ষমতা এবং মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর।

খোরশেদ হত্যা: “রাকিবদের ঘটনাস্থলে দেখেছে তারেক”

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের আলোচিত ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও ছাত্রদল কর্মী খোরশেদ আলম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি তারেকের বক্তব্য নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছে পুলিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তারেক পুলিশকে বলেছেন—ঘটনার সময় তিনি অন্য আসামি রাকিবসহ কয়েকজনকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন।

এ নিয়ে ওই কর্মকর্তার প্রশ্ন, “সে যদি ঘটনায় জড়িত না থাকে, তাহলে ঘটনাস্থলে অন্যদের কিভাবে দেখলো? সে কি দূরবীন দিয়ে দেখেছে?”

প্রযুক্তির সূত্রে রাকিবের উপস্থিতির তথ্য

তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার দিন রাকিবের ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।

মোবাইল ফোনের লোকেশন ডাটা ও অন্যান্য ডিজিটাল ট্রেইল বিশ্লেষণ করে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে দাবি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।

পুলিশের মতে, এ তথ্য মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং রাকিবের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা যাচাইয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দুইজনকে ঘিরে তদন্ত, ‘সঠিক লাইনে’ থাকার দাবি পুলিশের

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এই মামলায় আপাতত দুইজনকে ঘিরেই তদন্ত এগোচ্ছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বে ইনসাইটকে বলেন, “মামলায় জড়িত সন্দেহে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে আমরা সঠিক লাইনে আছি। তদন্ত চলছে, আরও গভীরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।”

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চিন্ময় বড়ুয়া জানান, প্রধান আসামি তারেককে ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য আসামি রাকিবকে একটি পৃথক মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের সময় সেখান থেকেই আটক করা হয়।

তবে এখনো তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। শিগগিরই রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি।

সম্পর্ক ও যোগাযোগ: ‘তারিনকে ফোন দিয়ে ডাকে খোরশেদ’

তদন্তে সংশ্লিষ্টদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্কও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে ‘তারিন’ নামে এক নারীর সঙ্গে খোরশেদের যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও এখনো তার সম্পৃক্ততার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা দেখছি তাদের (খোরশেদ ও তারিন) মধ্যে আগে থেকে সম্পর্ক ছিল। মাঝখানে কিছুটা বিরতি ছিল। এখন পর্যন্ত তারিনের সম্পৃক্ততা পাইনি, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”

বে ইনসাইটের প্রশ্নে তিনি জানান, “তারিনকে ফোন দিয়ে ডাকে খোরশেদ

তিনি আরও বলেন, “কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে তো আমরা অপরাধী বানাতে পারি না। আমাদের উপর আস্থা রাখুন।”

সিসিটিভি বিশ্লেষণ: মাঝপথেই ‘গ্যাপ’

ঘটনার আগে ও পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে তদন্তকারী সংস্থা। তবে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এদিকে বে ইনসাইটের হাতে আসা কিছু ফুটেজ যাচাই করে দেখা গেছে, ঘটনার দিন প্রধান অভিযুক্ত ‘কাকা তারেক’কে রাত সাড়ে ৯টার আগেপরে সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের সামনে দেখা যায়।

কিন্তু এরপরের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই সময়ের ফুটেজ মুছে গেছে।

স্থানীয় কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, তারেক সেখানে কিছু সময় লুডু খেলছিলেন। তবে কেউ সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি।

সহবাসীর দাবি: “জামিন পেয়ে খুশি ছিল তারেক, নাচও করেছে”

ঘটনার দিন তারেকের গতিবিধি নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন তার এক সহবাসী।

তার দাবি, “সেদিন কলাতলির একটি ঘটনায় হওয়া মামলায় জামিন পাওয়ার পর কোর্ট থেকে ফিরে সন্ধ্যায় বাসায় গিয়ে গোসল করে ‘ফ্রেশ’ হন তারেক, এমনকি কিছু সময় নাচও করেন এবং ঘুমান।”

পরে তারেকসহ তারা তিনজন অটোরিকশায় ঝাউতলা থেকে সুগন্ধা এলাকার প্রাসাদ প্যারাডাইসের সামনে যান।

সেখানে গিয়ে তারেক কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে লুডু খেলতে বসেন, আর ওই সহবাসী অন্য একজনের সঙ্গে সৈকতের দিকে যান।

তিনি বলেন, “পরে এসে দেখি তারা নেই। ফোন দিলে তারেক জানায়, সে ঝাউতলার বাসায় ফিরে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “কীভাবে গেছে, তা আমি দেখিনি। তবে সিসিটিভিতে থাকতে পারে।”

এ সময় ‘ফকির গ্রুপ’-এর কিছু সদস্য বাইকে এসে তারেককে খুঁজেছেন বলেও জানান তিনি।

মায়ের দাবি: “বাড়িতে এসে খেয়ে ঘুমিয়েছে”

অন্যদিকে, তারেকের মা ছেলেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

তিনি বলেন, “আমার ছেলে বলেছে, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে লুডু খেলা শেষ করে ঝাউতলার বাসায় যায়, তারপর গোসল করে রামুতে বাড়িতে আসে।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর সে কক্সবাজার থেকে রামুর বাড়িতে আসে এবং তারেক খাবার চান । পরে ঘুমিয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, “আমি তাকে বিছানা করে দিই। এরপর সে ঘুমিয়ে পড়ে। আমার ছেলে নির্দোষ।”

সহবাসী ও মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন তারেক দুইবার গোসল করেন—একবার সন্ধ্যায় বের হওয়ার আগে, আরেকবার রাত ১১টার দিকে বাসায় ফেরার পর।

পূর্বের অপরাধের রেকর্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের আগের অপরাধমূলক ইতিহাসও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এই গ্রুপটির আগেও বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের তথ্য আছে। তাদের রেকর্ড ভালো না।”

প্রাথমিকভাবে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত, তবে তদন্ত চলমান

তদন্তকারীরা বলছেন, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।

এক কর্মকর্তা বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে তারাই জড়িত। তবে আমরা আরও গভীরভাবে তদন্ত করছি।”

ঘটনার পটভূমি

গত ২৪ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন খোরশেদ আলম।

তিনি সদর উপজেলার ইসুলোর ঘোনা এলাকার বাসিন্দা শাহ আলমের ছেলে এবং ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে ঘিরে ফেলে হামলা চালায় এবং একপর্যায়ে ছুরিকাঘাত করে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার সময় তার সঙ্গে থাকা তারিন নামে এক নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।

তারিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “একদল দুর্বৃত্ত তাদের ঘিরে ধরে মূল্যবান জিনিস দাবি করে। এক পর্যায়ে ‘আরিফ’ নামে একজনকে মারধরের অভিযোগ তুলে খোরশেদকে ছুরিকাঘাত করা হয়।”

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি ছমিউদ্দিন বলেন, “প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের ঘনিষ্ঠদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে।”