শিক্ষক-সংকটে ধুঁকছে কক্সবাজারের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো: খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজারে মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও প্রশাসনিক সংকটে চলছে। জেলার ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শুধু কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া বাকি ৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।

একইসঙ্গে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদেও রয়েছে বড় ধরনের শূন্যতা। শুধু টেকনাফ এজাহার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনো বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই। এমনকি দুই শিফটের প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-তেও নেই সহকারী প্রধান শিক্ষক।

বিষয়ভিত্তিক সহকারি শিক্ষক পদের ক্ষেত্রেও আছে ভয়াবহ সংকট। কোথাও কোথাও খন্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ মোট ৪৯টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৩৩ জন, শূন্য ১৬টি। কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ৪৯টির মধ্যে কর্মরত ৩৩, শূন্য ১৬টি।

রামু খিজারি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ২৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৫ জন, শূন্য ১৯টি। মহেশখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১৫টির মধ্যে কর্মরত ৬, শূন্য ০৯টি। কুতুবদিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১৫টির মধ্যে কর্মরত ৫, শূন্য ১০টি।

এছাড়া উখিয়া বহুমুখী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১৪টির মধ্যে কর্মরত ১০, শূন্য ৪টি ; চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এ ২৫ টির মধ্যে কর্মরত ১০, শূন্য ১৫টি; চকরিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ২৫টির মধ্যে কর্মরত ১১, শূন্য ১৪টি এবং টেকনাফ এজাহার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ ১০টির মধ্যে কর্মরত ৪, শূন্য ৬টি।

অর্থাৎ পুরো জেলায় ১৫৩ সহকারি শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছে ৯১ জন আর শূণ্য পদ আছে ৬২টি। ৮২ সিনিয়র সহকারি শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছে ৩৫ জন আর শূণ্য আছে ৪৭ জন।

তবে ব্যতিক্রম হলো পেকুয়া জিএমসি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এখানে ০৯টি পদের মধ্যে ৯ জনই কর্মরত আছে।

কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষক রাম মোহন সেন বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, “অনেকগুলো সেকশন সামলানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক সংখ্যা মাঝেমধ্যে আরও কমে যায়। নিয়মিত অধিদপ্তরে সব তথ্য পাঠানো হয়।”

তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক দূর-দূরান্তের জেলা থেকে এখানে যোগদান করেন। পরে বদলি নিয়ে চলে যাওয়ায় সংকট আরও বাড়ে।

সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে তিনি বলেন, “পদ আছে, কিন্তু পদায়ন নেই। আমাদের স্কুলে দুই শিফটের জন্য দুইজন সহকারী প্রধান শিক্ষকের পোস্ট আছে।”

কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনুপম দাশ বলেন, বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “আমাদের ২০টি সেকশন। গণিত শিক্ষকের ছয়জন থাকার কথা, কিন্তু আছেন মাত্র দুইজন। এতগুলো সেকশনে দুইজন শিক্ষক কীভাবে পাঠদান করবেন?”

তার ভাষায়, বাধ্য হয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে গণিত ক্লাস নিতে হয়, এতে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

“এখন প্রায়ই বলতে হয়—স্যার, আরেকটা ক্লাসে একটু যান। অমুক স্যার আসেননি, অমুক ছুটিতে আছেন। শিক্ষক স্বল্পতার মধ্যে এভাবে চালানো খুব কঠিন।”

মহেশখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, শিক্ষক সংকট এতটাই তীব্র যে খণ্ডকালীন শিক্ষক ছাড়া বিদ্যালয় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, “খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া উপায় নেই, না হলে স্কুল বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা চারজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোনোরকমে স্কুল চালাচ্ছি।”

বিদ্যালয়গুলোর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, শূন্য পদ দ্রুত পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।

তিনি বলেন, “শূন্য পদের তথ্য নিয়মিত সরকারকে পাঠানো হয়। দ্রুত পদ পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়।”

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের স্থানীয় প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় বাইরের জেলার শিক্ষকরা নিয়োগ পান, কিন্তু পরে বদলি নিয়ে চলে যান।

“স্থানীয় শিক্ষার্থীরা যদি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বেশি অংশ নিয়ে টিকতে পারে, তাহলে নিজ এলাকায় পোস্টিং দেওয়া সহজ হবে। নিজের এলাকায় থেকে নিজের এলাকার মানুষের সেবা করতে পারবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *