বে ইনসাইট । কক্সবাজার
কক্সবাজারের বহুল আলোচিত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মো. হেলাল উদ্দিন, নুরুল আমিন, মো. নাছির উদ্দিন ও মোর্শেদ আলম। তাদের মধ্যে মোর্শেদ আলম পলাতক রয়েছেন। তারা সবাই চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের বাসিন্দা।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ এক বছর আট মাস ধরে চলা আলোচিত এ মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন।
বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন ও দেশের সেবায় গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তার পরিবার, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র এবং দেশবাসী-সবারই প্রত্যাশা ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।”
তিনি বলেন, আদালত কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও মামলার সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সবকিছু পর্যালোচনার পর চারজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
বাদীপক্ষের আরেক আইনজীবী আহসান সেজান বলেন, রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আসামিদের আচরণ ও চেহারায় অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল স্পষ্ট।
তিনি বলেন, “লেফটেন্যান্ট তানজিম ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। মানুষের জানমাল রক্ষা ও আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।”
তিনি জানান, হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলার রায়ই বুধবার ঘোষণা হয়েছে। রায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় ১৩ জনকে অতিরিক্ত ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আহসান সেজান বলেন, আদালতের রায়ে তারা “মোটামুটি সন্তুষ্ট”। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে সামাজিক ন্যায়বিচার, জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিচারক উল্লেখ করেছেন, প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন সাজাপ্রাপ্ত না হন, সেটিও বিচার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি আরও বলেন, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামিপক্ষের জেরা—উভয় দিক বিবেচনায় নিয়েই আদালত এ রায় দিয়েছেন। খালাস পাওয়া পাঁচজনের বিষয়ে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের অনেক আইনজীবী দাবি করেছেন, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
মামলার পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির আইনজীবী তাহসিন সিফাত বলেন, “এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। বিশেষ করে পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অস্ত্র আইনে পৃথক সাজা দেওয়ায় আমরা মনে করছি, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।”
২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মইজ্জ্যারপাড়া এলাকায় ডাকাতবিরোধী অভিযানে গিয়ে নিহত হন ২৩ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন।
টাঙ্গাইলের বাসিন্দা তানজিম বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ২০২২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে আর্মি সার্ভিস কোরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও শোকের জন্ম দেয়।
ঘটনার দুই দিন পর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ হত্যা ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। একই ঘটনায় চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করেন।
পরে মামলাগুলোর তদন্তভার দেওয়া হয় চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরীর ওপর। তদন্ত শেষে পুলিশ দুই মামলায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। প্রাথমিক এজাহারে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তদন্তে নতুন কয়েকজনের নাম উঠে আসায় তাদের আসামি করা হয়।