কক্সবাজার সদর হাসপাতালের লিফট দুর্ঘটনা: ত্রুটি নিয়ে বিপরীত দাবি, তদন্ত কমিটি গঠন

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে লিফটের নিচে চার দিন নিখোঁজ থাকা এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় লিফটের ত্রুটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গণপূর্ত বিভাগ বলছে লিফটে আপাতত কোনো বড় ত্রুটি পাওয়া যায়নি, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি—ত্রুটি জানিয়ে তিন বছর ধরে গণপূর্তকে একাধিক চিঠি দেয় হয়েছে ।

নিহত কোহিনূর আক্তার (৩২) উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ ডেইলপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা মেয়েকে দেখাশোনা করতে গিয়ে গত বুধবার দুপুরে নিখোঁজ হন। পরে শনিবার সকালে হাসপাতালের একটি লিফটের নিচে তার আংশিক পচে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ঘটনার পর হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কোহিনূর চতুর্থ তলায় লিফটের সামনে এসে দুই হাতে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এরপর তাকে আর কোনো তলায় নামতে দেখা যায়নি।

লিফটে ত্রুটি ছিল কি না

কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, মঙ্গলবার তারা হাসপাতালের লিফটটি পরিদর্শন করেছেন।

“আজ আমরা লিফটটি পরিদর্শন করেছি। আপাতত তেমন কোনো বড় ত্রুটি চোখে পড়েনি। ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে লিফটটি পরীক্ষা করা হয়েছিল,” বলেন অভিজিৎ চৌধুরী।

তিনি জানান, আরও দুই দিন লিফটটি পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর সেটি আবার চালু করা হতে পারে।
লিফটের দরজা হাতে টান দিলে খুলে যাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের কোনো অভিযোগ দেয়নি।”

কিন্তু হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (প্রশাসন) ডা. শান্তনু ঘোষ বলেন, ২০২৩ সাল থেকেই লিফটের নানান ত্রুটি নিয়ে একাধিক চিঠি দেয়া হয় গণপূর্ত বিভাগের কাছে। এমনকি লিফট পরিবর্তনের চিঠিও দেয়া হয়। কিন্তু এবিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ত্রুটি না থাকলে এমন দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল—এ প্রশ্নে নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন,

“সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী দেখা গেছে, লিফটের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগেই তিনি হাত দিয়ে ফেলেছিলেন। সে কারণে দরজাটি আবার খুলে গেছে।”

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে কয়েকজন যন্ত্র প্রকৌশলী বলছেন, আধুনিক লিফটে সাধারণত ইন্টারলক সিস্টেম থাকে, যার ফলে লিফটের কেবিন নির্দিষ্ট তলায় না থাকলে দরজা খোলার কথা নয়।

যন্ত্র প্রকৌশলী হাসিনুর রেজা চঞ্চল বলেন, “যদি লিফট অন্য তলায় থাকে, তাহলে নিচের তলায় এত সহজে দরজা খোলা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। দরজা খুলে সরাসরি শ্যাফটে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে সেটি লিফটের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।”

তিনি বলেন, লিফটের সেন্সর, ডোর লক ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

ধর্ষণের অভিযোগে মিলেনি আলামত

ঘটনার পর নিহতের স্বজনদের কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে কোহিনূরের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুললেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ ও চিকিৎসকরা।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শান্তনু ঘোষ বলেন, “এ ধরনের কোনো আলামত আমরা পাইনি।”

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ছমি উদ্দিন বলেন, ঘটনার দিনই একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। সুরতহাল কিংবা মরদেহ উদ্ধারের সময় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

ময়নাতদন্তে থাকা একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বে ইনসাইটকে বলেন, তারাও প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনো লক্ষণ পাননি। মৃত্যুর কারণ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।

তদন্তে কমিটি

ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিং নিও বলেন, “সাত কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।”

তিনি জানান, কমিটির প্রধান করা হয়েছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলী হোসেনকে।

কমিটির সদস্য ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. ইয়াসির আরাফাত বলেন, “প্রাথমিকভাবে এটি দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে। তবে মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

জেলার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র

কক্সবাজারের প্রায় ২৭ লাখ মানুষের জন্য জেলা সদর হাসপাতালটি অন্যতম প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন এখানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে লিফটের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স এর মূখ্য সমন্বয়ক মোহিব্বুল মোক্তাদির এর মতে, কোহিনূর আক্তারের মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *