কক্সবাজারের প্রশাসনিক বিবর্তন: মহকুমা থেকে জেলা, নতুন মানচিত্রের পথে মাতামুহুরী

বে ইনসাইট । কক্সবাজার

কক্সবাজার শুধু দেশের পর্যটন রাজধানীই নয়, প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকেও এটি বাংলাদেশের অন্যতম পরিবর্তনশীল অঞ্চল। ব্রিটিশ আমলে একটি ছোট মহকুমা হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই জনপদ এখন নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভৌগোলিক বিস্তার, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার প্রয়োজনেই বারবার বদলেছে জেলার মানচিত্র।

সবশেষ সেই পরিবর্তনের ধারায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও একটি নাম, “মাতামুহুরী উপজেলা”।

মহকুমা থেকে জেলার যাত্রা

১৮৫৪ সালে কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ থানা নিয়ে গঠিত হয় কক্সবাজার মহকুমা। পরে প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী এসব এলাকা ভেঙে নতুন থানা সৃষ্টি করা হয়। মহেশখালী থেকে আলাদা হয় কুতুবদিয়া, টেকনাফ থেকে উখিয়া এবং কক্সবাজার সদর থেকে রামু।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৫৯ সালে কক্সবাজার শহরকে টাউন কমিটিতে উন্নীত করা হয়। পরে ১৯৭২ সালে এটি পৌরসভায় রূপ নেয়।

অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ কক্সবাজার মহকুমাকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত করা হয়। এর মাধ্যমে প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই উপকূলীয় এলাকা নতুন পরিচয় পায়।

উপজেলা ব্যবস্থার সূচনা

স্বাধীনতার পর এরশাদ সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় ১৯৮৩ সালে দেশের বিভিন্ন থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। সেই সময় কক্সবাজার জেলার প্রধান থানাগুলোও উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

চকরিয়া, উখিয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, রামু ও মহেশখালী, সবগুলোই তখন উপজেলা কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে স্থানীয় প্রশাসনকে জনগণের আরও কাছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

চকরিয়া: বৃহৎ উপজেলা থেকে বিভাজনের ইতিহাস

কক্সবাজার জেলার প্রশাসনিক বিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি চকরিয়া। ১৭৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই থানা ছিল জেলার অন্যতম বৃহৎ প্রশাসনিক অঞ্চল।

উপকূল, পাহাড় ও বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকা নিয়ে গঠিত হওয়ায় সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক চাপ বাড়তে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের ২৩ এপ্রিল চকরিয়ার সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় পেকুয়া উপজেলা।

উজানটিয়া, পেকুয়া, টৈটং, মগনামা, রাজাখালী, বড়বাকিয়া ও শিলখালী ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা গঠনের মাধ্যমে চকরিয়ার প্রশাসনিক পরিসর ছোট করা হয়।

নতুন ‘মাতামুহুরী উপজেলা’

দীর্ঘদিনের দাবির পর আবারও ভাঙছে চকরিয়া উপজেলার সীমানা।

২০২৬ সালের ৭ মে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে চকরিয়ার সাত ইউনিয়ন নিয়ে “মাতামুহুরী উপজেলা” গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।

প্রস্তাবিত ইউনিয়নগুলো হলো—শাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, ভেওলা মানিকচর, ঢেমুশিয়া, বদরখালী ও কোনাখালী।

স্থানীয়দের দাবি, মাতামুহুরী নদীঘেঁষা এসব ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিকভাবে অবহেলিত ছিল। চকরিয়া উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জনসেবায় ভোগান্তির কারণে পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।

নিকার বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন মিললেও এখনো এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে এলাকাগুলো এখনও চকরিয়া উপজেলার অংশ হিসেবেই রয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্র বলছে, গেজেট প্রকাশ ও চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদনের পরই নতুন উপজেলা কার্যকর হবে।

ঈদগাঁও: সর্বশেষ কার্যকর উপজেলা

কক্সবাজার জেলার সর্বশেষ কার্যকর উপজেলা হলো ঈদগাঁও। ২০২১ সালের ২৬ জুলাই কক্সবাজার সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে এটি গঠিত হয়।

এর মাধ্যমে জেলার উপজেলা সংখ্যা দাঁড়ায় নয়টিতে।

বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো

বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় কার্যকর উপজেলা রয়েছে—

  • কক্সবাজার সদর
  • ঈদগাঁও
  • উখিয়া
  • টেকনাফ
  • চকরিয়া
  • পেকুয়া
  • মহেশখালী
  • কুতুবদিয়া
  • রামু

মাতামুহুরী উপজেলা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেলে জেলার প্রশাসনিক মানচিত্রে যুক্ত হবে দশম উপজেলা।

বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারের প্রশাসনিক বিবর্তনের ইতিহাস আসলে এই অঞ্চলের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধিরই প্রতিফলন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ এবং উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ভবিষ্যতে জেলায় আরও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *