বে ইনসাইট | কক্সবাজার
এক সময়ের প্রাণচঞ্চল বিনোদন, এখন শূন্যতা
ঈদ কিংবা বিশেষ ছুটির দিনে বন্ধু-পরিবার নিয়ে দল বেঁধে সিনেমা হলে যাওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন কক্সবাজারে প্রায় বিলুপ্ত। দেশের একমাত্র পর্যটন নগরীতে বর্তমানে কোনো চালু সিনেমা হল নেই, যা একসময় স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও বিনোদনের বড় কেন্দ্র ছিল।
এক দশক আগেও শহরে টকি হাউস, দিগন্ত সিনেমা হল এবং বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) অডিটোরিয়াম, এই তিনটি প্রেক্ষাগৃহ সচল ছিল। এখন সবগুলোই বন্ধ।
তিন হলের উত্থান-পতনের গল্প
১৯৬৮ সালে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে প্রতিষ্ঠিত টকি হাউস ছিল কক্সবাজারের প্রথম সিনেমা হল। দীর্ঘদিন জমজমাট চলার পর ২০০০ সালের দিকে দর্শক কমে গেলে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি বাজারঘাটার নিউ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় চালু হয় দিগন্ত সিনেমা হল। একই সময়ে, ১৯৯৬ সালে নির্মিত হয় বিডিআর অডিটোরিয়াম, যা পরে বিজিবির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১০ সাল পর্যন্ত এই তিনটি হলেই ভালো ব্যবসা ছিল। প্রতি শুক্রবার নতুন সিনেমা মুক্তি পেত, মাইকিং হতো শহরজুড়ে, আর দর্শকদের ভিড় থাকত চোখে পড়ার মতো।
করোনার পর শেষ প্রহর
করোনা মহামারির পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বিজিবি অডিটোরিয়ামও, যেটি শেষ চালু থাকা প্রেক্ষাগৃহ ছিল। আলীর জাহাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে।
হলের পাশের এক দোকানদার বাবু বলেন, “একসময় এই হলে হাউজফুল দর্শক থাকত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত সিনেমা দেখতে। এখন সব বন্ধ হয়ে গেছে।”
হল হারানোর পেছনের কারণ কী
স্থানীয়দের মতে, সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে।
সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাব। ২০০০ সালের পর থেকে বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যবসার ধস নামে। গল্প, নির্মাণশৈলী এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক উপাদান দর্শককে বিমুখ করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির প্রভাব। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় এখন ঘরে বসেই নতুন সিনেমা দেখা যায়। ফলে প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার আগ্রহ কমে গেছে।
পাশের অঞ্চলও একই পথে
শুধু কক্সবাজার শহর নয়, আশপাশের এলাকাতেও একই চিত্র। নাইক্ষ্যংছড়িতে ৯০-এর দশকে চালু হওয়া ‘পাহাড়ীকা’ সিনেমা হলও দর্শক সংকটে বন্ধ হয়ে যায়।
স্মৃতিতে রয়ে গেছে ‘হাউজফুল’ দিনগুলো
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল করিম বলেন, “একসময় এই হলে টিকিট পাওয়া কঠিন ছিল। এক শো শেষ হওয়ার আগেই পরের শোর টিকিট শেষ হয়ে যেত। এখন মনে হয় সবকিছুই স্বপ্ন।”
পর্যটন ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের মতে, “ভালো মানের, পরিবার নিয়ে দেখার মতো সিনেমা তৈরি হলে দর্শক আবার হলে ফিরবে। উন্নত নির্মাণ আর বড় বাজেটের কাজই দর্শক ধরে রাখতে পারে।”
ফিরে আসবে কি প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতি?
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিকায়ন, উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ, এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলে কক্সবাজারে আবারও সিনেমা হল সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তবে সে জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, প্রযোজক ও হল মালিকদের একসঙ্গে এগিয়ে আসা। ততদিন পর্যন্ত কক্সবাজারের রূপালী পর্দা থাকবে স্মৃতির ভেতরেই।