কক্সবাজারে দ্রুত ফুরোচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

কক্সবাজারের প্রায় সব উপজেলাতেই দ্রুত হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এর প্রভাবে জেলায় অদূর ভবিষ্যতে তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংকটের চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেক মানুষ এখন বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন পানীয় জলের জন্য বোতলজাত পানির ওপর নির্ভর করছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) জানিয়েছে, পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ কক্সবাজার পৌরসভা, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়। অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পর্যাপ্ত পুনঃভরাট ব্যবস্থার অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে।

পৌর এলাকায় বছরে ৬–১৪ ফুট পানি নামছে

ডিপিএইচইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার পৌর এলাকায় প্রতিবছর গড়ে ৬ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের কলাতলী ও টেকপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখন ৯০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও ছিল অনেক কম গভীরে।

পৌরসভার ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে তীব্র পানি সংকট চলছে। অনেক বাসিন্দাকে দূরবর্তী এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে পানি কিনে ব্যবহার করছেন।

এসব এলাকার টিউবওয়েলের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি হওয়ায় তা শুধু গোসল ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে। অন্যদিকে পৌরসভার সরবরাহ করা পানির মান নিয়েও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরবরাহকৃত পানিতে দুর্গন্ধ থাকে এবং তা পানযোগ্য নয়।

জেলায় ৩০ হাজার নলকূপ, তবু সংকট

ডিপিএইচই সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ চালু রয়েছে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক নলকূপ থেকেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে।

শহরের গোলদিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা সাগর দে বলেন, “১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকেই এখানকার ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এখন বিশুদ্ধ পানি পাওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

‘৪০০ ফুট গভীরেও মিষ্টি পানি পাইনি’ : একবছরে তিনবার বাসা বদল

টেকপাড়া এলাকার একটি ভবনের মালিক মো. ফরহাদ বলেন,“৪০০ ফুট গভীরে নলকূপ বসিয়েও মিষ্টি পানি পাইনি। বাধ্য হয়ে পৌরসভার পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু সেই পানিতেও দুর্গন্ধ থাকে, এটা পান করার উপযোগী নয়।”

কক্সবাজার শহরে ভাড়াবাসায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নেপাল চন্দ্র বলেন, পানির সংকটের কারণেই তাকে গত এক বছরে তিনবার বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে শহরে ভাড়া বাসায় থাকি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে পানির অবস্থা খুব খারাপ। খাবার পানি কিনে খেতে হয়। ব্যবহারের পানিও কোথাও লবণাক্ত হয়ে গেছে, কোথাও আবার আয়রনের সমস্যা।”

উখিয়া–টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চাপ

উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

ডিপিএইচই কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক বলেন,“উখিয়ার রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখন ১০০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকায় প্রতিবছর পানির স্তর ৮ থেকে ১৪ ফুট করে নিচে নামছে।”

কোন উপজেলায় কত গভীরে পানি

মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক জানান, সদর উপজেলার ঝিলংজা ও ভারুয়াখালীতে ৪০–৬০ ফুট, ঈদগাঁওয়ে ২৫–৪৫ ফুট, রামুতে ২০–২৮ ফুট, চকরিয়ায় ২০–৪০ ফুট, পেকুয়ায় ১২–৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকায় প্রতিবছর গড়ে ২ থেকে ৫ ফুট করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

মায়াজ প্রামাণিক বলেন, কক্সবাজারে এখনো স্থায়ী পর্যবেক্ষণ কূপ না থাকলেও বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত ইএমসিআরপি প্রকল্পের আওতায় উখিয়া ও টেকনাফে ২৮টি মনিটরিং কূপ স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া ৩২টি মিনি পাইপ স্কিমে রিয়েল-টাইম ডেটা লগার বসানো হচ্ছে, যা আগামী শুষ্ক মৌসুম থেকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফের সহায়তায় কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফে ভূগর্ভস্থ পানি পর্যবেক্ষণ প্রকল্পও চলমান রয়েছে।

পৌরসভার পানি ব্যবস্থায় চরম চাপ

কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুবেল বড়ুয়া বলেন, “২০১১–১২ সালে যখন আমাদের নয়টি পাম্প হাউস স্থাপন করা হয়, তখন ১৫০ থেকে ২০০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যেত। এখন ১২০০ থেকে ১৫০০ ফুট গভীরেও পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”

তিনি বলেন, “যে পানি পাওয়া যাচ্ছে তার মান খুব খারাপ ও দুর্গন্ধযুক্ত। অধিকাংশ ব্যক্তিগত নলকূপ অচল হয়ে পড়ায় পৌরসভার ওপর চাপ অনেক বেড়েছে। আমরা সীমিত সংখ্যক কার্যকর পাম্প দিয়ে দিনে দুবার পানি সরবরাহের চেষ্টা করছি।”

ভরসা বাঁকখালীর সারফেস ওয়াটার প্ল্যান্ট

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টকে প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রুবেল বড়ুয়া জানান, প্ল্যান্টটির কমিশনিং কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির শুরুতে এটি পুরোপুরি চালু হবে।

ডিপিএইচই কক্সবাজারের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনসুর বলেন,“এই প্ল্যান্টটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করতে পারবে। চালু হলে এটি একাই পৌরসভার প্রায় ৫৫ শতাংশ পানির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।”

বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যা: কেন নামছে পানি

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান মো. জাকারিয়া বলেন, কক্সবাজার একটি জটিল হাইড্রোজিওলজিক্যাল এলাকা।

তিনি বলেন, “এখানে আনকনফাইনড ও কনফাইনড—দুই ধরনের ইকুয়েফার রয়েছে। কনফাইনড ইকুয়েফার থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করলে পানির প্রবাহ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, ফলে স্তর দ্রুত নিচে নেমে যায়।”

লবণাক্ততা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী নদীর পানিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। নদীপথে যেসব এলাকায় পানি প্রবাহিত হয়, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততার প্রভাব পড়ছে।

বাড়ছে বাণিজ্যিক পানি বাজার

ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের সুযোগে কক্সবাজারে গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিকভাবে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। জেলায় বর্তমানে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত পানি বিক্রি করছে, যার মধ্যে কক্সবাজার শহরেই রয়েছে প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান।

২০০২ সাল থেকে পানি বিক্রি করে আসা হিমছড়ি ড্রিংকিং ওয়াটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার কামাল যিসান বলেন, “২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকেই পানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। সব মিলিয়ে কক্সবাজার শহরে দৈনিক এক লাখ লিটারের বেশি পানি এখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে।”

ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক হাব ধলঘাটা: উন্নয়ন প্রকল্পের ছায়ায় নির্বাচনী রাজনীতি

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়নকে ঘিরে একের পর এক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এলাকাটি ভবিষ্যতে একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে—এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তেমন কোনো সন্দেহ নেই।

এক পাশে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্য পাশে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প—এই দুই মেগা প্রকল্প ইতোমধ্যে ধলঘাটাসহ আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অংশীজনরা বলছেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চল ব্যবসা ও বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাবে পরিণত হতে পারে।

তবে উন্নয়নের এই জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার অভিযোগও উঠছে। স্থানীয়দের একটি অংশ জানান, সরকারের জমি অধিগ্রহণের ফলে অনেক পরিবার বংশপরম্পরায় ভোগদখল করা জমি বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। শ্রমনির্ভর বহু পরিবার অভিযোগ করেন, অল্প ক্ষতিপূরণ পেয়ে তারা আগেই স্থানচ্যুত হয়েছেন। এখনও কয়েকটি পরিবার উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কেমন প্রার্থী চান—এমন প্রশ্নে ধলঘাটার বাসিন্দারা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি ছাড়ার প্রয়োজনীয়তা তারা মোটামুটি মেনে নিয়েছেন। তবে জন্মভূমি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে তারা রাজি নন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাতে জমি অধিগ্রহণের পরও এলাকায় থাকতে পারে, সে জন্য পরিকল্পিত একটি টাউনশিপ গড়ে তোলাই তাদের প্রধান দাবি।

ওয়ার্ড নম্বর ৩-এর সদস্য জমির উদ্দিন বলেন, সরকারের জমি অধিগ্রহণের ফলে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
“আমাদের প্রধান দাবি হচ্ছে—স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান ও নিশ্চিত আবাসন,” বলেন তিনি।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কক্সবাজার–২ সংসদীয় আসন—যার মধ্যে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলা রয়েছে—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গোপসাগরের দ্বীপঘেরা এই আসনকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে দেখা হয় বলেই এখানে বরাবরই হেভিওয়েট প্রার্থীদের উপস্থিতি থাকে।

২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ২৯ হাজার ১২২ জন। ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে স্থানীয় ভোটারদের মতে, মূল লড়াই হবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুল্লাহ ফরিদ (ধানের শীষ) এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আজাদ (দাঁড়িপাল্লা)—এই দুই প্রার্থীর মধ্যে।

দুই প্রার্থীই ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কুতুবদিয়ার বাসিন্দা হামিদুর রহমান আজাদ সোমবার থেকে মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকায় অবস্থান করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি নিজের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আজাদ দুটি বহর নিয়ে ধলঘাটার নাসিরের ডেইল এলাকায় পৌঁছান। এ সময় জামায়াতের নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে স্লোগান দেন। স্থানীয় বাজারে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তিনি। পরে সরু উপকূলীয় সড়ক ধরে আবাসিক এলাকায় ঢুকে ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমর্থন চান।

এসময় হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, মহেশখালী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে।

তিনি বলেন, “মহেশখালী মাস্টারপ্ল্যান শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি নীলনকশা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মহেশখালী–কুতুবদিয়া এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।”

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে দেশের আমদানি–রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্ক স্থাপন এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে।

তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয়দের চাকরি থেকে বঞ্চিত করতে একটি সুযোগসন্ধানী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। নির্বাচিত হলে অনিয়ম বন্ধ করে অগ্রাধিকার ও যোগ্যতার ভিত্তিতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী আলমগীর ফরিদও সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় এবং ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চাইছেন তিনি।

আলমগীর ফরিদ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো চালু হলে স্থানীয় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
“বিশেষ করে গভীর সমুদ্রবন্দর কার্যকর হলে স্থানীয় যুবকদের জন্য বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে,” বলেন তিনি।

এদিকে মহেশখালী রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক আবদুল মান্নান রানা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “মহেশখালী শুধু একটি দ্বীপ নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কৃষি, মৎস্য, লবণ উৎপাদন ও পান চাষের ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন।”

তার দাবি, সরকারের মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই ঐতিহ্যবাহী ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

রানা জানান, প্রকল্পের আওতায় ৩৪ হাজার একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার একর জমি ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব এলাকার অধিকাংশ জমিই লবণ মাঠ, আর এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ পরিবারকে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আগামী ১০ বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেমন কক্সবাজার চাই: উন্নয়ন, দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মুখোমুখি প্রশ্নে নাগরিকরা

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

আলোচনায় বক্তারা বলেন, উন্নয়নের নামে কক্সবাজারে যা হচ্ছে, তার বড় অংশই অপরিকল্পিত। নেই সমন্বিত নীতিমালা, নেই জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। ফলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন শহর ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথ হারাচ্ছে।

জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) কক্সবাজার ও কক্সবাজার কমিউনিটি অ্যালায়েন্স, ঢাকা (সিসিএডি)-এর যৌথ উদ্যোগে গত ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজার শহরের ডিপিএইচই ওয়াশ কনফারেন্স হলে এই নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এর গবেষণা ও বিশ্লেষণ সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল বে ইনসাইট মিডিয়া গ্রুপ।

শাহ নেওয়াজ চৌধুরী
সমন্বয়ক, কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স (সিসিএডি)

“বিশ্বের যেকোনো জায়গায় যান, যেকোনো পর্যটন গন্তব্যে দেখবেন প্রতিটি রোডে এক্সচেঞ্জ হাউজ আছে। অথচ আমি কক্সবাজারে কোনো এক্সচেঞ্জ হাউজ দেখি নাই। ফরেন ইনভেস্টর আসছে—সে ডলার এক্সচেঞ্জ করবে কিভাবে?

দেখা যায়, হোটেলের পাশে একটা ছোট জায়গা আছে, সেখানে পানের দোকান দিয়ে রাখা হয়েছে, বাসের কাউন্টার দিয়ে রাখা হয়েছে। সরকার থেকে যদি এসব বিষয় দেখভাল করা না হয়, তাহলে এসব পরিবর্তন কিভাবে হবে?

এখানে কোনো পলিসি নাই, কিন্তু সবকিছু হচ্ছে—অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। দেখা যাবে, পলিসি বানাতে বানাতেই আমার সব শেষ হয়ে যাবে।”


মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর
আইনজীবী ও বিশিষ্টজন

“আমাদের এখানে সমস্যার কথা যারা বলেন, সেই সমস্যার সমাধানের মেইন প্রতিবন্ধকতা হলো—এখানে আইনের শাসন নেই, সততা নেই।

যিনি মাইক ধরে বড় বড় কথা বলেন, আইন বানান—তিনি নিজেই আইন মানেন না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। ধূমপান বিরোধী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির পকেটে সিগারেট থাকে। মাদক বিরোধী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মদ খেয়ে আসেন, চোখে-মুখে গন্ধ থাকে।

আমাদের নেতারা দুর্নীতি বিরোধী কথা বলেন, অথচ নিজেরাই বেশি দুর্নীতি করেন। তাহলে সাধারণ মানুষ কেন করবে না? রিকশাওয়ালা যে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়, সে এই সাহস করে কিভাবে? সে দেখে—তাদের নির্বাচিত নেতারা, যারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই তো তাদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়। সুতরাং তারাও নেয়।

এই যে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়—৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা—সবচেয়ে বড় দল বিএনপিও দেয় না। জামায়াত তো একটাও দেয় নাই।

আমি প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই—আপনাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, ‘আমি পরাজিত হতে পারি, কিন্তু গণতন্ত্রকে পরাজিত হতে দেব না। আমি আইনের শাসনকে পরাজিত হতে দেব না।’

তাহলেই ভোটে কারচুপি হবে না। কিন্তু যদি প্রতিজ্ঞা থাকে—মানুষ খুন করে হলেও আমাকে জিততে হবে, ক্ষমতায় যেতে হবে—তাহলে তো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।”


ছৈয়দ আলম
সভাপতি, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি

“এইভাবে চললে আরো ২০ বছর, ৪০ বছর গেলেও কক্সবাজারের উন্নয়ন হবে না।

আমি ২০০৪ সালে প্রভাবশালী এক ক্ষমতাধর মানুষের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলাম—এই ট্যুরিজমটা পরিকল্পনা করে কক্সবাজারের উদ্যোক্তাদের ছেড়ে দেওয়া হোক। তখন উনি বলেছিলেন, তারা পারবেন না, এখানে বাইরের ইনভেস্টর লাগবে।

আজ আমরা দেখি, বড় বড় মেগা প্রকল্প বাইরে লোকেরা নিয়েছে। সেখানে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। আমি মনে করি, এর পেছনে আমাদের ক্ষমতাধর নেতাদের একটা পার্সেন্টেজ কাজ করে। না হলে আমি কম দরে নিলাম আমাকে দিলো না, আপনি বেশি দর দিলেন আপনাকে কেন দিলো?

আমার অর্থ আছে, আমি বাংলাদেশের মানুষ, কক্সবাজারের মানুষ। আমি দরকার হলে এক্সপার্ট নিয়ে আসবো। তবুও আমি পারবো না কেন? শুধু বিদেশি লোকদের দিতে হবে কেন?

আর সৌদি আরব ৬৬ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দিতে বলেছে—এটাকে আমি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মনে করি। এখন তো মিয়ানমার বলছে, ওরা বাংলাদেশি বাঙালি, রোহিঙ্গা না। বাংলাদেশ সরকার যদি পাসপোর্ট দেয়, তাহলে মিয়ানমারের কথাই প্রতিষ্ঠিত হবে।”


ওমর ফারুখ
সাধারণ সম্পাদক, এনসিপি কক্সবাজার।

“রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে একটা বড় সম্ভাবনা আমরা হারিয়েছি। সেটা হলো হিউম্যানিটেরিয়ান করিডোর।

এই সমস্যাটা রাখাইনের। এটাকে যদি সমাধান করতে চান, তাহলে রাখাইনে আপনার স্টেক থাকতে হবে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ক্রাইসিসের পর রাখাইনে চায়না এবং ইন্ডিয়া স্টেক তৈরি করেছে।

অনেকে বলেন, ক্ষমতায় গেলে টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করবেন। কিন্তু প্রাগমেটিক ওয়েতে না গেলে এই বন্দর চালু করা সম্ভব নয়।”


জাহেদুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, জামায়াতে ইসলামী কক্সবাজার জেলা

“চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ছয় লেন হলেও যাতায়াত সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে, কিন্তু সেটার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

এই সমস্যাগুলোর মূল কারণ হলো—দেশে দীর্ঘদিন জবাবদিহিমূলক সরকার ও নেতৃত্ব ছিল না। আসন্ন নির্বাচনে যদি জবাবদিহিমূলক সরকার ও সৎ নেতৃত্ব তৈরি করা যায়, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

সৎ নেতৃত্ব দরকার, কারণ আমাদের দেশে সম্পদের অভাব ছিল না। তারপরও সমস্যা দূর হয়নি কেন? গত ৫৪ বছরে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে, তারা শত হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এমপি-মন্ত্রী হয়ে ব্যাংক লুট করে নিয়ে গেছে। তাই সৎ নেতৃত্ব নির্বাচন করা জরুরি।”


জাহানারা ইসলাম
সভাপতি, কক্সবাজার উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

“এখনো যদি বলি—কেমন কক্সবাজার চাই—এটা খুবই দুঃখজনক। আমাদের নিজেদের অপরাগতাকে সামনে এনে নিজেদের ছোট করার প্রবণতা কমাতে হবে।

আমাদের এখানের সবচেয়ে বড় শিল্প লবণ। সেটার ক্ষেত্রে কি আমরা কোনো বিপ্লব করেছি? আজ পর্যন্ত সেই বিপ্লব হয়নি। অথচ এখানেই আমাদের হাত দেওয়া উচিত ছিল। আমাদের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি আমাদের হাতেই।

কে কখন বিদেশ থেকে বিনিয়োগ করবে—সেই অপেক্ষায় বসে থাকলে হবে না। আমাদের সম্পদকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করা, মান উন্নয়ন করা আমাদের হাতেই। আসুন, আমরা যারা কক্সবাজারে আছি, আমরা আমাদের কক্সবাজারকে আমাদের মতো করে সাজাই—যে কক্সবাজার দেখে বিশ্ব তাকিয়ে থাকবে। সেই প্রযুক্তি, সেই দক্ষতা আমাদের অর্জন করতেই হবে।”


এম আলম
মহেশখালীর স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ কর্মী

“আমার জন্মস্থান মহেশখালী। আমরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। আমরা দেশের জন্য জমি দিয়েছি। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, আরও হবে।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে যে মহালুট হয়েছে, তার প্রতিকার কি আমরা পেয়েছি? এই যে মাতারবাড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হয়েছে—এটার ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে আমাদের কী অবদান রয়েছে? আমরা কি কোনো ফিডব্যাক পাই? কক্সবাজারবাসী কি উপকৃত হবে—এসব বিষয়ে তাত্ত্বিক কোনো তথ্যই কি আমরা জানতে পারি?”


রিয়াজ মোহাম্মদ শাকিল
সহসভাপতি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি

“সমস্যা, সম্ভাবনা, করণীয়—সব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু শেষ কথা হলো—বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেখা যাবে, আমরা ভোট দেবো একজন দুর্বৃত্তকে, একজন দখলবাজকে, একজন অসৎ লোককে।

আমাদের সকল উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা হলো দুর্নীতি। রাজনৈতিক অবস্থা বা অর্থনৈতিক অবস্থা যাই হোক না কেন, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিলে কখনো সুশাসন আসবে না। তাই যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের দুর্নীতির বিষয়ে স্পষ্ট কমিটমেন্ট থাকতে হবে।”


মুহাদ্দিস আমীরুল ইসলাম মীর
সভাপতি, ইসলামী আন্দোলন কক্সবাজার

“আমরা সুন্দর কক্সবাজার চাই। কিন্তু সেই সুন্দর কক্সবাজার গড়ে তুলতে কীভাবে করতে হয়, সেই ব্যবস্থাপনাটা আমরা নিই না।

এর মূল কারণ হলো—দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা কাজ করতে পারি না। সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।”


আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ
রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক

“পর্যটন উন্নয়নে বিকল্প চিন্তা কেউ করে না। হোটেল করছে সবাই হোটেলই করছে, রেস্তোরাঁ করছে সবাই একই ধরনের রেস্তোরাঁ করছে।

সরকারি হাসপাতালের অবস্থা দেখেন—মাটিতে পড়ে আছে রোগী। চাইলে আরও তিন-চারতলা ভবন করা যায়, লিফট বসানো যায়। কিন্তু এগুলো দেখার কেউ নেই। সরকারের পলিসিও ঠিক নেই।

আগামীতে যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের এসব বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে। সৎ নেতা হবে না যতক্ষণ জনগণ সৎ না হয়। বাংলাদেশে একজন প্রার্থীর নির্বাচনী খরচ ১০ কোটি টাকার নিচে হয় না। এই টাকা খরচ করে নির্বাচিত হওয়ার পর সে কীভাবে সৎ থাকবে? জনগণ তো সেই টাকা নিয়েছে। জনগণ যতক্ষণ সৎ হবে না, নেতা সৎ হবে না।”


শেখ আশিকুজ্জামান
সহ-সভাপতি, কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

“মিয়ানমারের ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ৯০ লাখ ডলার আটকে আছে। বৈধ চ্যানেলের বাইরেও বিভিন্ন পারপাসে পাঠানো টাকা আছে, যা আরও তিন গুণের বেশি আটকে রয়েছে।

সামনে যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাদের কাছে অনুরোধ—টেকনাফ স্থলবন্দর অতি শিগগির খুলে দেওয়া হোক। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হোক। এটা আমাদের প্রাণের দাবি।

এই সড়কের কারণে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল দেখতে হয়। তাই আমরা এই সড়কের বাস্তবায়ন আগামীতে দেখতে চাই।”


মিজানুর রহমান মিল্কি
পর্যটন উদ্যোক্তা

“তরুণ উদ্যোক্তারা সেন্টমার্টিনে বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু তারা সেই বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারছে না। সেন্টমার্টিনের ৯০ শতাংশ জায়গা এবং কক্সবাজারের কলাতলী জোনের বেশিরভাগ জায়গার মালিকানা এখন কক্সবাজারের বাইরের মানুষের হাতে।

সুতরাং সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত—কতটুকু জায়গা বাইরের মানুষ কিনতে পারবে, সেটার সীমা নির্ধারণ করা দরকার। যেটা আমরা পাহাড়ি অঞ্চলে দেখি। না হলে একটা সময় দেখা যাবে, কক্সবাজার আর কক্সবাজারের মানুষের হাতে নেই।

আর কক্সবাজারে কেউ বেড়াতে এসে চাইনিজ মাল কিনবে না। মানুষ এখানকার স্থানীয়দের তৈরি জিনিসপত্র কিনবে। সেই উদ্যোগ তৈরি করা জরুরি।”


হেদায়েত আজিজ মিঠু
সংগঠক, কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স (সিসিএডি)

“কক্সবাজারের মানুষের অন্যতম আয়ের উৎস হলো লবণ। কিন্তু এই খাত নিয়ে কে কী করছে? এখন লবণের দাম উৎপাদনের মিনিমাম খরচের অর্ধেকেও নেমে গেছে। তার মধ্যেই আবার লবণ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।

বিসিক কী করছে? বিসিক থেকে লবণ বের করে দেওয়া উচিত। বিসিক তো কোনোভাবে এই খাতকে প্রেট্রোনাইজ করছে না। বর্তমানে যে পরিমাণ লবণ মজুদ আছে, তা দিয়ে আগামী দুই বছর চলবে।

এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে কেউ আর লবণ মাঠে নামবে না। কার কী ঠেকা পড়ছে এত কষ্ট করে লবণ উৎপাদন করতে?”


মোহিব্বুল মোক্তাদীর তানিম
মূখ্য সমন্বয়ক, কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স (সিসিএডি)

“কক্সবাজার আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক নয়।

এই দায়বদ্ধতা থেকেই গত দুই বছর ধরে সিসিএডি রাজধানীতে ধারাবাহিক সংলাপ আয়োজন করে আসছে, যেখানে সরকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রতিনিধিদের জন্য বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা দিতেই এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ আয়োজন করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বয় না হলে ভবিষ্যতে কক্সবাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।”


মনোয়ার কামাল যিসান

সভাপতি, জেসিআই কক্সবাজার

“কক্সবাজারে বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন কার জন্য? স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, জীবনমান এবং নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।”

বের করা যায়নি গুলি: আফনানকে চট্টগ্রাম থেকে নেয়া হচ্ছে ঢাকায়

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

মিয়ানমার সীমান্তে তীব্র সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত বাংলাদেশি শিশু হুজাইফা আফনানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন মঙ্গলবার বে ইনসাইটকে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, “কয়েক ঘণ্টা ধরে জটিল অস্ত্রোপচার চালানো হলেও শিশুটির মাথা থেকে গুলিটি বের করা সম্ভব হয়নি। গুলিটি মস্তিষ্কের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আটকে রয়েছে। এটি অপসারণের চেষ্টা করলে শিশুটির প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে।”

এ কারণে তাকে ঢাকার বিশেষায়িত নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

“ওখানে তারা রোগীটিকে আরও ভালোভাবে সামলাতে পারবেন,” বলেন হাসপাতাল পরিচালক।

শনিবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তোতার দ্বীপ এলাকায় আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে।

এসময় টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিপরীত পাশে মিয়ানমার অংশে টানা গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রোববার সকাল ৯টার দিকে সংঘর্ষ চলাকালে সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে বাংলাদেশ অংশে পড়ে হুজাইফা আফনান গুলিবিদ্ধ হয়।

আহত শিশুটি টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচিছ ব্রিজ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জসিমের ১২ বছর বয়সী মেয়ে।

মাইনটি সীমান্তের কোন অংশে বিস্ফোরণ হয়েছে জানে না বিজিবি!

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে মো. হানিফ নামে এক বাংলাদেশি যুবকের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে মাইনটি সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে নাকি মিয়ানমারের ভেতরে বিস্ফোরিত হয়েছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

সোমবার সকালে নাফ নদীর তীরবর্তী হোয়াইক্যং সীমান্তের কাছে এ ঘটনা ঘটে।

আহত হানিফ হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফজলুর রহমানের ছেলে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যে চিংড়ি ঘেরের পথে বিস্ফোরণটি ঘটে সেটি মিয়ানমার সীমান্ত থেকে অন্তত এক কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থিত।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল বলেন, সকালে নাফ নদীর পাশের নিজস্ব চিংড়ি ঘেরে যান হানিফ। সেখানে নৌকা ও চাঁই ঠিক আছে কিনা দেখতে গিয়ে তিনি স্থলমাইনের ওপর পা দেন।

তিনি বলেন, “বেলা ১১টার দিকে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি করেন।”

পরিবারের সদস্যরা জানান, এমএসএফ হাসপাতাল থেকে তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিস্ফোরণের স্থান নিয়ে বিপরীত তথ্য

হানিফের সঙ্গে থাকা তার সহোদর ইমাম হোসেন বলেন, “আমাদের মাছের ঘেরটি বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে। বিস্ফোরণ হয়েছে ঘেরে যাওয়ার পথেই। মিয়ানমারের সীমান্ত সেখান থেকে অনেক দূরে।”

একই দাবি করেছেন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের স্থানীয় যুবক সাইফুল ইসলাম শাকিল। তিনি বলেন, “নাফ নদী ও আশপাশের চিংড়ি-কাঁকড়ার ঘেরগুলো এখানকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। বিস্ফোরণের জায়গাটি বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরেই।”

শাকিল জানান, মিয়ানমারের রাখাইন অংশে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিতে কয়েকদিন ধরে কেউ ওই এলাকায় কাজ করতে যাননি। সোমবার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হওয়ায় কাজে গেলে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

বিজিবির বক্তব্যে স্পষ্টতা নেই

ঘটনাস্থলটি বিজিবির ৬৪ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়- গত এক বছরে সীমান্তে কতজন স্থলমাইন বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন এবং মোট কতটি মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এই পরিসংখ্যান দিতে অপারগতা জানান।


আজকের বিস্ফোরণটি সীমান্তের কোন দেশের অংশে ঘটেছে- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,“সেটি আহত ব্যক্তি বলতে পারবেন।”


পরে মাইন কারা পুঁতে রেখেছে জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে চাননি। তবে বলেন, “প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, সীমান্তের কাছাকাছি কিছু এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করার কাজ চলছে।”


তিনি আরও বলেন, “সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয়দের সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত না করতে সচেতন করা হচ্ছে।”

সংঘর্ষের প্রভাব সীমান্তের এপারে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত কয়েকদিন ধরে সরকারি বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। সেখানে কার্যত যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।
এই সংঘাতের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও। জীবিকা নির্বাহের জন্য নাফ নদী ও আশপাশের এলাকায় যাতায়াত করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা গুলি ও স্থলমাইনের ঝুঁকির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ।


হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোকন কান্তি রুদ্র বলেন, “নাফ নদীতে মাছের প্রজেক্টে কাজ করার সময় এক যুবকের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”

স্থানীয়দের দাবি

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সীমান্তের কাছাকাছি স্থলমাইন থাকার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহজালাল- দ্রুত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে স্থলমাইন শনাক্ত করে অপসারণ এবং নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

পর্যবেক্ষণ শেষে অস্ত্রোপচার হতে পারে গুলিবিদ্ধ শিশুর

কক্সবাজার | ইনসাইট স্টোরি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলিতে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি শিশু হুজাইফা আফনানকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিটি স্ক্যান রিপোর্ট পাওয়ার পর তার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হবে।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

রোববার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছায় বলে জানান চমেক পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আলাউদ্দিন তালুকদার।
রাত ৯টার পর শিশুটির চাচা মৌলভী শওকত বে ইনসাইটকে বলেন, “চিকিৎসকরা শিশুটিকে আইসিইউতে নিয়েছেন। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট পাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জানিয়েছেন।”

মৃত্যুর গুজব, পরে সংশোধন

রোববার সকালে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোকন কান্তি রুদ্র প্রথমে জানান, মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী নিহত হয়েছে।

তবে দুপুরে এই তথ্য সঠিক নয় বলে বে ইনসাইটকে নিশ্চিত করেন হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল। তিনি বলেন, “শিশুটি মারা যায়নি।”

পরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস বে ইনসাইটকে বলেন, “শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্রথমে মৃত্যুর কথা শোনা গেলেও তা সঠিক নয়। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে।”

কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলো আফনান

১২ বছর বয়সী হুজাইফা আফনান টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জসিম উদ্দীনের মেয়ে। সে লম্বাবিল হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।

শিশুটির দাদা আবুল হাসেম বলেন,“সকালে আফনান নাশতা আনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। ফেরার সময় উঠানে হঠাৎ একটি গুলি এসে তাকে আঘাত করে। সে সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে।”

পরে তাকে প্রথমে উখিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বেলা ১২টার পর সেখান থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয় তার পরিবারের সদস্যরা।

সীমান্তের ওপারে কী চলছিল

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তোতার দ্বীপ এলাকা, যেটি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিপরীতে। স্থানীয়রা জানায়, যেখানে শনিবার রাত প্রায় ১১টা থেকে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলে।

এই সময় টানা গুলিবর্ষণ, মর্টারশেল বিস্ফোরণ ও ড্রোন হামলার শব্দ শোনা যায়। সংঘর্ষ চলাকালে সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে আফনানকে আঘাত করে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস জানান, “গুলিটি তার কানে লেগেছে।”

দ্বিমুখী আক্রমণে পড়ার দাবি সশস্ত্র গোষ্ঠীর

মিয়ানমারে থাকা একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একজন গ্রুপ কমান্ডার (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বে ইনসাইটকে রোববার দুপুরে ওয়াটসএপে বলেন, “আমরা দ্বিমুখী আক্রমণে পড়েছি। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। একদিকে জান্তা অন্যদিকে আরাকান আর্মি”।

তিনি জানান, “ভোর থেকে যারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, তারা নবী হোসেন গ্রুপ ও আরএসওর সদস্য হতে পারেন।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের চাপে অনেক সদস্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছেন।

‘টিকতে না পেরে পালিয়ে এসেছি’ – সশস্ত্র সদস্যের স্বীকারোক্তি

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাদেক নামের এক যুবক গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি নবী হোসেন গ্রুপের সদস্য।


তিনি বলেন,“আমরা আরাকান আর্মির সাথে টিকতে পারিনি। তাই পালিয়ে এসেছি।”


সাদেকের ভাষ্য, “আমাদের অনেক মানুষ ছিল। কে কোথায় গেছে ঠিক নাই। তোতার দ্বীপে আমাদের সাথে আরাকান আর্মির তুমুল যুদ্ধ হয়েছে।”

উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ও সড়ক অবরোধ

এদিকে রোববার সকালে বাংলাদেশী শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী উখিয়া–টেকনাফ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ ছিল।
পরে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সীমান্তবাসীর আতঙ্ক

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা বলেন, “গত দুই–তিন দিন ধরে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তবে শনিবার রাত ১১টার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গুলিবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।”

রোববার রাত সাড়ে ৯টায় স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাকিল বলেন, “দুপুর ১২টার পর থেকে আর গুলির শব্দ পাওয়া যায়নি। এখন সীমান্ত শান্ত রয়েছে। তবে প্রায় প্রতিদিন রাত বাড়লেই গোলাগুলি শুরু হয়।”

অনুপ্রবেশ ও আটক

সংঘর্ষের মধ্যে নাফ নদী ও স্থলসীমান্ত পেরিয়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান,“সীমান্ত অতিক্রম করে আসার পর মোট ৫৩ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে।”

রাতে টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, “আটকদের থানায় আনা হয়েছে। যাচাই-বাছাই চলছে। তাদের কাছে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি। আইনী প্রক্রিয়া চলছে”।

নিরাপত্তা জোরদার, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে

উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, “সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও স্থলসীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।”

সীমান্তে আপাতত গোলাগুলি বন্ধ থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি।

কক্সবাজারে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পায়নি সংশ্লিষ্টরা, বলছে “গুজব ও প্রতারণা”

কক্সবাজার | ইনসাইট স্টোরি

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চললেও, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ও পুলিশ।

তবে সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো তথ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে সংঘবদ্ধ অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টার তথ্য উঠে এসেছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

“না, আমরা কোনো প্রমাণ পাইনি। এগুলো মূলত গুজব। কয়েকটি সভায় আমরা স্পষ্টভাবে সবাইকে গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ করেছি,” বলেন তিনি।

আটক ও জব্দ: কী বলছে গোয়েন্দা তথ্য

সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর এলাকার একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের একজন সদস্য এবং একজন পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়।

পরবর্তীতে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং একটি পুলিশের ব্যাগ জব্দ করে তাদের কক্সবাজার সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।

আটক ব্যক্তিরা কারা

সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা হলেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্য পেকুয়ার ফজলুল হক ও পরীক্ষার্থী কুতুবদিয়ার জেসমিন আক্তার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা বে ইনসাইটকে বলেন, গোয়েন্দা তৎপরতার ভিত্তিতে ‘প্রশ্ন ফাঁসের’ অভিযোগেই তাদের আটক করা হয়। ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষার্থীকে উত্তর বলে দিচ্ছিলেন বাইরের একজন।

বে ইনসাইট জানতে চায় তা ‘ফাঁসকৃত’ প্রশ্ন কিনা? তিনি বলেন, প্রশ্ন হাতে নিয়েই উত্তর বলছিলেন বাইরে থাকা যুবক।

বড় পরীক্ষা, বড় গুঞ্জন

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবছর প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ১০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটি বড় অংশ ঝরে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ থেকে ১৫ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এই বিশাল অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়ানো নতুন কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন শাহীন মিয়া।

“১০ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কথা বলবেনই। কিন্তু এসব কথা পরীক্ষার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে এবং এমনকি পুরো পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে,” বলেন তিনি।

“সংবাদ প্রকাশ নিয়ে অভিযোগ”

কিছু সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “কিছু নিউজ চ্যানেল ‘শুনেছি’ বা ‘সম্ভাবনা আছে’ বা ‘সূত্র বলছে’ এমন শব্দ ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সব মানুষ বিষয়গুলো একভাবে ব্যাখ্যা করেন না। এতে অনেকেই মনে করেন, প্রকাশিত খবরটি হয়তো নিশ্চিত সত্য।”

তার দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত দলিল, ডিজিটাল প্রমাণ বা যাচাইযোগ্য তথ্য কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। “আমাদের কেউ এমন কিছু হাজির করতে পারেনি, একেবারেই না,” যোগ করেন তিনি।

“আটক, তবে প্রশ্ন ফাঁস নয়!”

তবে পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপরতার অংশ হিসেবে দুইজনকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন শাহীন মিয়া। তিনি বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কিছু ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।”

তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, “এগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়। পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা করেছিল তারা।”
আটক দুজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে দক্ষিণ খুরুশকূল কেন্দ্র ও সিটি কলেজ কেন্দ্রের সঙ্গে।

পুলিশের অবস্থান

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছমি উদ্দিনও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কোনো ঘটনার প্রমাণ পুলিশও পায়নি।

“পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে দুইজনকে আটক করে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে,” বলেন ওসি।

তিনি আরও জানান, নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য দিয়ে কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

‘প্রশ্নপত্র সাদৃশ’ প্রশ্ন, কিন্তু মিল নেই

এদিকে বে ইনসাইট একাধিক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তথাকথিত ‘প্রশ্নপত্র সাদৃশ’ কিছু প্রশ্ন সংগ্রহ করেছে। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলোর সঙ্গে পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের কোনো মিল নেই।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রতারণা হিসেবে দেখছে পুলিশ।ওসি ছমি উদ্দিন বলেন, “এগুলো সাধারণত ভুয়া প্রশ্ন দেখিয়ে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।”

প্রশ্ন থেকেই যায়

তবে বিশাল এই পরীক্ষাব্যবস্থায় গুজব ঠেকানো, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীলতা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কক্সবাজারে কখনো শৈত্যপ্রবাহ হয়নি কেনো?

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

কক্সবাজারে চলমান শীতল আবহাওয়া আরও এক সপ্তাহের মতো অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে তাপমাত্রা কমলেও এটিকে শৈত্যপ্রবাহ বলা যাবে না বলে স্পষ্ট করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

ইতিহাসে সর্বনিম্ন ১০.৩ ডিগ্রি, তবুও শৈত্যপ্রবাহ নয়

কক্সবাজারের আবহাওয়া ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি। সেদিন তাপমাত্রা নেমেছিল ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এরপরও এ জেলায় কখনো শৈত্যপ্রবাহ ঘোষণা করতে হয়নি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সাল থেকে সংরক্ষিত আবহাওয়া রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই উপকূলীয় জেলায় কখনোই শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।

কেন শৈত্যপ্রবাহ নয়

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শৈত্যপ্রবাহ ঘোষণা করতে হলে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামতে হয়। কক্সবাজারে এখন পর্যন্ত তাপমাত্রা কখনোই সেই সীমার নিচে নামেনি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, “এ অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সমুদ্রঘেঁষা আবহাওয়ার কারণে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। ফলে শীত বাড়লেও তা শৈত্যপ্রবাহে রূপ নেয় না।”

আজ বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার কক্সবাজারে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি বছরের সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে ঘণ্টায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইছে, যা শীতের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অ্যান্টিবায়োটিক নয়

শীতের প্রভাবে ঠাণ্ডাজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সাবুক্তগীন মাহমুদ শহেল বলেন, “ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতা দেখা দিলে নিজ উদ্যোগে পাড়া-মহল্লার ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।”

শিশু ও অ্যাজমা রোগীদের বাড়তি সতর্কতা

শীতের সময় শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে মি. শহেল বলেন, “শিশুদের সকালে, সন্ধ্যায় ও রাতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে নেওয়া উচিত নয়। গরম কাপড় ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।”

এ ছাড়া অ্যাজমা আক্রান্ত রোগীদের শীতের সময়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান এই চিকিৎসক।

যে মামলার জটিলতায় বাতিল হলো আযাদের মনোনয়ন

কক্সবাজার | বে ইনসাইট 

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়ন বাতিল  করা হয়েছে। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল।

শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আ. মান্নান যাচাই-বাছাই শেষে প্রথমে মনোনয়ন স্থগিত এবং কিছু সময় পর তা বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আ. মান্নান বলেন, “মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।”

তিনি জানান, বিস্তারিত কারণ মনোনয়ন বাতিলের সার্টিফিকেটে উল্লেখ থাকবে।

মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের সময় প্রার্থী আযাদের পক্ষে উপস্থিত থাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আরিফ বলেন, যে মামলার কথা বলা হচ্ছে সেটি স্বৈরশাসক আমলের একটি মামলা।ওই মামলায় তিনি তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেছেন এবং বর্তমানে উচ্চ আদালতে মামলাটি আপিলাধীন।

আইনজীবী মো. আরিফ বলেন, “এটি ছিল আদালত অবমাননার মামলা, কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ নয়। আমাদের বক্তব্য না শুনেই রিটার্নিং কর্মকর্তা একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

উল্লেখ্য, হামিদুর রহমান আজাদ ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া) আসন থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিএনপি–জামাত জোট থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

হলফনামায় ৭০ মামলার তথ্য

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামায় হামিদুর রহমান আযাদ তার বিরুদ্ধে থাকা ৭০টি মামলার তথ্য উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ মামলা প্রত্যাহারকৃত বা খালাসপ্রাপ্ত বলে জানান তিনি। কেবল একটি মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।

আদালত অবমাননার মামলার পটভূমি

২০১৩ সালের ৯ জুন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিচারাধীন বিষয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হামিদুর রহমান আযাদসহ জামায়াতের তিন নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করে।

ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে একটি সমাবেশে বিচারাধীন বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সমাবেশে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন,

“স্কাইপে সংলাপের গোপন তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর এ ট্রাইব্যুনাল আর এক মুহূর্তও চলতে পারে না।”

এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড ও তিন হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই সপ্তাহের কারাদণ্ডের আদেশ দেয়।

পরে ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই দণ্ডাদেশ কার্যকরের জন্য কক্সবাজারের সাবেক এই সংসদ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

বৈধ প্রার্থীরা

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার-২ আসনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, ইসলামী আন্দোলনের জিয়াউল হক,

খেলাফত মজলিশের ওবাদুল কাদের নদভী, গণঅধিকার পরিষদের এস এম রোকনুজ্জামান খান এবং

জাতীয় পার্টির মো. মাহমুদুল করিম।

আপিলের সুযোগ

নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করবেন। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে।

আইনে প্রার্থী অযোগ্যতার বিধান

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর ধারা ১২(১)(গ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ন্যূনতম দুই বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তবে কারামুক্তির পর পাঁচ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

এ ছাড়া সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদেও একই ধরনের বিধান রয়েছে।

আরো যে ৯ কারণে একজন প্রার্থী অযোগ্য হতে পারেন

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিচের যে কোনো একটি শর্ত প্রযোজ্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না—

১. উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করা হলে।
২. দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় হতে অব্যাহতি লাভ না করলে।
৩. কোনো আদালত কর্তৃক ফেরারি (Fugitive) ঘোষিত হলে।
৪. কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে (দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ না করলে)।
৫. আইসিটি অ্যাক্টের সেকশন ২০সি অনুযায়ী অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল হলে।
৬. নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ন্যূনতম দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে।
৭. প্রজাতন্ত্রের বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ কিংবা প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসর গ্রহণের পর তিন বছর অতিবাহিত না হলে।
৮. কৃষি কাজের জন্য গৃহীত ক্ষুদ্র কৃষিঋণ ব্যতীত অন্য কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি মনোনয়নপত্র দাখিলের আগ পর্যন্ত পরিশোধে ব্যর্থ হলে।
৯. ব্যক্তিগতভাবে টেলিফোন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি বা সরকারের সেবা প্রদানকারী কোনো সংস্থার বিল মনোনয়নপত্র দাখিলের আগ পর্যন্ত পরিশোধ না করলে।

নতুন শিক্ষাবর্ষ: কক্সবাজারে ইংরেজি মাধ্যমের নতুন বই আসেনি

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

দেশজুড়ে বই উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও কক্সবাজারে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা এখনো অপেক্ষায়।প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ এবং মাধ্যমিক স্তরে আংশিক সরবরাহ সম্ভব হলেও, ইংরেজি মাধ্যমের কোনো পাঠ্যবই এখনো জেলায় পৌঁছায়নি।

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম দিন পর্যন্ত কক্সবাজারে মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ নতুন বই পৌঁছেছে। তবে এই পরিসংখ্যানে ইংরেজি মাধ্যমের বই অন্তর্ভুক্ত নয়।

কক্সবাজারের জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বে ইনসাইটকে বলেন, “সব শিক্ষার্থীর মধ্যে বই পৌঁছানো হয়েছে, তবে তা আংশিক। ইংরেজি মাধ্যমে এখনো কোনো বই আসেনি এ কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে পুরনো বই দিয়েই সাময়িকভাবে পাঠদান চালু রাখতে হচ্ছে।”

এতে করেই স্পষ্ট, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে নতুন বই ছাড়াই।

কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ (ইংরেজি মাধ্যম) হাসান মোহাম্মদ জানান, প্রাথমিকের বই এসেছে, তবে মাধ্যমিক স্তরের বই আসেনি। 

তবে ৭ তারিখ থেকে তাদের ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ কার্যক্রম শুরুর কথা রয়েছে, তার আগেই বই পাওয়ার প্রত্যাশা করেন মি. হাসান।

তবে বে ইনসাইট শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছে, ইংরেজি মাধ্যমের বই সরবরাহে প্রতি বছরই কিছুটা বিলম্ব দেখা যায়। 

এদিকে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রামমোহন সেন বলেন, “আমাদের স্কুলে প্রায় ৪০ শতাংশ বই এসেছে। বাকি বইগুলো পথে আছে। যারা প্রথম দিন এসেছিল, তারা সবাই কিছু না কিছু বই পেয়েছে।”

তবে এই ‘কিছু বই’-এর তালিকায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা নেই।

প্রাথমিক শতভাগ বই এসেছে 

প্রাথমিক স্তরে বই বিতরণে সাফল্যের চিত্র তুলে ধরেছেন জেলা ও উপজেলা কর্মকর্তারা। কক্সবাজারের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শাহীন মিয়া জানান, “প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ বই এসেছে এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।”

উখিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আশরাফুল আলম সিরাজী বলেন, “ উপজেলার ৭৮টি সরকারি ও ২৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ১ লাখ ২৬ হাজার পাঠ্যবই এসেছে, যা চাহিদার সমপরিমাণ। প্রথম দিন যারা বিদ্যালয়ে এসেছে, সবাই সব বই পেয়েছে।”

এই সফলতার বিপরীতে মাধ্যমিক ও ইংরেজি মাধ্যমের চিত্র স্পষ্টভাবে বৈপরীত্য তৈরি করছে।

উপজেলাগুলোতেও আংশিক বাস্তবতা

মহেশখালীর বারিয়াপাড়া মডেল একাডেমির প্রধান শিক্ষক এম আব্দুল হান্নান জানান, “প্রাথমিকের সব বই এসেছে। কিন্তু মাধ্যমিকে শুধু নবম শ্রেণির বই এসেছে, অষ্টম শ্রেণির কিছু বই পাওয়া গেছে। বাকি বই এখনো আসেনি।”

যদিও জেলা শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, বাকি বইগুলো আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে স্কুলগুলোতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।