বে ইনসাইট | কক্সবাজার
দুইশ বছরের একটি শহরকে কীভাবে দেখা যায়? শুধু মানচিত্রে, নাকি স্মৃতিতে? নাকি একজন শিল্পীর ক্যানভাসে, যেখানে সময় স্তর হয়ে জমে থাকে?
শিল্পী ইয়াসির আরাফাত-এর “কক্সবাজার ডায়েরি” ঠিক সেই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড় করায় আমাদের। এই শহরকে আমরা কতটা চিনি, আর কতটা শুধু ব্যবহার করি?
উপনিবেশ, বন্দর, আর এক শহরের জন্মকথা
আজকের পর্যটন নগরী কক্সবাজার-এর শেকড় খুঁজতে গেলে যেতে হয় প্রায় দুই শতাব্দী পেছনে। ব্রিটিশ আমলে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের নামানুসারে গড়ে ওঠা এই জনপদ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে উপকূলীয় এক গুরুত্বপূর্ণ বসতি।
সমুদ্র, পাহাড়, নদী এই তিনের মিলনে গড়ে ওঠা ভূপ্রকৃতি শহরটিকে দিয়েছে এক অনন্য চরিত্র। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাকখালী নদী শুধু ভৌগোলিক নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও শহরের একটি মেরুদণ্ড।
কিন্তু এই দুই শতকে শহরটি যেমন বেড়েছে, তেমনি হারিয়েছে অনেক কিছু।
যে শহর ছিল ধীর, আর যে শহর এখন দ্রুত
একসময় কক্সবাজার ছিল নিস্তব্ধ, ধীরগতির এক শহর। যেখানে বিকেলের হাওয়া, সমুদ্রের গর্জন আর পরিচিত মুখগুলোই ছিল জীবনের কেন্দ্র।
আজ সেটি দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি।
এই রূপান্তরই ধরা পড়েছে শিল্পী ইয়াসিরের কাজে, একটি শহরের “আগে” এবং “এখন” -এর ভিজ্যুয়াল ডায়ালগ।
তার ভাষায়, “আমি যখন ফিরে আসি, দেখি আমার রেখে যাওয়া শহর আর এখনকার শহরের মধ্যে একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। সেই গ্যাপটাই আমি খুঁজতে চেয়েছি।”
আঁকার ভেতর দিয়ে দেখা: অবজারভেশন থেকে উপলব্ধি
ইয়াসিরের কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ধারণা, দেখা মানে শুধু দেখা নয়, বুঝে দেখা।
এই “দেখা” থেকেই জন্ম নেয় দায়বোধ।
একটা শহরকে চেনা কি শুধু সেখানে বসবাস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি তাকে দেখতে শেখার জন্য দরকার অন্য এক চোখ। যে চোখ পর্যবেক্ষণ করে, প্রশ্ন তোলে, আর শেষ পর্যন্ত ক্যানভাসে তার উত্তর খোঁজে?
শিল্পী ইয়াসির আরাফাত-এর কাছে কক্সবাজারকে নতুন করে দেখার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল বহুদিন পর শহরে ফিরে এসে। প্রায় ২০২০-২১ সালের দিকে ফিরে এসে তিনি আবিষ্কার করেন, তার ফেলে যাওয়া কক্সবাজার আর বর্তমান কক্সবাজারের মধ্যে তৈরি হয়েছে অদৃশ্য এক দূরত্ব। সেই দূরত্বের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সংযোগ, আবার বিচ্ছেদও।
এই খোঁজ থেকেই জন্ম নেয় “কক্সবাজার সিরিজ”।
স্মৃতির জায়গায় ফিরে যাওয়া, নতুন চোখে দেখা
ছোটবেলার পরিচিত জায়গাগুলো, যেখানে বসে আড্ডা, যেখানে কাটত বিকেল, যেখানে জমে থাকত জীবনের সহজতম মুহূর্তগুলো, সেই জায়গাগুলোতেই আবার ফিরে যেতে শুরু করেন ইয়াসির। তবে এবার তিনি দর্শক নন, একজন পর্যবেক্ষক।
প্রতিদিন প্রায় একটি করে ছবি আঁকতেন তিনি। তার ভাষায়, “ছবি আঁকা আমাদের দেখতে শেখায়।”
এই “দেখা” শুধু চোখে দেখা নয়, এটা উপলব্ধির বিষয়। যেমন, একটি ডাস্টবিন প্রতিদিন চোখে পড়ে, কিন্তু যখন সেটিকে আঁকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন তার রং, গঠন, তার চারপাশের নোংরা। সবকিছুই নতুন করে ধরা পড়ে। আর তখনই প্রশ্ন জাগে, কেন এটা এমন? কীভাবে এটি বদলানো যায়?
বাঁকখালির জল, স্মৃতির রঙ
শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাকখালী নদী-ও তার ছবিতে ফিরে এসেছে বারবার।
শৈশবের স্মৃতিতে যে নদীর পানি ছিল সবুজাভ, আজ তা অনেক সময় মলিন, কালচে। এই পরিবর্তন শুধু দৃশ্যমান নয়, এটি এক ধরনের মানসিক ধাক্কাও।
“আমি যখন আঁকতে বসি, তখন আমার সামনে অপশন থাক, আমি কি বর্তমান রং আঁকবো, নাকি সেই সম্ভাব্য রং, যা নদীটি পেতে পারত?” বলছিলেন ইয়াসির।
এই প্রশ্নই আসলে তার কাজের কেন্দ্রবিন্দু বাস্তবতা বনাম সম্ভাবনা।
হারিয়ে যাওয়া স্থাপনা, ফিরে আসা স্মৃতি
এই সিরিজে উঠে এসেছে কক্সবাজারের হারিয়ে যাওয়া বা পরিবর্তিত অনেক স্থাপনা। যেমন, একসময় শহরের বিনোদনের কেন্দ্র ছিল টকি হাউজ সিনেমা হল। আজ সেটি নেই, কিন্তু তার স্মৃতি এখনো জীবন্ত অনেকের কাছে।
একজন দর্শনার্থী প্রদর্শনীতে এসে সেই ছবি দেখে বলে উঠেন, “এই জায়গাটায় তো আমাদের শৈশব লুকিয়ে আছে!”
একইভাবে, কক্সবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ-এর পুরনো ফটক, যা সম্প্রতি ভেঙে ফেলা হয়েছে, তার ছবিও দর্শকদের মনে তুলেছে তুলনামূলক প্রশ্ন: নতুনের সঙ্গে পুরনোর সহাবস্থান কি সম্ভব ছিল না?
আরও আছে সাচি চৌধুরী মসজিদ, যা শহরের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। এইসব স্থাপনা শুধু স্থাপত্য নয়, এগুলো শহরের স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ।
২০০ ছবির ভেতর ৬০-এর প্রদর্শনী
ইয়াসিরের আঁকা ছবির সংখ্যা এখন ১৫০ থেকে ২০০-এর মধ্যে। এর মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া প্রায় ৬০টি ছবি নিয়ে শুরু হয়েছে একটি উন্মুক্ত প্রদর্শনী ২৩ মার্চ থেকে।
এই প্রদর্শনীর বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো গ্যালারির ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। রাস্তার পাশে, উন্মুক্ত স্থানে যেখানে একজন পথচারী হঠাৎ করেই থেমে যেতে পারেন, নিজের শহরকে নতুন করে দেখতে পারেন।
শহরকে আঁকার আহ্বান
এই প্রদর্শনীর মূল বার্তা খুবই সরল, কিন্তু গভীর।
“আপনি আপনার শহরকে আঁকুন, তাহলেই আপনি আপনার শহরকে চিনবেন।”
ইয়াসির মনে করেন, পৃথিবীর বড় শহরগুলো নিজেদের এতবার এঁকেছে যে তারা নিজেদের খুব ভালো করেই চেনে। আর তাদের শক্তি হলো দুর্বলতা, বিবর্তনের ধারা।
কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও তিনি একই স্বপ্ন দেখেন। যে শহরের শিশু, তরুণরা যদি আঁকার মাধ্যমে শহরকে দেখতে শেখে, তাহলে তারা ভবিষ্যতে এই শহরকে আরও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারবে।
চলমান একটি যাত্রা
“কক্সবাজার ডায়েরি” কোনো এককালীন প্রদর্শনী নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামীতে কক্সবাজারের বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি দেশের অন্যান্য শহরেও এই প্রদর্শনী নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পীর ভাষায়, “এটা শুধু ছবি না, এটা একটা ভাবনার যাত্রা, যেখানে আমরা আমাদের শহরকে নতুন করে দেখতে শিখি।”
এই শহরকে প্রতিদিন আমরা দেখি, ব্যবহার করি, অতিক্রম করি। কিন্তু কয়জন তাকে সত্যিই দেখি?
সম্ভবত, সেই দেখার শুরুটা হতে পারে একটি আঁকা ছবি দিয়েই।








