তিন রাষ্ট্রপর্বে কক্সবাজারের তিন মন্ত্রী: উপকূল থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

বে ইনসাইট | কক্সবাজার

পর্যটন নির্ভর জেলা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রিত্বের নজির খুব বেশি নয়। তবে ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ—তিন রাষ্ট্রপর্বেই এই জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব ছিল। জন্ম, পরিবার, ছাত্ররাজনীতি, দলীয় উত্থান, মন্ত্রীত্ব এবং বিতর্ক—সব মিলিয়ে তিনজনের রাজনৈতিক জীবন তিন ভিন্ন সময়ের প্রতিচ্ছবি।


ব্রিটিশ ভারত পর্ব

হারবাংয়ের সন্তান, প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রী

১৮৯০ সালে কক্সবাজারের হারবাংয়ে জন্ম নেন জালালউদ্দিন আহমদ। শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পান। বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা তাঁকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলে। সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “খান বাহাদুর” উপাধি দেয়।

১৯৩৭ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বঙ্গীয় আইনসভায় প্রবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী–এর মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৪৬–৪৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জনস্বাস্থ্য সংকট ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময়কালেই ছিল তাঁর মন্ত্রীত্ব।
ব্রিটিশ ভারতের শেষ অধ্যায়ে কক্সবাজার থেকে এটিই ছিল প্রথম প্রাদেশিক মন্ত্রীত্ব।


পাকিস্তান পর্ব

রামুর ফরিদ আহমদ: ছাত্রনেতা থেকে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী

৩ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে রামুর রশিদ নগরে জন্ম নেন ফরিদ আহমদ। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারে বেড়ে ওঠা ফরিদ আহমদ উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৫২ সালে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪–১৯৬৯ পর্যন্ত নেজামে ইসলাম পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৭ সালে প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল ইব্রাহিম চুন্দ্রিগারের মন্ত্রিসভায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৫ পর্যন্ত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৫ সালে বক্সার মুহাম্মদ আলিকে নিয়ে Muhammad Ali Clay শিরোনামে বই লেখেন। মাসিক ‘পৃথিবী’ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক এবং দৈনিক ‘নাজাত’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের আহ্বানে অনুষ্ঠিত রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। একই বছরে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন। ১৯৭১ সালে দামেস্কে আফ্রো-এশীয় পিপলস সলিডারিটি অর্গানাইজেশনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ ঢাকায় ইস্ট পাকিস্তান সেন্ট্রাল পিস কমিটি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ইস্ট পাকিস্তান পিস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি ও রাজাকার বাহিনীর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এই অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিতর্কিত করে তোলে।


স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব

সালাহউদ্দিন আহমদ: প্রতিমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৩০ জুন ১৯৬২ সালে চকরিয়ায় জন্ম নেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পিতা শায়দুল হক, মাতা আয়েশা হক। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে তৃতীয় খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হন।

দলীয় কাঠামোয় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দলীয় মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভীর গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়া তাঁকে দলের মুখপাত্র নিয়োগ দেন।

নিখোঁজ ও কারাবাস

২০১৫ সালের মার্চে ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন তিনি। বিএনপির দাবি ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে আটক করেছে; প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী র‌্যাবের সদস্যরা তাঁকে তুলে নেয়। দুই মাস পর ভারতের শিলংয়ে তাঁর অবস্থান জানা যায়। ভারতীয় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিদেশি আইন ভঙ্গের অভিযোগ আনে। ৩ জুন ২০১৫ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় নর্থ ইস্টার্ন ইন্দিরা গান্ধী রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল সায়েন্সেসে রাখা হয়।

তিন বছরের বেশি সময় পর, ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেঘালয়ের আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপি তাঁকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ শিলংয়ের আপিল আদালত তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়।

বর্তমান দায়িত্ব

রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন—যা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা রাজনীতিকদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বের পদ।


তিন সময়, তিন বাস্তবতা

রাষ্ট্রপর্বনামজন্মস্থানদলমন্ত্রীত্ব
ব্রিটিশ ভারতজালালউদ্দিন আহমদহারবাংকৃষক প্রজা পার্টিস্বাস্থ্য মন্ত্রী
পাকিস্তানফরিদ আহমদরামুনেজামে ইসলাম পার্টিকেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী
বাংলাদেশসালাহউদ্দ্দিন আহমদচকরিয়াবিএনপিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী; বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার থেকে উঠে আসা এই তিন রাজনীতিক তিন ভিন্ন রাষ্ট্রপর্বে তিন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করেন—ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ অধ্যায়, পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের দলভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি।

সংখ্যায় কম হলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের উপস্থিতি তাই স্পষ্ট—সমুদ্রের তীর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে আমরা সহযোগিতা নিয়েছি-

  1.  ্কালাম আজাদ (২০১৪). মুক্তিসংগ্রামে কক্সবাজার : প্রসঙ্গ রাজনীতি : কক্সবাজার জেলা প্রশাসন পৃ. ১২৭–১২৮.
  2.  Government of Bengal. “Alphabetical list of members”. Bengal Legislative Assembly Proceedings (1939). Vol. 54. 
  3.  Indian Annual Register, Volume 1. Annual Register Office. 1944. p. 2.
  4. হাসান মুরাদ সিদ্দীকী: চকরিয়ার ইতিহাস

দিন ফুরোলো ইউনূসের, ঘরে ফেরা হলো না রোহিঙ্গাদের!

সৌরভ দেব |

কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে যে ঈদের স্বপ্ন দেখেছিল তারা, সেই ঈদ এবারও কাটছে শরণার্থী শিবিরের টিন আর ত্রিপলের ঘরে। সময় শেষ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের, কিন্তু শেষ হয়নি রোহিঙ্গাদের অপেক্ষা।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আশার বার্তা দিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, নোবেলজয়ী পরিচিতি ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক ছিল তাঁর একটি বক্তব্য ‘সামনের ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি মিয়ানমারে গিয়ে করবে।’

কিন্তু সময় গড়িয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। সামনে ঈদও এসে গেছে। আর রোহিঙ্গারা রয়ে গেছে ঠিক সেখানেই—কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শিবিরে।

‘প্রতিশ্রুতির ঈদ’ অপেক্ষার আরেক বছর

উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে বসবাসরত ৪৫ বছর বয়সী আবদুস সালাম বলেন,“আমরা সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল এবার হয়তো সত্যি ফিরব। এখন বুঝি, কথাটা শুধু কথাই ছিল।”

শিবিরে ঈদ মানে উৎসব নয় বরং নতুন করে উপলব্ধি করা আরেকটি বছর হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। বাঁশ আর ত্রিপলের ঘরে ঈদের সকালে রান্না হয় সীমিত রেশনের খাবার। নেই আয়োজন, নেই গ্রামে ফেরা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ।

এক রোহিঙ্গা কিশোরীর কণ্ঠে ধরা পড়ে প্রজন্মগত সংকট, “আমি বাংলাদেশেই বড় হয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ আমার দেশ না, মিয়ানমারও আর চেনে না।”

ইউনূস অধ্যায়ের ইতি, ইস্যু রয়ে গেল

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইউনূস অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। কিন্তু এই সময়টাতেই রোহিঙ্গা সংকট আবারও অগ্রাধিকারের বাইরে চলে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবাধিকারকর্মী কলিম উল্লাহ বলেন, “রোহিঙ্গারা এখন ভূরাজনীতির অনাথ। সবাই সহানুভূতির কথা বলে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে চায় না।”

২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আট বছরেও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেনি। ইউএনএইচসিআরের হিসাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাবে তা দেড় মিলিয়নের কাছাকাছি।

জাতীয় নীতিমালা নেই, প্রতিনিধিত্ব নেই

‘ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গা’র প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বলেন,“বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত ১৩ লাখ রোহিঙ্গার জন্য কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। প্রতিনিধিত্বমূলক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, ইউনূসের ওপর তারা আশাবাদী ছিলেন।

‘আমরা মর্যাদা নিয়ে ফিরতে চাই’

রোহিঙ্গা আর্ট ক্লাবের অপারেশন ম্যানেজার ও চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, “আমরা চাই মর্যাদা আর নিরাপত্তা নিয়ে ফিরতে। ইউএন আর বাংলাদেশ সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা যেন আমাদের কমিউনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।”

ইউনূসের বক্তব্য: আবেগ না কৌশল?

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল আবেগপ্রবণ কোনো মন্তব্য, নাকি কৌশলগত বার্তা—এই প্রশ্ন ঘিরে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন গবেষকরা।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, প্রফেসর ইউনূসের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, প্রথমত, প্রফেসর ইউনূস এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন—‘আগামী বছর ঈদ আপনারা নিজ ভূমিতে করবেন’—এই কথাটা তিনি আবেগের বশে বলেননি।

তার ভাষায়, “উনি যে অবস্থানে ছিলেন—একটি দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, নোবেল লরিয়েট—এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আবেগে ভেসে এমন বক্তব্য দেওয়ার কথা নয়।”

তিনি মনে করেন, ইউনূসের বক্তব্যের পেছনে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “একটা সম্ভাবনা হচ্ছে—উনি সত্যিকার অর্থেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান শুরু করতে চেয়েছেন। অন্তত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটা শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছেন।”

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কিন্তু বাস্তবতা হলো—এটা বাস্তবসম্মত ছিল না।”

সরকারের অবস্থান: ‘এটা প্রত্যাশা ছিল, প্রতিশ্রুতি নয়’

রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে প্রতিশ্রুতি নয়, প্রত্যাশার প্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছে সরকার।

বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যটি মূলত ঈদকে ঘিরে এই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা তুলে ধরার একটি মানবিক ভাষ্য ছিল।

মিজানুর রহমান বলেন, “এই অঞ্চলে ঈদের সময় মানুষ গ্রামে যায়, বাবা-মা ও দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গারা যেহেতু আট বছর ধরে এখানে আটকে আছে, সেই মানবিক আবেগ থেকেই বলা হয়েছে—আগামী ঈদে আপনারা আপনাদের বাড়িতে যাবেন।”

রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরে কমিশনার বলেন,“এই সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের হাতে নেই। এটা মূলত মিয়ানমার রাষ্ট্র এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ এখানে একটি অংশ মাত্র।”
তিনি স্পষ্ট করেন,“যদি সমাধানটা বাংলাদেশের হাতে থাকত, তাহলে গত আট বছর ধরে এই সংকট ঝুলে থাকত না।”

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ: আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইস্যুটি ‘জিইয়ে রাখার চেষ্টা’

অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সীমিত সময়ের মধ্যেও রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবার দৃশ্যমান করেছে বলে দাবি করেন মিজানুর রহমান।

তার ভাষায়,“আমরা চেষ্টা করেছি। জাতিসংঘে একটি স্পেশাল কনফারেন্স হয়েছে। বাংলাদেশে তিন দিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের নজরে বিষয়টি আনা হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এসেছেন।”
তিনি বলেন,“ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে আবার এঙ্গেজমেন্ট শুরু হয়েছে—এটা বড় বিষয়।”

কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।

তার মতে, এটি একটি কন্টিনিউয়াস প্রসেস।“ যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে—এই বিশ্বাস আমাদের আছে।”

প্রত্যাবাসন ও তহবিল সংকট— ‘আশা ছাড়ছি না’

বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গা সংকটকে বারবার আন্তর্জাতিক টেবিলে তুলছে, সে ব্যাখ্যাও দেন কমিশনার।
তিনি বলেন, “এর দুটি প্রধান কারণ—একটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন, আরেকটি হচ্ছে এখানে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা।”

তিনি জানান, “তহবিল সংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই মানুষগুলোর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।”

মিজানুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ সরকার এই ইস্যুটি সবসময় আন্তর্জাতিকভাবে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এটা যদি চলমান থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো না কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব—এই আশা আমরা করি।”

রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রাধিকারে রোহিঙ্গা সংকট নেই

নৃ-বিজ্ঞানের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটি তাদের নির্বাচন ইশতেহারে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরেনি।

তার মতে, এটি রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।“ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো রোহিঙ্গা সংকটকে একটি বড় জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখছে না। অথচ বাস্তবে এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।”

এ বিষয়ে রাজনৈতিক মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী।

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“প্রফেসর ইউনূস কী উদ্দেশ্যে বা কী পরিকল্পনা নিয়ে এই কথা বলেছিলেন, সেটা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে বাস্তবতা হলো—এত অল্প সময়ে, বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে, এই সংকটের কোনো দৃশ্যমান সমাধান সম্ভব ছিল না।”

তার ভাষায়, “এটা যদি কোনো অলৌকিক ব্যাপার হতো—আলাউদ্দিনের চেরাগ বা আশ্চর্য প্রদীপের মতো—তাহলে হয়তো সম্ভব হতো। বাস্তব দুনিয়ায় সেটা হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, উনার সময় শেষ হয়ে গেছে।”
তবে তিনি বলেন, সংকটটি এখানেই শেষ নয়।“যেই সরকারই আসুক, এই বোঝা আমাদের ঘাড়েই থাকবে। এটাকে সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।”

‘রাখাইনে বৈধ সরকার নেই’

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী।
তিনি বলেন, “মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক দাঙ্গা, সংঘাত ও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এখন অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।”

প্রধান উপদেষ্টার আগের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“ওই মন্তব্য হয়তো আবেগের জায়গা থেকে ছিল, অথবা তখনকার পরিস্থিতির আলোকে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলে গেছে।”
তার মতে, সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাখাইনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। “এখন সেখানে কোনো বৈধ, কার্যকর সরকার নেই। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মতভাবে অনিশ্চিত।”

রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি, সরকারের পরিবর্তনে দায় শেষ হয় না

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “এই চুক্তিটা কোনো বিশেষ সরকার বা দলের মধ্যে হয়নি। এটা হয়েছে দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে।”


তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তখন মিয়ানমারে ছিল সুচির এনএলডি সরকার, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সরকার বদলালেই চুক্তি অকার্যকর হয়ে যায়—এমন নয়। রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার চুক্তি করে, আর যে সরকারই আসুক তার দায়িত্ব সেই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।”
তার মতে, নতুন সরকার চাইলে এই যুক্তি সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আবার অগ্রাধিকার তালিকায় আনতে পারে।

ইউএনএইচসিআর: ‘পরিস্থিতি এখনো প্রত্যাবাসনের অনুকূল নয়, সমাধান মিয়ানমারেই’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়।

ই-মেইলে পাঠানো এক প্রতিক্রিয়ায় সংস্থাটির মুখপাত্র শারি নিজমান জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে আসছে—উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে তারা নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চায়। তবে সেই প্রত্যাবাসনের জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো প্রয়োজন, সেগুলো এখনো পূরণ হয়নি।

ইউএনএইচসিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের নিজেদের আদি এলাকায় বসবাসের সুযোগ, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার, মৌলিক সেবা ও জীবিকায় প্রবেশাধিকার এবং নাগরিকত্ব ও বৈধ পরিচয়পত্র পাওয়ার একটি স্পষ্ট পথ নিশ্চিত করা জরুরি।

সংস্থাটি বলছে, এই শর্তগুলো নিশ্চিত করা মূলত মিয়ানমারের পূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে—যা বর্তমান বাস্তবতায় অনুপস্থিত।

রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, সেখানে ব্যাপক সংঘর্ষ, আন্তঃসম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং কাঠামোগত বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে রাখাইনে বসবাসকারী আনুমানিক ৫ লাখ ৩৬ হাজার রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা, চলাচলের স্বাধীনতা ও নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান মানবিক সংস্থার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সংস্থাটি জানায়, তারা বাংলাদেশ সরকারকে মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা সেবায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং এমন উদ্যোগের পক্ষে থাকবে, যা রোহিঙ্গাদের স্বনির্ভরতা বাড়াবে ও ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করবে।

নতুন সরকারের সামনে রোহিঙ্গা সংকট আগের মতোই এক কঠিন বাস্তবতা। জাতীয় নীতিমালা, কূটনৈতিক আগ্রাসন ও বহুমুখী সমাধান ছাড়া এই সংকট কাটবে না—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।

এই মুহূর্তে নিশ্চিত শুধু একটাই—দিন ফুরিয়েছে ইউনূসের, কিন্তু রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার দিন এখনো আসেনি। আরেকটি ঈদ পেরিয়ে যাচ্ছে অপেক্ষার প্রহর গুনে।

উপকূলীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার ১১তম দরিদ্র জেলা

বিশ্লেষণ | বে ইনসাইট

উপকূল, লবণ, মৎস্য, পর্যটন ও প্রবাসী আয়ের মতো বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার এখনো দেশের ১১তম দরিদ্র জেলা—এমন বাস্তবতা তুলে ধরে দারিদ্র্য নিরসনে ডাটা-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন এলজিইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

গত ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের ডিপিএইচই হলরুমে অনুষ্ঠিত ‘কেমন কক্সবাজার চাই’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনজুর সাদেক।

‘উপকূলীয় জেলা হয়েও আমরা পিছিয়ে’

তিনি বলেন, “পৃথিবীর প্রায় সব উপকূলীয় অঞ্চলই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের একমাত্র উপকূলীয় জেলা হয়েও কক্সবাজার অগ্রগতি করতে পারেনি। গ্যাস আছে, সমুদ্র আছে, লবণ-মৎস্য আছে—তবু আমরা পিছিয়ে। প্রশ্ন হলো, অন্যরা পারলো আর আমরা পারলাম না কেন?”

উপজেলাভিত্তিক দারিদ্র্যের চিত্র

মনজুর সাদেক জানান, দারিদ্র্যের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো বিপুল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

তিনি বলেন, “উপজেলা পর্যায়ে এখনো ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে এই হার ৩১–৩২ শতাংশ, রামুতে প্রায় ৩০ শতাংশ।”

এলিট-কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সমালোচনা

তার মতে, কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে ‘এলিট-কেন্দ্রিক’ চিন্তা প্রাধান্য পেয়েছে।

“আমাদের সামনে আসে এমপি, চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের এলিটরা। কিন্তু যাঁরা সামনে আসেন না, যাঁরা দৃষ্টির বাইরে—দরিদ্র মানুষ—তাঁদের কথা আমরা ভাবিনি। অথচ উন্নয়ন হওয়া উচিত তাঁদের জন্যই,” বলেন তিনি।

আবেগ নয়, দরকার ডাটা-ভিত্তিক চিকিৎসা

দারিদ্র্য নিরসনে আবেগ নয়, ডাটা-ভিত্তিক চিকিৎসা প্রয়োজন উল্লেখ করে মনজুর সাদেক বলেন, “এক্স-রে ছাড়া যেমন চিকিৎসা হয় না, তেমনি ডাটা ছাড়া উন্নয়নও হয় না। ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য নিয়ে জানতে হবে কোথায় হাত দিলে সবচেয়ে বেশি ফল পাওয়া যাবে।”

লবণনির্ভর অর্থনীতি ও কৃষি সংকট

লবণনির্ভর অর্থনীতিকে কক্সবাজারের দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, “অনেক উপজেলায় লবণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে লবণের কারণে অন্যান্য কৃষি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মানুষ দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

বান্দরবান ও উত্তরাঞ্চলের উদাহরণ

তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য বান্দরবান জেলার উদাহরণ দেখিয়ে বলা যায়—কৃষি ও পশুপালনকে দক্ষতার সঙ্গে গড়ে তুলতে পারলে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

“বান্দরবান একসময় খুব পিছিয়ে ছিল, এখন তারা ১৯তম অবস্থানে। কারণ তারা কৃষি ও গবাদিপশু পালনে দক্ষতা তৈরি করেছে। আমাদের এখানেও সেটা সম্ভব ছিল, কিন্তু আমরা পারিনি,” বলেন মনজুর সাদেক।

প্রবাসী আয় আছে, কিন্তু দক্ষতার অভাব

প্রবাসী আয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি রেমিট্যান্স আসে।

“কিন্তু আমাদের লোকজন স্কিলড নয়। সৌদি আরব, আবুধাবিতে আমাদের মানুষ আছে—কিন্তু দক্ষতা না থাকায় তারা সম্মানজনক জীবন পায় না। স্কিল ডেভেলপ করলে একই মানুষ আরও ভালো আয় করতে পারত,” বলেন তিনি।

দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দের প্রস্তাব

সমাধান হিসেবে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

“এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের বরাদ্দের অন্তত ১০ শতাংশ দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় করে এবং ইউনিয়নভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ করা হয়, তাহলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব,” বলেন মনজুর সাদেক।

ভোকেশনাল শিক্ষার ঘাটতি

হাতে-কলমে কাজ শেখানোর স্কুল ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত ভোকেশনাল ও স্কিল স্কুল নেই। অথচ সামান্য ইংরেজি, আচরণগত শিক্ষা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিলে আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি হয়।”

‘দারিদ্র্যমুক্ত কক্সবাজার অসম্ভব নয়’

সবশেষে মনজুর সাদেক বলেন, “ঠান্ডা মাথায়, ডাটা নিয়ে, সঠিক জায়গায় হাত দিতে পারলে কক্সবাজারকে দারিদ্র্যমুক্ত করা অসম্ভব নয়। সম্ভাবনা আছে—প্রয়োজন শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন।”

ফান্ড সংকট, পানির যুদ্ধ ও শিক্ষার বিপর্যয়: উখিয়া–টেকনাফে ‘নলেজেবল লিডারশিপ’-এর তাগিদ

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উখিয়া ও টেকনাফের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, পরিবেশ ধ্বংস ও স্থানীয় অর্থনীতির স্থবিরতা—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘কেমন কক্সবাজার চাই’ শিরোনামের এক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন কোস্ট ফাউন্ডেশন এর সহকারী পরিচালক ও রিজিওনাল টিম লিডার জাহাঙ্গীর আলম। সংলাপটি ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের ডিপিএইচই হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়।

উখিয়া–টেকনাফের একজন ভোটার পরিচয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) অনুযায়ী ২০২৫ সালের জন্য রোহিঙ্গা সাড়ার বাজেট ছিল ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৪৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৪৬ শতাংশ।

তিনি বলেন, “সময় যত যাচ্ছে, ফান্ড তত ড্রাই হয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ বলা হলেও বাস্তবে তা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কমে গেলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে—এটা বড় চিন্তার বিষয়।”

‘নলেজেবল লিডার’ না হলে সংকট বোঝা কঠিন

জাহাঙ্গীর আলমের মতে, এই জটিল বাস্তবতা মোকাবিলায় আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব।

তিনি বলেন, “স্ট্যাটিস্টিকস না বুঝলে এই সংকটগুলো বোঝা সম্ভব না। We want knowledgeable leader—এটা এখন সময়ের দাবি।”

ভূগর্ভস্থ পানির ভয়াবহ সংকট

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২২ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় ২০ হাজার টিউবওয়েল রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এর মধ্যে ৭ হাজার টিউবওয়েল থেকে পানি ওঠে না।

তার ভাষায়, “একসময় ২০০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত। এখন ১ হাজার ফুট গেলেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য এখানে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।”

কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে প্রায় ৪০০ হোটেলে একাধিক ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পানি উত্তোলনেরও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কিন্তু আমরা নিয়ম না মেনে পানি শেষ করে দিচ্ছি।”

রোহিঙ্গা ইনফ্লাক্সে ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা

রোহিঙ্গা আগমনের পর উখিয়া ও টেকনাফের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষায়, “এখানে ভবিষ্যতে আর সচিব কিংবা মন্ত্রিপরিষদ সচিব তৈরি হবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।”

উখিয়ায় ১১টি এবং টেকনাফে ১০টি উচ্চ বিদ্যালয় ও দাখিল মাদ্রাসা থাকলেও সেখানে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের শিক্ষক সংকট তীব্র। অনেক শিক্ষক এনজিওতে চাকরি নেওয়ায় বিদ্যালয়গুলো কার্যত শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে ৩ হাজার ২০০-এর বেশি লার্নিং সেন্টার এবং ১০ হাজারের বেশি শিক্ষক।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এনজিওগুলো কি আমাদের ২০–২২টি স্কুল ও কলেজে প্যারা টিচার দিতে পারে না? বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে না?”

পরিবেশ ধ্বংস ও ‘এনভায়রনমেন্ট রিকভারি ফান্ড’-এর দাবি

রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে উখিয়া–টেকনাফে প্রায় ৪ হাজার একর জমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম।

তিনি বলেন, “এখন আর এই জমিগুলো আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব না। তাই এনভায়রনমেন্ট রিকভারি ফান্ড গঠন করা ছাড়া বিকল্প নেই।”

তার মতে, সরকার জনপ্রতিনিধি ও এনজিওগুলোকে একসঙ্গে বসে এই তহবিল বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে।

‘২৫ শতাংশ হোস্ট কমিউনিটি বরাদ্দ’ বাস্তবে নেই

রোহিঙ্গা সহায়তায় ২৫ শতাংশ অর্থ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “এটা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। জনপ্রতিনিধিদের উচিত এনজিওগুলোর কাছে হিসাব চাওয়া—২৫ শতাংশ কোথায় খরচ হচ্ছে?”

অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ফাঁকা ভবন

উখিয়া ও টেকনাফে এনজিও অফিস ভাড়ার আশায় ২০০টির বেশি ভবন নির্মাণ হলেও বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন খালি পড়ে আছে বলে জানান তিনি।

“অনেকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। আমরা একটা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছি,” বলেন জাহাঙ্গীর আলম।

স্থানীয় উৎপাদন উপেক্ষিত

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্যবহৃত লবণ, শুঁটকি ও লুঙ্গি দেশের অন্য অঞ্চল থেকে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব পণ্য যদি কক্সবাজার থেকেই সরবরাহ করা যেত, তাহলে জেলার অর্থনৈতিক চিত্র অনেকটাই বদলে যেত।

স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নের তাগিদ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৭৮টির মতো ছোট হাসপাতাল থাকার পরিবর্তে উখিয়া হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে শয্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা একদিন চলে যাবে। কিন্তু এই অবকাঠামো আমাদেরই কাজে আসবে।”

সবশেষে তিনি বলেন, “ক্ষণস্থায়ী প্রকল্প নয়, আমাদের দরকার সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট। তা না হলে এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।”

কেমন কক্সবাজার চাই: উন্নয়ন, দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মুখোমুখি প্রশ্নে নাগরিকরা

কক্সবাজার | বে ইনসাইট

আলোচনায় বক্তারা বলেন, উন্নয়নের নামে কক্সবাজারে যা হচ্ছে, তার বড় অংশই অপরিকল্পিত। নেই সমন্বিত নীতিমালা, নেই জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। ফলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন শহর ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথ হারাচ্ছে।

জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) কক্সবাজার ও কক্সবাজার কমিউনিটি অ্যালায়েন্স, ঢাকা (সিসিএডি)-এর যৌথ উদ্যোগে গত ২৪ জানুয়ারি কক্সবাজার শহরের ডিপিএইচই ওয়াশ কনফারেন্স হলে এই নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এর গবেষণা ও বিশ্লেষণ সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল বে ইনসাইট মিডিয়া গ্রুপ।

শাহ নেওয়াজ চৌধুরী
সমন্বয়ক, কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স (সিসিএডি)

“বিশ্বের যেকোনো জায়গায় যান, যেকোনো পর্যটন গন্তব্যে দেখবেন প্রতিটি রোডে এক্সচেঞ্জ হাউজ আছে। অথচ আমি কক্সবাজারে কোনো এক্সচেঞ্জ হাউজ দেখি নাই। ফরেন ইনভেস্টর আসছে—সে ডলার এক্সচেঞ্জ করবে কিভাবে?

দেখা যায়, হোটেলের পাশে একটা ছোট জায়গা আছে, সেখানে পানের দোকান দিয়ে রাখা হয়েছে, বাসের কাউন্টার দিয়ে রাখা হয়েছে। সরকার থেকে যদি এসব বিষয় দেখভাল করা না হয়, তাহলে এসব পরিবর্তন কিভাবে হবে?

এখানে কোনো পলিসি নাই, কিন্তু সবকিছু হচ্ছে—অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। দেখা যাবে, পলিসি বানাতে বানাতেই আমার সব শেষ হয়ে যাবে।”


মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর
আইনজীবী ও বিশিষ্টজন

“আমাদের এখানে সমস্যার কথা যারা বলেন, সেই সমস্যার সমাধানের মেইন প্রতিবন্ধকতা হলো—এখানে আইনের শাসন নেই, সততা নেই।

যিনি মাইক ধরে বড় বড় কথা বলেন, আইন বানান—তিনি নিজেই আইন মানেন না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। ধূমপান বিরোধী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির পকেটে সিগারেট থাকে। মাদক বিরোধী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মদ খেয়ে আসেন, চোখে-মুখে গন্ধ থাকে।

আমাদের নেতারা দুর্নীতি বিরোধী কথা বলেন, অথচ নিজেরাই বেশি দুর্নীতি করেন। তাহলে সাধারণ মানুষ কেন করবে না? রিকশাওয়ালা যে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়, সে এই সাহস করে কিভাবে? সে দেখে—তাদের নির্বাচিত নেতারা, যারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই তো তাদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়। সুতরাং তারাও নেয়।

এই যে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়—৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা—সবচেয়ে বড় দল বিএনপিও দেয় না। জামায়াত তো একটাও দেয় নাই।

আমি প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই—আপনাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, ‘আমি পরাজিত হতে পারি, কিন্তু গণতন্ত্রকে পরাজিত হতে দেব না। আমি আইনের শাসনকে পরাজিত হতে দেব না।’

তাহলেই ভোটে কারচুপি হবে না। কিন্তু যদি প্রতিজ্ঞা থাকে—মানুষ খুন করে হলেও আমাকে জিততে হবে, ক্ষমতায় যেতে হবে—তাহলে তো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।”


ছৈয়দ আলম
সভাপতি, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি

“এইভাবে চললে আরো ২০ বছর, ৪০ বছর গেলেও কক্সবাজারের উন্নয়ন হবে না।

আমি ২০০৪ সালে প্রভাবশালী এক ক্ষমতাধর মানুষের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলাম—এই ট্যুরিজমটা পরিকল্পনা করে কক্সবাজারের উদ্যোক্তাদের ছেড়ে দেওয়া হোক। তখন উনি বলেছিলেন, তারা পারবেন না, এখানে বাইরের ইনভেস্টর লাগবে।

আজ আমরা দেখি, বড় বড় মেগা প্রকল্প বাইরে লোকেরা নিয়েছে। সেখানে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। আমি মনে করি, এর পেছনে আমাদের ক্ষমতাধর নেতাদের একটা পার্সেন্টেজ কাজ করে। না হলে আমি কম দরে নিলাম আমাকে দিলো না, আপনি বেশি দর দিলেন আপনাকে কেন দিলো?

আমার অর্থ আছে, আমি বাংলাদেশের মানুষ, কক্সবাজারের মানুষ। আমি দরকার হলে এক্সপার্ট নিয়ে আসবো। তবুও আমি পারবো না কেন? শুধু বিদেশি লোকদের দিতে হবে কেন?

আর সৌদি আরব ৬৬ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দিতে বলেছে—এটাকে আমি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মনে করি। এখন তো মিয়ানমার বলছে, ওরা বাংলাদেশি বাঙালি, রোহিঙ্গা না। বাংলাদেশ সরকার যদি পাসপোর্ট দেয়, তাহলে মিয়ানমারের কথাই প্রতিষ্ঠিত হবে।”


ওমর ফারুখ
সাধারণ সম্পাদক, এনসিপি কক্সবাজার।

“রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে একটা বড় সম্ভাবনা আমরা হারিয়েছি। সেটা হলো হিউম্যানিটেরিয়ান করিডোর।

এই সমস্যাটা রাখাইনের। এটাকে যদি সমাধান করতে চান, তাহলে রাখাইনে আপনার স্টেক থাকতে হবে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ক্রাইসিসের পর রাখাইনে চায়না এবং ইন্ডিয়া স্টেক তৈরি করেছে।

অনেকে বলেন, ক্ষমতায় গেলে টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করবেন। কিন্তু প্রাগমেটিক ওয়েতে না গেলে এই বন্দর চালু করা সম্ভব নয়।”


জাহেদুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, জামায়াতে ইসলামী কক্সবাজার জেলা

“চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ছয় লেন হলেও যাতায়াত সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে, কিন্তু সেটার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

এই সমস্যাগুলোর মূল কারণ হলো—দেশে দীর্ঘদিন জবাবদিহিমূলক সরকার ও নেতৃত্ব ছিল না। আসন্ন নির্বাচনে যদি জবাবদিহিমূলক সরকার ও সৎ নেতৃত্ব তৈরি করা যায়, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

সৎ নেতৃত্ব দরকার, কারণ আমাদের দেশে সম্পদের অভাব ছিল না। তারপরও সমস্যা দূর হয়নি কেন? গত ৫৪ বছরে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে, তারা শত হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এমপি-মন্ত্রী হয়ে ব্যাংক লুট করে নিয়ে গেছে। তাই সৎ নেতৃত্ব নির্বাচন করা জরুরি।”


জাহানারা ইসলাম
সভাপতি, কক্সবাজার উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

“এখনো যদি বলি—কেমন কক্সবাজার চাই—এটা খুবই দুঃখজনক। আমাদের নিজেদের অপরাগতাকে সামনে এনে নিজেদের ছোট করার প্রবণতা কমাতে হবে।

আমাদের এখানের সবচেয়ে বড় শিল্প লবণ। সেটার ক্ষেত্রে কি আমরা কোনো বিপ্লব করেছি? আজ পর্যন্ত সেই বিপ্লব হয়নি। অথচ এখানেই আমাদের হাত দেওয়া উচিত ছিল। আমাদের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি আমাদের হাতেই।

কে কখন বিদেশ থেকে বিনিয়োগ করবে—সেই অপেক্ষায় বসে থাকলে হবে না। আমাদের সম্পদকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করা, মান উন্নয়ন করা আমাদের হাতেই। আসুন, আমরা যারা কক্সবাজারে আছি, আমরা আমাদের কক্সবাজারকে আমাদের মতো করে সাজাই—যে কক্সবাজার দেখে বিশ্ব তাকিয়ে থাকবে। সেই প্রযুক্তি, সেই দক্ষতা আমাদের অর্জন করতেই হবে।”


এম আলম
মহেশখালীর স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ কর্মী

“আমার জন্মস্থান মহেশখালী। আমরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। আমরা দেশের জন্য জমি দিয়েছি। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, আরও হবে।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে যে মহালুট হয়েছে, তার প্রতিকার কি আমরা পেয়েছি? এই যে মাতারবাড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হয়েছে—এটার ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে আমাদের কী অবদান রয়েছে? আমরা কি কোনো ফিডব্যাক পাই? কক্সবাজারবাসী কি উপকৃত হবে—এসব বিষয়ে তাত্ত্বিক কোনো তথ্যই কি আমরা জানতে পারি?”


রিয়াজ মোহাম্মদ শাকিল
সহসভাপতি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি

“সমস্যা, সম্ভাবনা, করণীয়—সব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু শেষ কথা হলো—বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেখা যাবে, আমরা ভোট দেবো একজন দুর্বৃত্তকে, একজন দখলবাজকে, একজন অসৎ লোককে।

আমাদের সকল উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা হলো দুর্নীতি। রাজনৈতিক অবস্থা বা অর্থনৈতিক অবস্থা যাই হোক না কেন, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিলে কখনো সুশাসন আসবে না। তাই যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের দুর্নীতির বিষয়ে স্পষ্ট কমিটমেন্ট থাকতে হবে।”


মুহাদ্দিস আমীরুল ইসলাম মীর
সভাপতি, ইসলামী আন্দোলন কক্সবাজার

“আমরা সুন্দর কক্সবাজার চাই। কিন্তু সেই সুন্দর কক্সবাজার গড়ে তুলতে কীভাবে করতে হয়, সেই ব্যবস্থাপনাটা আমরা নিই না।

এর মূল কারণ হলো—দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা কাজ করতে পারি না। সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।”


আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ
রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক

“পর্যটন উন্নয়নে বিকল্প চিন্তা কেউ করে না। হোটেল করছে সবাই হোটেলই করছে, রেস্তোরাঁ করছে সবাই একই ধরনের রেস্তোরাঁ করছে।

সরকারি হাসপাতালের অবস্থা দেখেন—মাটিতে পড়ে আছে রোগী। চাইলে আরও তিন-চারতলা ভবন করা যায়, লিফট বসানো যায়। কিন্তু এগুলো দেখার কেউ নেই। সরকারের পলিসিও ঠিক নেই।

আগামীতে যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের এসব বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে। সৎ নেতা হবে না যতক্ষণ জনগণ সৎ না হয়। বাংলাদেশে একজন প্রার্থীর নির্বাচনী খরচ ১০ কোটি টাকার নিচে হয় না। এই টাকা খরচ করে নির্বাচিত হওয়ার পর সে কীভাবে সৎ থাকবে? জনগণ তো সেই টাকা নিয়েছে। জনগণ যতক্ষণ সৎ হবে না, নেতা সৎ হবে না।”


শেখ আশিকুজ্জামান
সহ-সভাপতি, কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

“মিয়ানমারের ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ৯০ লাখ ডলার আটকে আছে। বৈধ চ্যানেলের বাইরেও বিভিন্ন পারপাসে পাঠানো টাকা আছে, যা আরও তিন গুণের বেশি আটকে রয়েছে।

সামনে যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাদের কাছে অনুরোধ—টেকনাফ স্থলবন্দর অতি শিগগির খুলে দেওয়া হোক। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হোক। এটা আমাদের প্রাণের দাবি।

এই সড়কের কারণে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল দেখতে হয়। তাই আমরা এই সড়কের বাস্তবায়ন আগামীতে দেখতে চাই।”


মিজানুর রহমান মিল্কি
পর্যটন উদ্যোক্তা

“তরুণ উদ্যোক্তারা সেন্টমার্টিনে বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু তারা সেই বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারছে না। সেন্টমার্টিনের ৯০ শতাংশ জায়গা এবং কক্সবাজারের কলাতলী জোনের বেশিরভাগ জায়গার মালিকানা এখন কক্সবাজারের বাইরের মানুষের হাতে।

সুতরাং সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত—কতটুকু জায়গা বাইরের মানুষ কিনতে পারবে, সেটার সীমা নির্ধারণ করা দরকার। যেটা আমরা পাহাড়ি অঞ্চলে দেখি। না হলে একটা সময় দেখা যাবে, কক্সবাজার আর কক্সবাজারের মানুষের হাতে নেই।

আর কক্সবাজারে কেউ বেড়াতে এসে চাইনিজ মাল কিনবে না। মানুষ এখানকার স্থানীয়দের তৈরি জিনিসপত্র কিনবে। সেই উদ্যোগ তৈরি করা জরুরি।”


হেদায়েত আজিজ মিঠু
সংগঠক, কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স (সিসিএডি)

“কক্সবাজারের মানুষের অন্যতম আয়ের উৎস হলো লবণ। কিন্তু এই খাত নিয়ে কে কী করছে? এখন লবণের দাম উৎপাদনের মিনিমাম খরচের অর্ধেকেও নেমে গেছে। তার মধ্যেই আবার লবণ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।

বিসিক কী করছে? বিসিক থেকে লবণ বের করে দেওয়া উচিত। বিসিক তো কোনোভাবে এই খাতকে প্রেট্রোনাইজ করছে না। বর্তমানে যে পরিমাণ লবণ মজুদ আছে, তা দিয়ে আগামী দুই বছর চলবে।

এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে কেউ আর লবণ মাঠে নামবে না। কার কী ঠেকা পড়ছে এত কষ্ট করে লবণ উৎপাদন করতে?”


মোহিব্বুল মোক্তাদীর তানিম
মূখ্য সমন্বয়ক, কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স (সিসিএডি)

“কক্সবাজার আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক নয়।

এই দায়বদ্ধতা থেকেই গত দুই বছর ধরে সিসিএডি রাজধানীতে ধারাবাহিক সংলাপ আয়োজন করে আসছে, যেখানে সরকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রতিনিধিদের জন্য বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা দিতেই এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ আয়োজন করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বয় না হলে ভবিষ্যতে কক্সবাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।”


মনোয়ার কামাল যিসান

সভাপতি, জেসিআই কক্সবাজার

“কক্সবাজারে বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন কার জন্য? স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, জীবনমান এবং নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।”