কক্সবাজার | ইনসাইট স্টোরি
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলিতে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি শিশু হুজাইফা আফনানকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিটি স্ক্যান রিপোর্ট পাওয়ার পর তার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হবে।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ
রোববার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছায় বলে জানান চমেক পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আলাউদ্দিন তালুকদার।
রাত ৯টার পর শিশুটির চাচা মৌলভী শওকত বে ইনসাইটকে বলেন, “চিকিৎসকরা শিশুটিকে আইসিইউতে নিয়েছেন। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট পাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জানিয়েছেন।”
মৃত্যুর গুজব, পরে সংশোধন
রোববার সকালে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোকন কান্তি রুদ্র প্রথমে জানান, মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী নিহত হয়েছে।
তবে দুপুরে এই তথ্য সঠিক নয় বলে বে ইনসাইটকে নিশ্চিত করেন হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল। তিনি বলেন, “শিশুটি মারা যায়নি।”
পরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস বে ইনসাইটকে বলেন, “শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্রথমে মৃত্যুর কথা শোনা গেলেও তা সঠিক নয়। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে।”
কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলো আফনান
১২ বছর বয়সী হুজাইফা আফনান টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জসিম উদ্দীনের মেয়ে। সে লম্বাবিল হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।
শিশুটির দাদা আবুল হাসেম বলেন,“সকালে আফনান নাশতা আনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। ফেরার সময় উঠানে হঠাৎ একটি গুলি এসে তাকে আঘাত করে। সে সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে।”
পরে তাকে প্রথমে উখিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বেলা ১২টার পর সেখান থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয় তার পরিবারের সদস্যরা।
সীমান্তের ওপারে কী চলছিল
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তোতার দ্বীপ এলাকা, যেটি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিপরীতে। স্থানীয়রা জানায়, যেখানে শনিবার রাত প্রায় ১১টা থেকে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলে।
এই সময় টানা গুলিবর্ষণ, মর্টারশেল বিস্ফোরণ ও ড্রোন হামলার শব্দ শোনা যায়। সংঘর্ষ চলাকালে সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে আফনানকে আঘাত করে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস জানান, “গুলিটি তার কানে লেগেছে।”
দ্বিমুখী আক্রমণে পড়ার দাবি সশস্ত্র গোষ্ঠীর
মিয়ানমারে থাকা একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একজন গ্রুপ কমান্ডার (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বে ইনসাইটকে রোববার দুপুরে ওয়াটসএপে বলেন, “আমরা দ্বিমুখী আক্রমণে পড়েছি। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। একদিকে জান্তা অন্যদিকে আরাকান আর্মি”।
তিনি জানান, “ভোর থেকে যারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, তারা নবী হোসেন গ্রুপ ও আরএসওর সদস্য হতে পারেন।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের চাপে অনেক সদস্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছেন।
‘টিকতে না পেরে পালিয়ে এসেছি’ – সশস্ত্র সদস্যের স্বীকারোক্তি
বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাদেক নামের এক যুবক গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি নবী হোসেন গ্রুপের সদস্য।
তিনি বলেন,“আমরা আরাকান আর্মির সাথে টিকতে পারিনি। তাই পালিয়ে এসেছি।”
সাদেকের ভাষ্য, “আমাদের অনেক মানুষ ছিল। কে কোথায় গেছে ঠিক নাই। তোতার দ্বীপে আমাদের সাথে আরাকান আর্মির তুমুল যুদ্ধ হয়েছে।”
উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ও সড়ক অবরোধ
এদিকে রোববার সকালে বাংলাদেশী শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী উখিয়া–টেকনাফ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ ছিল।
পরে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সীমান্তবাসীর আতঙ্ক
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা বলেন, “গত দুই–তিন দিন ধরে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তবে শনিবার রাত ১১টার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গুলিবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।”
রোববার রাত সাড়ে ৯টায় স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাকিল বলেন, “দুপুর ১২টার পর থেকে আর গুলির শব্দ পাওয়া যায়নি। এখন সীমান্ত শান্ত রয়েছে। তবে প্রায় প্রতিদিন রাত বাড়লেই গোলাগুলি শুরু হয়।”
অনুপ্রবেশ ও আটক
সংঘর্ষের মধ্যে নাফ নদী ও স্থলসীমান্ত পেরিয়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান,“সীমান্ত অতিক্রম করে আসার পর মোট ৫৩ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে।”
রাতে টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, “আটকদের থানায় আনা হয়েছে। যাচাই-বাছাই চলছে। তাদের কাছে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি। আইনী প্রক্রিয়া চলছে”।
নিরাপত্তা জোরদার, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে
উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, “সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও স্থলসীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।”
সীমান্তে আপাতত গোলাগুলি বন্ধ থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি।