কক্সবাজার | ইনসাইট স্টোরি
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চললেও, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ও পুলিশ।
তবে সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো তথ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে সংঘবদ্ধ অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টার তথ্য উঠে এসেছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
“না, আমরা কোনো প্রমাণ পাইনি। এগুলো মূলত গুজব। কয়েকটি সভায় আমরা স্পষ্টভাবে সবাইকে গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ করেছি,” বলেন তিনি।
আটক ও জব্দ: কী বলছে গোয়েন্দা তথ্য
সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর এলাকার একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের একজন সদস্য এবং একজন পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়।
পরবর্তীতে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং একটি পুলিশের ব্যাগ জব্দ করে তাদের কক্সবাজার সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা কারা
সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা হলেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্য পেকুয়ার ফজলুল হক ও পরীক্ষার্থী কুতুবদিয়ার জেসমিন আক্তার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা বে ইনসাইটকে বলেন, গোয়েন্দা তৎপরতার ভিত্তিতে ‘প্রশ্ন ফাঁসের’ অভিযোগেই তাদের আটক করা হয়। ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষার্থীকে উত্তর বলে দিচ্ছিলেন বাইরের একজন।
বে ইনসাইট জানতে চায় তা ‘ফাঁসকৃত’ প্রশ্ন কিনা? তিনি বলেন, প্রশ্ন হাতে নিয়েই উত্তর বলছিলেন বাইরে থাকা যুবক।
বড় পরীক্ষা, বড় গুঞ্জন
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবছর প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ১০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটি বড় অংশ ঝরে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ থেকে ১৫ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এই বিশাল অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়ানো নতুন কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন শাহীন মিয়া।
“১০ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কথা বলবেনই। কিন্তু এসব কথা পরীক্ষার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে এবং এমনকি পুরো পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে,” বলেন তিনি।
“সংবাদ প্রকাশ নিয়ে অভিযোগ”
কিছু সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “কিছু নিউজ চ্যানেল ‘শুনেছি’ বা ‘সম্ভাবনা আছে’ বা ‘সূত্র বলছে’ এমন শব্দ ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সব মানুষ বিষয়গুলো একভাবে ব্যাখ্যা করেন না। এতে অনেকেই মনে করেন, প্রকাশিত খবরটি হয়তো নিশ্চিত সত্য।”
তার দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত দলিল, ডিজিটাল প্রমাণ বা যাচাইযোগ্য তথ্য কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। “আমাদের কেউ এমন কিছু হাজির করতে পারেনি, একেবারেই না,” যোগ করেন তিনি।
“আটক, তবে প্রশ্ন ফাঁস নয়!”
তবে পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপরতার অংশ হিসেবে দুইজনকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন শাহীন মিয়া। তিনি বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কিছু ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।”
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, “এগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়। পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা করেছিল তারা।”
আটক দুজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে দক্ষিণ খুরুশকূল কেন্দ্র ও সিটি কলেজ কেন্দ্রের সঙ্গে।
পুলিশের অবস্থান
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছমি উদ্দিনও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কোনো ঘটনার প্রমাণ পুলিশও পায়নি।
“পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে দুইজনকে আটক করে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে,” বলেন ওসি।
তিনি আরও জানান, নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য দিয়ে কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
‘প্রশ্নপত্র সাদৃশ’ প্রশ্ন, কিন্তু মিল নেই
এদিকে বে ইনসাইট একাধিক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তথাকথিত ‘প্রশ্নপত্র সাদৃশ’ কিছু প্রশ্ন সংগ্রহ করেছে। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলোর সঙ্গে পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের কোনো মিল নেই।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রতারণা হিসেবে দেখছে পুলিশ।ওসি ছমি উদ্দিন বলেন, “এগুলো সাধারণত ভুয়া প্রশ্ন দেখিয়ে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।”
প্রশ্ন থেকেই যায়
তবে বিশাল এই পরীক্ষাব্যবস্থায় গুজব ঠেকানো, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীলতা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।